Thursday, 23 January 2014

প্রেমিকা ও দস্যু

http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=2d0eb2c95d00fb681a9bf130296342f2&nttl=13012014256443

ঢেউয়ের মৃদু ছন্দে দুলছে ঈষৎ ডিঙ্গি নৌকা।
হাঁটুতে চিবুক রেখে একমনে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছো। তাকানোর ভঙ্গিতে জলের দাপট আছে,তন্ময়ও আছে । নদীর পানিতে তারাদের যেনো চাঁদর পাতা। আকাশে বিরাট রুপোর থালা চাঁদ ভেসে যাচ্ছে সুখসুখেপানিতে তার ছায়া তিরতির
অনেক দূরে অন্য নৌকোর মাঝির ভাটিয়ালি গান খুব হালকা করে ছুঁয়ে যাচ্ছে,আর নৌকোর দুলুনিতে মাঝে মাঝে আমার নাক তোমার চুল ছুঁয়ে হালকা করে তোমার গলায় উম দিচ্ছে। যতোবার আমার নাক তোমার গলা ছুঁয়ে দিচ্ছে, তুমি কেঁপে উঠছো জীবনে

কোথা থেকে এলো দমকা বাতাসে তোমার চুল উড়তে লাগল মণিপুরী সকাশে সাথে আঁচল। তুমি ভীষন ব্যস্ত, একহাতে মুখ থেকে চুল সরাচ্ছো আর একহাতে আঁচল। দেখে আমার নেশা লাগছিলো। যেন জলের কাব্যে থির হয়ে আছে সেই উড়ান,মোহন ।

দুষ্টুমি ভরা ঠোঁট ও চোখ নিয়ে বললাম, কার কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করছো সখী ?
তুমি কপট রাগ দেখিয়ে বললে, দেখছো না কী দমকা উড়াল সই বাতাস ?
বাতাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে আজ ওলো ডরপুক ?
আমার গলায় কিছু ছিলো কি? চকিতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলে কেন?
লজ্জায় শ্যামলা দু’গাল নদীর জলে চাঁদের ছায়া শ্যামলা রঙে লজ্জা লাল যতো খোলে আর কোন রঙেই নয়। ধবধবে ফর্সা প্রেমিকাও তো ছিল। সেখানে এই নির্যাসটুকু ছিলো না। ছিল না এ ক্ষণকাল,থাকে না জন্মের লাজ সাধ ।

আমি আর একটু সামনে ঝুঁকে তোমার দিকে আসতেই তুমি অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলে, এই না এসো না, নৌকো কাত হয়ে যাবে
আমাকে যে তখন তোমার নেশায় পেয়ে গেছে সখী, তপ্ত অনুরাগ আমার সারা শরীরের রক্তে তখন উঠানামা করছে। ইচ্ছার ঘুড়ি হানাহানি করছে চেতনার গরাদে ।
বেপোরোয়া গলায় বললাম, কাত হয়ে গেলে কি?
আমার কামার্ত চোখ দেখে ভয়ার্ত তুমি বললে, ভিজে যাবো ডুবে যাবো..
ঠোঁট তখন তোমার গলা চন্দ্রগ্রহন স্পর্শ করেছে, আমি জিজ্ঞেস করছি তারপরও, ভিজে গেলে ?
তপ্ত স্পর্শে কিছুটা সমর্পিত,বেণুধ্বনি বাজলো নদীর প্রবালে । তুমি মৌ গলায় বলছো, আমি জানি না, আমাকে তুমি তীরে নিয়ে চলোচলো মাটির কাছে ..জল থেকে দূরে ।
তীর কোথায় সখী, তীর কি চাইলেই পাওয়া যায় ?

তোমার লজ্জা, তোমার ভয়, তোমার ঘাম, তোমার প্রেম সব মিলিয়েই তুমি “আমার মাদকতা”
বাতাস ছুঁয়েছে, বাতাস হার মেনেছে কিন্তু আমি যে হার মানবো না সখী।
অস্ফুট স্বরে তোমার বলা “ডাকাত” শব্দটি আমার সমস্ত বাঁধের ওপর যেনো কুঠার মারলো
এখন আমায় ডুবতে দাও, নিমজ্জিত হতে দাও। তুমি আমার দুই স্বপ্নের মাঝে এখন।
আমার অশান্ত আদরে ভেসে যাচ্ছো ডুবে উঠছো ছটফট করছো নদীর ভাসানে ভেসে যাচ্ছে ছোট নুড়ি, প্রণয় শৈবাল । তিমির নেই কোনোখানে । আমাদের বৈভবে আজ জলের পাহারা ।

আহ এতো নড়ে না মেয়ে, স্থির থাকো একদম মাতৃভূমির মতো ।
২১/১০/২০১৩


Saturday, 11 January 2014

যখন যা মনে হয় ২

প্লেনে আর বিমানবন্দরে ধূমপান নিষিদ্ধ কিন্তু ডিসকাউন্টে সিগ্রেট বিক্রি আইনসিদ্ধ।

কিছু বিখ্যাত লোকের সংস্পর্শে এসে অনুভূতি হয়েছে, আরমানী গুচ্চি বাহিরে কেবল, ভিতরে সবাই সমান নাঙা

প্রতিদিন সকালে অফিস যাওয়ার আগে কাবার্ড খুললে খুঁজে পাই না কোন কাপড় পরবো। সবগুলোইতো কতোবার পরা। আবার সপ্তাহান্তে কাবার্ড গুছাতে গেলে মনে হয়, একী অবস্থা, কি করেছি, জায়গা হয় না। বাহান্ন সপ্তাহই একী অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যাই। কোন অনুভূতিটা সত্যি নাকি আমি অস্বাভাবিক?


ভালবাসা একটা বায়বীয় পর্দাথের নাম, যেটা অনুভব করতে পারায় আর না পারায় দৈনন্দিন জীবনে অনেক পার্থক্য হয়ে যায়
মদ খাওয়া হারাম কিন্তু ঘুষ খাওয়া হালাল। 


সংসার হলো কারগিল সীমান্ত যেখানে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের শান্তিপূর্ন সহাবস্থান। বর্ডার লাইন ক্রস করলেই গোলাগুলি। 


আগেরদিনে মেয়েদের জন্যে সন্তানটি পুত্র হোক এই কামনা করা হতো। পুত্র সন্তানের জননীকে সার্থকরুপে ধরা হতো। কারণটা হয়তো পুরোই বৈষয়িক ও কিছুটা স্বার্থপরতাও ছিল। মেয়েরা প্রথমে বাবার ওপর তারপর স্বামীর ওপর আর বুড়ো বয়সে ছেলে মাকে দেখাশোনা করবে এরকম একটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার ব্যাপার ছিল। পুত্রসন্তানকে ভালবাসার মাঝে একটা স্বার্থপরতা কাজ করতো। এখনতো মেয়েরা স্বাবলম্বী আর সমাজও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাহলে এখনো পুত্রসন্তান জন্ম দেয়াই কেনো নারী জীবনের স্বার্থকতার দন্ড থাকবে?


একজন মাকে যখন কেউ বলেন, তোমার মেয়েটা তোমার মত সুন্দরী হয় নাই, বাবার মতো হয়েছে দেখতে। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মায়ের কিংবা একজন পজেসিভ অস্বাভাবিক মায়ের কি প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত। তাকে সুন্দরী বলেছে তাতে সুখী হওয়া উচিত নাকি সন্তানকে অপমান করেছে তাতে দুঃখিত হবেন? জুতো মেরে গরু দান --- কী এর নাম? মানুষ কথা বলার আগে কবে ভাববে? 


ইন্ডিয়ান কূটনৈতিক দেবযানী তার গৃহপরিচারিকাকে চার ডলারের নীচে ঘন্টায় বেতন দিতেন বলিয়া যেসব মানবতাকর্মী সুশীলরা তার বিরুদ্ধে আর্টিকেল লিখে ফেবু ভাসিয়ে দিচ্ছেন, তাদের জন্যে বলছি, বাংলাদেশীরা ঘন্টায় এক ডলারও হয়তো বেতন দেন না আর পাকিস্তানীরা গৃহপরিচারিকাকে হয়তো কোন বেতনই দেন না উপরন্তু ধর্ষন করেন। খামাখা জায়গায় অজায়গায় সুশীলতা দেখানোর দরকার নেই। 

কিছু কিছু ফেসবুক বন্ধু যে নিষ্ঠার সাথে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে (আর্ন্তজাতিক ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, ক্রিকেট, নারী দিবস, পশু দিবস, ফুল দিবস, কাঠাল দিবস ইত্যাদি ইত্যাদি) তাদের প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করে এবং বিভিন্ন বানী সম্বলিত স্ট্যাটাস দেয় তাতে আমি মুগ্ধ এবং বিস্মিত। মনে মনে ভাবি ডিজিটালি যারা এতো সিনসিয়ার – স্ব স্ব ক্ষেত্রে তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে জানি কতো সিনসিয়ার ---- গর্বিত এমন লোকজনের বন্ধু হতে পেরে --- স্যালুট বন্ধুগন

salmon grandy born on Monday , named on Tuesday, Married on Wednesday, got ill on Thursday, died on Friday, burried on Saturday, prayed for on Sunday. That was the end of salmon Grandy---

প্রকাশক যত্ন করে বই ছাপিয়ে লেখককে উপহার দিবেন আর লেখক সেই বই তার বন্ধু শুভান্যুধায়ীদের উপহার দিবেন। বেশীরভাগ বাংলাদেশী পাঠকদের এই চাওয়া।

এই পাঠকরা সেই উপহারের বই নিয়ে বসুন্ধরায় দই ফুচকা খাবেন, সিএনজি চড়ে বান্ধবী নিয়ে আশুলিয়া বেড়াতে যাবেন, মোবাইলে ফেসবুক করবেন, আজিজে যেয়ে বইয়ের বদলে টিশার্ট কিনবেন। কিংবা ম্যাকে যেয়ে “বিগ ম্যাক” মেন্যু খাবেন, স্মার্টফোনে স্মার্টগেইম খেলবেন, আইফেল টাওয়ার কিংবা লন্ডন আই দেখবেন কোন সমস্যা নেই।

কষ্ট হয় শুধু বইয়ের জন্যে টাকা কিংবা ইউরো খরচ করার বেলায় 

Tuesday, 17 December 2013

যখন যা মনে হয়


বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এতো রাজনৈতিক স্ট্যাটাস কেন দেয়? তারা খুব সমাজ সচেতন সেজন্যে? তাই যদি হবে আশেপাশে এতো অপকর্ম ঘটছে কী করে? নাকি ছাত্র – পেশাগত জীবনের ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গের গ্লানি, প্রেমিকার উপেক্ষা, ক্ষয়ে চলা জীবনের সব ক্ষোভ এক পাত্রে রেখে ঢেলে দেয়ার এটাই সর্বত্তোম উপায়?  


দাড়ি থাকলেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না। শফি সাহেব রবীন্দ্রনাথ হতে চেষ্টা করে ধরা খেলেন। রবি ঠাকুর মেয়েদের বহু কিছুর সাথে তুলনা করেছেন, সবাই ধন্য ধন্য করেছে আটকে গেছে বেচারা শফী। সরাসরি তেঁতুল না বলে ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া কাব্য করে এর থেকে বহু বেশী কিছু হয়তো বলা যায়, কবিরা তাই করেন।

রবি ঠাকুরের জন্যে কিছু লিখতে পারি না। চাকরী বাকরী কিছু করেন নাই, সারাদিন বজরায় বসে লেখালেখি করে অর্ধেক বাংলা সাহিত্য তিনি একাই লিখে ফেলেছেন। ভাগ্যিস তখন ফেবু ছিল না। কী করতেন কে জানে। এক লক্ষ ফলোয়ার পেতেনতো বটেই আর মুহুর্মুহু স্ট্যাটাস আপডেট দিতেন। (ফীলিং রাইটার্স ব্লক)

সকালে যখন কেউ কাউকে “সুপ্রভাত” লিখে শুভেচ্ছা পাঠায়, এটার মানে শুধু শুভ সকাল নয়। “আমার ঘুম ভাঙ্গার পর আমি তোমাকে ভেবেছি” এটাও জানানো হয় তাকে। (ভাষান্তর)

“ফাঁকি” সে যতো ধুরন্ধরই কাউকে দিক, এক সময় না এক সময় সেটা ধরা পড়ে, এটাই ফাঁকির নিয়তি আর প্রকৃতি। যারা ঠকে তারা নিসন্দেহে বোকা কিন্তু যারা ঠকায় তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। তাদের চিকিৎসা প্রয়োজন।

প্রেম করতে হলে এমন যুবকই শ্রেয় যে তোমার লিপিষ্টিক নষ্ট করবে, মাসকারা নয় (ভাষান্তর)

প্রেম আর সিগারেটের একই ধর্ম। দুজনেই ঠোঁটে সুখ দেয় কিন্তু বুকে যন্ত্রনা দেয়। (ভাষান্তর)

এ্যালকোহল কেন মহৎ? চোখে রঙ লাগিয়ে দু’গুন করে কিন্তু মনকে একলা করে (ভাষান্তর)

যা চাও তা পাওয়ার জন্যে যদি যুদ্ধ না করো, তা হারিয়ে ফেললে তার জন্যে কান্না করো না (ভাষান্তর)

একটি ভাল সম্পর্ক তোমাকে অনেক প্রেরণা দিতে পারে আর একটি খারাপ সম্পর্ক তোমাকে পরেরটির জন্যে অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান দিতে পারে (ভাষান্তর)

শরীরের মধ্যে “ঠোঁট” দুটো হলো সবচেয়ে বেশী ছদ্মবেশী অঙ্গ। ছোট একটা হাসি দিয়ে পৃথিবীর অনেক কঠিন সত্যি লুকিয়ে রেখে বলতে পারে, আমিতো ভাল আছি (ভাষান্তর)

তানবীরা
১৭/১২/২০১৩


Thursday, 5 December 2013

আমার আমি


আমার পরিচিত কাছের মানুষেরা অভিযোগ করেন আমার কাছে, আমি বড় হই না, বাচ্চাদের মতো করি, বয়সটা আমার কোথাও একুশে আটকে আছে। হয়তো পিছনে পিছনে বলেন, আমি যা করি তা হয়তো আমাকে মানায় না। যিনি আমার এই ছেলেমানুষীর সবচেয়ে বেশী ভুক্তভোগী তিনি বলেন, শরীরটা শুধু ডেভেলাপ করেছে, ব্রেইনটা ডেভেলাপ করেনি। তবে তিনিও এটা বলতে বলতে এখন ক্লান্ত হয়ে ক্ষ্যান্ত দিয়েছেন শুধু আমি যেমন ছিলাম তেমনই রয়ে গেছি। সবার অনুযোগের পরেও আজও নিজেকে সামলে সবার আকাঙ্খা অনুযায়ী নিজেকে বড় করে তুলতে পারিনি।

বদলে যাওয়া বড় হওয়া সব কী নিজের হাতে থাকে? সবাই কী চাইলেই নিজেকে ইচ্ছেমতো বদলে ফেলতে পারে? বড় হয়ে যেতে পারে?

অনেকেই বলেন ছোটবেলায় এই লেখকের বই আমার ভীষন প্রিয় ছিল, ঐ গায়ক বা নায়ককে আমার ভীষন ভাল লাগতো। ঐ খাবারটা খুব মজা লাগতো। আমার কোন অতীত নেই, নেই কোন পাষ্ট টেন্স। আমার তখনো যা প্রিয় তা এখনো প্রিয়, তখনো যা আমার ছিল এখনো তা আমারই আছে। আমি কোন কিছুর দাবী ছেড়ে দিতে শিখি না, যা আমার তা একান্ত আমার। আজো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা চটপটি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের অনুভূতি দেয়, বসুন্ধরা ফুডকোর্টের দই ফুচকা আমার সে অনুভূতি একটুও কেড়ে নিতে পারেনি। ছোটবেলায় জিতু আঙ্কেলের বা মিঠুন আঙ্কেলের নাচ যে আনন্দ নিয়ে দেখতাম এখনো সেই আনন্দ নিয়েই দেখি, অক্ষয় কুমার কিংবা হৃত্তিক রোশান তার জায়গা ছিনিয়ে নিতে পারেনি। টিনটিন কিংবা ডলুমাসী, টম এন্ড জেরী আজো সেরকমই হাসায় কাঁদায়। যা যা কিংবা যাকে যাকে যতোটুকু ভালবাসতাম তা তা কিংবা তাকে তাকে আরো বেশী ভালবাসি আজো। বেলী কিংবা কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ দেহ মনে সেই সময় যে শিরশিরানি আনতো আজো তেমনই আকুল করে। চওড়া পাড় দেয়া ভাজ ভাঙ্গা বাসন্তী রঙের নতুন তাতের শাড়ি, হাতে রঙ বেরঙের লাল হলুদ সবুজ রেশমী চুড়ি, কপাল জুড়ে বড় চাঁদের মতো কালচে লাল টিপ আর ঘাড় গলা খোঁপা জুড়ে জড়িয়ে থাকবে অজগরসম কাঁঠালিচাঁপার মালা। তখনো প্রিয় এখনো প্রিয়।

দাদুর সাথে কতো দিন দেখা হয় না। কবে আবার কোন পৃথিবীতে দেখা হবে, আদৌ দেখা হবে কীনা জানি না। যদিও মনে প্রাণে বিশ্বাস করি শক্তির ধ্বংস নেই আবার হয়তো কোথাও না কোথাও দেখা হয়ে যেতে পারে কোন না কোন রুপে, হয়তো দাদু নাতনী হয়ে নই তবুও তবুও। যাকে মন দিয়ে খুঁজে লোকে তা নাকি পেয়েও যায়। আমি কী দাদুকে ভুলে গেছি? কম ভালবাসি? বড় হওয়া মানে কী ছোটবেলা ভুলে যাওয়া? দাদুর জন্যে মন কেমন করলে কান্না না করা? কতো শীতের রাত লেপের নীচে দাদুর গায়ের ওম নিয়ে কেটেছে সেকি চাইলেই ভুলে যেয়ে বড় হওয়া যায়? নাকি শীতবেলায় সেই স্মৃতি মনে পড়লে দু ফোটা গড়িয়ে পড়া অশ্রুকে বড় হয়ে যাওয়ার অনুশাসনের মাঝে আটকে দেয়া যায়?

আজো শেষ বিকেলের গোধূলির সূর্যের লাল আভায় মন জানি কেমন কেমন করে ওঠে, কার জন্যে কীসের জন্যে জানি না। আজো কোকড়ানো চুলের উস্কো খুস্কো বাদামী তরুন দেখলে মনে রিনিক ঝিনিক সুরের দোলা নাচে, এক পলকের জন্যে হলেও আবার ফিরে তাকাই। এখনো শিমূল মুস্তফার কন্ঠে জয় গোস্বামীর “পাগলী তোমার সঙ্গে” কবিতার আবৃত্তি শুনলে নাম না জানা কারো পাগলী হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আজো সমুদ্রের উষ্ণ নোনা জলে পা ভেজালে ভাষায় বর্ননা করা যায় না এমন অনুভূতি গা ছুঁয়ে মন ছুঁয়ে যায়। কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এখনো মনে হয় হাত বাড়ালেই আকাশটাকে ছোঁয়া যায়। এখনো মায়ের চুলের তেলের গন্ধ সর্বাপেক্ষা প্রিয়, মন মাতায়। এখনো মিতালী মূর্খাজীর ‘আকাশটাতো নীল চিঠি নয়, জানলা খুলে আমার লেখা পড়বে, মনটা কী আর ময়না পাখি? মনটা কী আর ময়না পাখি সোনার শিকল দিলেই বাঁধা পড়বে” শুনলে মনে হয়, এতো আমার কথা, এতো শুধুই আমার কথা, মিতালী কী আমার কথাই গাইছে?

প্রিয় যা ছিল প্রিয় তাই আছে। কিছুই হারায়নি হয়তো হারাবেও না। সেই জ্বলে ওঠা নিভে যাওয়া জোনাকী পোকা, আমসত্ত্ব, চালতার আঁচার, সারা গায়ে সুর মেখে বৃষ্টিতে ভেজা। না গান না কবিতা না সেই কাউকে নাম না বলা হৃদয় গহীনে লুকিয়ে থাকা মানুষটা, চোখের কাজল কিংবা খোঁপার কাঁটা, তেতুল বনে জ্যোস্না দেখা কিংবা কপালে কারো নামের টিপ আঁকা। প্রিয় থেকে প্রিয়তর হয়েছে সমস্ত কিছু, তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে দিন দিন এই যা। বড় হওয়া হবে না আমার, হলো না আমার আর

কিন্তু তারপরও কী কিছুই বদলায়নি? সবার চাহিদামতো বড় হয়তো আমি হয়ে উঠতে পারিনি কিন্তু খানিকটা বদলে আমি নিশ্চয় গেছি। কারো নজরে সেটা না পড়লেও মাঝে সাঝে যখন অনেক ব্যস্ততার ফাঁকে একটু অবসরে নিজের দিকে ফিরে তাকাই, খুলে দেখি নিজেকে, কোথায় সেই পুরনো আমি? কিছুটা রুক্ষ আর অনেকটাইতো বদলে যাওয়া আমি।

তানবীরা

০৫/১২/২০১৩

Monday, 28 October 2013

জীবন থেকে নেয়া (চোর নিয়ে মেঘাডেট)

আজকে “আমরাবন্ধু”র জন্মদিন। বিগত যৌবনা এই ব্লগটাতে পারতে কেউ আজকাল আর উঁকি দেয় না। শুধু যারা মায়া কাটাতে পারে নাই তারা মাটি কামড়ে পড়ে আছে। হ্যাপি বার্থডে এবি, অনেক অনেক হাসি খেলার – আলোর বেলা কেটেছে এখানে। ভাল না থাকো, টিকে অন্তত থাকো।
প্রথমে সেদিন চোর এলো আমাদের বাড়িতে তারপর পুলিশ। ঘটনাটা এরকম, বুধবারে বাবা মেয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং যথারীতি একজন টিভি আর একজন ল্যাপটপের মধ্যে ঢুকে গেছে। আমি বাড়ি ফিরে খুব তাড়াহুড়া সব গোছাচ্ছি আবার বেরোতে হবে, আমাদের খুব কাছের বন্ধু একবছর আগে মারা গিয়েছেন, তার সেদিন মৃত্যুবার্ষিকী। মেঘকে ওপরে পাঠিয়েছি রেডী হতে। বাগানের দরজার নবটা দেখি অর্ধচন্দ্র। মুচড়ে আছে ঠিক অর্ধেক মাপে।
মেয়ের বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি বাইরে গিয়েছিলে, বললো না।
আমি বললাম তাহলে এমন হলো কি করে লক?
তিনি বললেন, মেঘ হয়তো বাইরে গিয়েছিলো।
মেঘ নীচে আসতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে বললো, নাতো মা, আমি যাইনি।
আমি বললাম তাহলে কি চোর এলো নাকি।
বললেও ভাবার সময় নেই এখন প্রায় সাতটা বাজে, বেরোতে হবে। কেউ গা করলো না।
বেরোতে যাবো সেই মুখে প্রতিবেশী এলেন। তার আগের দিন খুব বৃষ্টি হয়েছিল। ময়লা যাওয়ার পাইপ নাকি ভরে আছে, পরিস্কার করার লোক ডাকবে। দুই বাড়ির যেহেতু লাইন একটাই তাই পয়সা ভাগাভাগি করতে হবে সমান সমান। আমরা বললাম করবো, তুমি ডাকো লোক। সে তবুও পিছনে যেতে চাইলো, অগত্যা বাগানের দিকের দরজা খোলা হলো। দরজা খুলতে পারছে না কারণ লকের অবস্থা বারোটা। কোনরকমে খুলে দেখা গেলো, সাইকেল গ্যারেজ, বাগানের দিক থেকে বাইরে যাওয়ার দরজা, এবং মেইন দরজার পিছন দিকে ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে রেখে গেছে। আমাদেরতো খবরই নেই।
মেঘ যারপর নাই আনন্দিত। নিরিবিলি জীবনে একটি এ্যাকশানধর্মী ব্যাতিক্রমী ঘটনা। আনন্দে দৌড়ে একবার বাবার কাছে যায়তো আমার কাছে আসে। আমিতো ধরি নাই, আমিতো জানি কিভাবে লক খুলতে হয়, আমিতো করি নাই, ওটা চোর করেছে। আমি তোমাকে সত্যি বলছি।
ওর বাকবাকুমের জ্বালায় আমি আর ওর বাবা কথা বলতে পারছি না। পুলিশ, ইন্স্যুরেন্স সব ফোন করতে হবে। আবার ঐদিকে যাওয়াও জরুরী, কারো জন্মদিন না যে, না করে দিবো। আমি যখন ধৈর্য্যহারা পয়েন্টে পৌঁছেছি আবার মুখ খুললে চড় দিবো, তখন আসল কথা পেট থেকে বের হলো।
মা, আমি ওখানে সবাইকে আর কাল স্কুলে সবাইকে বলতে পারি, আমাদের বাড়ি যে চোর এসেছিল। প্লীজ মা প্লীজ, প্লীজ।
অনেকসময় আমি বলি, এটা আমাদের প্রাইভেট ব্যাপার স্কুলে বা কারো সাথে গল্প করবে না তাই আগে থেকে সাবধানতাঃ।
আমি বললাম, ঠিকাছে।
আহা কি আনন্দ তার ঝরে গলে পড়ছে। এতো বড় রোমাঞ্চকর ঘটনা তাদের বাড়িতে।
বাড়ি ফিরে এসে পুলিশকে ফোন করেছি, তারা আসছেন। ফিল্মীধারা বজায় রেখে প্রথমে চোর তারপর পুলিশ।
মেঘ উত্তেজনায় ওপরে যেতে পারছে না, রাত বাজে দশটা। আমি বললাম, আসুক পুলিশ, দেখুক, কোন বাচ্চা হল্যান্ডে এতোক্ষণ জেগে থাকে। আমি কিচেনে পরদিনের লাঞ্চ বানাচ্ছি, এমন সময় কলিং বেল বাজলো, দেখলাম চারশো মিটার স্পীডে কি জানি নীচের থেকে সিড়িতে ওপরে গেলো। পুলিশ এসেছে আর বান্দা ওপর থেকে নীচে নামে না। অন্যদিন কাপড় বদলে ব্রাশ করে শুতে কমসে কম ত্রিশ মিনিট সময় লাগে আর সেদিন পাঁচ মিনিটে ওপরের লাইট অফ!!!।
পুলিশ এমন বস্তুর নাম।
চোর অবশ্য আমার মনোজগতেও অনেক ওলট পালট ঘটিয়ে দিয়ে গেছেন। চোরের কারণে আমার সারাক্ষণ চোর সংক্রান্ত গান কবিতা মাথায় আসতে লাগলো। এই চোর যায় চলে, এই মন চুরি করে ......... কিংবা চুরি করেছো আমার মনটা এই টাইপ। তারচেয়ে ভয়াবহ যাতে চোর নেই তাও চোরা চোরা রুপে ধরা দিতে লাগলো। বাসায় মেইল করেছি, ঘরেতে চোর এলো গুনগুনিয়ে .........
বন্ধু ধ্রুব আগে বলতো, মাথায় কিরা ঢুকছে, আসলে মাথায় কিছু গেঁথে গেলে, কিরা ঢুকার মতোই
চোর একবারই এসেছিল নীরবে
আমারই দুয়ারও প্রান্তে
সেতো হায় মৃদু পায়
এসেছিল পেরেছিতো জানতে
সে যে এসেছিল বাতাসতো বলেনি
হায় সেইক্ষণে এ্যার্লাম মোর চলেনি
তারে সে আলোতে চিনতে যে পারিনি
আমি পারিনি কিলায়ে তারে মারতে
পৃথিবীর সকল চোরকে আমার ওপরের চোরাসাহিত্য খানা উপহার দিলাম।
মেঘ অনেক দুঃখী মুখ করে আমাকে শুক্রবারে বলল, আম্মি পরীক্ষা কেন হয়?
আমি বললাম, ঠিক করে পড়েছো কীনা সেটা জানতে হবে না?
আমরাতো ক্লাশে পড়ি, টীচারতো দেখে, ওকি আমাদেরকে তাহলে বিশ্বাস করে না?
পড়লে পরীক্ষা দিতে সমস্যা কি?
আমার ভাল লাগে না
তুমিতো ঠিক করে পড়ো না তাই ভাল লাগে না, যারা ঠিক করে পড়ে তাদের নিশ্চয় ভাল লাগে না।
কারো ভাল লাগে না আম্মি, কারো ভাল লাগে না। আমি একদম সত্যি বলছি
তাই নাকি? কেন ভাল লাগে না?
আমাদের স্ট্রেস হয় আর স্ট্রেস শরীরের জন্যে ঠিক না।
মেঘের বাবা যেদিন দেরী করে অফিস থেকে ফিরেন, মেঘ অনেক গোপন সুখ দুঃখ মায়ের সাথে ভাগাভাগি করেন।
রোজ ভোরে উঠতে অনেক কষ্ট হয়, তাই না আম্মি।
হুম
বড় হওয়া অনেক কষ্ট। এরপর রোজ ভোরে উঠে চাকুরীতেও যেতে হবে। জীবনে আসলে আনন্দ কিছু নেই।

যুদ্ধ কান্না শিশু আর আমাদের রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি থেকে অনেক শিশুকে ইউরোপে দত্তক পাঠানো হয়েছিল। ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফ্রান্স, সুইটজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক “যুদ্ধ শিশু” বা “ওয়ার চাইল্ড” দত্তক এসেছে। তাদের বেশীর ভাগের বয়স এখন চল্লিশের কিছু ওপরে কিংবা কিছু নীচে। অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর থেকে ধরা যাক ত্রিশ কিংবা মধ্য ত্রিশ থেকে নিজের শিকড় খুঁজে ফিরছেন। কেউ কেউ কাউকে খুঁজে পান, কেউ কেউ বিফল হন। কারো বায়োলজিক্যাল বাবা মা বেঁচে আছেন কিংবা দুজনের একজন আছেন কারো কারো কিছু নেই।

খুঁজে পাওয়ার পর? বায়োলজিক্যাল বাবা মা নিতান্ত গরীব। রিকশা চালক, চায়ের দোকানে কাজ করেন ইত্যাদি। এপারে ছেলেমেয়ে বেশীর ভাগই উচ্চশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত। তারা বাংলা বলতে পারেন না। বাবা মা ইংরেজী বলতে পারেন না। তখন কাউকে চাই যে দুজনের মাঝে সেতু গড়বে। মাঝে মাঝে আমি তাদের সেতু হই। বেশীর ভাগ বাবা মা, ভাইবোন কথা বলতে পারেন না, কাঁদেন বেশী আর ছেলেমেয়েরা পাথর মুখ করে তাকে নিয়ে বাবা মা, ভাইবোনদের সুখ কিংবা দুঃখ স্মৃতি শুনতে চান। ডাচ প্রকৃতির কারণে এরা কাঁদেন কম কিংবা শিশুকাল থেকে কেঁদে কেঁদে পাথর এখন। এতো আবেগী ঘটনায় জড়িয়ে কি খুব নির্লিপ্তভাবে কাজ করা যায়? একজন একপাশে ফোনে কাঁদেন আর একজন অন্যপাশে স্কাইপে উৎসুক চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। কি বললো আমার কথা? কি বললো? পড়াশোনা না জানা বাবা মা, ভাইবোনদের ভাষা নেই আছে বোবা কান্না। আর উচ্চশিক্ষিত এপারে সন্তানটির অনেক ভাষা চাই, জানার আঁকুতি দিনরাত তার সেখানে সে কেমন ছিল? কি খেয়েছিল সে, কি খেলতো? কি তার ভাল লাগতো? কে তাকে বেশি ভালবাসতো? ভাষান্তর তখন অনেক কঠিন। ভেবে ভেবে বের করতে হয় সন্তানকে মা কি বলতে পারেন।


চল্লিশ বছর নীড় খুঁজে ফেরা বৃন্তচ্যুত মানুষেরা এখনো কেঁদে যাচ্ছেন। এরপর যখন কেউ বলেন আপনারা “গনহত্যা” করিয়েছেন, আপনাদের মুক্তিযোদ্ধারা মানুষ মেরেছে তখন তাদেরকে ঘৃনা করার মত ঘৃনাটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না। 

Thursday, 29 August 2013

নৈতিকতা নিয়ে আমার ভাবনা গুলো

মুক্তমনায় এখন লেখালেখি চলছে, সামনের বইমেলাতে প্রকাশিতব্য আমাদের বই “ধর্ম ও বিজ্ঞান, সংঘাত নাকি সমন্বয়”কে কেন্দ্র করে। একটি বিশেষ বিষয়কে ঘিরে সবাই তার পক্ষের - বিপক্ষের যুক্তি তুলে ধরছেন, নানা বড় বড় মনীষী, গবেষকদের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন যার যার নিজের লেখাতে। এর মধ্যে অবধারিত ভাবেই হয়তো একটা কথা বার বার চলে আসছে, ধর্ম মানুষের কি কাজে লাগে , ধর্মের প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতা। এই লেখা গুলো পড়ার পর যখন নিজে নিজে সেগুলোকে নিয়ে ভাবি আর নিজের প্রতিদিনের জীবনের চারপাশটা মিলিয়ে দেখতে যাই, প্রায়শই একটা জিজ্ঞাসা মনে খেলে যায় । কোনটা তাহলে সত্যি? একটা জিনিস একই সাথে কালো এবং সাদা দুটো হতে পারে না, জিনিসটি হয় কালো নয় সাদা। নাকি আমরা চরম স্বাভাবিক সত্যকে মেনে নেয়ার মতো সাহস নিজেদের মধ্যে সঞ্চয় করতে পারি না, নিজেদের মানসিক দুর্বলতাকেই ধর্মের আবরনে মুড়ে নেই? আর বার বার কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার মতো কালো মেয়েকে উজ্জল শ্যাম বর্ন বলে চালাতে চাই, ব্যাপার তাই কি ? আমার চিন্তা ভাবনাই কি ধোয়াশা নাকি আমিই ঠিক বিষয়টি বুঝতে পারছি না। আমার এই লেখা অনেকটা আমার আত্ম জিজ্ঞাসা। এতে শুধুই আমার মনের ভাবনা গুলো যেগুলো অনেক সময়ই জট পাকিয়ে যায় তাই লিখছি। এতে কোন মনীষীর কিংবা গবেষকের উদ্বৃতি নেই, আছে সাধারন একজন মানুষের তার চারপাশ অবলোকন করা আর তার দ্বিধাগ্রস্ত মনের এলোমেলো ভাবনা।
অনেকেই তাদের লেখায় ধর্মের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, মানুষের মধ্যে নৈতিকতা সৃষ্টির জন্য ধর্মের প্রয়োজন আছে। সত্যিই কি তাই? কি সেই ধর্ম বিশ্বাস যার থেকে নৈতিকতা উৎপন্ন হয়ে এমন চরমে চলে যায় যে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের গলায় ছুরি চালিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেন না? কোন সেই নৈতিকতার কারনে প্রত্যেক ধর্মের ধর্মপ্রাণ লোকেরা অন্য আর ধর্মের ধর্মপ্রাণ মানুষের বাসায় জলগ্রহন করতে দ্বিধা বোধ করেন? একজন ধর্মপ্রাণ ব্রাক্ষণ কিছুতেই কোন হাজী মওলানার বাড়ীতে খাদ্য দ্রব্য স্পর্শ করবেন না, যেমন করবেন না একজন মওলানাও একজন ব্রাক্ষণের বাড়ীতে। অথচ দুজনেই যার যার ধর্মের মহারথী, দুজনেই নৈতিকতার ধারক এবং বাহক। এতে নৈতিকতাই বা কোথায় আর ধর্মই বা কোথায়? এটা কি তাদের প্রতি সৃষ্টি কর্তার কিংবা সৃষ্টি কর্তার প্রতি তাদের অনাস্থাই প্রমাণ করে না? মানুষকে ঘৃণা করা, একজন মানুষের প্রতি আর একজন মানুষের অবিশ্বাস ও সন্দেহই কি ধর্ম আর নৈতিকতা?
ধর্ম থেকে আসা নৈতিকতার কিছু উদাহরণঃ আমি এখানে আমার চোখে দেখা ধর্মের নৈতিকতা নিয়ে আমার ভাবনা গুলো লিখবো। বাংলাদেশ অত্যন্ত গরীব দেশ হওয়াতে আমাদের দেশের লোকের সর্বপ্রথম যে চিন্তাটা থাকে তাহলো যেনতেন প্রকারে নিজের এবং ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য যতো দ্রুত এবং যেকোন উপায়ে সম্ভব আখের গুছিয়ে ফেলা। অন্ততঃ জলপাই সরকার এসে অনেক রথী মহিরথীর বাড়ি থেকে যে হারে রিলিফের টিন উদ্ধার করেছেন তাতে এ ব্যাপারে অন্তত কারো দ্বিমত থাকার কথা না। যার যতোই থাকুক না কেন সোনার চামচে যেনো নিজের সন্তান খেতে পায় তার সুবন্দোবস্ত নিশ্চিত করে যেতেই হবে। যার যার সার্মথ্যনুযায়ী সে সে হাত বাড়ায়। মসজিদের শহর ঢাকা, সুমধুর আজানের ধ্বণিতে চারপাশ অনুরণিত সারাবেলা। মুসলমানদের দ্বিতীয় মহামিলন এজতেমা হয় এই দেশে। যে দেশের প্রায় নব্বই ভাগ লোক চূড়ান্ত ধর্মপ্রান সে দেশ দুর্নীতিতে ডাবল হ্যাট্রিক !!! এটাকে কি চোখে দেখবো? এই রঙের নাম কি কালো না সাদা? নাকি ছাই বর্ন এটাকেই বলব?
চরম দারিদ্রতার কারণে বাংলাদেশের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী, সে যে উপায়েই হোক বিদেশ পাড়ি জমান। দুর্ভাগা বাংলাদেশের চরম হতভাগা লোকগুলো সোনার হরিণের পিছনে বাবা - মায়ের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ছুটে আসে নিজের তথা পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। বারো থেকে ষোল লক্ষ টাকা ব্যয় করে এসে যখন দেখে হরিণ গলিয়ে সোনা বের করে নেয়া হয়েছে বহু আগেই তখন তারা স্তব্ধ হয়ে যান। পিছনের সব ইতিহাস ভুলে যেয়ে, বাংলাদেশে কি করতেন, কি পড়তেন সেই দিন খাচায় তুলে রেখে, সেই টাকা উদ্ধারের জন্য যে কোন কাজ পান তাতেই ঝাপিয়ে পড়েন। এরমধ্যে সবচেয়ে সহজ লভ্য কাজ হচ্ছে কোন ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে ঢুকে পড়া। ধার্মিক দাড়িওয়ালা, ক্ষেত্রবিশেষে টুপিওয়ালা মালিকরা তাদেরকে কখনো কখনো থাকা খাওয়ার জন্য কিছু দেন, অনেক সময় শুধু কাজের সুযোগটাই দেন, টিপসের টাকাই এলাহী ভরসা। আজকাল যেহেতু অবৈধ অভিবাসীদের উপরে বিদেশীরা খুবই ক্ষ্যাপা, অবৈধ কাউকে কাজে রাখা যে কারো জন্যই দশ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত। তাই অবৈধ অভিবাসীদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত হওয়ায় মাঝে মাঝে অনেক মালিক কৈফিয়ত দেন যে, এতো রিস্ক নিয়ে যেহেতু রেখেছি, পয়সা বেশি দিতে পারব না। অসহায় ছেলে গুলো কাগজ হলে একটা হিল্লা হবে এই আশায় বুক বেধে সেটাই নীরবে মেনে নেয়।
একশ্রেণীর ধর্ম পেশা লোকজন যে থালায় খাচ্ছে, সেই থালাকেই ফুটো করে যাচ্ছেন অবিরত। প্রথমতঃ অবৈধ একজনকে আশ্রয় দিচ্ছে, সরকারের বিরুদ্ধে যেয়ে। অবৈধভাবে তার শ্রমকে অপব্যবহার করছে এবং সরকারকে প্রতিনিয়ত শুল্ক ফাকি দিচ্ছে। যে শুল্ক দ্বারা সবার সন্তানদের স্কুল - কলেজের খরচা আসবে, অসুস্থদের ভাতা আসবে, গৃহহীন কারো গৃহের ব্যবস্থা হবে, কর্মহীন কারো মাসিক ভাতা আসবে, সব কিছুর উৎস এই শুল্ক। একসাথে কতোজনকে ফাকি দিচ্ছে তারা? সৃষ্টিকর্তা, সরকার, বিবেক ???
কিন্তু এই তারাই আবার সরকারের কাছে আবেদন - নিবেদন করে রবিবারে বাচ্চাদের ধর্ম শিক্ষার জন্য সরকারের কাছ থেকে বিনা মূল্যে মিলনায়তন সহ ইমামের বেতন আদায় করছেন। এর মধ্যে ধর্ম কোথায় আর নৈতিকতা কোথায় ? কিসের মূল্যবোধ তারা তাদের সন্তানদেরকে তথা সমাজকে উপহার দিচ্ছেন? ঠিক আছে কাফের সরকারকে ঠকাচ্ছে, কাফেরদের প্রতি কোন মূল্যবোধের বা বিবেকের দরকার নেই, কিন্তু দেশী ভাইদেরকে ঠকানোর পেছনে কি যুক্তি? এদের অনেকেই প্রায় প্রতি বছর পরিবার নিয়ে হজ্বব্রত পালন করে আসেন, তারপর আবার অনেক সময়ই শোনা যায় এই রেস্টুরেন্ট মারামারি হয়েছে কারণ পাচ বছরের দিন রাত খাটা পয়সা না দিয়ে বরং সেই শ্রমিককে পাওনা টাকা দেয়ার ভয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, শ্রমিককে পুলিশে দিয়ে, মালিক হজ্বে !!!! জামিনে বেরিয়ে এসে তখন দেখা যায় সেই শ্রমিক মালিককে মারতে গিয়েছে, এদের সবাই কিন্তু ধার্মিক। এই রেষ্টুরেন্ট মালিকরা প্রায় প্রত্যেকেই প্রাথমিক অবস্থায় একদা শ্রমিক ছিলেন যারা পরবর্তী জীবনে মালিক হয়েছেন। শ্রমিক অবস্থায় তারা যে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, মালিক হয়ে তারা অন্যদেরকে সেই একই জিনিস ফিরিয়ে দিচ্ছেন, জীবন থেকে কি শিখেছেন তবে তারা কিংবা ধর্ম থেকে?
আজকাল আবার আর একটা ব্যাপার থাকে। মদ বিক্রি না করলে রেষ্টুরেন্ট চালানো যাবে না, আবার হাজী সাহবে মানুষরা মদ বিক্রি করতে পারবেন না। সামাজিক একটা ইয়ে ইয়ে ব্যাপার এসে যায়। তাই মালিকরা প্রত্যেকেই বয়ান করে থাকেন মদ বিক্রির পয়সা তারা খাবার বিক্রির পয়সা থেকে আলাদা রাখেন। কারন এটা হালাল না। এটা দিয়ে তারা কর্মচারীদের বেতন দেন। এখন, প্রথমতঃ যখন কেঊ বিল দেন, তখন তারা নিশ্চয়ই মদের টাকা আর হালাল খাবারের টাকা আলাদা করে দেন না। তারা তাদের কষ্ট করে উপার্জন করা হালাল টাকাতেই পাওনা পরিশোধ করেন। আর দ্বিতীয়তঃ যে ছেলে গুলো হাত পুড়িয়ে রেধে খাওয়াচ্ছে তারা হালাল পরিশ্রম করে তাহলে হারামের টাকায় বেতন নিচ্ছে!!!! যিনি কর্মচারীদেরকে হারাম বেতন দিচ্ছেন, তার বিবেক কিসের উপর ভর করেছে? এট কি ধর্ম না তার থেকে উৎপন্ন হওয়া নৈতিকতা?
পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে মানবিক অধিকার যাতে খর্ব না হয় এবং মানুষের জীবন যাত্রার মানের সমতা রাখতে বিভিন্ন ধরনের ভাতার প্রচলন আছে। এই ভাতার মূল উদ্দেশ্য থাকে দুর্বলদেরকে রক্ষা করা, তাদের নূন্যতম মানবিক প্রয়োজনগুলো মেটানো। প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাদের প্রত্যুৎপন্নমতি বুদ্ধির দ্বারা সরকারের সাথে টম এন্ড জেরীর হাইড এন্ড সিক গেম খেলে সারা বেলা। এমন কোন ভাতা নেই যা সরকারের কাছ থেকে তারা আদায় করেন না। এমনকি তালাকপ্রাপ্তা ভাতাও। আইনতঃ তারা বিবাহ বিচ্ছেদ করেন এবং ধার্মিক মতে বিবাহিত থাকেন। এই ভাতা কিন্তু খুব একটা সামান্য নয়। অনেকে এই টাকায় ঢাকায় গুলশানে, বারিধারায় তিন হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট পর্যন্ত কিনে নেন দু’বছরে। যদিও কাফের সরকারের এই পয়সাযে তাদের জন্য হালাল সেটা তারা কোরানের আয়াত, সুন্নাহ, ফিকাহকে ডলে পিষে বুঝিয়ে দিয়ে ছাড়বেন। ধর্মের মাধ্যমে নৈতিকতা শিক্ষার কি চরম উদাহরণ!!! তদুপরি বলব, যখন একজন অধার্মিক লোক চুরি করেন, তাকে নিয়ে উচ্চ বাচ্য করার হয়তো তেমন কিছুই নেই, তার জন্য হয়তো অন্যদের দৃষ্টিকোন থেকে সেটাই স্বাভাবিক। সে কোন কিছুর আড়ালে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করে না। কিন্তু একজন ধর্মপ্রান সমাজ স্বীকৃত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ব্যাক্তি যখন চুরি করে তখনতো ধর্মের দিকে অঙ্গুলী উঠবেই, ধর্ম আধারিত নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই স্বাভাবিক নিয়মে। প্রার্থনার ব্যাপারটি নিয়ে ধার্মিকরা সারাক্ষন মাতামাতি করেন। তারমানে কি এই ধরে নেয়া যায় না, অন্যায় করেন বলেই বারবার কারো কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন আসে? যদিই অন্যায়ই না করেন, দুর্বলতাই না থাকে, তবে কিসের ক্ষমা চাওয়া? নিজেরা দুর্বল বলেই সারাক্ষন কারো আজ্ঞাবহ হওয়া কিংবা কারো উপড় নির্ভর করার ব্যাপারটা আসে।
আমার বিশ্লেষণে দুই ধরনের ধার্মিক আছে। এক ধরন হলো সাদা মাটা ধার্মিক। তারা কিছু না জেনে না বুঝেই ধার্মিক কিংবা বাবারেও করতে দেখছি তাই আমিও করি টাইপ। এই শ্রেণীর এমন অবস্থা বাবারও দশ খানা ছেলে পুলে ছিল তাই নিজেরাও সেই খাতায় নাম দিতে থাকে। যতক্ষণ না ডাক্তার এসে থামান স্বাস্থ্যগত কোন কারণ দেখিয়ে। এদেরকে আমি ঠিক ধার্মিক বলি না, বলি প্রথা পালনকারী, জিজ্ঞাসাহীন এক ধরনের আজ্ঞাপালনকারী বাহন। দ্বিতীয় দল হলেন আসল দল, মুখে দুনিয়া কয় দিনের কিন্তু কাজে সেই দুনিয়ার জন্য এমন কোন কর্ম নাই যা তারা করবেন না। সব জিনিসের একটা ধর্মভিত্তিক ব্যাখা তাদের কাছে পাওয়া যাবে। যেকোন জিনিসকে ধর্মের আলোকে তারা আলোকিত করে ফেলেন। নিজেদের মতো নৈতিকতার একটা ব্যাখা নিশ্চয়ই তাদের মন তৈরী করে রাখেন, যার খোজ খবর আমরা রাখি না। কবির কথানুযায়ী হয়তো দারিদ্রতা মানুষকে মহান করে কিন্তু টি। আই। বি’র রিপোর্টনুযায়ী মানুষকে চোর করে, অনন্ত বাংলাদেশের চৌদ্দকোটি মানুষ তাই প্রমান করেছে।
শুধু কি দারিদ্রতাই নৈতিকতাকে ক্ষয় করেঃ উপরের আলোচনা থেকে মনে হতে পারে শুধু দরিদ্র লোকেরাই ধর্মকে ব্যবহার করে কিংবা ধর্মের আড়াল বা আশ্রয় নিয়ে অন্যায় করে থাকেন। আসলে কি তাই? আমার সীমিত দৃষ্টিতে দেখা, অনুভব করা ও জ্ঞানের আলোক বলব না। তাহলে ধনী আরব রাষ্ট্রগুলো কিংবা কম্যুনিষ্টরা মানুষের উপর এতো অন্যায় করছেন, কেনো? বরং ধর্মের আবরনই অনৈতিক স্খলনের জন্য দায়ী। ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষ নিজেকে আড়াল করে এবং সকল ধরনের অনৈতিক অপরাধ করে থাকে। দুবাই বা অন্য যেকোন মুসলমান রাষ্ট্রে গেলেই এটা দেখা যায়। আরবরা দরিদ্র না কিন্তু তারা দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাথে টাকা - পয়সা, ওয়ার্ক পারমিট ইত্যাদি বহু ব্যাপার নিয়ে দিন রাত মিথ্যে কথা বলছে, প্রতারণা করছে। সেই মিথ্যে কথা শুরুর আগে একবার ইয়াল্লাহ বলছে, শেষে একবার বলছে। দরিদ্র দেশের মানব সন্তানদের ব্যবহার করে উটের দৌড় করাচ্ছে, কিংবা যৌন হয়রানী করছে। কিন্তু আবার আজান দেয়ার সাথে নামাজ পড়ে চিত্ত শুদ্ধও করছে। বেশীর ভাগ আরবদের বেশ কয়েকটি করে বাড়ি থাকে, যার অনেক গুলোই ফাকা ও তালাবন্ধ থাকে বছরের পর বছর, সেই জায়গায়ই হয়তো পাচশ গজ দূরে একটি কুড়ের মধ্যে বারোজন মানুষ গাদাগাদি করে থাকেন। ধর্ম কি সেই শিক্ষায় দেন মানুষকে ? ধর্মের দ্বারা নৈতিকতা কতো জায়গায় ধর্ষিত এবং পদদলিত। তবে শক্ত আইনের বাধনে যেসব জায়গায় পড়তে হয় সেসব জায়গায় অনৈতিক কাজ অনেক কম হয়। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, যেলোক দেদারসে ট্যাক্স ফাকি দিচ্ছে কিংবা ভীড়ের বাসে টিকেট ফাকি দিচ্ছে অথবা কর্মচারীর বেতন মেরে দিচ্ছেন, সেই তিনিই কিন্তু কখনও ভুল জায়গায় পার্কিং করার চিন্তা মাথায় আনবেন না, কিংবা মেয়েকে কাফের বিদেশী ছেলেদের সাথে কোএডুকেশনে পড়তে দিবো না কিংবা আঠারোর আগে আইনতঃ বিয়ে দিবেন, এই ধরনের চিন্তা মাথায় আনবেন না। যে আরবরা নিজের দেশে অ - আরবীয় সমাজের মানুষের সাথে গরু ছাগলের মতো ব্যবহার করেন, তারাই যখন ইউরোপে গরমের ছুটি কাটাতে আসেন, পরিবার পরিজন নিয়ে, অ - আরবীয় সমাজের সাথে তখন শিষ্ট ও চরম ভদ্র আচরন করে থাকেন। তাহলে কি শক্ত, কঠোর, অলংঘনীয় সব আইনগুলো অনেক সময় ধর্মের সমান্তরাল হিসেবে কাজ করে স্থান - কাল - পাত্র ভেদে নৈতিকতা শিক্ষা দেয় মানুষকে?
ধার্মিকরা হয়তো গুনাহ হবে সেইজন্য অনেক সময় অনেক অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু ভয় দেখিয়ে কি সব সময় নিজেকে বিরত রাখা যায় যদি অন্তর থেকে কেউ তাগিদ অনুভব না করেন? বিবেক থেকে অন্যায়কে অন্যায় ভাবেন না বলেই হয়তো সাধারনতঃ দেখা যায় যেকোন অন্যায় করার পর ক্ষমা চেয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে নেয়ার একটা ভরসা ওদের মধ্যে কাজ করে। যখন কেউ ভাবেন আমি অন্যায় করে উপাসনার দ্বারা তার থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারবো, সেই ভাবনার প্রেষনাই তাকে অন্যায়ের প্রতি জোর ধাবিত করে। ধার্মিকরা প্রায়ই তাদের ধর্মের প্রতি অত্যন্ত ভালোবাসা থেকেই হয়তো বলে বসেন, ধর্মের কোন দোষ নেই এর অপব্যাখা দেয়া হচ্ছে। তাই যদি সত্যি হয়, ধর্ম যদি এতোই নাজুক ব্যাপার হয়ে থাকে যে, যে খুশী সেই তার অপব্যাখা কিংবা ভুল ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সেই দুর্বল জিনিসটা “নৈতিকতার” মতো একটা শক্ত জিনিসের ভার কিভাবে নিতে পারে? অজ্ঞতা থেকেই ভয়ের আর ভয়ের থেকে নানারকম কল্পনার সৃষ্টি হয়। রাক্ষস, খোক্কস, পরী, পংক্ষীরাজ ঘোড়া কিংবা এমন কোন অবয়বের যাকে সর্ব শক্তিমান মনে করার আপ্রান চেষ্টা চলে। যার উৎস হলো অজ্ঞতা কিংবা ভয় তা কি করে নৈতিকতা ধারন করতে পারে?
এই লেখাটা পড়ে আপাত মনে হতে পারে যে, ধর্ম সব অনৈতিকতার কারন বা ধার্মিক লোকেরাই অনৈতিক কাজ করে। কিন্তু আমার মতে ধর্মহীনতা মানেই যেমন নীতিহীনতা নয় তেমনি ধার্মিক মানেই নীতিবান, সচ্চরিত্রের লোক সবাই নন। শুধু ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়, এই ধারনাটা সাধারনের মাঝে বদ্ধমূল হওয়াটা বিপদজনক। এতে করে ধর্মের ঢাল ব্যবহার করে অনৈতিক কাজ গুলো হরদম করে যাওয়ার একটা একটা সুযোগ সে পাচ্ছে এবং আমাদের চারপাশের বাস্তব বলে দেয়, সেই সুযোগের সদ্বব্যহার সে করছে। ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য অনুধাবন করতে পারা আর সেই অনুভূতিকে বিবেকের কষ্টি পাথরে ঘষে নিজের জীবনে প্রতিফলন ঘটানোই আমার মতে নৈতিকতা, যা ধার্মিক অধার্মিক সকলের মধ্যেই থাকতে পারে কিংবা থাকেও। পরিশেষে নিজের একটা উপলব্ধি যেটা থেকে মুক্ত হওয়া এ জীবনে আর সম্ভব হবে না জানি, সেটা লিখছি। ধর্মের ব্যাখা বলি আর গল্পই বলি, যেখানে ধর্ম নিজেই বলেছে, প্রথমে মানুষে এসেছে এবং পরে তার কল্যানের জন্য ধর্ম এসেছে। প্রত্যেক ধর্মের এই একই গল্প, শুধু গল্পের চরিত্রের নাম আর প্লট আলাদা। সেজন্য যা মানুষের প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষের পরে এসেছে তা যেনো কখনই মানুষের থেকে বড় না হয়ে উঠে। প্রয়োজনের বস্তু যখন যাদের প্রয়োজন হবে তারা ব্যবহার করবেন নিশ্চয়ই , কিন্তু তাকে সবার জন্য অনিবার্য করে তোলার কোন কারন নেই। আজকের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের যুগে এটুকু উপলব্ধি করতে পারি, এই পৃথিবীর এখন ধার্মিক মানুষের চেয়ে নীতিবান মানুষের প্রয়োজন অনেক অনেক অনেক বেশী।
তানবীরা তালুকদার
২৫.০৬.০৮