Wednesday, 22 April 2015

স্বাধীনতা মানে

স্বাধীনতা মানে বৈশাখ উদযাপন নয়
স্বাধীনতা মানে রমনা টিএসসি নয়
স্বাধীনতা মানে নাভির নীচে শাড়ি পড়া নয়
স্বাধীনতা মানে বেপর্দা নয়
স্বাধীনতা  মানে প্রেমিকের জন্যে অপেক্ষা নয়
স্বাধীনতা মানে ভাই সন্তানের সাথে ঘুরতে বেরোনো নয়
স্বাধীনতা মানে কপালে টিপ পরা নয়
স্বাধীনতা মানে অসাবধানে ওড়না সরে যাওয়া নয়
স্বাধীনতা মানে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি নয়
স্বাধীনতা মানে মন ভর্তি আতঙ্ক আর এক রাশ ভয়

স্বাধীনতা মানে অবিশ্বাস করতে শেখা
স্বাধীনতা মানে মানুষ নয় পুরুষ চেনা
স্বাধীনতা মানে 'বিধর্মী নারী গনিমতের মাল' জানা
স্বাধীনতা মানে ধর্মের নাম নিয়ে পশুপ্রবৃত্তি চাড়া দেয়া (jabin)

স্বাধীনতা মানে ছাত্রলীগ
স্বাধীনতা মানে শামীম ওসমান
স্বাধীনতা মানে পদ্মা সেতু
শফী হুজুরের হাতে অভিজিতের প্রাণ (me)

তানবীরা
২০/০৪/২০১৫




মেয়র যদি হতে চাও তবে ঝাড়ুদার হও আগে!


ঢাকার মেয়র ইলেকশনের প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে, মেয়র হচ্ছেন তারা বুঝি শহর ঝাড়ু দেয়ার জন্যে! কী প্রতারণা দিয়ে এসব ভদ্রলোকদের প্রচারণা শুরু! মেয়রদের কাজ শহর ঝাড়ু দেয়া নয়, ঝাড়ু দেয়ানো। ভয় হয়, মেয়র হয়ে তারা মেথর বেচারার চাকরিটাই না খেয়ে দেন!

মেয়রের খুব মিষ্টি ভাষান্তর করা হলো, ‘নগরপিতা’। তার নগরবাসী সন্তানদের ভাল-মন্দ, সুবিধে-অসুবিধে দেখে শুনে রাখবেন তিনি। পহেলা বৈশাখে এতো বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো, আজো তা নিয়ে প্রত্যেকদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে, কোন একজন মেয়র পদপ্রার্থীকে আজও দেখা যায় নি সেখানে গিয়ে তাদের দাবিতে সামিল হতে কিংবা কোথাও এই বিষয়ে তাদের কথা বলতে। এ ঘটনা দুর্ঘটনা কী মেয়রের আওতায় আসে না? মেয়েগুলোকে নগরের আওতায় পড়ে না, নাকি সেখানে মেয়র কিংবা মানুষ হিসেবে তাদের কোন বিবেক বা দায়িত্ববোধ কাজ করতে নেই শুধু মৌখিক আলগোছে কথা না-বলে দৃঢ় দাবি কিংবা আন্দোলনের সাথে একাত্ম হওয়ার জোরালো কণ্ঠস্বর কোথায়? আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানিয়ে পত্রিকাতে বিবৃতি দিয়ে একজন নগরপিতা কিছুতেই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না।

সাভারে এতো বড় নাটকীয় ব্যাঙ্ক ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলো এ বিষয়েও তারা নিশ্চুপ। যেনো এসবের সাথে শহরের মেয়রের কোন সম্পর্কই থাকতে নেই। তারা আছেন মুক্ত আকাশে পায়রা ওড়ানোর ধান্ধায়। তাই তারা একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে ঝাড়ু মারা প্র্যাক্টিস করে যাচ্ছেন। হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন সাভার সিটি কর্পোরেশানের আন্ডারে পরে না। ঠিকাছে, তাও যদি হয় তারপরও জাতীয় ইস্যুতে প্রত্যেক সচতেন নাগরিকের দায়িত্ববোধ আর বিবেকবোধতো কাজ করে।

আধুনিক রাজনীতির প্রথম আর প্রধান ফর্মলা হচ্ছে সম্ভবত “গদির সাথে সেটে থাকো” সরকারের যাঁরা যে-পদে আসীন আছেন, সিটের সাথে পেছনটা সুপারগ্লু দিয়ে আটকে নিয়েছেন। যতো ঝড় ঝঞ্ঝাই আসুক না কেন, গদি হিলা চলবে না। যা হয় হোক, দেশে, নগরে, তাতে আমার বা আমাদের কী আসে যায়? আমরা সুস্থ, নিরাপদ থাকতে পারলেই হলো, গদি টিকে থাকাই আসল সত্য বাকি সব মিথ্যে।

পি এম আগামী নির্বাচনের আগে সম্ভবত কোন ইস্যুতে মুখ খুলবে না। সব ইস্যু জমিয়ে রাখছেন তিনি পরের নির্বাচন পার হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্যে। সম্ভবত ভবিষ্য বংশধর তৈরি না-হওয়া পর্যন্ত তিনি গদিতে সেঁটেই থাকবেন আর আমাদের প্রতি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ওপর প্রতিশ্রুতি গেলাবেন। মেয়ররাও সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা করে সামনে এগোচ্ছেন, দেশের যা হয় হোক, তা নিয়ে তারা ভাবিত বা ব্যথিত নন আশা করি, ঝাড়ুপোচা ঠিক করে চললেই হলো। মানুষ যদি নিজের প্রাণ আর সম্ভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকতে না-পারে এই নগরে, তাহলে এতো ঝাড়ুপোচা কী  জন্যে, কাদের জন্যে?

দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু গণমাধ্যমের আয়োজনে আয়োজিত মেয়রপ্রার্থীদের জবাবদিহিমূলক অনুষ্ঠানে হেভিওয়েট মেয়রপ্রার্থীরা আসছেন না, অনুপস্থিত থাকছেন নানা অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই। যাঁরা নাগরিকদের প্রশ্নের ও জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে ভয় পান বা এসব অপছন্দ করেন, তাঁরা কিভাবে ভবিষ্যতে নাগরিকদের কাছে স্বচ্ছ থাকবেন বা থাকার চিন্তা করবেন? তাঁরা লোকদেখানো সাইক্লিং, দৌড়, ঝাড়ু এসব স্টান্টবাজি করে মিডিয়ার পাতায় পাতায় চাররঙা ছবি ছাপাতেই যদি উৎসাহী হন, তাহলে তাঁদের সততা, আন্তরিকতা, নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না কেন?

সাম্প্রতিককালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে নৃশংস নরহত্যার যে অমানবিক উৎসব হয়ে গেলো দেশজুড়ে, যেটা থেকে মহানগরগুলোও মুক্ত ছিলো না, সেটার ব্যাপারে মহানগরের নাগরিকদের নিরাপত্তা দেবেন তাঁরা কিভাবে, যেখানে রাজনৈতিকভাবে তাঁদেরই প্রার্থীরা নামছেন নির্বাচনে এবং এড়িয়ে যাচ্ছেন সেসব জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা? এতোদিন যাঁরা গণতন্ত্র গেলো, স্বৈরাচারী সরকারের পতন চাই বলে ধুয়ো তুলছেন, তাঁরা এই সরকারের অধীনেই বা নির্বাচন করেন কোন মুখে? কোন আন্দোলনের ফসল তাঁদের এই নির্বাচন কমিশনের বা সরকারের অধীনে নির্বাচনের নির্লজ্জতা? মানুষ হানাহানি চায় না, একটু শান্তি চায়, একটু নিরাপদ নগর চায়, সন্তানদের শিক্ষার সুব্যবস্থা চায়। এসবে সরকারবিরোধীদের যেমন মাথাব্যথা নেই, তেমনি সরকারের ব্যর্থতাও একদম স্পষ্ট। এসব নিয়ে কোনো হবু নগরপিতার কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য কি আছে? নির্বাচনের পর আবারো শুরু হবে না তো গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে মানুষপোড়ানোর মহোৎসব আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থ ‘আপ্রাণ চেষ্টা’? নগরবাসীর পিতৃত্ব অর্জনে যাঁরা হন্যে, তাঁরা নগরবাসীর নিরাপত্তার কথা কিছু কি ভাবছেন নির্বাচনের পরে?

ঢাকার সিএঞ্জি মিটার সমস্যা, যাতায়তের দুর্ভোগ, বাচ্চাদের স্কুল কলেজে সিটের অভাব, ভাসমান। গৃহহীনদের বা ভিক্ষুকদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা এসব নিয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কী লেখা আছে? অলৌকিক কিছু লিখে তাক লাগিয়ে ভোট আদায় নয়, বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত সমাধানের পরিকল্পনা চাই।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা গত প্রায় দশ বছরের ব্যাপক সমস্যা। গত মেয়াদের নগরপিতার ব্যর্থতা আধা ঘন্টার ‍বৃষ্টিতেই বিশ্রীভাবে চোখে পড়ে। তিনি আবারও ভোট চাইছেন গতবারের ব্যর্থতা কাঁধে নিয়েই। নগরবাসী কি তাঁর কথায় কান দেবেন না পথের দিকে তাকাবেন? চট্টগ্রামের জব্বারের বলিখেলার ঐতিহ্য শত বছরের পুরনো। এবং তার সাথে লোকজ মেলাটারও, যা দেশের অন্যতম বৃহত্তর লোকজ মেলা। এবার চট্টগ্রাম পুলিশের বড়কর্তা ঘোষণা দিয়েছেন, মেলা এবছর করা যাবে না। কারণ, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কারণে তাঁরা নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। এই অক্ষম প্রশাসনের দায়ভার রাষ্ট্রের, এবং এই গা-শিউরানো তথ্যের দিকে আমরা দিনে দিনে এগিয়ে গেছি। কিন্তু, বাকি সব বাদ দিলেও এই মেলায় অংশগ্রহণকারী শত নিরীহ, দরিদ্র, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীর কী হবে যাঁরা সারা বছর এই মেলার জন্যে অপেক্ষা করেন এবং এবারও তাঁরা অনেকে এরই ভেতর পসরা নিয়ে ভিড় জমিয়েছেন মেলায় জিনিসপত্র বিক্রি করবেন বলে? তাঁদের ভেতর কেউ কেউ সারা বছরই তাকিয়ে থাকেন এই মেলার দিকে, কারণ এটাই তাঁদের সর্ববৃহৎ উপার্জনের উৎস। কোনো মেয়রপ্রার্থী কি তাঁদের পক্ষে একটি কথাও বলবেন না কিংবা মুখ খুলবেন না বন্দরনগরীর শত বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন করার বিপক্ষেও?

চট্টগ্রামে ব্যাটারি রিকশার ব্যাপারটা নিয়েও নানা কোলাহল। আগের মেয়র সেটা তুলেই দিলেন, আরেকজন প্রার্থী সেটা থাকবে বলে ঘোষণা দিচ্ছেন, মানে তাঁকে নির্বাচিত করলে। এটাও একটা ট্রাম্প কার্ড খেলার চেষ্টা। কিন্তু, যে-রিকশাগুলোর সরকারি কোনো সংস্থার অনুমোদন নেই, যাদের ডিজাইনে সমস্যা, যেগুলোর কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে, যারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইচ্ছেমত, এবং ঢাকাতেও যেগুলো বন্ধ করা হয়েছে, সেসবের ব্যাপারে কেউ কি নিজের খেয়ালখুশিমত সেসব চালু করার ক্ষমতা রাখেন? যানটির নকশা উন্নত না-করে, বিদ্যুতের আইনি সরবরাহ নিশ্চিত না-করে কিংবা চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না-দিয়ে শুধু ব্যাটারি রিকশা নামানোর ঘোষণা তো মূলত মানুষের সাথে প্রতারণা বা নতুন সমস্যার রাস্তা খুলে-রাখা। নগরবাসীর জন্যে ব্যাটারি রিকশা একই সাথে দুর্ভোগ ও সুবিধের নাম। কিন্তু, এটার দুর্ভোগ কমিয়ে সুবিধে বাড়ানোর ন্যায়সঙ্গত উপায়ের কথা কেউ ভাবছেন না কেন কোনো নগরপিতৃত্বপ্রার্থী?

হে নগরবাসী, ঠিক করুন, নির্বাচনে কী করবেন, কাদের নির্বাচন করবেন। তারা আপনাদের পাশে থাকবে কী থাকবে না, কোন ইস্যুতে থাকবে তা তাদের জিজ্ঞেস করুন, জেনে নিন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন কোন পথে যাবে বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে রাস্তায় নেমে ঝাড়ু-দেয়ার আইওয়াশ আর কত দিন? মেয়রের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি সেগুলোর বিস্তারিত বিবর জেনে নিয়েই সিদ্ধান্ত নিন, নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে যাবেন না বাড়িতে ভালোমন্দ খেয়ে দেয়ে দুপুরে টেনে ঘুম দেবেন।

তানবীরা
২৩/০৪/২০১৫



Friday, 17 April 2015

সেকাল - একাল

পাহাড় কিনবে এট্টা?
চুড়োয় বাড়ি হবে পাইন আর বার্চগাছের মাঝখানে?
একটা ছোটো ঝর্না থাকবে যেটায় নাইবো সব দিনেরাতে?
পূর্ণিমায় সেখানে রুপোলি ফিতে ঝলমলাবে আর পশুরা আসবে জল খেতে?
ফুলবাগানে নানা রকমের পাখি আসবে, তাদের গানে মুখর থাকবে নীরবতা।
একটা উঁচু ওয়চটাওয়ার থাকবে, তাতে চড়ে অনেক দূর অবদি দেখবো?
নানা রঙের তক্তার জোড়াতালি দেয়া ঘর হবে বাচ্চাদের। ট্রি টপ হাউজ।

********


পাহাড় কিনবো, খুউউউব বড় একটা
সেখানেতে প্রচুর কাঠের জন্যে গাছ লাগাবো, কিছু সব্জি আর ফলও সাথে
একটা ওয়াটার পাম্প লাগবে, পানির সুবন্দোবস্ত করতে হবে
সিকিউরিটি রাখতে লাগবে, পূর্নিমা অমাবস্যায় যেনো
কোন পাহাড়িও কাছে ঘেঁষতে না পারে আমাদের পাহাড়ের
পাখিও যেনো কিছু খেতে না পারে, নিছদ্র ভাবে ঢেকে দিতে হবে সব
বন্দুকওয়ালা ওয়াচম্যান হলে সবচেয়ে ভাল হয়
তার থেকে যা আসবে তা দিয়ে প্রতি বছর আমাদের
বাচ্চাদের নিয়ে একটি রঙীন ফরেন  ট্যুর হয়ে যাবে।
১৮/০৪/২০১৫



বৈশাখ ১৪২২

অভিজিৎ রায়, বাবু খুন হওয়ার পর বাংলাদেশের নামকরা সেলিব্রেটি বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে অনেক সুশীল পোস্ট নাযিল হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের কোমল অনুভূতি তথা ইসলামের মাহাত্ম্য না বুঝে লেখার জন্যে অভিজিৎ, বাবু, রাজীব মৃত্যুবরন করেছে এটাকে তারা সিরিজ পোস্ট লিখে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন ফেবুতে। উদাহরন ছিলো, স্টিফেন হকিং, গ্যালিলিও, ব্রুনো, সক্রেটিস খুন হন নাই, হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তমনারা, সুতরাং দোষ লেখকদের, খুনীদের নয়।

বৈশাখের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঈমানী পোস্ট নাযিল হওয়া শুরু হয়েছে ফেসবুকে। হিন্দুয়ানি উৎসবতো বটেই তারওপর মেয়েদের কাপড় চোপড় ঠিক ছিল না, নাভি দেখা গেছে, ওড়না সরে গেছিলো, ভাল মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হয় না, মেয়েদের দরকার ছিল কি বৈশাখ উদযাপন করার, আরো কত কী।

পুলিশের উপ কমিশনার বাতেন বলেছেন, “পাঁচটার মধ্যে সবাইকে চলে যেতে বলা হয়েছিল” এখন যেহেতু অনেকে যায় নাই তাই ............ তাদের শাস্তি হয়েছে বলে কী ধরে নেবো মাননীয় উপ কমিশনার!

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেছেন, “যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তারা বহিরাগত” ...... আপনার ব্যক্তিগত দাওয়াতে আসে নাই বলে কী তাদের দায়িত্ব আপনার নয়! যারা ঘটনাটির শিকার হয়েছে তারাও সম্ভবত বহিরাগত। এটাতো কোন সংরক্ষিত এলাকা নয় যে আপনি বহিরাগত বলে নিস্কৃতি চাইছেন মাননীয় প্রক্টর!

এখন অপেক্ষায় আছি সুশীল বুদ্ধিজীবি লেখক, গায়ক, উপস্থাপক সেলিব্রেটি সমাজের লাইক ভিখিরি বাণীগুলো পড়ার অপেক্ষায়। কেনো সেদিন ঐ মেয়েগুলোকে অবমাননা করা আসলে তেমন দোষের কিছু হয়নি জানিয়ে তারা নিশ্চয় শীঘ্রই, কোমল অনুভূতি দৃষ্টিকোন, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন, ধার্মিক দৃষ্টিকোন থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ন মতামত ব্যক্ত করে জানাবেন, সব দোষ আসলে মেয়েগুলোরই ছিলো। ছেলেদের প্রলুব্ধ করা মেয়েদের উচিত হয়েছে? তাদের প্রত্যেকটা পোস্ট দুইশ বারো জন শেয়ার করবেন, তিন হাজার লাইক পড়বে আর তিনশ কমেন্ট আসবে।

কাদের কাদের লেখা পড়ার অপেক্ষায় আছি নামগুলো নাই বা বললাম, আফটার অল বাংলাদেশের মেয়ে আমি, দেশীয় সংস্কৃতি “ভাশুরের/দের নাম মুখে আনা মানা”।  ভিডিও ফুটেজে যাদের চেহারা পরিস্কার দেখা যায় পুলিশ তাদেরকে খুঁজে পায়না আর পেয়ে গেলেও ধরতে মানা







Thursday, 16 April 2015

মনে পড়ে ঃ ফেরদৌসী মজুমদার

পড়লাম ফেরদৌসী মজুমদারের লেখা আত্মজীবনী ‘মনে পড়ে’। বনেদি, ধনী মুসলিম পরিবারে জন্ম হয়েছিলো তাঁর ১৯৪৩ সালে। চৌদ্দ ভাইবোনের সংসার ছিলো তাদের, তিনি ছিলেন এগারো নম্বর। বেশ কড়া শাসন আর আধুনিকতার মিশ্রণে ছিলো তার পারিবারিক জীবন। কবীর চৌধুরী, শহীদ মুনীর চৌধুরীর বোন তিনি, বাকি ভাই বোনেরাও সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত, রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান তারা। আত্মজীবনীতে তিনি তার পারিবারিক ঘটনা বেশ অকপটেই বলেছেন, সে-জিনিসটা আমার ভাল লেগেছে। আমার নিজের ছোটবেলাও কেটেছে মুসলিম রক্ষশীল পরিবারে। আমি তার পরিবার দিয়ে কিছুটা যেনো নিজের পরিবারটাই দেখতে পেলাম। মাথায় কাপড় দেয়ার জন্যে, পর্দায় থাকার জন্যে মেয়েদেরকে শাসন, সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরতে দেরি করা নিয়ে ছেলেদেরকে শাসন, পড়াশোনা নিয়ে মারধোর, অশান্তি, হয়তো তখন ঢাকার ঘরে ঘরে এরকমই গল্প ছিলো...


তখনো এতো লোক ঢাকায় বাস করতো না। গ্রামের দু একটি সচ্ছল পরিবারের দুএকজন ঢাকায় থাকে। প্রায়ই দেখা যেতো গ্রাম থেকে কেউ না কেউ, কোন না কোন প্রয়োজনে কিংবা কখনো স্রেফ শহর দেখার জন্যে ঢাকা চলে আসত এবং যারা ঢাকায় থাকে তাদের বাসায় উঠে যেতো। অনেকটাই “মান ইয়া না মান, ম্যায় তেরা মেহমান” টাইপ অবস্থা। ফেরদৌসীদের বাড়িও তার ব্যতিক্রম ছিলো না, তা নিয়ে ফেরদৌসী লিখেছেন, “বাবার দিকের লোকজন এলেই আম্মা সচেতনভাবে ওদের একটু সেবা-যত্ন করতেন। ওরা এলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের থাকা খাওয়ার একটু অসুবিধে হতো। বাড়িতে এলে বিছানায় উঠে যেত ওরা, মাটিতে নেমে যেতাম আমরা।............. কিন্তু এসব ঘটনা থেকে আমার মনে যেটা দাগ কেটেছে এবং যে উপসংহারে উপনীত হতে আমি বাধ্য হয়েছি-সেটা হচ্ছে দেশের বাড়ির প্রায় অশিক্ষিত লোকগুলো বড় সঙ্কীর্ণমনা হয়। এদেরকে সন্তুষ্ট করা বড় কঠিন। এদের ভিলেজ পলিটিক্সটা বড় মারাত্ক। বিচিত্র স্বভাব, বিচিত্র মনমানসিকতা। তাই গ্রামীণ সরলতার পাশাপাশি গ্রাম্য সঙ্কীর্ণতার কথাটিও ভুললে চলবে না।”


যতোটা আগ্রহ নিয়ে বইটি শুরু করেছিলাম বইটা ঠিক ততোটা আশা পূর করতে পারে নি। সত্তরের শুরুতে রামেন্দু-ফেরদৌসীর বিয়ে হয়। সেসময়ে দুজন ভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ পারিবারিক সম্মতি নিয়ে সংসার পাতছেন, সে খুব বিরল একটা ঘটনা। তাঁর ভাষাতেই, “মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে কদাচিৎ শোনা যেতো, কিন্তু মুসলমান মেয়ে হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে শোনা যেতো না”। কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু লিখেন নি তিনি। আমার দৃষ্টিতে, এটি খুব উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা যা বাংলাদেশের মানুষের জানার দরকার ছিলো। এই অন্ধ, বধির সমাজে, মৌলবাদী জনগোষ্ঠীর মত পরিবর্তন করতে এ ধরনের ঘটনার বিশদ প্রচারের প্রয়োজন আছে। প্রথমে পরিবার রাজি ছিলো না, পরে রাজি হয়েছে তার দৃঢ়তা দেখে শুধু এটুকুই লিখেছেন তিনি। সামাজিকভাবে কী ধরনের বাধাবিঘ্ন এসেছে বা আত্মীয় স্বজনদের কিভাবে মানালেন তা নিয়ে কিছুই লিখেন নি। তাঁর নিজের পরিবার ছাড়াও রামেন্দুর পরিবার ছিলো, রামেন্দুর সমাজ ছিলো, তাদের আচর তাঁর প্রতি কেমন ছিলো, তারা তাকে কিভাবে গ্রহ করেছিল সে-সম্পর্কেও একটি কথা নয়! তাঁর সুখ-শান্তির সংসারের কিছু বিবর সমাজকে জানানো তাঁর দায়িত্ব ছিলো বলে অন্তত আমি ভাবি।


রামেন্দু মজুমদারকে অনেকবার আমি পত্রিকায়, টিভিতে অনেক অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দেখেছি। ফেরদৌসীকেও আমি বিভিন্ন প্রগতিশীল, বক্তব্যধর্মী নাটকে মঞ্চে ও টিভিতে অভিনয় করতে দেখেছি। এই পরিবারটি সম্পর্কে আমার ধারনা খুব অন্যরকম ছিলো। কিন্তু ফেরদৌসীর বইটি আমাকে বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। আমি কিছুটা অংশ বই থেকে হুবহু তার ভাষাতেই তুলে দিলাম,

“ধর্ম নিয়ে জহুর ভাই অনেক পড়াশোনা করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইসলাম সব ধর্ম বিষয়ে মোটামুটি পড়েছেন। শুনেছি বৌদ্ধধর্ম তাঁর ভাল লেগেছিল। এমনকি গৌতম বুদ্ধের মতো গাছের নিচে ধ্যানে বসতে চেয়েছেন। প্যাগোডা না পেয়ে ২-১ দিন নাকি ধ্যানের উদ্দেশ্যে গাছের নিচেও বসেছিলেন। ১৩ – ১৪ বছর বয়সে বোধহয় বৌদ্ধধর্মের বিশ্বাসটা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। পরে গৌতম বুদ্ধের জীবনবিমুখতা তাঁর কাছে ভালো লাগলো না। জীবনের ঝঞ্ঝাট থেকে পালিয়ে বেড়ানো তিনি সমর্থন করেন না। কিন্তু এটা সত্য তিনিই বলেছেন, একসময় তাঁকে Buddist Qayyum ও বলা হতো। খ্রিষ্টান ধর্ম তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ১৪ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রোমান ক্যাথলিক হয়েছিলেন। তিনি ত্রিপিটকও পড়েছেন। কোনো ধর্মেই যখন শান্তি পাচ্ছিলেন না তখন তিনি কমিউনিস্ট হয়ে গেলেন। সেসময় তাকে Qayyum the Communist  বলা হতো। বেশ কয়েক বছর তিনি ও নামেই সুপিরিচিত ছিলেন, কিন্তু ওতেও শান্তি পেলেন না তিনি। অবশেষে নিজের সেই ধর্মে ইসলামের দিকে ঝুঁকলেন। সেটা হয়েছে আব্বা তাঁকে ইসলামের মর্ম বুঝিয়ে একটা চিঠি দিয়েছিলেন এবং সেটা পড়েই তিনি কোরান শরিফ পড়া শিখেছিলেন। আব্বা তাঁর জন্যে মৌলবী রেখে দিয়েছিলেন – নিজেও পড়াতেন; কিন্তু জহুর ভাই মৌলবীকে ফাঁকি দিয়ে প্রজাপতি ধরতেন। ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে মৌলবীর চাকরি নট। সম্পূর্ণভাবে আব্বা নিজে পড়াতে শুরু করলেন। সেই যে কোরানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা জন্মালো তা আর কোনদিন কমে নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে। জহুর ভাই ইসলাম ধর্মের আর কোরানের বাণীর এমন আধুনিক ব্যাখা দেন যা অনেকেরই অজানা। কোরানের গূঢ় তত্ত্ব এবং কোরানের বাণীর নির্যাসটা তিনি আহরণ করেছেন এবং জীবনে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন।

যখনই কোথাও কোনো ভাষণ দিয়েছেন ঠিক জায়গাতে কোরান থেকে ঠিক আয়াতটি বা শব্দটি বেছে নিয়েছেন। কোয়েটাতে একবার এক লেকচারের আগে তিনি কোরানের কিছু অংশ আবৃত্তি করেছিলেন। কোয়েটা কলেজের তৎকালীন Chief instructor এফএসকে লোদি এটার বিরুদ্ধে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারে জহুর ভাই ভ্রুক্ষেপ হয় নি, তিনি তাঁর চেতনায়, তাঁর বিশ্বাসে অনড় ছিলেন এবং অনেক পাঞ্জাবিও তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাঙালির বুদ্ধিমত্তা, বাঙালির মনমানসিকতারই জয় হয়েছিল সেদিন।“ 
  

এতোটা গোঁড়া চিন্তাভাবনা আর মানসিকতা যার তিনি সেই যুগে কী করে একজন ভিন্নধর্মীর গলায় মালা দিলেন! যার মনে নিজ ধর্ম নিয়ে এতোটা শ্রেষ্ঠত্ব আর গরিমা কাজ করে তিনি অন্য ধর্মের কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, ভাবতেও কষ্ট হয় আমার। যে সময়ে মেয়েদের স্কুলে থাকতেই বিয়ে হয়ে যেতো, সে সময়ে তিনি ডবল এম।এ করে টিভিতে নাটক করতেন, এ বইটি পড়ে আমার সেটা ভাবতেও কষ্ট হয়। ধর্মের কাছে কী সত্যি তাহলে শিল্প-সাহিত্য, প্রগতিশীলতা অসহায়? এতো আধুনিক জীবন যাপন করে এমন রক্ষনশীল চিন্তা ভাবনা মনে রাখা কতোটা পরস্পরবিরোধী।


তবে পুরো বইয়ের কোথাও ফেরদৌসী তার ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো খুব বিশদে লিখেন নি যেটা আত্মজীবনী লেখার অনেকটা মূলধারা বলে ভাবা হয়। তিনি তাদের পারিবারিক ঘটনাবলীই লিখে গেছেন। অনেকটা খাপছাড়া, ধারাবাহিকতা নেই। এক এক সময়, এক এক ঘটনা। পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশক, সত্তরের দশকের পর্যায়ক্রম অনুপস্থিত। সাংস্কৃতিমনা, শিক্ষিত পরিবারের ঘটনাবলী থেকে সমাজ পরিবর্তনের, রাজনৈতিক আন্দোলনের, মুক্তিযুদ্ধের যে-ধারাবাহিকতা আসার কথা ছিলো তাও নেই। যার কারণে ছোট থেকে বড় হয়ে-ওঠা ফেরদৌসীর বিশদ কিছু চিত্র এখানে পাওয়া যায় না। শেষের দিকে তাদের চৌদ্দ ভাইবোনের জীবনের সারমর্ম লিখেছেন, সবার প্রেম-বিয়ে-সংসার নিয়ে লিখেছেন। তারমধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত তার নিজের কাহিনি, যার মধ্যে প্রেম-বিয়ের কিছু নেই, শুধু আছে রান্না করতে জানতেন না, সেটা শিখেছেন আর তাঁর মেয়ের কথা! হয়তো এ-কারণে, বইটি ঠিক যতোটা আলোচনায় আসার কথা ছিলো, ঠিক ততোটা আলোচনায় হয়তো আসে নি। কিন্তু বইটিতে অনেক তথ্য আসার সুযোগ ছিলো। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনকে তুলে ধরার একটি দলিল হতে পারতো এই বইটি। সে-হিসেবে বইটা আশা জাগিয়েও ব্যর্থতার ছায়ামাখা একটা সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিয়ে গেলো।

গত গ্রীষ্মের ছুটিতে বইটি যথারীতি উপহার পেয়েছিলাম ছোটভাই আরাফাত শান্ত থেকে।

তানবীরা
১৫/০৪/২০১৫




Sunday, 12 April 2015

ভিন্ন চোখে দুনিয়া দর্শন – ১

এতোদিন পশ্চিমে থেকেও আবহাওয়াটা ঠিক পোষায় না সাজিয়াদের। শীতকে প্রচণ্ড ভয় তার ওপর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কাছের এই দেশগুলোতে শীতের দিনে আলোও নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক্রিসমাসের ছুটিতে প্রায়ই সূর্যালোকের খোঁজে এদিকে ওদিকে বেড়িয়ে পড়ে তারা। সারা জীবনের স্বপ্ন একবার ইজিপ্টে যাবে। সূর্যালোক খোঁজ করতে করতে ইজিপ্টে মন ঠিক করে আনন্দে আত্মহারা। যথাসময়ে বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে চললো ইজিপ্ট-দ্যা ল্যান্ড অফ হিসট্রি।
লুক্সর টেম্পল, কোর্নাক টেম্পল, ভ্যালি অফ দ্যা কিংস, হাবু টেম্পল, টেম্পল অফ হাসিবস্যুট, কোম ওমবো ইত্যাদি নানা জায়গায় ভ্রমণ করলো নীলের ওপর দিয়ে, ক্রুজ ট্যুর ছিলো। আট দিনের ভ্রমণ শেষে দিগ্বিবিজয়ের আনন্দ নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলো।
সাজিয়ার বারো বছর বয়সী মেয়েও বললো, মা, জীবনে যতো ছুটি কাটিয়েছি, ইজিপ্ট ইজ দ্যা বেস্ট।
আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে কোন ইভেন্টই গোপন থাকে না, আর এটা গোপন থাকার তো কোন কারণই নেই। মহাসমারোহে ফেসবুকে ফটো পোস্ট করে চলেছে সাজিয়া। এতো এতো ছবি উঠিয়েছে ডিএসএলার-এ, বাছাই করে পোস্ট করাও একটা বিরাট কাজ। একদিন স্থানীয় একজন বেড়াতে এলেন। গল্প হচ্ছে, চা খাচ্ছে।
বললো, আপনাদের মিশরের ছবি দেখে খুবই ভাল লাগছে। কোথায় কোথায় গেলেন? আমারও অনেকদিনের ইচ্ছা ওখানে যাওয়ার, কতো ইতিহাস।
সাজিয়ার তো আনন্দে টইটুম্বর অবস্থা, আনন্দে আটখানা হয়ে ফেটে পড়ে বলতে লাগলো কোথায় কোথায় গিয়েছে।
উনি একটু অপেক্ষা করে বললেন, মুসা নবী যেখানে নীল নদকে ওনার লাঠি দিয়ে দুই দিকে দুই ভাগ করলেন, সেখানে যান নাই!
সাজিয়া একটু থমকে গেলো। তারপর বললো, এসবতো আসলে মিথ, লোকের মুখে মুখে ছড়ায়, এ ধরনের কোন জায়গার অস্তিত্ব আসলে নেই।
ভদ্রমহিলা খুবই রেগে গেলেন, কী বললেন? কী বললেন আপনি? মুখে মুখে ছড়ায়? কুরআনে লেখা আছে জানেন, আল্লাহর কুরআনে!
সাজিয়া নিরুত্তর। যেভাবে উনি রেগে গেছেন তাতে সে এখন কী বলবে বুঝতে পারছিলো না।
সাজিয়াকে এমনিতেই ভদ্রমহিলার কম পছন্দ। আল্লাহর প্রতি সাজিয়ার ডর ভয় কম, এমনিতে সাজিয়া মানুষ খারাপ না হলেও কোন ইসলামি রেওয়াজ পালন করে চলে না। ছেলেরা অল্পবয়সে অনেকসময় এমন হয় উনি দেখেছেন, আবার বয়স হলে ঠিকও হয়ে যায় কিন্তু মেয়ে এরকম উনি শুধু এই একটা চিজই দেখলেন। সাজিয়াকে নিরুত্তর করাতে পেরে উনি বিজয়ীর দম্ভে আবার বললেন, আমার পরিচিত অনেকেই যারা গেছেন তারা দেখে এসেছেন। অনেক মুসলমান ট্যুরিস্ট হিসেবে শুধু এটা দেখতেই যায়, এটা আসলে ইমানের ব্যাপার।
নিরুপায় সাজিয়া বললো, চলেন গুগুলে দেখি এমন কোন জায়গা মিশরে সত্যিই আছে কিনা?
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে উনি বললেন, সব গুগলে থাকে না, সব গুগলের ব্যাপার না। অনেক কিছু কুরআনে আছে, ইমানের ব্যাপার।
রাগে লাল চেহারা করে বারবার যেই এমফেসিস তিনি ‘কুরআন’ শব্দের ওপর দিচ্ছিলেন সাজিয়া ভয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো যে উনি না রাগে তাকে মার দিয়ে ফেলেন। সাজিয়া মিশরের ইতিহাস জেনে ও তাকে বলবে, কী না বলবে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো।
সবদিক বিবেচনা করে সাজিয়া তার মুখ বন্ধ রাখাই সমীচীন মনে করলো। এখন সে জেনে গেছে ধর্মানুভূতি আহত হলে মারাত্মক ক্ষেপে যাওয়ার, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মেরে-ফেলারও অধিকার আছে।
_________________________
[৩২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রাজা মেনেস উত্তর মিশর আর দক্ষিণ মিশরকে এক রাজ্যে পরিণত করেন। তার পর ৩১টি রাজবংশের শতশত রাজা-যাদের উপাধি ছিল ‘ফেরৌন’-এই মিশর রাজ্যটি শাসন করেন। কাজেই ‘ফেরৌন’- যাকে ‘ফেরাউন’ বলা হয়-তা কারো নাম নয়, এটা তৎকালীন মিশর শাসনকর্তার উপাধি। এই শতশত ফেরাউনদের মাঝে অনেকেই যেমন অত্যাচারী ছিলেন, আবার অনেকে দয়ালু প্রজাবৎসলও ছিলেন। আর এই ৩১টি রাজবংশের শতশত ফেরাউনদের মাঝে একজনই ফেরাউন আছেন যাঁর নামের আগে ‘দি গ্রেট’ কথাটি উল্লেখ করা আছে। আর তিনি হলেন ‘দি গ্রেট দ্বিতীয় রামেসিস’ যিনি ৬৭ বছর মিশরকে শাসন করেছেন। শুধু তাই নয়-তাঁকে তাঁর মৃত্যুর পরেও হাজার বছর ধরে মিশরবাসী ‘দি গ্রেট’ নামে ডেকেছে।
বনি ইস্রায়েলেরা প্রথমে মিশরের উদ্বাস্তু ছিল। অনেক বনি ইস্রায়েল দাস হয়ে মিশরে এসেছে এবং শত শত বছর সময়ের প্রবাহে স্থায়ীভাবেই বসবাস করছিল, আর তারা সিনাই উপদ্বীপের রামিশেজ প্রদেশে বসবাস করত। তাদের আদিবাস কেনান বা প্যালেস্টাইন। সেখান থেকে প্যালেস্টাইন বা কেনান দেশ পূর্বদিকে। মুসা বনি ইসরায়েলদের সাথে নিয়ে পূর্ব দিকে প্যালেস্টাইন না-গিয়ে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে কয়েকশ মাইল পশ্চিমে নীল নদ পাড়ি দিতে যাবে কোন দুঃখে?
আর মুসা পালিয়েই বা যাবে কেন? মুসার নেতৃত্বে বনি ইস্রায়েলিদের যে-দলটি প্যালেস্টাইনে গিয়েছিল সে দলে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় লক্ষ লোক ছিল, সাথে আরও ছিল তাদের বিশাল পশু পাল। ছয় লাখ লোক এক রাতে রাষ্ট্রীয় কোন আলাপ আলোচনা ছাড়া পালিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া কি সম্ভব? মুসার নিজের কিতাব ‘তোরা’ বা ‘তাওরাত’ থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি- “তখন রাত্রিকালে ফেরাউন মোসি (মুসা) ও হ্যারোনকে ডাকাইয়া বলিলেন, তোমরা উঠো, ইসরায়েলদিগকে লইয়া আমার প্রজাদের মধ্য হইতে বাহির হও, তোমাদের কথানুসারে মেষপাল ও গো-পাল সঙ্গে লইয়া চলিয়া যাও এবং আমাকেও আশীর্বাদ করো……” তার মানে, বেরুনোর কথা ফেরাউন নিজেই বলেন, মুসা পালিয়ে গেছে, এটা সত্যি নয়। এবং তিনি ঠিক হুমকি দিয়েও তাড়িয়ে দেন নি, মুসা তো তাঁর ঘরেই পালকপুত্রের মতো ছিলো।
‘দি গ্রেট দ্বিতীয় রামেসিস’ নীল নদে ডুবে মরেছেন একথা সত্যি। একটা দুর্ঘটনায় তিনি পানিতে পড়ে মারা যান কিন্তু সেটা হজরত মুসাকে মারতে গিয়ে, একথার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি?]
__________________________________________________________________
এ সমস্ত খুব ভাল করে জানা থাকা সত্বেও সাজিয়া মুখ খুলে সামনের জনকে কিছুতেই বলতে পারলো না, যার অস্ত্বিত্ব নেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। গল্প গল্পই হয় আর বাস্তব বাস্তব। আসলে যখন কেউ কিছু মেনে নিয়ে তারপর কথা শুরু করেন তখন সেখানে আলোচনার আর কিছু থাকে না।