Tuesday, 7 May 2013

চুপি চুপি কেঁদে রোদ পোহানো দিন


বাবা মা প্রায় চার দশক ধরে তাদের স্বপ্নমমতা আর ভালোবাসা দিয়ে ছোট্ট যে সংসারটি সাজিয়ে রেখেছিলেন তার একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। অনেক ঝগড়া, মান অভিমান, মারামারি, অসুস্থতা, গানবাজনা, নাচানাচি, পরীক্ষা,চাকরির টেনশানের আপাত সমাপ্তি। সবাই যার যার গন্তব্যে ঠিক করে নিয়ে যার যার জীবন খুঁজে বেরিয়ে গেছে, পিছনে রয়ে গেছে শুধু ধূলোমাখা স্মৃতি নাকি হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা। ফিরে ফিরে আসবো এই আঙিনায় শর্তহীন সেই রঙ্গীন দিনের ছোঁয়া পেতে। মাত্র কয়েকদিন আগেই যেটা ছিল আমার ঘর আমার নিজের ঘর, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অধিকারের জায়গা, নিরাপত্তার জায়গা আজকে ছোট্ট বালিশ নিয়ে, টুকটুকে লালপরী ভাইঝিটা সেই ঘরে ঘুমায়,হ্যা শুধু খাটটা বদলে গেছে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হালফ্যাশনের বিছানা এসেছে ডোরা সাথে নিয়ে কিন্তু আয়তন বর্গক্ষেত্র কিছুই বদলায়নি। ডাইনীং টেবলের নীচে বসে চেয়ার সব টেনে দিয়ে আমি আর ভাইয়া ঘর ঘর খেলতাম, সেই একই জায়গায় একই ভঙ্গীতে বসে আরভিন তাহিয়া শ্রেয় একই খেলা খেলে যাচ্ছে। মাঝখানে এতোদিন চলে গেছে?! কোথায় গেছে সেই সবদিন? কোন কালের আর্বতে? কোথায় গেলে তাকে আবার ছুঁতে পারা যাবে?

আমি জানি আমরা ভাইবোনেরা যে যেখানেই থাকি,যখনই কোথাও বাচ্চাদের কিংবা কিশোর কিশোরীদেরকে যদি লুডু খেলতে দেখি, এক পলকের জন্যে হলেও দাঁড়িয়ে পড়বো। সেইসব মুষলধারে বৃষ্টিভেজা দিনে, যেদিনগুলোতে আব্বু বাইরে যেতে পারছেন না, বৃষ্টির কারণে সব অচল, রাস্তায় পানি জমে গেছে, রিকশা গাড়িকিছুই চলছে না। আম্মি খিচুড়ি মাংস করছেন, আর আমাদের গল্পের বই পড়া ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। আব্বু ডেকে বসাতেন লুডু খেলতে। মানুষ বেশি, সবাই খেলতে চায় আর কি করা,শুরু হতো সাপলুডু। একবার মই দিয়ে সড়াৎ ওপরে চড়া আবার পরক্ষণেই সাপে খেয়ে নিলে লেজে নেমে যাওয়া। যখন মই দিয়ে চড়ছি সবাই এতো জোরে চিৎকার করছি আবার যখন সাপে খেয়ে নীচে নামছি তখনো তাই। পাড়া প্রতিবেশি সবাই ভাবতেন কি হয়েছে এই বাড়িতে এতো চিৎকার কিসের?যে বাড়িতে একটা উলটা শব্দ হয় না সে বাড়িতে এতো শোরগোল, অনেকেই আড়ে ঠাড়ে খোঁজ নিতে চাইতেন, আমরা এতে উৎসাহিত হয়ে, মজা পেয়ে আরো দ্বিগুন উৎসাহে চেঁচামেচি করতাম। ওদেরকে ভয় দেখাতে চাইতাম ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে এই বাড়িতে, তাই চিৎকার হচ্ছে।

হরতালে আটকে থাকা দিনগুলো ছিলো আরো আনন্দের।দিনের বেলা মুভি দেখা আর রাতের বেলা কার্ড খেলা। আব্বু আমি ভাইয়া আর সুমি। বাকিরা দর্শক ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত। ব্রে খেলতে গিয়ে কি টেনশান। কার ভাগে রানী আসবে আর রানী একা আসা মানেই বারো পয়েন্ট। টেনশান ছিল যেনো এরওপর ভবিষ্যতের কার্ড ক্যারিয়ার নির্ভর করছে। যদি আমি রানী খেয়ে গেছি কি রেগে যেতাম। দুবার পরপর রানী খেলে কার্ড ছিঁড়ে, পয়েন্ট লেখার খাতা ছিঁড়ে, সব ভেঙ্গে কেঁদে কেটে অস্থির করতাম। আব্বু কি বকতো, হার মানতে পারিস না, তুই খেলার অযোগ্য। কেউ না কেউ একজনকেতো রানী খেতেই হবে, তুই খেলেই সবার দোষ। কিন্তু পরদিন আবার বসতাম, আজকে রানী খেলে কাঁদবো না, ভাঙবো না কিছু এই প্রমিজ করে আব্বুর কাছে, কিন্তু দুই – তিনবার পরপর রানী খেলে প্রমিজ আর মনে থাকতো না। কার্ড যে খারাপ খেলতাম তা নয়, সব ভাইবোনকে আব্বু বেশ হাতে ধরে কার্ড হিসেব করে গুনে খেলা শিখিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু মাঝে মাঝে কার্ডই এমন আসতো যে রানী না খেয়ে উপায় ছিল না। চাইলেও আর সেইভাবে কার্ড খেলার দিনে ফিরে যাওয়া সম্ভব না।এখন রানী পরপর পাঁচবার খেলেও মনে কোন অনুভূতি আসবে না, হারজিত আসলে কোন ব্যাপার না, দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য শুধু মন এখন সে কথা জেনে গেছে।

আমরা হারমোনিয়ামে আর ভাইয়া তবলায় সে কতো কতোদিন গেছে। নিশিথে যাইও ফুলে বনে ও ভোমরা, কিংবা চৈতালী চাঁদিনী রাতে, মহুয়া বনে দেখেছি তারে এলোচুল ঘুঙুর বাঁধা পায়। রাতভর গানবাজনা রাতভর আড্ডা। মাঝে মাঝে পাশের বাসা থেকে টিটুভাইয়া ভাবী কিংবা হাসি চাচী কবির চাচা জানালা খুলে দিয়ে জোরে ডেকে বলতেন, জোরে জোরে গাও, আমরাও শুনি কিংবা এই গানটা কর কিংবা ঐ গানটা। বিশেষ করে লোডশেডিং এর সন্ধ্যাগুলো। এতো গরমে ফ্যান নেই, টিভি নেই আমাদের গানইতো সবার ভরসা। মেহেদী পরার কতো আয়োজন। সারারাত মেহেদী নিয়ে গুলতানি, পাড়াশুদ্ধ কার প্রেম হলো কার কি হলো তার আলাপ আলোচনা শেষে ভোররাতে যার যার মতো কোন জায়গায় কাত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা, আম্মি আব্বু সকালে এসে চাদর টেনে দিয়ে যেতেন গায়ে। পহেলা বৈশাখের সাজগোজ প্ল্যান কতো আয়োজন। রমনা বটমূলে ছয়টায় যাওয়ার প্ল্যান সারাজীবন করেছি কিন্তু কোনদিনও ছয়টায় পৌঁছতে পারিনি। কি ট্র্যাজিডি।

এক একটা মৌসুম আসতো ছাঁদে ঘুড়ি ওড়ানোর। তখনো এতো হাইরাইজ এপার্টমেন্ট নেই ঢাকাতে। আশে পাশে বেশির ভাগ চারতলা পাঁচতলা বাড়ি, বিকেলে সবাই কম্পিটিশান দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো। আমাদের ঘুড়ি নাটাই লোকবল কিছু নেই। ভাইয়া তখন বড় হয়েছে, আমাদেরকে ফেলে দিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যায়। আমাদের বিকেলে কিছুই করার থাকে না, মন খারাপ করে ছাঁদের এপাশ থেকে ওপাশে হাটাহাটি করে, আম্মির গাছের লেবু, কাজি পেয়ারা, গোলাপ দেখে নীচে নেমে আসি। একদিন হঠাৎ কারো কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাঁদে এসে পড়ে দৈবাৎ। সেটা দিয়ে কি করবো ভাবতে ভাবতে আমাদের বাসায় থাকে যে ছেলেটা বললো দেন আপা, আমি উড়াই। সে কোথা থেকে মাঞ্জা দেয়ার সরঞ্জাম যোগাড় করে ছাঁদে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু করলো। আমরাও মজা পেয়ে গেলাম, ঠিক করলাম ঘুড়ি কিনবো না,লোকের ঘুড়ি কেটে কেটে উড়াবো। নিজেরা কিছুই জানি না, বাসায় যারা থাকে  তাদেরকে সব ডেকে বিকেলে ছাঁদে নিয়ে যাই, কি উত্তেজনা। এমন উত্তেজনা যে সারাদিন অপেক্ষা করে থাকি কখন বিকেল হবে, ছাঁদে যাবো। পাড়াময় নাম হয়ে গেলো ঘুড্ডি কাটাখোর হিসেবে। পাড়াভর্তি চাচা সম্পর্কের লোক বিধায় আদরের ধমকধামক দিয়েই ছেড়ে দিতো। কিন্তু চাচাদের বাসার ভাড়াটিয়ারাতো আর সহ্য করবেনা। একদিন বিকেলে তুমুল উত্তেজনা পরপর তিন চার ঘুড়ি কেটে নিয়েছি, যাদের ঘুড়ি কাটা গেছে তারা রাগের মাথায় ছাঁদে উঠে এসেছে। দারোয়ানতো আমাদের সাথে ঘুড়ি কাটায় ব্যস্ত,নীচে কেউ নেই। আমরা হঠাৎ সিড়িতে হৈচৈ শুনে ঘাবড়ে গেছি। আম্মি শুনলে রক্ষা থাকবেনা। কাটা ঘুড়ি, মাঞ্জা, নাটাই সবতো ছাঁদে পানির ট্যাঙ্কির নীচে লুকানো থাকে, আম্মি তার কিছুই জানে না। এই খেলায় আছি আমরা আর আমাদের বাসায় থাকে যারা তারা। প্রথমে ভয় পেলেও পরে সাথে সাথে উলটা পার্ট নিয়ে বললাম, ছাঁদে এসেছেন কাকে জিজ্ঞেস করেছেন? বাড়িওয়ালার পারমিশান নিয়েছেন? মেয়েদেরকে ছাঁদে উঠে বিরক্ত করতে এসেছেন? ঝাড়ির চোটে ব্যাকা করে নীচে নামিয়ে দিলাম। তারপর কেমন যেনো ঘুড়ি ওড়ানো মৌসুম আবার হারিয়ে গেলো।

আমাদের কোন ভাইবোনেরই কেমন যেনো ঝাঁকে ঝাঁকে বন্ধুবান্ধব ছিলো না। প্রত্যকেরই দু’একজন বন্ধু কিন্তু তারা একদম পরিবারের সদস্যদের মতো। আমরাই আমাদের বন্ধু ছিলাম, আছি। আমরা নিজেদেরকে নিজেরা যতো ভাল বুঝি মনে হয় ততো ভাল আমাদেরকে কেউ বুঝে না বুঝতে পারবে না। তাই বন্ধু বানানোর আগ্রহও আমাদের অনেক কম ছিল। কিন্তু এক আশ্চর্য কারণে সবার বন্ধুই সবার বন্ধু হয়ে গিয়েছে। আমার বন্ধু ভাইয়ার বন্ধু আবার ভাইয়ার বন্ধু আমার বন্ধু। ভেদাভেদ নেই। আবার সোয়াপও হয়েছে। দেশান্তরী হওয়ার কারণে সুমির বন্ধু আমার আর আমার বন্ধু সুমির কাছে চলে গেছে। নতুন বারবিকিউ মেশিন কেনার পরের সেই প্রচন্ড গরমের বারবিকিউ সন্ধ্যাগুলো, নাচানাচি, ছাঁদের গানের আসর এগুলো হয়তো আর সেভাবে কখনো ফিরে আসবে না। বাসার সমস্ত বাচ্চাগুলোকে জমিয়ে নিয়ে ছাঁদের সুইমিংপুলে চুবানো, ওয়াটার পিস্তল খেলা কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপা হয়ে আম্মির ভয়ে লুকিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে ঘরের কার্পেট ইত্যাদি সব ভিজিয়ে দিয়ে প্রচুর বকাঝাকা খাওয়ার দিন এখন ইতিহাস। অফিসের কাঁচঘেরা ঘর থেকে দুপুরের বৃষ্টি যখন প্রথমে মন আর তারপরে চোখ ভিজিয়ে দিয়ে ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাসনিয়ে আসে, মনে হয় এর কিছুই কি কোনদিন আমার ছিলো না?

একটা মজাও ছিলো, আমাদের বাড়ি কেউ বেড়াতে এলে সহজে যেতে চাইতো না। আমাদের কান্ড কারখানা এতো মজা লাগতো, আমাদেরকে দেখতেই দেখা যেতো বেশ কয়েকদিন বেশি থেকে গেছে। এটা আমরাও একটা পর্যায়ে এসে বুঝতে পারতাম। কিংবা সকালে এলে রাত অব্ধি থেকে গেছে। ভাইবোনদের আমাদের সবচেয়ে প্রার্থনীয় জিনিস ছিলো একসাথে ঘুরতে যাওয়া। সে যমুনা রিসোর্ট হোক, কিংবা সিলেট, সেন্ট মার্টিন হোক কিংবা নীলগিরি, নইলে লং ড্রাইভ দাদুর বাড়ি – নানুর বাড়ি। আন্তাক্ষরী খেলতে খেলতে যাওয়া ফিরে আসা তারপর তিনদিন গলা বসা। এখনো এই একটা জিনিস ধরে রাখার জন্যে সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করবো ভেবে  রেখেছি। বছরে একবার যেভাবেই হোক সবাই মিলে বেড়াতে যাবো, ছোটবেলা খুঁজে ফিরতে।

ছোটবেলায় ডালিম কুমারের গল্প শুনেছিলাম। পুকুরের মধ্যে কৌটা, কৌটার মধ্যে ভোমরা আর তার মধ্যে দৈত্যের জান। আমাদের সারা বাসার সমস্ত সুর আর সূতো যার কাছে জমা ছিল সেই ভোমরা যার মাঝে আমাদের সবার জান সে এখন দৈত্যপুরবাসিনী। মিষ্টি একটা দৈত্য এসে ভালবেসে নিয়ে গেছে তাকে। এতো দুষ্টামী,এতো শয়তানী, এতো বাদরামি এতো যুগ ধরে সবকিছু যে একজন এতোদিন ধরে রেখেছিলো তার অপরিসীম মায়া আর ভালবাসা দিয়ে সে এখন নতুন জীবনে প্রবেশ করেছে। তার নিজের জগত তৈরী হবে হাজারো ব্যস্ততা দিয়ে। আমার মানিপ্ল্যান্টের ঝুলানো টবে তার ভালবাসার স্পর্শ এখন হয়তো আর আসবে না। আমার কবিতার খাতা, গল্পের বই গুছিয়ে রাখার সময় পাওয়া তার জন্যে এখন অনেক কঠিন হবে। আমার কাপড় সব গুছিয়ে পরের বছরের অপেক্ষা করার দিন এখন আর তার নেই। এখন তার দিন অনেক দ্রুত শেষ হবে তার নিজের স্বপ্নের জাল বুনে। বিছানার চাদরে এখন মেঘলার গন্ধ খোঁজা সে ভুলে যাবে নতুন আনন্দে। এখন পুরনো সুর বদলে যেয়ে নতুন সুরের অপেক্ষা তার ............ যেসব সুখ আনন্দ স্বপ্ন সে দেখেছে আর যেগুলো দেখেনি তার সব যেনো তার ঝুলিতে প্রকৃতি উদার হস্তে ঢেলে দেয় এই মিনতি রইলো প্রকৃতির কাছে আমার -আমাদের। একদিনের জন্যেও যেনো আনন্দ ম্লান না হয় তার দুচোখের স্বপ্ন ফিকে না হয়।

পাঁচই মে চাঁদের পালকি চড়ে এই গোলাপী পরী আমাদের বাড়িতে চলে এসেছিলো অপরিসীম মমতা বুকে নিয়ে। শুভ জন্মদিন পুতুল সোনা। আনন্দময় জীবন হোক আনন্দময় ভুবন হোক।

০৩/০৫/২০১৩

লেখাটি লিখতে লিখতে অসংখ্য বার চোখ ভিজে গেছে। মানুষের সবচেয়ে ডিফেকটিভ অংশের নাম হলো “মন”। সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়। অলস দুপুর, বিষন্ন বিকেল কিংবা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা ......... সবই মন খারাপের নাম

তার পছন্দের আর আমার পছন্দের একটা গান এই লেখায় জুড়ে থাকুক


মেলেছো চোখ উড়েছে ধূলো
দুরের পালক তোমাকে ছুলো
তবু আজি আমি রাজি
চাঁপা ঠোঁটে কথা ফোটে
শোনো আমাকে রাখো চোখের কিনারে গোপন মিনারে

ঘুম ভেঙ্গে কিছু মেঘলা দিন হোক

ওড়নার পাশে সেফটিপিন হোক
বিকেলের নাম আলপাচিনো হোক
খেয়ালী ছাতে

কফি কাপে একা ঠোঁট ছোয়ানো দিন

চুপি চুপি কেঁদে রোদ পোহানো দিন
ভালো হয় যদি সঙ্গে আনো দিন
যেকোন রাতে

জানি দেখা হবে ঠোঁটের ভেতরে ঘুমের আদরে

চকমকি মনে মন জ্বালাতে চাই
দিনে ব্যালকনি রাতে বৃষ্টি চাই
পিছুডাকে ঘুম সাজাতে চাই
বিছানা ঘিরে

ছোট ল্যাম্পশেড অল্প আলো তার

চুল খুলে কে রুপ বাড়ালো তার
তুমি বোঝ নাকি মন্দ ভালো তার
যেও না ফিরে
জানি দেখা হবে রাতের সোহাগে তোমার পরাগে

Tuesday, 30 April 2013

রানী যায় রাজা আসে




আজকে ৩০শে এপ্রিল ২০১৩তে সরকারীভাবে নেদারল্যান্ডসের রানীর রাজত্ব শেষ হয়ে আবার রাজার রাজত্ব শুরু হলো। ৩০শে এপ্রিল “কুইন্সডে” হলেও এটা রানী বিয়াট্রিক্সের জন্মদিন ছিল না। তাঁর জন্মদিন ছিল ৩১শে জানুয়ারী। ৩০শে এপ্রিল ছিল তার মা রানী জুলিয়ানার জন্মদিন। কিন্তু ৩১শে জানুয়ারী যেহেতু আবহাওয়া খারাপ থাকে, জনগন আনন্দ উৎসব করতে পারে না আর ৩০শে এপ্রিল সাধারণত একটু আবহাওয়া ভাল থাকে, চারদিকে ফুল আর পাখির গান তাই সর্বসম্মতিক্রমে বিয়াট্রিক্সের মায়ের জন্মদিনই এতোদিন কুইন্সডে হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে নতুন রাজা উইলাম আলেকজান্ডার এর জন্মদিন ২৭শে এপ্রিল, তাই আশাকরি কিংসডে পালন করতে বেশি অসুবিধা হবে না। রানী বিয়াট্রিক্স অনেক জনপ্রিয় ছিলেন কারণ তিনি বেশি রয়ালিটি মানতেন না। তাকে প্রায় এদিকে ওদিকে জীন্স পরা অবস্থায় সাইকেল চালাতে দেখতে পাওয়া যেতো। খুব বেশি বডিগার্ড সিকিওরিটি এগুলোর ধার ধারতেন না।

পাঁচ মিলিয়ন ট্যাক্সের টাকা খরচ করে উইলাম আলেকজান্ডার রাজা হলেন। জনগনের ট্যাক্সের টাকায় অথচ শোনা যায় তারা নাকি পৃথিবীর ছয় নম্বর ধনী পরিবার। আর আমরা একটা কাঠি লজেন্সও পেলাম না। অফিস থেকে দুটো কমলা টমপুজ খাওয়ার বন দিলো। ২০০২ সালের ০২ ফেব্রুয়ারী যখন উইলিয়াম বিয়ে করলো তখনও শনিবারে বিয়ের তারিখ ফেলা হলো যাতে সরকারী ছুটি ঘোষনা না করতে হয় আর বিয়ের খরচ কম লাগে। আরে আমাদের দেশের চেয়ারম্যান মেম্বারের ছেলের বিয়েতেও স্কুল কলেজ ছুটি দেয়া হয়, সারা গ্রামের লোককে ভোজ খাওয়ানো হয়। এখানে রাজার বিয়ে উপলক্ষ্যে জনগন একটা বাতাসাও পেলো না। তাও আর্জেন্টিয়ান মেয়ের বাপকে বিয়ের সরকারী অনুষ্ঠানে আসতে দিবেন না কারণ তিনি আর্জেন্টিনার সামরিকজান্তার কৃষিমন্ত্রী ছিলেন কিন্তু বাকি সব পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন। রাজার অভিষেক অনুষ্ঠানও এতো সাদামাটা হলো, আমাদের দেশের চেয়ারম্যানদের শপথ অনুষ্ঠানও এর থেকে জমকালো হয়। পাঁচ মিলিয়ন ইউরো কোথায় খরচ করলো কে জানে? নিজেদের আলখাল্লা সাইজ জামা বানাতে নাকি? চার্চের মধ্যে যেয়ে শপথ নিয়েছে। এই নাকি রাজকীয়তা? বংগভবনের প্রেসিডেন্টের শপথগ্রহন দেখা দরকার ছিলো এদের। রাজকীয়তা কাহাকে বলে, কতো প্রকার আর কি কি জানতো। কতো লোক আসলো সেখানে আর এখানে পরিবার পরিজন নিয়ে শপথ নিয়ে ফেললো তারপর বাইরে এসে সবাইকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়ে শেষ। রানী বৃদ্ধা হয়েছেন, অসুস্থ ছোট পুত্রের সেবা করবেন তাই বড় ছেলেকে রাজত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন।



বর্তমান রাজার তিন মেয়ে, বিবাহিত আকর্ষনীয় কিছু না। ১২৩ বছর পর আপাতত রানীর রাজ্য শেষ হলেও ঘুরে ফিরে আবার রানীর রাজ্যেই ফিরে আসবে নেদারল্যান্ডস। সেদিন হয়তো আমরা থাকবো না অভিষেক অনুষ্ঠান দেখার জন্যে।


শীতনিদ্রা থেকে ফিরে আসার চেষ্টায় বহুদিন পর লেখালেখির খাতায় আঁকিবুঁকি কাটা
০১/০৫/২০১৩

Thursday, 28 March 2013



যতোটা তোমাকে নিজের করে চাই সেই তুলনায় দূরত্ব অনেক বেশি
তুমি হাত না বাড়ালে এ পথ শেষ হবে না
যতোটা তোমাকে কাছে পাই সেই তুলনায় আকাঙ্খা অনেক বেশি
তুমি জল না হলে এ তৃষ্ণা মিটবে না

২৮.০৩.২০১৩

Saturday, 9 February 2013

বানী অফ আওয়ার বাচ্চাকাচ্চা

মিষ্টি মা, তোমাকে কনগ্র্যাটস।
কেনো আব্বু?
তুমি বুকফেয়ারে একটা বুক উইন করেছো
তাই? তুমি কি করে জানলে?
আম্মু বলেছে।

আরভিন বাচ্চা ০৭/০২/২০১৩

আমি সবার বিয়ে খেতে পারলাম মামা, শুধু তোমার আর পাপারটা বাদে
তোমরা কেনো আমাকে ফেলে একা একা বিয়ে করে ফেলেছো?

মেঘ বাচ্চা ০৬/০২/২০১৩

Tuesday, 5 February 2013

মন খারাপের দিন



আমার মেয়ে মাত্রই দশে পা দিলো। তাকে আমি সজ্ঞানে কখনো সেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প করিনি। একটা বিরাট কারণ প্রবাসীনি হওয়ায়। আর মায়ের কাছে সন্তান সবসময় ছোট থাকে। মনে হতো এতো ভয়াবহ ঘটনা বাচ্চার মনে খারাপ প্রভাব ফেলবে, আর একটু বড় হোক সে, তারপর জানবে সব। কিন্তু যা হয়, বাসায় আলোচনা শুনে শুনে, খালা – মামা, গুগল থেকে সে জানে, ৭১ এ পাকিস্তানীরা বাংলাদেশের সাথে “অনেক খারাপ” করেছিলো। মানুষ মেরে ফেলেছিলো, তাই পাকিস্তানীরা বাংলাদেশের বন্ধু নয়, আমরা কখনো কোন কাজে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে পারি না, এটা কখনো আর সম্ভব নয়। যেহেতু এটা সে জানেই, তাকে আমি “আমার বন্ধু রাশেদ” সিনেমাটা বেশ কয়েকবার দেখতে দিয়েছিলাম। আমার মনে হয় আমাদের বাচ্চাদের ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলার এর থেকে সুন্দর উপায় আর হয় না। মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে আমি অনেক কারণেই অসম্ভব শ্রদ্ধা করি, তারমধ্যে এটিও একটি কারণ। 


যদিও সিনেমা দেখতে বসার আগে একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা দিয়েছিলাম। তাতে যুদ্ধের সিনেমা শুনে সে খুব ভয় পেয়ে গেছিলো। আগেই জিজ্ঞেস করলো, মা, রক্ত হবে? রক্তকে সে ভীষন ভয় পায়। তার কাছে, বাংলা – হিন্দী সিনেমাতে লোকে অনেক চিৎকার করে কথা বলে, মারামারি করে আর রক্ত হয়। সে খুব একটা পছন্দ করে না, মায়ের মতো ভীতু স্বভাব পেয়েছে। আমার বন্ধু রাশেদ সিনেমাটা দেখে শুধু শেষ দৃশ্যে অনেক ভয় পেয়েছে, তাতে পাকিস্তান সম্পর্কে – মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার ভাবনা আরো গাঢ়ো হয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্যে সে পাগল। প্রধান আকর্ষন, মামার বাড়ি, দাদুর বাড়ি তারপর আছে ফুচকা, ঝালমুড়ি, বোরহানী, কাবাব। আর আমিও মনে ধারনা দিয়ে রেখেছি, চাকরী শেষ করে আমরা চলে যাবো, তার প্রিয় বাংলাদেশে। যদিও সে ভেবেই পায়না সব ছেড়ে রেখে কোন আক্কেলে এখানে আমরা চাকরি ফলাইতে এসেছি। 


আজকে কাদের মোল্লার রায়ের প্রেক্ষিতে দেশে কি হচ্ছে, দেখার জন্যে তাড়াতাড়ি টিভি অন করেছি। কাদের মোল্লা, যুদ্ধ, রাজাকার শব্দগুলো শুনছে বারবার। একবার আমাদের মুখে আবার টিভির মুখে। তারপর জিজ্ঞেস করছে, কি হচ্ছে দেশে, টিভিতে আমরা কি দেখছি? তাকে “রাজাকার” সম্বন্ধে বলা মাত্র, তার প্রতিক্রিয়া ছিলো, “ওরা কি ওদের মাথা খেয়েছিলো”? “কতো বোকা হতে হয় এমন একটি কাজ দেশের লোকের বিরুদ্ধে করার জন্যে?”ওদের অনেক শাস্তি হওয়া দরকার।“ তখন কষ্ট লাগে যারা সব জেনে বুঝে বসে আছেন তাদের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে। তারা যদি বুঝতে পারতেন, এ ধরনের অন্যায় যারা করে তাদের আসলে অনেক অনেক অনেক শাস্তি হওয়া দরকার। চারধারে রাজনীতির কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে মানবতা, পরাজিত হতে হতে আজকাল একধরনের বিষন্নতায় ভুগি। গরীবের রক্ত, আর্তনাদ বিশ্বে কতো ডলারে বিকায়? প্রায় রোজই পত্রিকায় খবর পাই, আবুধাবী, দুবাই, বাহরাইনে, মালোশিয়াতে শ্রমিকের মৃত্যু, লাশ আসছে। স্বাধীনতা কি দিয়েছে তাদের? প্রবাসে আগুনে পুড়ে মৃত্যু? আর যারা বেঁচে থাকবে তাদেরকে অন্তত হাহাকার? কখনো ন্যায় বিচারের জন্যে আর কখনো দুমুঠো খাবার জন্যে? বিচারের বাণী আজীবন নিভৃতেই কেনো কাঁদবে? মাননীয় আদালত, হাতজোড় করছি, ছেলেমেয়ের সামনে মুখ রক্ষা হয় সে ইতিহাস তৈরি করুন। কি করে জানাবো তাদের, এই ঘৃণ্য অপরাধ নিয়ে আমরা রাজনীতি করেছি, স্বজনহারাদের আর্তনাদ মিশে গেছে রাজনীতির গুটির চালে। ন্যায় বিচার হয়ে গেছে শুধু “শেখ হাসিনার” মুখের বুলি আর রাজনৈতিক হাতিয়ার? বিয়াল্লিশ বছর অনেক সময়, শহীদের আত্মারা আজো কেঁদে ফিরছে তাদের প্রাপ্য বিচারের আশায়। একটু কান পাতুন মহামান্য আদালত। 


তারপরও সামনে স্বাধীনতা দিবসকে মাথায় রেখে মেয়েকে গান শেখাই,

আমায় যদি প্রশ্ন করে আলো নদীর এক দেশ
বলবো আমি বাংলাদেশ।
আমায় যদি প্রশ্ন করে কলকাকলীর দেশ
বলবো আমি বাংলাদেশ।

মেয়ে জিজ্ঞেস করে “কলকাকলী” কি মা? এই বিষন্নতার মাঝে কি করে বুঝাই “কলকাকলী” কি? 


তানবীরা
০৬/০২/২০১৩

Friday, 1 February 2013

প্রথম বইয়ের প্রথম প্রকাশ



http://www.amadershomoy2.com/content/2013/02/08/news0246.htm

http://www.ekusheyboimela.com/archives/20821

রাতে বসে বসে স্বামী স্ত্রী রোজকারের খেজুরে আলাপটা সেরে নিচ্ছিলাম। স্বামী টিভি অফ করে প্রায় ওপরে যাচ্ছেন যাচ্ছেন পর্যায়ে আছেন, আর আমাকে তাগাদা দিচ্ছেন যেনো আমিও শুয়ে পড়ি। পতিদেবের ধারনা রোজ কম ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমার মেজাজটা দিন দিন আরো খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। তিনি নিয়ম করে দিয়েছেন, উইকডেজে রাত এগারোটার পর বাড়িতে কেউ আর জেগে থাকতে পারবে না। আমি ল্যাপি অফ করবো করবো অবস্থায় আছি, এমন সময় শেষবারের মতো ফেবুটা চেক করতে যেয়ে দেখি জাগৃতি প্রকাশনী তাদের এবারের বইমেলার প্রকাশনার এ্যালবাম আপলোড করেছেন।

ত্রিশে জানুয়ারী রাত এগারোটায় চুয়াল্লিশটা ফটো নিয়ে ভেসে এলো জাগৃতি আমার ফেবুর হোমপেজে। আমি লাইক করলাম ভদ্রতা করে আর উলটে উলটে ছবিগুলো সব দেখছিলাম, কারা সে ভাগ্যবান যাদের এবার জাগৃতি ডেকে নিলো। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পরিচিত অপরিচিত নামগুলো দেখে যাচ্ছি আর ভাবছি, আমার এবারো হলো না, কেউ বললো না, তানবীরা রেডী? এমন সময় ম্যাসেজ বক্সে একটা লাল টিপ ফুটে উঠল। আমি অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে টিপে ক্লিক করলাম, ঘুমের সময় উতরে যাচ্ছে, কার আবার কি দরকার পড়লো? দেখি জাগৃতি আমাকে বলছে, আমার এই লিষ্টে আপনার একটা ফ্ল্যাপ থাকার কথা ছিলো না এবার? হঠাৎ গোস্বা খাওয়ার প্রবণতা আমার চিরদিনের। ঝাঁঝিয়ে বললাম, হলো আর কই? জাগৃতি একটু অবাক হলেন হয়তো, বললেন, আপনিতো আর কোন যোগাযোগ করলেন না। আমিও সমান তেজেই বললাম, আপনিওতো কোনদিন জিজ্ঞেস করলেন না। তখন অবশ্য ভাবছিলাম এসেছে আমার কাঁটা ঘায়ে নুন ছিঁটাতে। 


বাদানুবাদ বেশি দূর গড়ানোর আগেই জাগৃতি একটা ম্যাসেজ দিলেন, ছয় ঘন্টা সময় দিলাম আপনাকে, আপনার লেখা গল্পগুলো যেখানে যা আছে, সব একসাথে করে আমাকে মেইল করেন ওয়ার্ড ফাইলে। আমি অবাক বলে কি? এসময়ে? কোন ধরনের কোন প্রিপারেশন ছাড়া? সারাজীবনের সংশয়বাদী মানুষ আমি আমার সংশয় প্রকাশ করলাম, পিছলাতে চাইলাম, ভাবলাম বলবে ফলবে কিন্তু করবে না। আমার মনোভাব বুঝতে পেরেই হয়তো জাগৃতি জানালেন, কোন নেগেটিভ চিন্তা মনে ঠাঁই না দিয়ে কাজ করুন। সময় ছয় ঘন্টা, শুরু হলো এখন। তবুও নাছোড়বান্দা আমি বললাম, সারারাত জাগিয়ে কাজ করিয়ে, পরে সর‍্যি বলে দিয়ে ধোকা দিবেন নাতো, আবার? এবার ওনার পালা ছিলো, জানালেন, দিতেই পারি। দেশে আসলেন, একটা ফোন নেই, কোন যোগাযোগ নেইযদিও দেশে যাওয়ার আগে আমি ফেবুতে ডিসক্লেমার দিয়েই গেছিলাম, যার যার ইচ্ছে ফোন করতে, আমি কাউকে করলে আর কাউকে করতে না পারলে ঝামেলা বেশি হয়, থাক তাই কাউকেই করবো না নীতি পালন করেছি। ফোন জাগৃতি করেন নাই কিন্তু সেটাতো আর মুখের ওপর বলা যায় না, মানী প্রকাশক তথা প্রকাশনা বলে কথা। 


 গতোবারো বইমেলায় বই বের হয় হয় করে দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। তাই এবার পণ করেছিলাম কাউকে বলবো না। কাউকে মানে কাউকে না। স্বামী কন্যা কাউকে না। যদিও কথাটা পেটে খুঁচখুঁচ করছিলো। মেইলের পর মেইল আসছে। ফ্ল্যাপ দেখছি, লেখক পরিচিত, বই সম্বন্ধে দুটো কথা কতো কি। প্রথম বই বের হচ্ছে, ফ্ল্যাপে কি যাবে কারো সাথে আলাপ না করেই লিখছি। অন্যের ফ্ল্যাপ পড়া আর নিজের ফ্ল্যাপ লেখা কি এক বস্তু? বরং লোকেরটা লিখে ফেলা সহজ। নিজেরটা না। বিণয় আছেতো, আত্মপ্রচার নেইতো সব ভাবতে হয়। বেশিরভাগ দিনের অফিসের প্রথম বেলাটা যায়, ভাইবোনদের সাথে মেইলে আড্ডা দিয়ে। ছুটিতে দেশে যাবো সামনে। অনলাইনে কেনাকাটা, বাজার পছন্দ চলছে। বেশিরভাগ দিন আমি থাকি বেশি এক্টিভ। আর তখন বলে যাচ্ছি আমি ব্যস্ত, তোরা পছন্দ কর, আমি অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি। 

এতো কঠোর গোপনতার কারণ হলো আমার কন্যা। স্বামী এসব ব্যাপারে বেশি রিয়াক্ট করেন না। বলেছিলাম না সারা দুনিয়া হলো ধোকা, ঠিক হলোতো আবার আমার কথা, এ ভঙ্গীতে তাকানোই হবে তার প্রথম এবং শেষ প্রতিক্রিয়া। কিন্তু মেয়ে অনেক দুঃখ পায়। ফিলিপ্স থেকে একটা মডেলিং লটারীর মতো করলো, ওয়েক আপ এ্যালার্ম লাইট দিবে বলে জানিয়েছিলো। পরে কিছুই আর জানায়নি। মেয়ে খুব দুঃখ পেলো। রোজ মায়ের ফেসবুক খুলে লাইক গুনেছে, তারপর তার প্রশ্ন, তুমি কি “এনাফ” গুড করোনি? কতো পেয়েছো? কেনো তাহলে তুমি লাইট পেলে না? একটা কালচারাল অগার্নাইজেশনে অনেককেই তাদের অবদানের জন্যে পুরস্কার দেয়া হচ্ছিল, আমরা বসে দেখছি। তারা অনেকদিনের মেম্বার আর আমরা নতুন যুক্ত হয়েছি বলা চলে, স্বাভাবিকভাবে আমরা কিছুই পাইনি। সে ছলছল চোখে আমায় জিজ্ঞেস করে, কেনো তোমাকে কিছু দেয়নি মা? তুমি কি কিছুই গুড করো নাই? রিসেশানে চাকরি গেলো তাও তার কথা, মা কেনো, কি করেছিলে? কেনো ওরা তোমাকে আর চায় না? মেয়ের সামনে হিরোগিরি ছেড়ে দেয়া বড়ো কষ্ট। মেয়ে মাকে বড়ো একজন আইডল ভাবে। আমি যা বলি সেও তা আমাকে ফিরিয়ে বলে। আমি তোমাকে নিয়ে অনেক প্রাউড হতে চাই মা। 

শুধু তোর জন্যেরে মা অনেক কিছু ভাল করে করতে ইচ্ছে করে। বাবা মায়ের জন্যে যা করিনি কিংবা করতে পারিনি কিংবা হয়তো করতে চাইনি সেইসব তোর জন্যে করতে ইচ্ছে করে ময়না মা আমার। বই প্রকাশনা নিয়ে অনেক গল্প উপন্যাস পড়েছি, অনেকের কাছে অনেক গল্প শুনেছি। ভীষন ঝক্কির ব্যাপার স্যাপার। এতো ঝক্কি যে অনেক গ্রুপ বছরে একবার একখানা বই প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু বইযে কারো কারো এতো সহজে এতো দ্রুত প্রকাশ হয়ে যায় জানতাম না। অশেষ কৃতজ্ঞতা জানবেন ফায়সাল আরেফীন দীপন, বছরের শুরুতে এতোবড় একটা ধাক্কা দিয়ে বছরটাকে সারাজীবনের মাইলষ্টোন বানিয়ে দেয়ার জন্যে।  জাগৃতি নিজেও আমার মান্ধাতার আমলের লেখা যার ড্রাফট পর্যন্ত আর খুঁজে পাইনি তার পিডিএফ ভেঙ্গে, সাইজে এনেছেন বইয়ের জন্যে।  ত্রিশে জানুয়ারী ২০১৩, সারাজীবনের একটা মাইলষ্টোন থাকবে স্মৃতির মনিকোঠায়। মা হওয়ার আনন্দের মতো অনুভূতি হচ্ছে। 


সবিণয় নিবেদনঃ এতোক্ষণ যে কারণে এই প্যাঁচাল লেখা হলো, আমার বইটা যদি বইমেলায় উপস্থিত বন্ধুরা জাগৃতির স্টলে যেয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখেন আমি ধণ্য হবো। আর কেউ কেউ যদি চটপটি – ঝালমুড়ি – গুড় দেয়া চা ইত্যাদি একদিন স্যাক্রিফাইস করে আমার বইখানা কিনেন তাহলে এই গরীব লেখিকার একটা ভবিষ্যত হয়, বাধিত হন তিনি। আট তারিখে বইমেলায় জাগৃতি এর স্টলে।

প্রচ্ছদ তৌহিন হাসান, ১৬০ পৃষ্ঠা, মূল্য ২৭৫ টাকা।