Saturday, 16 June 2018

আব্বু দ্যা বস (কার্ড)




কার্ড খেলা শিখেছিলাম আব্বুর কাছে বেশ ছোট বয়সে তবে প্রথমে আব্বুকে “প্রমিজ” করতে হয়েছিলো, কখনো কোথাও টাকা দিয়ে কার্ড খেলবো না। আমাদের স্কুল-কলেজ তথা পুরো ছাত্র জীবনই কেটেছে, হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও এর মাঝে। শহুরে মধ্যবিত্তের মাথায় তখনও এপার্টম্যান্ট ব্যাপারটি সেভাবে গেঁথে যায় নি, তাই এই শহরে তখনও ইট কাঠের দালান ভেদ করে ঐ আকাশ দেখা যেতো ঢাকা’র সেন্টার পয়েন্টে বাড়ি বলে ছাদে উঠলেই ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজের ছাত্রদের রাস্তায় টায়ার পোড়ানো, পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, টিয়ার শেল মারা, কি তুমুল উত্তেজনা, সবই শুধু চোখে দেখা যেতো। একমাত্র বিনোদন ছিলো বোকা সরকারী টিভিতে ফিল্টার করা খবর, ভিসিআর আর পরে এসে ডিশ যোগ হলো আর এর বাইরে ছিলো বইরাস্তার পরিস্থিতি সব সময় বাসা থেকে লুকিয়ে বের হয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া’র অনুকূলে থাকতো না বলে কার্ড খেলা শিখিয়ে দিয়ে আব্বু’র তেমন কিছু লস হয় নি। আব্বুরও সময় আমাদের সাথে ভালই কাটতো

আমাদের সময় গড়পড়তা মধ্যবিত্ত জীবনে “মেয়ে মাইনষের কার্ড” খেলাকে যারপর নাই ঘৃণা’র এবং তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হত। একদল কাজিন খেলতো আর একদল কঠোর “গুনাহ” এর দৃষ্টিতে দেখতো। আমাদেরকেও ঠারে ঠুরে কথা শুনতে হয়েছে, কি জানি (একটা লম্বা নিশ্বাসের পজ হবে) তারপর এখনই কেয়ামত হয়ে মাথায় আকশ ভেঙে পরবে এই রকম উদাসি সুরে টেনে টেনে খানিকটা নাকে আর খানিকটা গলা দিয়ে বলা হতো, “কিয়ের জানি কি দিনকাল পরছে, কি জমানা আইছে গো, মাইয়ারা বলে টাসটুস খেলে”। এই কথাগুলো শুনেছি আমরা পরিবারের একান্ত আপনজনদের কাছ থেকে, এক হাত দূরত্বের মাঝে থেকে শুধুমাত্র স্বয়ং আব্বু আর ভাইয়া এতে সরাসরি জড়িত ছিলো বলে আমাকে বা আমাদেরকে “ক্রসফায়ার”এ দেয়া হয় নি। আমি আজও ভেবে পাই না, আমাদের সংস্কৃতিতে মেয়েদের যেহেতু বাসা থেকে বেরোনো’র সমস্যা, কার্ডের মত একটা বুদ্ধির খেলায় তাদের এত নেতিবাচক মনোভাব কেন? এরমধ্যে পাপপুণ্য কোথায় জড়িত? অল্প টাকায় আর অল্প জায়গায় যে কোন জায়গায় লুডু’র মত এটিও খেলা যায়। তবে অনুমান করতে পারি, ক্লাব ব্যাপারটা আমাদের দেশে খুব নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপণ হয় নাটক, সিনেমা কিংবা মিডিয়াতে, ক্লাব মানেই এলকোহল আর কার্ড, সুতরাং এ জিনিস মানষের চেতনায় খারাপ ভাবে আঁকা হতে বাধ্য। বাজে দিকও অবশ্য আছে, যখন প্রথম দিকে খেলার খুব নেশা, বান্ধবীরা মিলে ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে খেলতাম, প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের কাছে ধরাও খেয়েছি, সেসব কত কথা

বাসায় সবাই মিলে যখন খেলতে বসতাম, মানে, আমি, আব্বু, ভাইয়া আর সুমি তখন দুটো খেলা বেশি খেলতাম, স্প্রেডসট্রাম বা কল ব্রীজ আর ব্রে কল ব্রীজে চ্যালেঞ্জ কম, ক্রিকেটের মত, ভাল কার্ড হাতে এলে ছক্কা মারা যায় আর মন্দ কার্ড হাতে এলে পিটিয়ে খেলে এক দুই রান যা তোলা যায় আর কি। ব্রে হলো একটু চ্যালেঞ্জিং, ফুটবলের মত, গোল খেলেই হারলে, যত গোল খেলাম মানে পয়েন্ট পেলাম ততই ব্রে হলাম পয়েন্ট পাওয়া মানেই বোকা। হাতের কার্ড যত ফেলে দেয়া যায় মানে যত অন্যকে গছিয়ে দেয়া যায় সেটা হলো এই খেলার মুন্সীয়ানা কার্ড খেলা মোটামুটি আয়ত্বে এসে গেছে, কি করে কার্ড গুনতে হয়, কার হাতে কি কার্ড আছে কি করে ধারনা করা যায়, কে কিভাবে সাজাচ্ছে অনুমান করতে শিখে গেছি,  দেখা যেতো অনেক সময় ভাগ্যই অনুকূল থাকতো না। এমন সব কার্ডই হাতে এমন আসতো যে সব বুঝেও হার মেনে নেয়া ছাড়া কিংবা খেলার দিক পরিবর্তন করার কোন সুযোগই আসতো না। বাস্তব জীবনে বহু পরিস্থিতি, আমাকে এই কার্ড খেলা বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে, পরিবেশের কাছে মাঝে মাঝে আমরা কতটা অসহায়। সব জেনে বুঝেও ধৈর্য্য ধরে খেলাটা খেলে যেতে হয়, সময়ের অপেক্ষায়। আবার এমনও হয়েছে উচ্চাভিলাষী হয়ে কিংবা আনমনে দুটো দান ভুল খেলেছি, সেই যে গেইমটা হাত থেকে চলে গেলো, আর কিছুতেই রিকভার করতে বা সামাল দিতে পারলাম না। যা হারালো তা হারালোই, ফিরে পাওয়া গেলো না।

এরকম সময়ে খুব সর্তক হয়ে যেতাম, বার বার ভাবতাম, কার্ড দিতে খুব হিসেব করতাম, সময় নিতাম। আব্বু মজা করে বলতো, এত দেরী কর কেন, খেলো খেলো, খেললেই পাবে, চাললেই পাবে। খুব রাগ হত, অনেক রেগে যেতাম, আমি হেরে যাচ্ছি আর আব্বু মজা পাচ্ছে। এখনও সে আগেরই মত জীবন ভর নানা খেলায় শুধু আমি হেরেই যাচ্ছি, কত ভুল হয়ত বুঝতে পারি কিন্তু সংশোধনের সুযোগ জীবন আর দেয় না। তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে খেলে যেতে হয়, হরদম খেলে যেতে হয়। আব্বু’র মজা করে, হেসে, দুষ্টুমি করে বলা কথা গুলোও এখন কত গভীর অর্থ নিয়ে ধরা দেয়।  

তবে, আব্বুর একটি কথা আজও রেখেছি, পয়সা দিয়ে কখনো কারো সাথে কার্ড খেলিনি। বড় কারণ অবশ্য কেউ কখনো অফারই করেনি, তাই নিজেকে পরীক্ষা করাই হয়ে ওঠেনি।

বাবা দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা আব্বু, লাভিউ আব্বু (সামনাসামনি তো কখনো বলে উঠতে পারি না, লেখা পড়েই আপনি জেনে নিন)  

পৃথিবীর সব ভাল বাবা, দুষ্ট বাবা, মিষ্টি বাবা, পঁচা বাবাদেরকও বাবা দিবসের অনেক অনেক অভিনন্দন। আর যে সকল মায়েরা বাবা এবং মায়ের দুটো দায়িত্ব বিপুল বিক্রমে পালন করছো সে সব কমরেডদের লাল স্যালুট।

০৬/০৬/২০১৮






Tuesday, 29 May 2018

জ্বীন দ্যা ক্যাটালিস্ট

আমাদের ছোটবেলায় গ্রাম থেকে গৃহকর্মী নিয়োগের একটা বেশ প্রচলন ছিলো। মুরুব্বীদের যুক্তি ছিলো, তারা খুব বিশ্বাসী হয়, চুরি-টুরি করে সহসা পালিয়ে যেতে পারবে না। শিশুদের কাছেও তারা কিন্তু সমান আকর্ষণীয়ই ছিলো। সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান আর বায়োনিক ওম্যান ছাড়া যাদের পৃথিবী ছিলো, নন্টে-ফন্টে, ঠাকুরমার ঝুলি, সিন্দাবাদের বানিজ্য যাত্রা থেকে রুশ দেশের উপকথা'র মধ্যে সীমাবদ্ধ তাদের কাছ সে সব গৃহকর্মীরা ছিলো সাক্ষাত অনন্ত জলিল। বিস্ময়কর পিলে চমকানো সব গল্পে পরিপূর্ণ ছিলো তাদের উদর।


বাড়ির কাজ টাজ হয়ে যাওয়ার পর তাদের দায়িত্ব থাকত, ছোটদের কে গল্প শোনানো। নানারকম গল্পের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ ছিলো, "সতিকারের ভূতের গল্প"। কারণ তারা সেসব নিজের চোখে দেখেছে। কখনও ছোটরা সন্দেহ প্রকাশ করলে, আত্মবিশ্বাসী গলায় তাদের জানানো হত, সেসব গল্পের যারা প্রধান চরিত্র তারা তাদের না চিনলেও তাদের বাবা-কাকা'রা তাদের চেনেন। একই গ্রামের, শুধু ঐ দূরের সে সব বাড়ি, যে গুলোতে তারা কখনও যায় নি, সেখানেই বাস তাদের, হুহ। একদম সাক্ষ্য প্রমাণ সব হাজির। এরপর তাদেরও সেসব বিশ্বাস না করে আর কোন উপায় ছিল না।

গল্পগুলো হত খানিকটা এ ধরনের, গ্রামে একটা "দূষিত" তেতুল গাছ আছে, বহু দিনের পুরনো, অনেকবার সবাই কাটতে চেয়েছে গাছটাকে, জ্বীন'রা এত বাঁধা দেয় যে লোকজন আহত নিহত হয়ে গাছটাকে কাঁটার চিন্তা বাদ দিয়েছে। বিশেষ দরকার ছাড়া ঐ গাছের নীচ দিয়ে কেউ যাওয়া আসা করে না, নেহাত কখনও করলেও শনিবার-মঙ্গলবার, বারবেলা, সন্ধ্যেবেলা এসব বেছে দেখে সাথে অন্য লোকজন নিয়ে যাতায়াত করে সবাই। কিন্তু সেদিন এমন ঝুম বৃষ্টি ছিলো যে কফিলকে সে সময় সেদিক দিয়ে একা আসতেই হলো। রাতে সে যখন ঘুমালো তখন তার প্রচন্ড জ্বর। সকাল থেকে উঠেই সে অদ্ভূত সব আচরণ করতে লাগলো। যেমন, মাজেদা ফুপুর দুধের বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির পাশে'র পুকুরে চুবাতে চুবাতে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো। সে সময় দৈবক্রমে ঐ পুকুরের পাশ দিয়ে দবির চাচা হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখে তাড়াতাড়ি বাঁধা দিতে গেলে কফিল তাকেও পুকুরে ফেলে চুবাতে শুরু করলো। দবির চাচার চ্যাচাম্যাচিতে লোকজন জড়ো হয়ে কফিলকে বেঁধে ফেললো বিরাট একটা গাছের সাথে। বিরাট গাছ হতে হবে নইলে গাছ শুদ্ধ উপড়ে নিয়ে আসবে কফিল কারণ তার শরীরে তখন আছে অশীরিরি শক্তি।


এরপর তাড়াতাড়ি লোক ছুটে গেলো অনেক দূরের গ্রামে, ওঝা আনতে। খুব নামকড়া ওঝা, যে দশ গ্রামের অনেকের বদ থেকে বদ জ্বীন ছাড়িয়ে ডাক সাইটে হয়েছে। বাড়িতে তার অনেক বোয়াম আছে, যেখানে সে আঁচারের বদলে জ্বীন ভরে রাখে। ওঝা এসে কফিলে'র নাকে শুকনো মরিচ পোড়া ধরলো, চামড়ার জুতো শুকালো, দুর্বোধ্য সব মন্ত্র পড়লো যার এক বর্ণ ও কেউ বুঝতে পারলো না। লাঠি দিয়ে মারলো প্রচুর, মেরে আধমরা করে ফেলে জিজ্ঞেস করলো, কেন ধরেছিস আর কি হলে ছেড়ে দিবি? রেগে তখন জ্বীন কফিলের মাধ্যমে প্রথমে খুব গালাগালি করলো ওঝাকে, সেসব এত নোংরা গালি যে ভাষায় প্রকাশের মত নয়. মারতেও চাইছিলো কিন্তু নেহাত হাত পা বাঁধা তারপর মুক্তি পাওয়ার উপায়ন্তর না দেখে চিঁহি চিঁহি সুরে জানালো, সে গাছের ডালে পা ছড়িয়ে বসে আয়েশ করে বাদাম খাচ্ছিলো, নামলো বৃষ্টি, তাতেই তার মেজাজ খারাপ এর মধ্যে কফিল
বৃষ্টি দেখে গাছের নীচ দিয়ে দৌড় দিয়ে যাওয়ার সময় তার বাদামের ঠোঙা ফেলে দিলো তাই কফিলের ওপর সে ভর করেছে। অনেক ক্ষতি না করে বাড়ি ফিরবে না। এই শুনে ওঝা আরও রেগে গেলো। তবে রে হারামজাদা, আমার সাথে ফাজলামো, জানিস আমার নাম কি? এই বলে ওঝা নিজের বাপ-দাদা'র চৌদ্দ গোষ্ঠী'র নাম বলতে থাকে, এবং তারা কে কবে কোন কুখ্যাত হারামজাদা জ্বীনকে কি করে কুপোকাত করেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা শেষ করে বলেন, এক্ষুণী ছেড়ে যাবি তুই নইলে আমার একদিন কি তোর একদিন। আগে বল, তোর নাম কি? সব জ্বীনদের একটি করে নাম থাকত। ভাল জ্বীনদের খুব কাব্যিক ভারী শব্দের আরবী নাম, সাধারণ জ্বীনদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনের আরবী ভাষার নাম আর মন্দ জ্বীনদের বাংলা নাম, যেগুলো সচরাচর সনাতন ধর্মালম্বীদের হয়।


তারপর জ্বীন কফিল কে দিয়ে নাকি সুরে অনেক কান্নাকাটি করায়, কি হলে ছাড়বে এই নিয়ে অনেক দর কষাকষি হয়, মানতে হয় জ্বীনকেই নইলে "বোয়ামে" কারাবদ্ধ হওয়ার ভয় আছে। এক সময় গ্রাম শুদ্ধ সকলে দেখলো, টিনের চালে মরমর আওয়াজ করে কি জানি একটা কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়ে গেলো, যাওয়ার সময় আবার সামনের নিম গাছটার কয়েকটা ডাল ভেঙে মাটিতে পরে গেলো। এতক্ষণের শক্তিমান কফিল নিথর দেহে মাটিতে পরে আছে, মুখ দিয়ে তার ফ্যানা গড়াচ্ছে। ওঝা তখন মুরগীর সালুন দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে অনেক টাকা পয়সা আর সালামী নিয়ে বিপুল গৌরবে সহাস্যে বিদায় নিচ্ছেন আর ছেলেকে দেখে শুনে রাখতে ছেলের বাবা মাকে উপদেশ দিচ্ছেন।


কি করে বুঝবেন আপনার বয়স হয়ে গেছে? যখন দেখবেন অতীত খুব টানছে। আগে যা শুধু শুনতাম আজকাল অকারণেই তার বিশ্লেষণ মাথায় ঘোরে। বার বার মনে হয়, এই পুরো ঘটনায় মারামারি-ঝাড়াঝাড়ি যা হলো তা হলো কফিল আর ওঝার মাঝে। সর্বশক্তিমান, অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন অদৃশ্য "জ্বীন" যে সকল ঘটনার ক্যাটালিস্ট, প্রভাবক বা নিয়ামক সে কিন্তু সকল কিছুর উর্ধ্বে থেকে সকলের কাছে অধরাই থেকে গেলো।

Monday, 21 May 2018

টিউলিপের দেশে


https://bangla.bdnews24.com/probash/article1494787.bdnews


অটোমান সম্রাটরা টিউলিপের চাষ করতেন যাকে আজ আমরা তুরস্ক বলে জানি। ষোলশ শতাব্দীতে নেদারল্যান্ডসে টিউলিপের আগমন। পনেরশ বিরান্নবই খ্রীষ্টাব্দে কার্লোস ক্লোসিয়াস যখন প্রথম টিউলিপের ওপর তার অন্যতম বইটি লেখেন তার বাগানে প্রায়ই হানা পড়তো আর টিউলিপের গেঁড় রীতিমত চুরি হত। যখন ওলন্দাজদের স্বর্ণ যুগ চলছিলো, অর্থনীতিসব কিছু সুন্দর আকৃতিতে আসছিলো তখন ফুলের চাষও ছিলো রীতিমত তুঙ্গে। চিত্রাঙ্কনে কিংবা উৎসবে টিউলিপের জনপ্রিয়তা ছিলো সীমাহীন সতেরশো শতাব্দী’র মধ্যভাগে টিউলিপ এতো জনপ্রিয়তা পায় যে আর্থিক ভাবে এর গেঁড় বিক্রি’র সাফল্যকে তখন লোকে “টিউলিপম্যানিয়া” বলতো। লোকে এই পরিমান গেঁড় কিনতো তাতে গেঁড় এর দাম এতই বেড়ে যায় যে, মুদ্রার বদলে বাজারে গেঁড় বিনিময় হত যতক্ষণ পর্যন্ত না গেঁড়টা নষ্ট হয়ে যায়।

এখনো নেদারল্যান্ডস টিউলিপ ও অন্যান্য ফুলের জন্যে বিখ্যাত। প্রায়শই লোকে আদর করে “ফ্লাওয়ার শপ অভ দ্যা ওয়ার্ল্ড” বলে ডাকে। বড় বড় মাঠে টিউলিপের চাষ হয়, যে গুলোকে রঙের জন্যে দেখতে অসাধারণ সুন্দর লাগে। পুরো বসন্ত কাল জুড়ে নেদারল্যান্ডসে টিউলিপ তথা ফুলের উৎসব হয়। টিউলিপের প্রতি ভালবাসা ওলন্দাজদের অপরিসীম, যখন যখন যেখানে বাইরে তারা তাদের বসতি গেড়েছেন, সাথে নিয়ে গেছেন টিউলিপ। তাই এমেরিকার নিউ ইয়র্কে (আদতে যেটা নিউ আমস্টার্ডাম ছিলো), মিশিগান, হল্যান্ড ইত্যাদি শহরে যেখানে যেখানে ডাচ বসতি বেশী সেখানে আজও টিউলিপ ও টিউলিপ উৎসব দেখতে পাওয়া যায়।

উত্তর হল্যান্ডের মাথায় লক্ষ লক্ষ টিউলিপ, হিয়াসিন্ট ও অন্যান্য ফুল দেখা যাবে, যা পুরো দেশের মানচিত্র বদলে দেবে, তৈরী করবে বিভিন্ন রঙের এক সমুদ্র। প্রতি বছর উত্তরপোল্ডারে “টিউলিপ উৎসব” এর আয়োজন করা হয়। টিউলিপ মাঠের ভেতরে এপ্রিল মাসের শেষ দিক থেকে মে মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত এই উৎসবটি চলে। ফুলের বাগান, বাজার সব উপচে পরতে থাকে। আমস্টার্ডামের কাছে আলসমেয়ার শহরটিতে দেখা যায় বাড়িতে বাড়িতে ফুলের বেঁচাকেনা, শহরের বাড়ি গুলোও ফুল দিয়ে নানাভাবে সাজানো হয়, সত্যিই দেখার মত একটি ব্যাপার।

বাগান দেখতে চাইলে কইকেনহোফ যাওয়া আবশ্যিক। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুলের বাগান এটি। হারলেম শহরের দক্ষিন দিকে এর অবস্থান, এবং আপনি অবশ্যই এটি চিনবেন, যদি কখনো কোন ছবিতে বিরাট কোন টিউলিপ ফুলের বাগান দেখে থাকেন, আপনি নিশ্চিত থাকুন এটিই সেটি। পর্যটকদের ভ্রমণ প্যাকেজে প্রায়ই ফুলের বাগান, উৎসব এগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। বেশীর ভাগ ফুলের বাগানেই পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধা থাকে এবং পর্যটকরা যাতে সহজে যাওয়া আসা করতে পারে তার ব্যবস্থা থাকে।


তানবীরা তালুকদার
১৬/১১/২০১৭

আমাদের মা দিবসের গল্প

মেঘের জন্মদিনের পরে যে উৎসবটি আমাদের বাড়িতে মহা ধুমধাম করে পালন হয় সেটি হলো, মাদার’স ডে। কিছুটা প্যারালাল ও বলা চলে। বোঝা যাচ্ছে না? আচ্ছা, তাহলে বিস্তারিতই লিখি।
আমি যদি জন্মদিনের আগে মেঘ কে ধমক দেই, বলি, তুমি আমার কথা শোন না, তোমার জন্মদিনের পার্টি ক্যান্সেল, কেন আমি এত কষ্ট করতে যাবো? আজকাল, আমি উলটো ঝাড়ি শুনি, তাহলে মাদার’স ডেও ক্যান্সেল, তুমি আমার কোন কথাটা শোন, শুনি? তোমাকে গিফট দেই না আমি? স্পেশাল নাস্তা বানিয়ে বিছানায় নিয়ে দেই না? তুমিও তাহলে কিছু পাবে না আর।
তারপর সে সব ভুলে আমরা আবার বন্ধু হই। এক মাস ধরে বাসার বিভিন্ন জায়গায় আমার হাঁটা চলা বন্ধ, কারণ ওখানে আমার উপহার লুকানো আছে, আমি জিমে গেলে আমার জন্যে হাতে কার্ড বানানো হয় সাথে আরও নানা কিছু। লুকিয়ে ইউটিউব দেখা চলে, আমার জন্যে নতুন রেসিপি খোঁজা হয়, তবে এসবই কিন্তু সততার সাথে করা হয় না।
বন্ধুরা মিলে যায়, মায়েদের জন্যে উপহার কিনতে, মায়েদের জন্যে কিনতে গেলে নিজেদের জন্যে পছন্দ হয়ে যায়, (মা কি বেটি), যা টাকা নিয়ে যায় বাবার কাছ থেকে তার অর্ধেক দেখা যায় নিজের জন্যে কিনে আগেই নিয়ে নিয়েছে, বাকি অর্ধেক ও নিজের পছন্দের জিনিস কেনে, জানে ওটা মায়ের পছন্দ হবে না, ওকেই দিয়ে দেবে। এবার তাই বলে দিয়েছি, গিফট নিয়ে চোট্টামি করবি তো, যা যা পছন্দ হবে না, সব দোকানে ফেরত দিয়ে বদলে নেবো, তোকে কিন্তু দেবো না। ডাচ কায়দা মত সাথে ক্যাশ মেমো দিয়ে দিবি।
হেসে কুটিপাটি হয়ে বলেছে, না, না এবার তোমার পছন্দ মত উপহার দেবো মামি। ইউএসতে বড় মায়ের সাথে মেইল ও চালাচালি হল এই নিয়ে, আমাকে বলা হলো, সাজেশান দিতে, কি কি আমি চাই। কিন্তু কোনটা কেনা হলো সেটা আমাকে জানানো হয় নি। মেয়ের বাবা আবার এক ডিগ্রী বেশি চালাকি করতে এসে ধরা, তোমার গলার, হাতের আর আঙ্গুলের মাপ দাও। আমি বললাম, সাজেশানে গলা নেই, যাও ভাল করে চেক করো, এত স্মার্ট সাজারও কিছু নেই। বাবার বোকা-চালাকি’তে মেঘ আবার হেসে কুটিপাটি।
উপহার ছাড়াও এবারের মা দিবস অনেক অনেক অনেক স্পেশাল। আদুরে মেঘের স্পেশাল স্পেশাল খালামনিরা আসছে এবার মেঘের সাথে মা দিবস উদযাপন করতে। মেঘ সবার জন্যে আলাদা আলাদা ডিজাইনের কার্ড বানিয়েছে, চার দিন ধরে। প্রত্যেকটা কার্ডের ডিজাইন আলাদা হতে হবে, ইউনিক হতে হবে প্রতিটা কার্ডকে। আজ আমাদের বাড়ি তে চার চান লাগ গায়ে।
ধমক দিয়েছি আমার সোনা বাচ্চাকে, সারাদিন এগুলো নিয়ে বসে আছিস, গান প্র্যাক্টিস কখন করবি? বেচারী মেয়ে আমার ভয়ে, খালি গলায় গান গাইছে আর সাথে সাথে দু হাতে কাগজ কাটছে আর আঠা লাগাচ্ছে। কার্ড ডিজাইন করছে, আড়চোখে নজরও রাখছে, আমি দেখে ফেলছি কি না তার সারপ্রাইজ। তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, তোমার জন্যে বছরে দু বার সব হয়, জন্মদিন আর মাদার’স ডে আর আমার শুধু জন্মদিন। কেন, একটা কিডস ডে থাকবে না? এটা খুব আনফেয়ার না মামি? আমিও খুব কনফিডেন্ট গলায় বললাম, রোজ ডে’ই তো কিডস ডে, তোকে তো আমি রোজ পেলে যাই, বছরে একটা দিন মাদার’স ডে, ঐটাই সবচেয়ে আনফেয়ার।
আমি জানি মেঘ, সামটাইমস, আ এম মীন টু ইউ এজ ইউ আর টু মি বাট ইউ বোথ নো, উই লাভ আস দ্যা মোস্ট
পৃথিবী’র সব মা’দেরকে মা দিবসের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। আর আফশোস হয় কেন কোন মা দিবসে আমি আমার মায়ের কাছে নেই, আমার মা আমার কাছে নেই। দূর থেকে উপহার দিয়ে কি সব আহ্লাদ মেটে? ছোটবেলায় তো জানতাম না, মা দিবস কি।
ভীষণ মিষ্টি এই দিনটি সব মা প্রাণ ভরে উপভোগ করুক, যেমন আমি বা আমরা অনেকেই করছি।
মঙ্গল হোক সকলের।

বদলে যাওয়া প্রেম

গল্পে গল্পে রাত হত, ভালবাসায় ভোর
পাশে বসে খাওয়া, আদর নিয়ে জোর
খটখটে বিকেল কিংবা সন্ধ্যে ছোঁয়া বৃষ্টি
লোকের ভীড় আর ক্রিকেট মাঠের অনাসৃষ্টি
পায়ের ব্যথায় কাতর তবুও চলেছো হেঁটে 
দু ঘন্টা কথা বলে কি এই আজন্ম তৃষ্ণা মেটে?
বোশেখ মাসের এই গরমে চলছে এসি, বন্ধ পাখা
এ পাশে অপেক্ষার প্রহর গুনছে আজও সে একা
রাতের খাওয়া বদলে গেছে, অন্য কারো সাথে
পড়বে হয়ত মনে এই আশায় কেউ তবুও থাকে।
সময় বদলায়, কথা ফুরায়, হারায় মানুষ ন্যায্য পাওনাটুকু
বদলে বুঝি শুধু আমিই গেছি, বদলাও নি কি তুমিও এতটুকু?

02/05/2018



যতই অপবাদ দাও না কেন সে কিন্তু পাগল নয়
আবেগের তীব্রতাকে লোকে ভেবে নেয় স্বেচ্ছাচারিতা
প্রয়োজন কে নাম দেয় তুচ্ছ বিলাসিতা
এত বেশি দোষী সে মানা যায় না
কাচের মত স্বচ্ছ আর গভীর তার ভালবাসায় বড্ড হাসফাস লাগে


She' everything but crazy.
They've mistaken her passion for aggressiveness,
her needs for silly demands.
Her flaws were too much to handle
and her love too real to accept.

সে যে বসে আছে একা একা

এক সওদাগরী আপিসে সে কেরানি ছিলো, জীবন মানে সপ্তাহে পাঁচ দিন, ভোর সাড়ে ছয় ঘটিকায় নিদ্রা হইতে জাগিয়া বৃষ্টি-বরফ ঠেলিয়া তাহাকে আপিসে যাইতে হইতো। সেইখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ঘরে’র আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত কুরসী’তে বসিয়া সারাদিন রাজ্যের মাইনষের প্যানপ্যান, ভ্যানভ্যান শোনাই ছিল তাহার কাজ। এইসব রসকষহীন কঠিন হিসাবের কথা শুনিতে শুনিতে বেলা গড়াইয়া দ্বিপ্রহর।


অথচ ইহার মধ্যেই ঐ দূর নীল আকাশে কত শত শাদা মেঘ ডানা মেলিয়া উড়িয়া যাইতো। সেই দৃশ্য অবলোকন করিয়া কিছু পাখি কলকাকলি করিয়া তাহাদের সুমিষ্ট সুরে গান গাহিয়া উঠিতো। হঠাৎ হঠাৎ আকাশ ভীষম রাগিয়া কাঁদিয়া উঠিতো। মাঝে মাঝে তাহাতে রাস্তায় জল জমিয়া যাইতো। দুষ্ট মিষ্টি ছেলের দল তাহাতে লাফাইয়া উঠিয়া ব্যস্ত পথিকের জামা কাপড় ভিজাইয়া দিতো। লাজুক কোন মায়াবতী কিশোরীর দুই চোখ আচমকা কোন বিপ্লবী তরুণের হৃদয় ছুঁইয়া তাহাকে আর্দ্র করিয়া তুলিতো। আরও কত শত কিছু ঘটিয়া যাইত এই বিশাল ধরাধামে যাহার কোন ছোঁয়া এই সওদাগরী আপিসে আসিয়া পৌঁছাইত না। সেইখানে সারাক্ষণ চলিত কঠিন লাভ আর লোকসানের বাণিজ্যিক খেলা।


মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘবের সাধ্য তাহার ছিল না। তাহাকে চলিতে হইত কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে দিয়া। তবুও তাহাদের খানিক সত্যি আর খানিক মিথ্যা সহমর্মিতা দেখাইয়া সান্ধ্য ছয় ঘটিকার দিকে সে বাটি ফিরিতো। ফিরিয়া তাহাকে বাধ্যতামূলক রান্নাবাটি খেলিতে হইত। সেই খেলা সাঙ্গ হইলে শুরু হইত পিতা-কন্যার যুগলবন্দী ঘ্যান প্যান। এই সমস্ত কিছুর মাঝেই সে তাহার মুঠোফোন খানি ব্যবহার করিয়া মুখবহিতে প্রবেশ করিত, সেইখানে রাজ্যের হাসিখুশী মানুষ তাহাদের সুখ আনন্দের ছবি বা বার্তা পোস্ট করিয়া রাখিয়াছে, দেখিয়া তাহারও ভাল লাগিত। সেই ভাল লাগা সে এইদিক সেইদিক কিছু “লাইক” কষাইয়া যথাসাধ্য প্রকাশ করিত আর তাহার পর ঘুমাইতে যাওয়ার আয়োজন করিত কারণ পরদিন তাহাকে আবার একই রুটিনে চলিতে হইবে।


,
রাঁধার পরে খাওয়া, আর খাওয়ার পরে রাঁধা
বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা।


রবি ঠাকুর তাহাকে ভাবিয়াই হয়ত এই পদ্যখানি রচিয়া ছিলেন। এই সংসার বেড়াজাল হইতে তাহার কোন মুক্তি ছিল না। অথচ কত কি করিবার ছিল, কত দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া দেখিবার ছিল, কত সহস্র বই তাহার না পড়াই রহিয়া গেলো, কত লক্ষ সঙ্গীত রহিল অশ্রুত, সিনেমার কথা না হয় নাই বা কহিলো, এ ছাড়াও আরও আরও আরও কত শত কত কি


সে যে বসে আছে একা একা, রঙ্গীন স্বপ্ন তার বুনতে,
সে যে চেয়ে আছে ভরা চোখে, জানালার ফাঁকে মেঘ ধরতে।
তার গুণগুণ মনে গান বাতাসে ওড়ে, কান পাতো মনে পাবে শুনতে,
তার রঙের তুলির নাচে মেঘেরা ছোটে, চোখ মেলো যদি পারো বুঝতে।
সে যে বসে আছে একা একা, তার স্বপ্নের কারখানা চলছে,
আর বুড়ো বুড়ো মেঘেদের দল, বৃষ্টি নামার তাল গুনছে।
তার গুণগুণ মনের গান বৃষ্টি নামায়, টপটপ ফোঁটা পড়ে অনেকক্ষণ,
সেই বৃষ্টিভেজা মনে দাগ দিয়েছে, ভেজা কাক হয়ে থাক আমার মন।

১১/০৪/২০১৮

সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ - ভারতবর্ষ

সাম্প্রতিক কালে আসানসোলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি নিয়ে অর্ক ভাদুড়ী’র হৃদয় নিংড়ানো লেখাটি বেশ কয়েকজন আমাকে ইনবক্সে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেককে আমি আবারও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, আমাকে আপনারা এর যোগ্য ভেবেছেন বলে। ইমাম সাহেবের আচরনে আপনারা আশাবাদী হলেও আমি নিতান্ত বিনয়ের সাথে সাদামাটা ভাষায় এখানে আমার হতাশা বলছি,


ইমাম সাহেব তার ছেলে হত্যার বিচার চান না, তিনি অসম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেন, যেমন কখনো ছিল। আচ্ছা, ইতিহাস আমরা সবাই কম বেশি পড়েছি, আমরা নিজেরাও কালের সাক্ষী, ইতিহাসের অংশ হয়ে আছি। “ভারতবর্ষ” ঠিক কোন সময়টাতে অসাম্প্রদায়িক ছিল, বলতে পারবেন কেউ? সেই সময়ের কোন ইতিহাস কি কেউ কখনো পড়েছেন? ইমাম সাহেব অলীক কোন স্বপ্ন দেখছেন না তো? ইতিহাস সাক্ষী, ভারতীয়দের মধ্যে একতা থাকলে শত শত বছর ধরে ভারতবর্ষ বিদেশীদের দ্বারা শাসন হত না।


বৃটিশ সামাজ্র্যে কখনও সূর্য অস্ত যেতো না, সে কি এমনি এমনি ছিল? সেটুকু দূরদর্শিতা ছিল বলেই তারা দু’শ বছর আমাদের শাসন করেছে। ভারতের সব বিচ্ছিন্ন টুকরো গুলোকে একসাথে জুড়ে যেমন গোটা ভারতের মানচিত্র এঁকেছিল আবার ছেড়ে যাওয়ার সময় টুকরো’ও করে গেছে এই সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। নইলে কোন যুক্তিতে একটি দেশ এখন তিনটি দেশ? তিনটি দেশ হয়েই কি থেমেছি আমরা কোথাও? এখনও সেই হানাহানি করেই যাচ্ছি। আড়াইশ বছর আগেও যা ছিল এখনও তো তাই আছে। ব্রিটিশদের এই রাজনীতি এখন খেলছে আমাদের স্বদেশী রাজনৈতিক নেতারা। বাংলাদশে যা অবস্থা ভারতেও অবস্থাও তথৈবৈচ। জনতা খায় রাজনীতিবিদরা খাওয়ায়, খেলা চলছে হরদম এবং চলবে “কায়ামত সে কায়ামত তাক”।


আড়াইশ বছরে ঈদ–পূজা ডিজিটালাইজড হয়েছে কিন্তু চলছে। বরং আরও বেড়েছে, থামেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমরা কি করে রক্ষা করি? ফেসবুকে অসাম্প্রদায়িক স্ট্যাটাস লেখা’র মাধ্যমে। সেই স্ট্যাটাসের ভাষা হয়ঃ “সব মুসলিম বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা” কিংবা “সব সনাতন ধর্মালম্বীদের শারদীয়া শুভেচ্ছা”। শুভেচ্ছা’র মত একটা সার্বজনীন ভদ্রতা’ও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই পায় না, হায় অভাগা ভারতবর্ষ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা যা করে গেছে আমরাও তা বিনা বাক্যে পালন করে যাচ্ছি। কখনও কি নিজের মনকে প্রশ্ন করি, কি করছি আর কেন করছি?


যেকোন একটি ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে বাংলাদেশ–পাকিস্তান–ভারতের মধ্যে যে পরিমান গালি’র বন্যা বয়ে যায় তাতে নিঃন্দেহে আমাদের অসাম্প্রদায়িকতাই ধরা পরে। বিচ্ছিন্ন হওয়া যে আমাদের কতটা অনিবার্য ছিল তা আজও প্রতীয়মান। ফেসবুকে’র বিভিন্ন লেখালেখি গ্রুপে আমার খুব সামান্য যাতায়াত। স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষাভাষী গ্রুপে আমি বেশি যুক্ত। এই খেলা নিয়ে দু দেশের সৃজনশীল ব্যক্তিরা যে ভাষায় একজন অন্য একজনকে আক্রমণ করে তারপর সেই ব্যক্তিই আবার প্রেমের কবিতা’ও লেখে। সেলুকাস।


সর্বশেষে, পুত্র হারা ইমাম সাহেব ছেলে হত্যার বিচার চান না। এই দুঃখী আত্মার প্রতি যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এটি কিন্তু খুব সুস্থ কোন ব্যাপার নয়। আপনারা যারা ইমাম সাহেবের মহানতা দেখছেন এরমধ্যে তার সাথে কি তার বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, প্রচলিত গনতন্ত্রের প্রতি অনাস্থাটা দেখতে পেয়েছেন? তিনি মহান, আমিও নিসঙ্কোচে স্বীকার করছি কিন্তু সাথের এই কারণ গুলো’ও বাস্তব। বিচার চান নি “দীপন” এর বাবা’ও। কারণ জানতেন, বিচার পাবেন না। বিচার চেয়ে চেয়ে আজও পথে পথে ঘুরছেন, অভিজিতের বাবা। বিচার পাননি। তারা সবাই কিন্তু ঠিক একই কারণে খুন হয়েছেন। এই ভারতবর্ষে কম ছেলের প্রাণ উৎসর্গ হয় নি। আজকে আসানসোল তো কালকে ব্রাক্ষনবাড়িয়া। ইমাম সাহেবের ছেলের আগেও অনেকের প্রাণ গেছে, এখনও যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও যাবে যাদের কখনও কোন বিচার হয় নি, হয় না আর হবে না।


আসলে গোটা পৃথিবী’র কোন জায়গাটাতে “ধর্ম” নিয়ে মারামারি হয়নি সে জায়গাটি আমি খুঁজছি। ইউরোপ এখন আটকে আছে কঠিন আইনের বেড়াজালে। আইন শিথিল হলেই অন্য চেহারা বের হয়ে আসতে পারে সে ব্যাপারে আমার দ্বিধা কম।


ইমাম সাহেবের শোকার্ত পরিবারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর অর্ক ভাদুড়ী’কে অসংখ্য ধন্যবাদ এই মর্মস্পর্শী লেখাটি আমাদের দ্বারে পৌঁছে দেয়ার জন্যে।

০৯/০৪/২০১৮