Friday, 14 June 2019


খুব ছোট বয়সে, হয়ত বারো কি তের, ভিসিআরে বাসায় সিনেমা দেখলাম ‘তিন ভুবনের পারে’। সারা বাসা, আত্মীয়, বান্ধবী মহল যখন উত্তম কুমারের ফ্যান আমি তখন ‘সৌমিত্র’ প্রেমে দিওয়ানা। দিনরাত আমার মাথায় নেচে যায় ছিপছিপে সেই তরুণের টুইস্ট ‘জীবনে কি পাবো না, ভুলেছি সেই ভাবো না’। সৌমিত্রের সিনেমা খুঁজে খুঁজে দেখা শুরু হলো। যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সেখানে সত্যজিৎ রায় অবধারিত। সৌমিত্রকে খুঁজতে যেয়ে হয়ে গেলাম সত্যজিৎ রায়ের আজীবনের ফ্যান। অপুর সংসার, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, অরণ্যের দিনরাত্রি, অশনি সংকেত কিংবা জয়বাবা ফেলুনাথ। অনেকেই বলে থাকেন সত্যজিৎ রায় নিজে লম্বা বলে, সৌমিত্রের প্রতি তার এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল কিন্তু অভিনয় দক্ষতা দেখার পর সেটাকে কি নিছক পক্ষপাতিত্ব বলার সুযোগ কি থাকে? সত্যজিৎ রায় নিজে গুণী আর মেধাবী ছিলেন, তাই তার কাজ ভাষায় কে ফুটিয়ে তুলতে পারবে তাকে খুঁজে নিতে পেরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের বেশির ভাগ সিনেমার প্রধান পুরুষ চরিত্রে ছিলেন সৌমিত্র। আর যার সিনেমার হাতেখড়ি হয়ে যায়, সৌমিত্র, সত্যজিৎ রায়ের সাথে তার সিনেমা দেখার মোড় সারা জীবনের জন্যে ঘুরে যায় অন্যরকম স্বাদের সব সিনেমাতে।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর একজনের মাঝে এরকম বহুমুখী প্রতিভা বাংলা ভাষায় বিরল। লেখা, শিশু সাহিত্য, চলচিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, আঁকা, প্রকাশক, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। প্রতিটি জায়গায় ছিল সমান দক্ষতা। উনিশো একুশ সালের দোসরা মে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে এই কিংবদন্তির জন্ম। কাছের মানুষদের কাছে সত্যজিতের ডাকনাম ছিল ‘মানিক’। ওই বাড়িটিকে এককালে বলা হতো ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’। বাংলা সাহিত্যের তীর্থভ‚মি হিসেবে স্বীকৃত এই বাড়িতে জন্মেছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, শিশু সাহিত্যের আরেক অমর নাম সুকুমার রায় চৌধুরীসহ অন্যান্য যোগ্য উত্তরসূরি। এই বাড়িতেই একদা কবি, সাহিত্যিক ও জ্ঞানী-গুণীদের মিলনমেলা বসত। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঐতিহাসিক এই বাড়িটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।


মাত্র ৫ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালে আবারো এসেছিলেন মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। সেদিন পল্টন ময়দানে প্রধান অতিথির প্রদত্ত ভাষণে বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি তার ভাষণে উল্লেখ করেন ‘আমার কুড়ি বছরের চলচ্চিত্র জীবনে বিশ্বের বহু স্থান থেকে এবং আমার নিজ দেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার, পদক এবং সম্মান লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে যে সম্মান, যে ভালোবাসা আমি পেলাম তা সবকিছুর কাছে ¤øান হয়ে গেছে। আমি কোনোদিন এই জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলব ভাবতে পারিনি। আমি বক্তা নই। আমি থাকি নেপথ্যে। ছবি আঁকি, পরিচালনা করি। আজ সকালে ঢাকায় এসে আমি যা দেখেছি তাতে আমি অভিভূত। আমি বহুদিন থেকে শহীদ দিবসের কথা শুনে আসছি। কিন্তু এখানে এসে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না আপনারা বাংলাভাষাকে কতখানি ভালোবাসেন।’


এই সতেরই মার্চ ‘থেস্পিয়ানস নেদারল্যান্ডসের’ আমন্ত্রণে এসেছিলেন সত্যজিৎ পুত্র প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক সন্দীপ রায়, তাঁর স্ত্রী ললিতা রায়, অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী আর প্রযোজক সামিয়া জামান। ঠাণ্ডা, বৃষ্টি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোববারের সন্ধ্যায় এত মানুষের সমাগম দেখে, সন্দীপ রায় ঘরোয়া আড্ডায় যাকে বাঙালির চিরাচরিত ডাক নামের ঐতিহ্য ধরে সবাই ‘বাবুদা’ নামে ডাকে, অভিভ‚ত হয়ে বলেই ফেললেন, ‘বাবাকে সবাই এত ভালোবাসে আমি কল্পনাই করতে পারিনি, এই আবহাওয়া দেখে আমি ভাবিনি যে গোটা পঞ্চাশেকের বেশি লোক হবে, অথচ হল কানায় কানায় পূর্ণ।’ সন্দীপ রায় সাথে নিয়ে এসেছিলেন, সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথের স্কেচ ও বুকলেট, আগ্রহীরা পরম যত্নে তা সংগ্রহ করেছেন। এমস্টেলভিনের এক থিয়েটারে সামিয়া জামানের প্রাণবন্ত পরিচালনায় এক ঘরোয়া আড্ডায় জানা গেলো অনেক অজানা তথ্য। সত্যজিৎ রায় যাকে বাংলার আগাথা ক্রিস্টি বলে অনেকে আর তার লেখা অনবদ্য চরিত্র ‘ফেলুদা’ যাকে স্কটিশ লেখক ও চিকিৎসক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের সমকক্ষ বাংলা চরিত্র বলে ধরে নেয়া হয়, সেই ‘ফেলুদা’কে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়ার জন্যে প্রযোজক পেতেন না। শিশুতোষ চলচিত্রের প্রতি প্রযোজকদের অপরিসীম অনীহা কাজ করতো। স্রেফ টাকার জন্যেই তাঁর অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও ‘ফেলুদা’ সিরিজের আরও সিনেমা বানানো বাদ থেকে গেলো। কালজয়ী এই চরিত্রের এ বছরে ৫০ বছর পূর্তি হলো। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে সন্দেশ পত্রিকায় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি প্রকাশিত হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ওই সিরিজের ৩৫টি সম্পূর্ণ ও ৪টি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়।


তবে অবস্থার এখন অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, এখন বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে ‘ফেলুদা’ এক জনপ্রিয় চরিত্রের নাম আর তিনি শুধু শিশু-কিশোরদের কাছেই আটকে নেই, বড়দের পৃথিবীতেও তার অনবদ্য বিচরণ। সন্দীপ রায় পিতার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে তৈরি করে যাচ্ছেন একের পর এক ‘ফেলুদা’। প্রযোজকরা নাকি এখন বলেন, ‘একটা অন্য সিনেমা বানিয়ে দিন আর দুটো ফেলুদা।’ সেই নিয়ে গল্প করতে যেয়ে সন্দীপ রায় বললেন, তাঁর বাবার সময় থেকেই অন্য সব সিনেমার শুটিং যেমন হোক হয়ে যায় কিন্তু ‘ফেলুদা’ করতে গেলে একটার পর একটা বাধা আসবেই। কখনো দ্বিগুণ কিংবা কখনো তিনগুণ খরচা হয়ে যায় ‘ফেলুদা’র শুটিংয়ে। দেখা যাবে লোকেশনে কিছু না কিছু সমস্যা হবে, নইলে অভিনেতা-অভিনেত্রী অসুস্থ, নইলে পুলিশের ঝামেলা ইত্যাদি। একবার ব্যাংকক থেকে শুটিং শেষে ফেরার পথে দমদমে কাস্টমস তাদের নেগেটিভ আটকে দেয়। সেই নেগেটিভ কাস্টমস থেকে বহু কষ্টে উদ্ধার করে পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পাঠানো হলেও পঁচাত্তর শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছিল বলে আবার শুটিং করতে হলো।

‘ফেলুদা’ এখন শুধু বাংলায় আটকে নেই। হিন্দি সিনেমার প্রযোজকরাও ‘ফেলুদা’ নিয়ে সমান আগ্রহী। একটি সিনেমা হিন্দিতে তৈরি হওয়ার পর বাবুদা দেখলেন, একটা সুন্দর সিনেমা হলো বটে কিন্তু ‘ফেলুদা’ হলো না। ‘ফেলুদা’ বলতে যে টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত বাঙালি আমেজ আছে সেটি হিন্দিতে কিংবা অন্য কোনো ভাষায় আনা প্রায় অসম্ভব। যেমন- লুচি, আলুর দম আর গুড়ের সন্দেশ কিংবা সুক্তো আর ইলিশ ভাজা’র যে সংস্কৃতি, বাঙালির প্রাণে যে আবহটা তৈরি করে সেটিকে অন্য ভাষায় আনতে গেলে, ‘ফেলুদা’ আর ‘ফেলুদা’ রইলো কোথায়! সে তো অন্য এক চরিত্র দাঁড়িয়ে গেলো। তাছাড়া কিছু কিছু কথা’র সে স্বাদ, রস যা বাঙালি’র কাছে এক ধরনের দ্যোতনা তৈরি করে সেগুলোকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করলে তার অর্থই হারিয়ে যায়, যেমন :

তবে রে
কিংবা বটে

এর হিন্দি বা ইংরেজি পাওয়া যায়? না আক্ষরিক অনুবাদ সেই স্বাদ এনে দিতে পারে? তাই বাঙালির ‘ফেলুদা’ বাঙালি হয়ে রয়ে গেছেন বাংলাতেই। সন্দীপ রায়ের সাথে বর্তমানে ফেলুদা হিসেবে আছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। অভিনেতা হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার কিন্তু আমার কাছে ফেলুদা সৌমিত্রই। ছোটবেলার পছন্দ বলে কথা। সত্যজিৎ রায় ছাড়া সে সময় তার মানের যে চলচ্চিত্র পরিচালকরা ছিলেন বিশ্বজুড়ে, কেউ শিশুদের নিয়ে কাজ করেননি। তিনিই এই ব্যাপারে এক মাত্র ব্যতিক্রম। অর্থনৈতিক ব্যাপারটা তিনি বরাবরই কম গুরুত্ব দিতেন, কাজটাই তার কাছে মুখ্য ছিল। সোসাইটি ফর দ্য প্রিজারভেশন অব সত্যজিৎ রায় আর্কাইভস প্রতি বছর ফেলুদা প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে দক্ষিণ কলকাতার লি রোডের নাম পাল্টে হয়েছে সত্যজিৎ রায় ধরণী। এই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁর জীবনের অনেকখানি সময় কাটিয়েছিলেন লি রোডের কাছের রাস্তা বিশপ লেফ্রয় রোডে। কাজেই, সেই সুবাদে লি রোডের নাম পাল্টে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।


তবে শুধু ফেলুদা নিয়েই নয়, সত্যজিৎ ঠিক করেন যে, বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী ‘পথের পাঁচালী’ই হবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। ১৯৫২ সালের শেষদিকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রাথমিক দৃশ্যগুলো দেখার পর হয়তো কেউ ছবিটিতে অর্থ লগ্নি করবেন। কিন্তু সেই আশার গুড়েবালি। সে ধরনের আর্থিক সহায়তা মিলছিল না তাঁর। ‘পথের পাঁচালী’র দৃশ্যগ্রহণ তাই থেমে থেমে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পন্ন হয়। কেবল তখনই দৃশ্যগ্রহণ করা সম্ভব হতো, যখন সত্যজিৎ বা নির্মাণ ব্যবস্থাপক অনিল চৌধুরী প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান করতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ওই বছরই সেটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ছবিটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে এবং সেই সঙ্গে বহু পুরস্কার জিতে নেয়। বহুদিন ধরে ভারতে ও ভারতের বাইরে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। ছবিটি নির্মাণের সময় অর্থের বিনিময়ে চিত্রনাট্য বদলের জন্য কোনো অনুরোধই সত্যজিৎ রাখেননি। এমনকি ছবিটির একটি সুখী সমাপ্তির (যেখানে ছবির কাহিনীর শেষে অপুর সংসার একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্পে’ যোগ দেয়) জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধও তিনি উপেক্ষা করেন।


অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, সত্যজিতের মতো বরেণ্য মানুষের নিজের কোনো বাড়ি ছিল না; মা, মামা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এক ভাড়া বাড়িতেই সারা জীবন কাটিয়ে দেন তিনি। তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় ও ছেলে সন্দীপ রায় দুজনেই সত্যজিতের কাজের সঙ্গে ছিলেন জড়িয়ে। বেশির ভাগ চিত্রনাট্য বিজয়াই প্রথমে পড়তেন এবং ছবির সঙ্গীতের সুর তৈরিতেও তিনি স্বামীকে সাহায্য করতেন। আয়ের পরিমাণ কম হলেও নিজেকে বিত্তশালীই মনে করতেন সত্যজিৎ। কেননা পছন্দের বই বা সঙ্গীতের অ্যালবাম কিনতে কখনোই কষ্ট হয়নি তাঁর।


চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তাঁর কাজের পরিমাণ ছিল বিপুল। তিনি নির্মাণ করেছেন ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তাঁর কাজের ‘ভার্সেটাইল’ রূপটি চির স্মরণীয়, অরণ্যের দিনরাত্রির পরিচালককে হীরক রাজার দেশেতে মিলিয়ে ফেলা শক্ত। অরণ্যের দিনরাত্রিতে চার শহুরে তরুণ ছুটিতে বনে ঘুরতে যায় এবং একজন বাদে সকলেই নারীদের সাথে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে যা তাদের মধ্যবিত্ত চরিত্রের নানা দিক প্রকাশ করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন যদিও এই নিয়ে আমার সামান্য অনুযোগ আছে রায় সাহেবের প্রতি, চলচ্চিত্রে রূপ দিতে যেয়ে প্রায়ই তিনি মূল লেখা থেকে সরে যেতেন। হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন, যেটিতে তাঁর রাজনৈতিক মতামতের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ছবিটির চরিত্র হীরক রাজা ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা ঘোষণাকালীন সরকারের প্রতিফলন। সত্যজিতের ছেলে স›দ্বীপের অনুযোগ ছিল তিনি সবসময় বড়দের জন্য গম্ভীর মেজাজের ছবি বানান। এর উত্তরে ও নতুনত্বের সন্ধানে সত্যজিৎ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন তাঁর সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন। এটি ছিল সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্র কিশোরের লেখা ছোটদের জন্য একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানানো সঙ্গীতধর্মী রূপকথা। গায়ক গুপী ও ঢোলবাদক বাঘা ভ‚তের রাজার তিন বর পেয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে ও দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আসন্ন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করে। ছবিটির নির্মাণকাজ ছিল ব্যয়বহুল, অর্থাভাবে সত্যজিৎ ছবিটি সাদা-কালোয় তৈরি করেন। অশনি সংকেত ছবিটির পটভ‚মি ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ফলে ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই দুর্ভিক্ষ কিভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল তা-ই এই ছবির মূল উপজীব্য। বর্তমানে এই ছবিটি ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গাইড টু দ্য বেস্ট ১,০০০ মুভিজ এভার মেড’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে একটি ছবি তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এই মন্তব্য করে যে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি শরণার্থীদের বেদনা ও জীবন-অভিযাত্রার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন, তাদের নিয়ে রাজনীতির প্রতি নয়।


যদিও বহুবিধ নান্দনিক শাখায় তাঁর পদচারণা ছিল কিন্তু তাঁর স্বীকৃতি আর পুরস্কার এসেছে চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমেই, সারা বিশ্বের মানুষ তাকে ধ্রুপদী চলচিত্র পরিচালক হিসেবেই জানে। চিত্রসজ্জা বা ভিজ্যুয়াল ডিজাইন সত্যজিতের পছন্দের একটি বিষয় ছিল এই দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। সত্যজিৎ তাঁর জীবদ্দশায় পেয়েছেন বহু সম্মাননা ও পুরস্কার। তিনিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার সত্যজিৎকে সে দেশের বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার ‘লেজিওঁ দ’নর’ ভ‚ষিত করে। ১৯৮৫ সালে তিনি পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস এন্ড সায়েন্সেস তাঁকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে। ওই সময়টায় ভারত সরকার তাঁকে দেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’। সেই বছরেই মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর ‘আকিরা কুরোসাওয়া’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রয়াত পরিচালকের পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর।


Thursday, 11 April 2019

জার্নাল ২০১৯

“ এদেশের মুসলমান এক সময় মুসলমান বাঙালি, তারপর বাঙালি মুসলামান, তারপর বাঙালি হয়েছিলো; এখন আবার তারা বাঙালি থেকে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি মুসলমান থেকে মুসলমান বাঙালি, এবং মুসলমান বাঙালি থেকে মুসলমান হচ্ছে। পৌত্রের ঔরষে জন্ম নিচ্ছে পিতামহ ”
হুমায়ূন আজাদ


রাজনীতি মার্কেট, মাদ্রাসা একটা প্রোডাক্ট আর জনগন তার কনজিউমার। "ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই" এর চিরতরের নীতি কাজ করবেই। রাজনীতিবিদরা মার্কেট সার্ভে করেই ব্যবসায় নেমেছে, তাদেরও তো দুটো করে খেতে হবে। মার্কেট বদলে গেলে, কনজিউমার না থাকলে, প্রোডাক্ট অটোমেটিক বদলে যাবে। উদাহরণ দিলাম না, ইউরোপে থেকে উদাহরণ দিলেই গালি খেতে হবে তবে অন্তর্জালের যুগে ইতিহাস সবার হাতের মুঠোয়।

শফি হুজুরের মাদ্রাসায় পড়ছে কারা? রাজনীতিবিদ্গনের ছেলেমেয়ে? শফি হুজুরের ওয়াজ শুনতে যায় কারা? মন্ত্রী-আমলা বড় ব্যবসায়ীরা? যারা যান, তারা বদলান, বাকি কিছু নিজ থেকেই বদলে যাবে। ইতিহাস সাক্ষী
ঠিক যে সময় বিজ্ঞানীরা "ব্ল্যাক হোলের" ছবি তুলেছে সে সময়ই "যুগান্তর" আগুন নেভার দোয়া ছেপেছে। "যুগান্তর" ব্যবসা করতে নেমেছে, সমাজসেবা নয়, তারা জানে এ দেশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা বিশ্বাস করে, "দোয়া" পড়লে আগুন নিভে যাবে শুধুমাত্র সে জন্যই তারা আগুন নেভার দোয়া ছাপিয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে প্রধানমন্ত্রী একা কেন দায়ী হবে? সমান দায় কেন আপনার-আমার নয়? প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিলেই সতের কোটি মানুষের মানসিকতা বদলাবে না, দশ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও এই "কনফিউজড" জাতির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। প্রতিনিয়ত ঘটনাগুলো যে স্থানে ঘটছে তাতে প্রমানিত, সৃষ্টিকর্তা কত অসহায়, তবে কেন সব প্রধানমন্ত্রীর দায়! ক্ষত থাকবে কিন্তু ক্যান্সার না, সম্ভব?

নিভিয়ে প্রদীপ দীর্ঘ করে রাত
প্রতিবাদে চলে গেলো মনির-নুসরাত
বৃথা যেতে দিও না এই বলিদান
বদলে যাও, গাও মানবতার গান

11..04.2019

Wednesday, 3 April 2019

“দেবী” ও “ডুব” বৃত্তান্তঃ

অনিমেষ আইচঃ “রানু”র স্বামী চরিত্রে তিনি যথার্থ। সারাক্ষণ প্যান্ট-শার্ট পরে তৈরী কখন বউকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। রাতেও বেচারা কাপড় বদলায় না। পকেটে সবসময় টাকা পয়সাও রেডী আছে। আজকালের যুগে যেখানে প্রায় কারণ ছাড়াই, যেমন, বউয়ের নাক পছন্দ হয় না, কিংবা বউ ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে, কিংবা বউয়ের শাড়ির রঙ পছন্দ হয় না অজুহাতে ছেলেরা বউ ছেড়ে দেয়, সেখানে সে বিরল প্রজাতির স্বামী তো বটেই। “আজকাল” কথাটা বললাম, সিনেমায় মোবাইল এবং ফেসবুক এনে অরিজিন্যাল গল্পটাকে মর্ডানাইজ করা হয়েছে।

জয়া আহসানঃ আমার খুব পছন্দের মানুষ, স্টাইল আইকন। “রানু” চরিত্রটি আধা গ্রাম্য একটি মেয়ের ছিলো (অনেক আগের পড়া বইটি, স্মৃতি থেকে বলছি)। প্রিন্টের শাড়ি – ব্লাউজ পরে, লেপ্টে কাজল দিলেই পুরোদস্তুর “আরবান” লুক বদলে ফেলা যায় না! আমার ব্যক্তিগত ধারনা, জয়া এই চরিত্রটি নিজে না করে অন্য কাউকে দিয়ে করালে আরও ভাল করতেন। সুচিত্রা সেনকে যেমন পুরো গ্রাম্য মেয়ের চরিত্রে ঠিক ভেবে ফেলা যায় না, জয়াকে নিয়েও তেমনটিই। তবে এটা পুরোই হয়ত আমার সমস্যা।

চঞ্চল চৌধুরীঃ “আয়নাবাজি” সিনেমাটা ততখানি ভাল না লাগলেও চঞ্চল চৌধুরীকে অসাধারণ লেগেছিলো। মনপুরাতেও লেগেছিলো। এখানেও লেগেছে। তবে অনেক কয়টি মিসির আলী বই পড়াতে মিসির আলী ভাবলেই আরও একটু বুড়ো অধ্যাপক চেহারা কল্পনায় আসে। তারপরও তাকে খারাপ লাগে নি।

শবনম ফারিয়াঃ “নীলু” চরিত্রে এই মেয়েটিকে সবদিকে অসাধারণ লেগেছে। পার্ফেক্ট কাস্টিং।

ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে ইউটিউবে “ডুব” পেয়ে হতবাক আমি ইউরেকা ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। ঝকঝকে প্রিন্ট। বেশ কিছুক্ষণ দেখে ফেললাম কিন্তু কোন আওয়াজ নেই। আমরা যারা চুরির ওয়েবসাইটে সিনেমা দেখে অভ্যস্ত, তারা জানি, জীবন প্যারাময়। বেশ কিছুক্ষণ সামনে টেনে দেখলাম শেষের দিকে কিছু কথা শোনা যায়। সন্দেহ হলো, ঠিক ঠিক “ডুব” কিনা, আমার ফেসবুকের এক মুভি ফ্রীক বন্ধু আপাকে লিঙ্কটা দিয়ে চেক করতে বললাম, তিনি “ডুব” নিয়ে বিশাল এক রিভিউ লিখেছিলেন। তিনি চেক করে আমাকে সন্দেহমুক্ত করে জানালেন, ইহাই উহা। আমি বললাম, সমস্যা কি? সাউন্ড প্রব্লেম? ঠিক করে আপ্লোড করে নি, চোরাই? তিনি আবারও আশ্বস্ত করে জানালেন, না, ইহাই মূল সিনেমা।

আমার একটাই শব্দ মনে হলো, ক্র্যাপ।

যাই হোক, আরও আধ ঘন্টা আগে- পিছে ধস্তাধস্তি করিয়া সেদিনের মত ক্ষান্ত দিয়া পরে একদিন দেখিয়া লইব ভেবে বিলাসীর খুঁড়ো মুডে অন্য সিনেমা নিয়া বসিলাম। তারপর আবারও একদিন পিঠ শক্ত করিয়া, আজকে হ্যাঁ আজকেই ভেবে ডুবাইতে বসলাম, এবং যথারীতি আধ ঘন্টা পর বন্ধ করিয়া ডান হাতখানি বাম গালে রাখিয়া ভাবিতে বসিলাম, জাতি কি আমার এই অপারদর্শিতা মানিয়া লইবে?

না, ডুবের নির্মাতা, কলাকৌশলীদের প্রতিভা নিয়ে আমার কেন গোটা জাতিরই কোন সন্দেহ নেই। তবে, এই জাতি এই “চার্লি চ্যাপলিন” মার্কা আধা মূকাভিনয় সিনেমা দেখার জন্যে কতটুকু উপযুক্ত হয়েছে সে নিয়ে সন্দেহটা জাতিভুক্ত হিসেবে আমার নিজের প্রতি নিজের রয়েই গেলো।


Sunday, 31 March 2019

দেশের প্রথা ভাঙা গদ্যসাহিত্য

https://www.bhorerkagoj.com/2019/02/16/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%BE-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE-%E0%A6%97%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B9/?fbclid=IwAR3Y4cnE01EgVf78lD9qyKb2XwqyjkWIuhBG8t6qsXUSu--u59qbwYMyW8A


বাংলাদেশের প্রথা ভাঙা গদ্যসাহিত্য
তানবীরা তালুকদার

স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশের রাজনীতির নিদারুন পতন-উত্থান, বেল বটম প্যান্ট আর বড় ঘড়ি পরার ফ্যাশন, ফেরদৌস ওয়াহিদ, আজম খান, ফকির আলমগীর, পিলু মমতাজ এর আধুনিক ঢং এর  বাংলা গান, নায়ক রাজ রাজ্জাকের রংবাজ, সালাউদ্দিন জাকীর ঘুড্ডি, আলমগীর কবির এর সীমানা পেরিয়ে-নতুন নিরীক্ষায় ঢাকার বাংলা সিনেমা, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, দেওয়ান গাজীর কিসসা, কথা ৭১ এর মত সাড়া জাগানো মঞ্চ নাটক, সুর্বণা-আফজাল এর পারলে না রুমকী, বুলবুল আহমেদ অভিনীত ইডিয়ট, বরফ গলা নদীতে মিতা চৌধুরি, ফেরদৌসী মজুমদার এর কালো স্যুটকেস মত টিভি নাটকের আধুনিকতার ছোঁয়ায় চারদিকে প্রথা ভাঙার বা নতুনের জয় কেতনের ওড়ানোর সময় চলছিল। এর থেকে বাদ যায় নি বাংলা সাহিত্যও। সাহিত্যের শাখা অনেক বিস্তৃত, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ কি নয়। কবিতায় রাজত্ব করেছেন, শামসুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, হুমায়ূন আজাদ, শহীদ কাদরী প্রমুখ। জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, আনোয়ার পাশা, মুনীর চৌধুরিদের অনুপস্থিতিতে বাংলা উপন্যাসকে সামনে এগিয়ে নিতে এসেছেন সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন, শওকত ওসমান, আহমদ ছফা, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ। এখানে শুধু কয়েকটা গদ্য নিয়ে আলোচনা করবো, সাহিত্যের সব শাখা নিয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে একটা বড় উপন্যাসের চেয়েও বড় হয়ে যাবে লেখা।

স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রয়াত লেখক সৈয়দ শামসুল হকের হাত ধরে সম্ভবত প্রথম নেতিবাচক চরিত্রের নায়কের আগমন ঘটে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যে। খেলারাম খেলে যাউপন্যাসের নায়ক বাবর আলী টেলিভিশনের জনপ্রিয় একজন উপস্থাপক যিনি একা থাকেন ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে। তিনি সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ তরুণীদের সাথে সঙ্গমে প্রবল আগ্রহ বোধ করেন। বাংলা সাহিত্যে এই উপন্যাসটিকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে বরাবর কিন্তু উপন্যাসে বাবর আলীর চরিত্রের অন্যান্য দিক গুলো কেমন করেই যেনো অনেক পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। আত্মদহন, মনের গভীর গোপন দুঃখ শরীরের উত্তাপে শীতল করে বেঁচে থাকতে চাইতো বাবর আলী। এই উপন্যাসটিই সম্ভবত বাংলাদেশের পাঠককূলের দ্বারা সবচেয়ে ভুল দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা উপন্যাস। লেখকের নিজের ভাষাতে,
রচনার প্রায় কুড়ি বছর পরও এর জন্যে আমাকে আমার অন্যান্য রচনার চেয়ে অনেক বেশি জবাবদিহি করতে হয়।আমি খুব কম পাঠককে জানি, যিনি উপন্যাসের একেবারে শেষ বাক্যটি লক্ষ্য করেছেন। আমার বিশ্বাস, এই শেষ বাক্যটিতে দাঁড়িয়ে কেউ এ উপন্যাসের জন্যে আমাকে তিরস্কার করতে পারবেন না।
সর্বদা অস্থিরতায় ভোগা এক মানুষ বাবর, যে মাঝে-মাঝেই আক্রান্ত হয় একাকীত্বে। উপন্যাসে সেই প্রসঙ্গ বারবার ফিরে ফিরে আসে। তাকে যেন ঠিক চেনা যায় না, জগৎ যে চেনে, যার নিজস্ব কিছু দার্শনিক চিন্তা মাঝে-মাঝে চমকে দিয়ে যাচ্ছে পাঠককে। বাবর আলীর কিছু ভাবনা যা আমাকে ছুঁয়ে গেছে,
তুমি আছ অতীত ভবিষ্যতের মাঝখানে, আগেও যেখানে ছিলে, পরেও সেখানে থাকবে।
কিংবা
যা ভাল লাগে তা ধরে রাখা বোকামি। মানুষ ধরে রাখতে চায় বলেই দুঃখ পায়। আসলে সব কিছুই একটা স্রোতের মত। সুখ, ঐর্শ্বয, জীবন, আকাশ, বিশ্ব, মহাবিশ্ব, ছায়াপথ, তারকাপুঞ্জ, সব কিছু। সমস্ত কিছু মিলে আমার কাছে প্রবল শুভ্র জ্বলন্ত একটা মহাস্রোত মনে হয়। দুঃসহ কষ্ট হয় তখন। আমার জীবনে যদি একটা কোন কষ্ট থাকে তাহলে তা এই। এই মহাস্রোতের সম্মুখে আমি অসহায় তুচ্ছ, আমার অপেক্ষা সে রাখেন না। তুমি আমি এই শহর, মহানগর, সভ্যতা সব অর্থহীন বলে মনে হয়। আমি কি করলাম, তুমি কি করলে, ন্যায়-অন্যায় পাপ-পূণ্য, মনে হয় সবই এক, সব ঠিক আছে কারণ সবই কত ক্ষুদ্র।
এসব ভাবনায় কি আমরা আসলে আলাদা বাবর আলীকে দেখতে পাই না? আমরা দেখি, বাবর আলী চট্টগ্রামে দুপুরে ঘুমিয়ে তার বাবাকে স্বপ্ন দেখেছে আর রাতে ফেরার পথে বিমানে বসে রাতের ঢাকাকে ছেলেবেলার জোনাক জ্বলা বনের মতলাগছে। জোনাক জ্বলা বনআর কাজলা দিদিযেন বাঙালির শৈশব-কৈশোরের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।  উপন্যাসের শেষে দেখি বাবর জাহেদা নয় হাসনুকেই উদ্ধার করেছে। কৈশোরে বোনকে রেখে পালিয়ে আসার ফলে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল সীমাহীন গ্লানি, অপরাধবোধ, যন্ত্রণা ও অনুতাপ; এসব ভুলে থাকার জন্য সে বেছে নিয়েছিল প্রতারণা ও লাম্পট্যের পথ, আর নিজের পরস্পবিরোধী এই দুটো চরিত্র তাকে করে তুলেছিলো দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ।

চিলেকোঠার সেপাইআখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা বাংলা সাহিত্যের আর একটি মাইলফলকমেদহীন লেখা, কল্পনার রামধনুতে ভর করে হেঁটেছেন তিনি ভিন্ন পথে। রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি থাকে। সমসাময়িক ঘটনার বাস্তবতা আর লেখাতে যদি অমিল থাকে তাহলে সাথে সাথে পাঠকের সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। খেঁটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণি, বস্তিবাসী, গ্রামের সাধারণ মানুষরাই তার উপন্যাসের চরিত্র, কোন নামকরা, বিখ্যাত মানুষজনদের তার উপন্যাসে রাখেন নি। উপন্যাসের নায়ক আসলে উনিশো উনসত্তর সাল। এ সময়টিকে ধারণ করে আছে তৎকালীন পূর্ববাংলার ঐতিহাসিক গণজাগরণ। ইতিহাসের এ সময়কে চিত্রিত করতে আন্দোলিত সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে অনেক চরিত্রকে তুলে ধরেছেন লেখক। তাই সে সময়ের অনুষঙ্গ হিসেবে দুটি বিষয় এসেছে এ উপন্যাসে- মিছিল ও রাজনীতি।গল্পের প্রধান চরিত্র রঞ্জু ওরফে ওসমান, ওসমানের বন্ধু আনোয়ার আর আলতাফ। সাথে আছে রিকশা চালক খিজির। আলতাফ ডানপন্থী আর আনোয়ার বামপন্থী। এই দুই বন্ধুর কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে লেখক সে সময়ের মানুষের দুই ধরনের রাজনৈতক চিন্তা ভাবনার সাথে আমাদেরকে বিশদ ভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন। ঢাকার এক সস্তার গলিতে ওসমানের বাসা, এক অফিসের সাধারণ চাকুরে সে, তার বাড়িওয়ালা পাকিস্তনাপ্রেমী রহমতউল্লাহ। রহমতউল্লার এর কাছে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে খিজির, এখন তার রিকশা চালায়, তার গ্যারাজেই থাকে। 

উপন্যাসে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দুটি প্রধান আঙ্গিক হলো ব্যক্তি ও সমষ্টি। ওসমান যে কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি এড়িয়ে চলে, আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে চিলেকোঠার ব্যক্তিমানস। সমষ্টি তথা শোষিত শ্রেণির মানুষরা এসেছে মিছিলের রূপে, সংগ্রামী ঐক্যতান নিয়ে। উনিশো উনসত্তরের মিছিল বর্ণনায় লেখকের  ভাবাবেগ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উৎসারণ, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নিষ্পেষণ থেকে হাজার বছরের বাঙালি অস্তিত্ব রক্ষাই ছিল এ মিছিলের মূল উদ্দেশ্য। তাইতো এ মিছিলের উত্তাপ, অস্তিত্ব-বিচ্ছিন্ন ওসমান চরিত্রটিকেও কাছে টেনে নিতে পেরেছিলো। 
পুরান ঢাকার খিস্তি খেউড় তুলে ধরা আখতারুজ্জামানের লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনেক পাঠক সাবলীল এ খিস্তি খেউড়কে অশালীন বলে মন্তব্য করেন। চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে তুলে ধরতে সাবলীল ভাষার ব্যবহার আর উপমার কোন বিকল্প নেই। আর এ দু জায়গাতেই তিনি ছিলেন অনায়াস।

আবু ইসহাকের সূর্য-দীঘল বাড়ীউপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে দিয়েছে নতুন মাত্রা। উপন্যাসটিতে দেখানো হয়েছে মানুষের আলো-অন্ধকার পথ। কুসংস্কারের ভেতর প্রবেশ করে নগ্ন করে দেখানো হয়েছে কুসংস্কারের প্রকৃত মূর্তি। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ছিল উনিশো তেতাল্লিশ সালের দুর্ভিক্ষ,  উনিশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ, নবগঠিত পাকিস্তান নিয়ে বাংলার মানুষের আশাভঙ্গ,  গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, মোড়ল শ্রেণির মানুষের ষড়যন্ত্র, সর্বোপরি গ্রামীণ নারীর জীবন সংগ্রাম ও প্রতিবাদী চেতনা। বইটি স্বাধীনতার আগের প্রকাশনা হলেও সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সমসাময়িক পরিস্থিতির সাথে সামান্য সূতা সম পার্থক্য ছিলো না। নিতান্ত বাঁচার আশায় স্বামী পরিত্যক্ত জয়গুন এক বুক আশা ও চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে ছেলেমেয়েকে সঙ্গে করে শহরে যায় কাজ ও খাদ্যের সন্ধানে। শহরের মজুতদারের গুদামে চালের প্রাচুর্য, হোটেলে খাবারের সমারোহ তাদের আকৃষ্ট করেছিল শহরে যেতে।  শহরের অলীক বা মিথ্যা হাতছানি তাদের শহরের বুকে ঠাঁই দেয়নি, বরং দূর করে দিয়েছে গলাধাক্কা দিয়ে। অসহায়ের সহায় তখন একমাত্র থাকে গ্রামের পরিত্যক্ত অপয়া ভিটে সূর্য-দীঘল বাড়ীজীবিকার তাগিদে সে চাল ফেরি করার কাজ নেয়। গ্রামের মাতব্বর মৌলবিরা জয়গুনকে ধর্মের শৃঙ্খলে বন্দি করতে চেয়েও পারে না বলে প্রতিশোধ স্পৃহায় জ্বলতে থাকে সবসময়। জয়গুন তোবা না করলে মৌলবী তার মেয়ের বিয়ে পড়াতে পারবে না বলে গ্রামের মাতব্বর রায় দিলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে সে বলে,
তোবা আমি করতাম না। আমি কোন গোনা করি নাই। মৌলবী সাব বিয়া না পড়াইলে না পড়াউক। আমার মায়মুনের বিয়া দিমু না।
কিন্তু প্রতিবাদকণ্ঠী জয়গুনকে বাস্তবতার কাছে পরাস্ত হতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক বলয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে একজন প্রতিবাদী নারীকে তার মেয়ের ভবিষ্যৎ-জীবনের কথা ভেবে মিথ্যে অপবাদ গায়ে মেখে হার স্বীকার করে নিতে হয়। জয়গুন সকলের সামনে তওবা করে। এত কিছুর পরও অভাবের তাড়নায় গ্রামে আর টিকতে পারে না জয়গুন। বিভিন্ন ঘটনা পরস্পরায় আবার জয়গুনের প্রতি মমতা জাগে প্রাক্তন স্বামী করিম বকশের। জয়গুনকে রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয় সে সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছের তলায়। গ্রামের লোক ছুটে আসে দেখতে। সকলেইএকমত,‘সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূত তার গলা টিপে মেরেছে।
এ ঘটনার পর জয়গুন আর এক মুহূর্ত থাকতে চায়নি সেখানে। তার ভেতরের সকল শক্তি যেন খান খান হয়ে যায় এক দমকায়। আবার সেই অজানার পথে পা বাড়ায় জয়গুন। ছেলেমেয়ের হাত ধরে জয়গুন ও শফির মা বেড়িয়ে পড়ে। তাদের একমাত্র ভরসা এই আল্লাহর বিশাল দুনিয়ায় কোথাও না কোথাও একটু জায়গা তাদের ঠিকঠাক মিলে যাবে।
অত্যন্ত সহজ ভাষায় লেখা এই বইটি ধরে রেখেছে অনেক গভীরতা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক হুয়ামূন আহমেদ। প্রথম উপন্যাসেই নজর কেড়েছিলেন সুধীজনদের।
ড. আহমদ শরীফ বলেছিলেন, “হুমায়ুন আহমেদ বয়সে তরুন, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবন রসিক,স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকায়। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন-এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।
আমাদের নিরাশ করেন নি তিনি। জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন তিনি, তরুণ সমাজের ক্রেজ। নন্দিত নরকেঢাকার মধ্যবিত্ত জনগনের আশা, নিরাশা, প্রেম, হতাশার যেনো এক শিল্পিত প্রামান্যচিত্র। উত্তম পুরুষে লেখা এই উপন্যাসে প্রথা মেনে কোন নায়ক নায়িকা নেই। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সুন্দরী মেয়ে রাবেয়া বড়, তার এক বছরের ছোট খোকা, বাবার প্রথম পক্ষের সন্তান মন্টু,আর পরিবারের সবচেয়ে ছোট কিশোরী রুনু। এছাড়া পরিবারটির সাথে থাকে ছেলে-মেয়েদের গৃহশিক্ষক মাস্টার।
একদিন চৈত্র মাসের দুপুরে রাবেয়া হারিয়ে যায়, অবশেষে মাস্টার কাকা তাকে খুঁজে  আনে, এবং বলে সে নাকি তার স্কুলের পাশে গিয়েছিলো। তার কিছুদিন পরেই রাবেয়ার প্রেগনেন্সি ধরা পড়ে। মা,খোকা সবাই রাবেয়ার কাছে জানতে চায় দুর্ঘটনার কারণ কিন্তু মানসিক ভাবে অসুস্থ রাবেয়া কিছুই বলতে পারে না,বুঝতেও পারে না।বাবা তার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সফল হয় না। এর মধ্যে শারিরীক লক্ষণ ধরা পড়ে রাবেয়ার শরীরে এবং শেষে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে মারা যায় সে। এই ঘটনায় মন্টু মাস্টারকে দায়ী করে ও কুপিয়ে মেরে ফেলে। আদালতের রায়ে ঠান্ডা মাথার খুনের অপরাধে মন্টুর ফাঁসি হয়।
বইয়ের শেষ লাইনগুলো, "ভোর হয়ে আসছে।দেখলাম চাঁদ ডুবে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠের উপরে চাদরের মতো পড়ে থাকা ম্লান জ্যোৎস্নাটা আর নেই।" একটি পরিবারের অসহায়ত্ব আর করুণ চিত্রের যেনো এক বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি।

কল্পবিজ্ঞানসাহিত্যের এই ধারাটি বাংলাদেশে প্রায় উপেক্ষিত ছিলো যতদিন না মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এসে কিশোর কিশোরীদের কথা ভাবলেন। তার লেখা অসংখ্য কল্প বৈজ্ঞানিক গল্প উপন্যাসের মধ্যে কপোট্রনিকের সুখ দুঃখবেশ জনপ্রিয়। তিনিও তার প্রথম লেখা দিয়েই পাঠক কূলের মন জয় করতে সমর্থ হন। এই গল্প গুলো লেখেন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে। গল্প গুলো মূলত একটি একটির সাথে যুক্ত, তাই পড়তে গেলে একটি কাহিনী বলেই মনে হয়। একজন খেয়ালি বিজ্ঞানীর নানা কর্মকান্ড নিয়ে গল্প গুলো লেখা। স্ত্রী বুলার সাথে তার প্রেম, বিয়ে আর সন্তান টোপনের জন্মের মধ্যে দিয়ে গল্প গুলো বিস্তৃত হয়েছে। সময়ানুসারে গল্প গুলো সাজানো হয়েছে বইতে। মানুষ ও রোবটের সম্পর্ক নিয়ে গল্প গুলো। সময়ের সাথে সেই সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। প্রমিথিউস নামে একটা রোবট তৈরি করেছিলেন। সেটি ছিল পৃথিবীর প্রথম মানবিক আবেগসম্পন্ন রোবট, কিন্তু সে নিয়ে গর্ব করার কোন সুযোগ হয় নি। রোবটটি তার স্ত্রীর প্রেমে পড়েছিল এবং হাস্যকরভাবে কপোট্রনের কন্ট্রোল টিউবে গুলি করে আত্মহত্যা করেছিল। আইজ্যাক আসিমভের তিনটি রোবোটিক্স সূত্রের কথাই সম্ভবত জাফর ইকবাল এখানে বলতে চেয়েছেন। যদিও রোবটের মানবিক ব্যবহার, সময় ভ্রমণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমতা প্রতিটি গল্পেই বারবার উঠে এসেছে। কল্প কাহিনী ভালবাসে এমন যেকোন বয়সী পাঠককে মুগ্ধ করে রাখে এই বইটি।

উপন্যাস নয় কিন্তু বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে কিংবা কোন একটা নির্দিষ্ট সমাজ বা সময়কে সঠিক ভাবে ধরে রেখেছে এমন কয়েকটি বইয়ের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। আজও বাঙালির সবচেয়ে অর্জন বলতে আমরা মুক্তিযুদ্ধকেই জানি। সেই যুদ্ধদিনের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তারিখ দিয়ে লিখে রেখেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার একাত্তরের দিনগুলিবইটিতে। যুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে চাইলে এটি একটি দলিল হিসেবে কাজ করবে। আশির দশকের শেষ দিকটা কিংবা নব্বই এর প্রথম দিকে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবস্থানের সাদা কালো দিকটা কিছুটা তুলে ধরেছে তসলিমা নাসরিনের নির্বাচিত কলামবইটি একদিকে যেমন ব্যাপক নিন্দিত হয়েছে তেমনি নন্দিত হয়েছে, সমালোচনা যতই থাকুক, একই সাথে সারসত্যও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ছিলেন আমাদের বীরাঙ্গনারা। তিন লাখ বীরাঙ্গনা যেনো সমাজ থেকে এক লহমায় নাই হয়ে গেলেন। তাদের পরিবার পরিজন, সমাজ কোথাও তাদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। কোথায় গেলেন তারা, কি ঘটেছিল তাদের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশে? নীলিমা ইব্রাহিমের, আমি বীরাঙ্গনা বলছি বইটি লিখে রেখেছে সেই দুঃখ গাঁথা।

এই লেখায় আলোচনা করা হয় নি কিন্তু অনায়াসে আলোচনা করা যায় এমন কিছু উপন্যাসের নাম উল্লেখ না করলে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপঃ আনিসুল হকের মা, শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু, জাকির তালুকদারের মুসলমানমঙ্গল, শাহরিয়ার কবিরের একাত্তরের যীশু, মাহমুদুল হকের খেলাঘর, সেলিম আল দীনের চাকা, রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা, হুমায়ূন আজাদের শুভব্রত ও তার সম্পর্কিত সুসমাচার, আহমদা ছফার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি, শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন, শওকত ওসমানের জননী, রশীদ করিমের আয়েশা, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নিন্দিত নন্দন, ইমদাদুল হক মিলনের নূরজাহান, সেলিনা হোসেনের হাঙর  নদী গ্রেনেড, আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নং চলচিত্র, আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত, রাবেয়া খাতুনের মধুমতি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
08/02/2019

Monday, 4 March 2019

কেইস নোটেবোমের কবিতা

জোয়ারভাটা

এ তামাদি সব আমি নিজেই ভেবেছি
এই নৃত্য এই জল
গাড়ি, আইসক্রীম

কেবল তুমি আলাদা, তোমাকে ভাবতে পারিনি। 
একদিন স্বচ্ছ সময়ে তোমার আগমন ছিল ধ্বনি,
হয়তো যেমন আমি চেয়েছিলাম, হয়তো অন্যরকম।
লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীকে তুমি
ডিমের খোলসের মতো পেছনে ফেলে গিয়েছিলে
আর এখন!
আদি পৃথিবীর ওপরে দাঁড়িয়ে আছো,
দাঁড়িয়ে আছো।

শীতকালের প্রজাপতি তুমি।

এখন মুহূর্ত অব্দি ভাঙছে, বিরতি নিচ্ছে লাজুক
আর আমাদের খাচ্ছে
আরো নিজেকে পরিপাক করে ফেলছে মেঘ-সমান
যেন এটি সবকিছুর চেয়েও বড়।

আসলে কোনো কিছুর চেয়েই বড় নয়।
কাব্যগ্রন্থ : কবিতা পড়ার টেবিল

প্রণয়িনী হেমন্ত
ছায়াময় কুয়াশা ঘিরে আছে আজকের সন্ধ্যা
শরীর শিরশির করা মরা গাছগুলোর পেছনে চাঁদ ডুবে গেছে
এখন তো বড় রাজা এসে গেছে
একটি হেমন্ত, একটি মৃত্যু, একটি অমানবিক বিলাপন

শোনো, এই পৃথিবী ঘুরছে নিঃশ্বাস নিচ্ছে হারানোর বেদনা নিয়ে
বুকে নিঃশ্বাস আর বেদনা নিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছে 
গরুগুলো যেনো আরো তাজা আরো শব্দহীন হয়ে যায়
যেমন ঝিনুকগুলো, সমুদ্রের শরীরে দ্রুত বড় হয়ে ওঠে
কিংবা জীবন্মৃত হয়ে থাকা সেই মানুষগুলো,
একই সাথে বাঁচতো, একই সাথে বলতো।
কাব্যগ্রন্থ : মৃতরা চলেছে বাড়ির খোঁজে

প্রলোভন
পুঁজি কখনো আমায় ভোলেনি,
ভুলিনি আমিও পুঁজিকে,
নিঃসঙ্গ আমি, নিঃসঙ্গ কবিতাটিও,
আর সব পোকায় কাটা,
শব্দরা যেখানে মানে খুঁজে পায় সেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি,
বই, চিঠি, বার্তা,
আর অপেক্ষা।
অপেক্ষা করেছি আমি সারাবেলা।

আলো ও অন্ধকারের শব্দেরা,
বদলে দিয়েছে আমাকেও—আলো ও অন্ধকারে।
কবিতারা আমাকে ছুঁয়ে চলে গেছে
আর নিজেকে চিনেছি আমি।
দেখে যাই শুধুই দেখে যাই আমি।

কোনো পরিত্রাণ নেই এই আসক্তির।
এস্কাদারের কবিতারা আজও তাদের কবিকে খুঁজে বেড়ায়।
কারো পথ দেখানোর অপেক্ষায় তারা ঘুরে বেড়ায় অভিজাত
শব্দের মহলে
আর প্রত্যাশার প্রলোভন তাদের নির্ভুল।
মিলিত, কবিতা, সৃষ্টি করে
এবং অলঙ্ঘনীয় আকৃতি।

বৃষ্টির মত
বৃষ্টির স্বভাব হলো সারাবেলা গলে যেতে চাওয়া
আর চারাগুলো মাটিকে জোরে চেপে ধরে থাকতে চায়

এভাবেই ভেসে আসে সমুদ্রের নরম বাতাস
সাথে কুহেলিকা তুমি বয়ে যাও আমার তীর ধরে,
তোমার বিষণ্নতা প্রতিনিয়ত আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে
ওই সেই বৃষ্টির স্বভাবমতো সারাবেলা গলে যেতে চায়।

এখন খুব আস্তে আস্তে তিক্ততা আসে, কিন্তু আসে, এবং
অবাক করা চাঁদের খেলার সাথে তারা শোভিত—
এটা আমার প্রতিদিনের মৃত্যু সুধা হয়ে আছে,
তুমি এবং আমি যেনো মৃত নাকি তারও বেশি অবসন্ন।  
কাব্যগ্রন্থ : উদাসীন কবিতাগুলো 

এমনও তো হতে পারে
এমনও তো হতে পারে
এই সকালে চাই অশ্লীল কিছু চাই কিছু নোংরামো,

ওই যে আঁকা গোলাপ
ইচ্ছের ম্যাগনাম ওপাস।

ছোটটির ইচ্ছে করে এখনও
আরো ছোট রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে।

বড়টিকে সবাই কিনে নিতে চায়
অঢেল সব জিনিসের সাথে।

নিজেকে আটকে রাখা খুব কঠিন,
প্রজাপতি দেখলেই, বড় হয়ে যাবে আবার,

ফুলেরা যেভাবে মাটিকে উস্কানি দেয়,
আর পোকারা সাপকে।

এটাই তো ভর
থালার সমতা রক্ষা করে।

সেখানেই সকলের অস্ত্বিত্ব
সময়ের সাথে কেশ-বিন্যাস
ঈশ্বরের তৈরি করা যেনো এক ভঙ্গুর বিশ্ব।

এটাই প্রিয় বন্ধু, এটাই জীবন।
আর এই ছিলো এবং এই আছে।

#এনআনসেন্টলেটারটুমাইডিয়ারেস্টডটার

পার্ট টু
মেঘবালিকা, ও মেঘবালিকা
কত স্বপ্ন কথা ছিল তোমার সাথে
অথচ ক্লান্তিহীন পথচলা থামেনা থামেনা
বেড়ে চলে জীবনের নীরবতা
বছর ঘুরে আবার এসেছে তোমার জন্মদিন, তুমি এবারও স্কুল ট্রিপে আর আমি বসে তোমার কথা ভাবছি -----তোমাকে চিঠি লিখছি। এখনও আশা করছি, একদিন তোমার বাংলা পড়াটা ভাল হবে, তুমি এই চিঠি গুলো পড়তে পারবে।
জন্মদিন তোমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় অফিশিয়াল এজেন্ডা মেইনটেইন করো তুমি, কে কে তোমাকে উইশ করলো কিংবা করলো না, কে কে তোমাকে উপহার দিলো নাকি দিলো না। কতক্ষণে কে তোমাকে উইশ করবে তা নিয়ে মহা ব্যস্ততায় তোমার দিন যায় আর আমাকে একটু পর পর শুনতে হয়, আমি অনেক স্পেশাল, হ্যাঁ না মা? আমাকে সবাই অনেক ভালবাসে, হ্যাঁ না মা? মেয়ের উজ্জল মুখের দিকে চেয়ে সেই মুহুর্তে বলা যায় না, এই পৃথিবীর প্রতিটি বাচ্চাই তার পরিবার, নানা-নানী, দাদা-দাদী, ফুপু, মামা, খালাদের কাছে ভেরি ভেরি স্পেশাল।
ফিরে এসে মায়ের ফেসবুক চেক করবে, কে কে উইশ করে পোস্ট দিলো, কে দিলো না, কেন দিলো না, সব জানতে চাওয়া চাই। গতবারের স্ক্যানিয়ে বাবা ধরা পরলো, বাবার টাইম লাইন চেক করে অভিমানী গলায় বললো, তুমি আমার জন্মদিন নিয়ে কিছু বললে না!
রাত বারোটা বাজার দশ মিনিট আগে থেকে ফোন হাতে নিয়ে উত্তেজনায় রীতিমত কাপতে থাকে, একবার নিউইয়র্ক থেকে ফোন আসতে তিন-চার মিনিট দেরী হলো, বার বার মোবাইল দেখছে আর বলছে, হয়ত ভুলে গেছে, মা, আমি করি?

আমি আশ্বাস দিলাম, কিছুতেই ভুলতে পারে না, মনে হয় ঘড়ি স্লো, কিন্তু সে কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। উইন্টার টাইমিং এর কারণে এই ফোনটাই সব চেয়ে আগে আসে। নিরুপায় হয়ে আমি বললাম, আচ্ছা আচ্ছা কর। ফোন পেয়ে বম্মা, বার বার সর‍্যি বললো। আর আমাকে বললো, বিশ্বাস করো, আমি ফোন হাতে নিয়েই ঘুরছি, বারোটা হলেই ফোন করবো, জাস্ট ভাবলাম, কথা বলতে বসার আগে একটু গুছিয়ে বসি।
লাস্ট ইয়ার স্কুল ট্রিপে হোস্ট ফ্যামিলির সাথে ছিলে, তারাও তোমার জন্মদিন সেলিব্রেট করেছে, স্কুল থেকেও তোমার জন্মদিন সেলিব্রেট হলো তারপরও কত আয়োজন তোমার। বম্মা’র হোয়টসএপ নেই আর মেঘের নেই ম্যাসেঞ্জার। হোস্ট ফ্যামিলির ওখানে বসে স্কাইপ ডাউনলোড করে বম্মাকে কল করেছো, একা ফ্ল্যাটে বম্মাকে কাঁদিয়ে ছেড়েছো তুমি।

তুমি বড় হয়ে ডাক্তার হবে না অর্থনীতিবিদ, কিংবা কেমিস্ট না সেলসে যাবে তা নিয়ে আমি ভাবি না। একটা কিছু তো হবেই, জীবন চলে যাবে। সেসব আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি চাই পরিপূর্ণ একজন মানুষ হও। যতটা আনন্দ নিয়ে ঘুমাতে যাবে ঠিক ততোটা আনন্দ নিয়েই যেনো ঘুম থেকে জাগো। ঘুম থেকে জেগে ভোর দেখে যেনো তোমার মনে হয়, জীবনটা কত সুন্দর, বেঁচে থাকা কত মধুময়।
শুভ জন্মদিন মা। ঠিক এই উত্তেজনা, আনন্দ, পরিতৃপ্তি আর উচ্ছাস নিয়ে যেনো অনন্তকাল ঘুরে ফিরে প্রতিটি জন্মদিন তোমার জীবনে আসে বাচ্চা। হাজার বছর আয়ু হোক তোমার।