Tuesday, 9 February 2016

শূণ্য সেই ঘরটি

দরজায় ঝুলিয়ে ছিলে দুটো তালা, ভাগ্যে আমার জুটলো উপহাস। তুমি আত্মরক্ষার নাম দিতে পারো নিজের প্রতি, সেও পরিহাস। এতে কৌতুকের কিছু ছিল না তো: আমি দরজা তালাবন্ধ করে রেখেছিলাম গভীরভাবে ভাবার জন্যে। ঘরটায় পড়ে ছিলো: এটাওটা, কেদারাক’টা, আরেকটা সোফা, পরার নৈমিত্তিক কাপড়গুলো। তবুও এটি একটি শূন্য ঘর যদি বোঝ আমি কী বলছি মাথার ভেতর বসে আছে একটা টিকেট: যেকোনোসময়, বলে ওটা, একটা রসিকতা। কিভাবেই না আমার ইচ্ছে হয় আমার যেন একটা সময়সীমা থাকে এই খালি ঘরটা ছেড়ে-যাওয়ার, কিংবা সেই বাইরের বারান্দাটা হয়ে উঠবে একটা গোপন সুড়ঙ্গ, হয়তো ঘোরানো একটা রাস্তা। হয়তো আমি চেয়েছিলাম বিদায়ের একটা নির্দিষ্ট রোম্যান্স পড়বে ঝাঁপিয়ে, যেন অপেক্ষা করছি আমি জাদুর বদলে সাহসের জন্যে, অথবা এমন কিছুর জন্যে যেটা আমার নেই। সন্দেহ নেই যে তুমি ভাবছিলে অন্য কেউ যদি বসত করে সেই শূন্য ঘরটায়। বলাই বাহুল্য। অন্য মানুষ ছাড়া আসল শূন্যতার অর্থই বা কী? দুবার ভেবেছি অনেক সময়েই। কিন্তু যখন চলেই এলাম, বলতে পারি না যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি স্রেফ আমার দেহটা অনুসরণ করে এসেছিলাম দরজার বাইরে, একটার পর একটা দ্রুত পা ফেলে, এমনকি ঘরটা ভরে উঠতে শুরু করলো সেসবে যেসব, আমি নিশ্চিত, আগে ওখানে কখনোই ছিলো না।
আমরা দুজনেই অন্য কোনো সময়ে অন্য পৃথিবীতে ছিলাম। এখন আমাদের চারধারে শুধুই শূন্যতা।


The door had a double lock,
and the joke was on me.
You might call it protection
against self, this joke,
and it wasn’t very funny:
I kept the door locked
in order to think twice.
The room itself: knickknacks,
chairs, and a couch,
the normal accoutrements.
And yet it was an empty room,
if you know what I mean.
I had a ticket in my head:
Anytime, it said, another joke.
How I wished I had a deadline
to leave the empty room,
or that the corridor outside
would show itself
to be a secret tunnel, perhaps
a winding path. Maybe I needed
a certain romance of departure
to kick in, as if I were waiting
for magic instead of courage,
or something else
I didn’t have. No doubt
you’re wondering if other people
inhabited the empty room.
Of course. What’s true emptiness
without other people?
I thought twice many times.
But when I left, I can’t say
I made a decision. I just followed
my body out the door,
one quick step after another,
even as the room started to fill
with what I’d been sure wasn’t there.
We both below to another time and another space 
now its all emptiness !

Thursday, 28 January 2016

আজ করে তো আভি কার বনাম কাল করবো ভেবে কভু না করবো

ধরুন, সকালে অফিস যাওয়ার সময় আপনি শার্ট পরতে গেলেন, টাক করে আপনার শার্টের বোতাম টা খুলে গেলো। আপনি তাড়াহুড়ো করে সেটা কে নিয়ে একটু টানাটানি করতে গেলেন তো আপনার নাস্তার হাতে অসাবধানে লেগে থাকা বাদামী স্ট্রবেরি জ্যাম টুকু থেকে একটু দাগ ও শার্টের গায়ে লেগে গেলো। আপনি পরলেন বিপদে। এ সময়ের মধ্যে এ শার্ট ঠিক করে আপনার পক্ষে অফিসে যাওয়া সম্ভব না। তো স্বাভাবিক ভাবেই আপনি শার্ট টা পাশে সরিয়ে রেখে অন্য একটা পরে অফিসে যাবেন।

বিকেলে বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে গিয়ে যখন সকালের বোতাম ছেঁড়া শার্ট খানা চোখে পড়বে তখন

একজন ইউরোপীয়ান সাথে সাথে নিজে সুঁই সূতো নিয়ে বসে বোতাম খানা লাগিয়ে ফেলবে। তারপর স্পট রিমুভার লাগিয়ে শার্ট খানা নিজের হাতে ধুয়ে শুকোতে দিবে।

একজন বঙ্গ পান্ডব অফিস থেকে এসে শার্ট খানা দেখলে দলা মোচরা করে এক পাশে সরিয়ে রাখবে, আর ভাববে, কালকে দর্জিকে দিবো। তার পর মূর্হুতেই মনে করবে দর্জিকে দিলেই দশ টাকা তারপর আবার ধোপাকে দিলে আরো দশ টাকা। কোন মানে হয় একটা বোতামের জন্যে। কুড়ি টাকা খরচা করলে পাঁচ পাতা বোতাম কেনা যাবে। তারচেয়ে সপ্তাহান্তে যখন বাড়িতে যাবো, বউ কে কিংবা মা কে দিবো, বোতাম লাগিয়ে ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিবে। কুড়ি টাকার ডালপুরী খেলে বরং কাজে দিবে।

সারা সপ্তাহ শার্ট টা বিছানার কোনে, চেয়ারের হাতলে গড়াগড়ি খেলো। সপ্তাহান্তে কোন কারণে বাড়ি যাওয়া হয়ে উঠলো না। শুক্রবার ভরপেট খেয়ে দুপুরের ঘুম দিয়ে উঠে বিকেলে মনে হলো বন্ধুর মায়ের চল্লিশা আজ। উপহার ছাড়া ভাল খানাদানা করার এটাই একটা উপলক্ষ্য, মিস করা ঠিক হবে না। তাড়াতাড়ি রেডি হতে যেয়ে দেখলো চারটে শার্টের কোনটাই ধোয়া বা ইস্ত্রি করা না। যেটা পরিস্কার সেটা দুমড়ানো, মোচড়ানো, বোতাম নেই একটা আবার জ্যামের দাগ ও লাগা। ভেবে টেবে দেখলো, এতো লোকের মাঝে, শোকের বাড়ি কে আর খেয়াল করবে, এটা পরেই যাই।


যে ভাবা সেই কাজ। ঐ শার্ট পরেই নিমন্ত্রণ খেয়ে এলো। পরদিন অফিস যাওয়ার সময় আবার একই সমস্যা, পরিস্কার শার্ট নেই। তখন ভাবলো, পাঁচশো লোকের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেয়ে এলাম, কেউ কিছু দেখলো না, অফিসে আর কটা মানুষ, কে কাকে খেয়াল করে, আজ দেরী হয়ে যাবে, এখন এভাবেই পরে যাই, অফিস থেকে আসার পথে না হয় একবার দর্জি বাড়ি ঘুরে আসা যাবে। আবার সেই বোতামহীন শার্ট পরে অফিসে চলে গেলো। সন্ধ্যেয় ক্লান্ত শরীরে আর দর্জির কথা মনে নেই তারপর পরদিন ... তারপর দিন ......

Tuesday, 19 January 2016

বিভ্রান্তি - An Illusion



তুমি কী আছো – তুমি কী আছো সেখানে আনন্দ করতে
তুমি কী দেখতে পাচ্ছো এতো মানুষের ভিড়েও আমি কতো একা
আঁটকে গেছি এই নির্জনতার দ্বীপে
সেই পৃথিবীতে যেখানে শুধু ঘৃণা আর অবহেলা
সুখের প্রতিটি কনা পালিয়ে যেতে চায় সারাবেলা
আনন্দ হাসি আর নেই তো সঙ্গী
কারণ আমি আমার অতীতের কাছে বন্দী
দিনরাত ছুটছি গন্তব্যহীন লক্ষ্যে 
জীবনটা বদলে গেলো একটা নাটকের অঙ্কে
 সাহায্যের প্রত্যাশায় চিৎকার করে কাঁদি – শোনো
অপমৃত্যু এগিয়ে এসেছে আমার নিকটে জানো
সারাদিন মাথায় বাজে যন্ত্রণাদায়ক প্রতিধ্বনি
ভেঙ্গেচুরে দিচ্ছে একদিন অনেক দৃঢ় ছিলেন যিনি
নির্মলতার মানে কি হয় গো
আমার কথা না আমার পদ চিহ্ন রয় গো
শিরায় শিরায় শয়তানী বন্ধুত্বের নেই অবকাশ
ভাবি আনন্দের কেন সদা অন্যের বাড়িতে বাস
মরনই আমার কাম্য অনেকবার করেছি সেই চেষ্টা
অশ্রু দিয়েই মিটিয়েছি আমার আজন্ম সুখের তেষ্টা
কল্পনা আর বাস্তবের দূরত্ব প্রগাঢ় যখন
আশা মরীচিকা, আলোকিত মানুষদের ভাবী কথন  
কী সে পাবো শান্তি কী হলে
শয়তানের আত্মা নির্জন রাতে ঘরে এলে
 
 
প্রতিরোধে দেবদূত নেয় যুদ্ধের প্রস্তূতি  
মনে করিয়ে দেয় পবিত্র ভূমির স্তুতি
হাল ছাড়া আমাকে দেয় শক্তি চালাতে দুষ্টের ওপর আক্রমণ
 সারাক্ষণ মনে একটানা সুরের অনুরনন
ফিরে পেয়েছি মন ভর্তি প্রশান্তি
মোকাবিলা করে যাচ্ছি বিগত নাস্তি
সুন্দর আর অসুন্দরের এই যুদ্ধ, আসলে কী
মনের মাঝে পাপের আনাগোনা যখন দেহ শুচি
জীবন একটা বিভ্রম ভাবনাটি অবিরত মনে খেলে
শেষ বেলায় কে জানে কী আছে কপালে
স্বর্গ আর নরক দুটোর পরিনামই নায্য
মরে কী শান্তি পাবো নাকি হবো পরিত্যাজ্য
ভাবছি বসে একা এই ভিড়ে
আটকে আছি নির্জনতার তীরে
তুমি কী আছো কোথাও
 
 
তানবীরা
১৪/০১/২০১৬


Are you there - are you there to cheer .
Are you there to  see me Surrounded by people yet all alone
Trapped within this solitary zone
A world where chaos and hate overtake
Every bit of happiness that may try to escape
Laughter and smiles never seem to last
Because I am haunted by memories of my past
Running the distance with nowhere to go
These are the days of my life, a Broadway show
Screaming for help, does anyone hear
The demons of death are coming so near
Echoes in my head tormenting me all day long
Breaking the one  who was once very strong
What does serenity mean anyway
Is it the swag in my step or just the words I say
Deep rooted evil no time for a soul mate
Wondering why joy is always a day late
Suicide is the easy answer many times I've tried
Happiness seems to be the tears I have cried
Unable to distinguish what's real from what's fiction
Hope is an illusion, an optimist's prediction
What will it take to get me right
A visit from the devil on a lonely night
Angels prepare to battle and take a stand

To remind me of their holy land
When I want to give up, they push for me to be strong
In my head I hear their harmonious song
A tranquil state I now find myself
Dealing with the hand in which I was dealt
Good vs evil, what does it really mean
Am I dirty when I appear to be clean
Life is an illusion a constant mind trick on me
Who knows what my fate will be
Heaven and hell are both fair game
Will I succumb to peace or fall down in shame
Surrounded by people yet all alone
Trapped within this solitary zone
Are you there !



Sunday, 17 January 2016

ভিন্ন চোখে দুনিয়া দর্শন — ৪

সাজিয়াদের এখানে ক্রিসমাসের সময় ‘আন্তর্জাতিক ক্রিসমাস’ মেলা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের দেশীয় বিখ্যাত সব পণ্য নিয়ে পশরা সাজান। সাধারণত খুব ভীড় হয়। খাবার, কাপড়, গয়না, পটারি, শো’পিস কী নেই সেখানে! মেলা উপলক্ষ্যে মঞ্চে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের পরিবেশনায় নাচ-গান হয়। আবার ভিডিও চলে প্রজেক্টরে; যাকে বলে উৎসব উৎসব আমেজ। সাজিয়াও প্রতিবার যায় অন্যান্য বান্ধবীদের সাথে মেলা দেখতে। জিনিসপত্রের বেশ দাম হয়, বেশির ভাগ পণ্যই হাতে তৈরি বলে দাবী করা হয়। চাইলেই মনের মতো সব কেনা যায় না। তারপরও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নানা রঙের আলোয় সাজানো ‘ক্রিসমাস মেলা’ একটা বিরাট আকর্ষণ। হরেক রকমের খাবার, স্ন্যাকস, গরম গরম তৈরি করে বিক্রি করা হয়। খাবারের দোকানে ভীড় তো লেগেই থাকে। শীতকালের বিষণ্ণতা আর অন্ধকার কাটিয়ে মানুষকে চাঙ্গা করে রাখে এই মেলাগুলো।
পোলিশ স্টলে দাঁড়িয়ে সাজিয়া তার অনেকদিনের শখের পোলিশ পটারির বিখ্যাত সেই নীল-লাল কম্বিনেশানের ডিশ, প্লেট, বাটি এগুলো বাছাই করছিলো কেনার জন্য তার বাজেট অনুযায়ী। প্রতিবারই কিছু না কিছু কেনে সে কিন্তু এবার অনেক কিছু কিনবে ভেবে আগে থেকেই তৈরি ছিলো। সাজিয়ার সাথে আরো কয়েকজন ছিলেন। কেউ কেউ টুকটাক কিছু কিনলেন কিন্তু একজন কিছুই কিনলেন না, সারা স্টল শুধু আঁতিপাতি করে দেখলেন আর কিছুক্ষণ সাজিয়ার কেনাকাটা দেখলেন। সাজিয়া একটু অবাক হলো কারণ তিনি কেনার বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন আগে। সাজিয়া চাকুরীজীবী, ছিমছাম চলাফেরা। তাকে দুশো-পাঁচশো ইউরো খরচ করার আগে একটু ভাবতে হয় অথচ ইনি বড় ব্যবসায়ীর গৃহিণী, আপাত দৃষ্টিতে উনার সেই সমস্যাও নেই।
কৌতূহলী হয়ে সাজিয়া জিজ্ঞেস করেই ফেললো,’ভাবী, কিছু কিনলেন না?’
-শুকনো গলায় জবাব,’নাহ, ভাবী।’
সাজিয়া বলবে না বলবে না ভাবলেও কখন যে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো,’আপনার তো ডিশগুলো অনেক পছন্দ, সবসময় বলতেন না আপনি?’
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে সাজিয়ার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে দুটো সার্ভিং ডিশ বের করে পেছনটা দেখালেন। ওখানে ‘সোয়ার্জকফ’ ব্র্যান্ডের মাথাটা আঁকা।
তারপর বললেন,”মানুষের মুখ, মাথা এগুলো দেয়া থাকলে বাড়িতে ফেরেশতা আসে না। এগুলো কেনা, ব্যবহার করা হারাম। আমি তো এসব বাছি, মেনে চলি। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, বংশের শিক্ষা, এগুলোতো বাদ দিতে পারি না। বিদেশে আসছি বলে কী হয়েছে, খানদান তো খানদানই আছে।”
শেষের কথাগুলো হয়তো তিনি সাজিয়াকে লক্ষ্য করেই বললেন। কারণ সাজিয়ার মধ্যে তো বাছাবাছির বালাই নেই। যা ভাল লাগে তাই করে, সমাজ, ধর্ম এসব নিয়ে ভাবনা কম। দুদিনে চোখে বিদেশ দেখে দেশের সব শিক্ষা দীক্ষা ভুলে বসে আছে।
ঘরে কুকুর ও প্রাণীর ছবি থাকা কেমন?
*************** *************** **
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ
করেছেন;-
“ঐ ঘরে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করে না, যে ঘরের
ভিতর কুকুর থাকে বা জীবজন্তুর ছবি থাকে।”
-বোখারী ও মুসলিম শরীফ।
বন্ধুরা আপনাদের কারও ঘরে যেকোনো প্রাণীর
ছবি অথবা আপনাদের পরিবারের কারও
ছবি টাঙানো থাকলে তা আজই নামিয়ে ফেলুন। কেননা যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে ঐ
ঘরে নামাজ আদায় করলে, নামাজও পর্যন্ত
হবে না। নামাজগুলো পুনরায় পড়া ওয়াজিব। এমনও হতে পারে, আপনাদের রুমের
মধ্যে ক্যালেন্ডার অথবা পত্রপত্রিকা থাকতে পারে এবং এগুলোর মধ্যে জীবজন্তুর কিংবা নায়ক-নায়িকার ছবি থাকা অবস্থায় আপনি নামাজ আদায় করেছেন। ঐ নামাজও হবে না। আর কারও ঘরের শো-কেসের মধ্যে বাঘ, বাল্লুক, হরিণ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি রাখা হয় সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য। এগুলোও রাখা যাবে না। কেননা এ ধরনের
মূর্তিও ঘরের মধ্যে রাখা হারাম। ইসলাম
আসছে মূর্তি ভাঙার জন্য, মূর্তি গড়ার জন্য নই।
আল্লাহ-তাআলা আমাদেরকে বোঝার
তাওফিক দান করুক। আমিন।
সূত্রঃ কুরআন ও হাদিসের বানী – Voice of Quran & Hadith
সাজিয়া এমনি বেশ টক টক কথা বলতে পারে মুখ চালাতে খুব মন্দ নয় সে। এখন একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। মনে মনে হাসতে হাসতে ভাবতে লাগলো, যে-দেশে ভ্যান গগ, রেমব্র্যাঁ-র ছবির এতো বড় বড় মিউজিয়াম আর মাদাম তুসো’তে আছেই দিনরাত হাঁ-করে খোলা, সে-দেশে ফেরেশতার নির্বিঘ্নে চলাফেরা তো খুবই অসুবিধাজনক হওয়ার কথা। যেখানে সেখানে ফেরেশতা উষ্ঠা খেয়ে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। ঐটুকু সোয়ার্জকফের মাথা খুঁজে খুঁজে বাড়ি বাড়ি যেতে গেলে ওভারটাইম করতে হবে তাকে।
তারচে বড় কথা কাফেরদের দেশে ব্যবসা করে দুনিয়ার টাকা কর ফাঁকি দেওয়াতে দোষের কিছুই দেখে না ফেরেশতারা; যত দোষ ঐ আঁকা আঁকির মধ্যেই খুঁজে পায়! প্লেটে পশু, প্রাণীর ছবি থাকা হারাম কিন্তু দেয়ালে ছেলে মেয়েদের ছোটবেলার ছবি, তারবেলা? যে টাকা থেকে যথাযথ কর পরিশোধ করা হয়নি, তার কী হবে? ওহ, সৌদি, দুবাই, কুয়েত, বাহরাইনে তো কর নেই, মুসলমানদের জন্য তো কর ব্যাপারটি নেই। সেটা নাছাড়াদের ব্যাপার। আমরা তো যাকাত দেই, কোরবানী দেই, গরীবরা পেট ভরে বছরে দুদিন মাংস খায়, কাপড় পরে, আবার কী।
আঁকাআকিতে মুসলমানরা বিশ্বাস করে না তার প্রমান অনেক বার তারা রেখেছে। কার্টুন হোক আর সোয়ার্জকফের মাথা, আঁকা বন্ধ। সম্প্রতি ‘শার্লে এবদো’কে যে শিক্ষা তারা দিয়েছে তা অনেকদিন ফরাসিরা ভুলতে পারবে না আশা করি। ঠিক যেমন লেখালেখিতেও তাদের ভরসা নেই। তুমি কার্টুন এঁকেছো তার জবাবে অন্য কার্টুন আসতে পারে, তুমি প্রবন্ধ লিখেছো তার জবাবে প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। কিন্তু তা হবে না কখনোই। যেহেতু কোরানে ছবি আঁকা, গল্প লেখা এগুলো নিষেধ করা হয়েছে তাই তাদের বিশ্বাস হলো চাপাতিতে। এক কোপে লাল লাল ছোপ ছোপ গরম রক্ত গলগল করে বের হয়, কর্ম সাবাড়। কি উত্তেজনা আসে তা দেখলে। বই পড়ে বা ছবি এঁকে এই উত্তেজনা পাওয়া সম্ভব?
সাজিয়া অন্য আর একদলকে দেখেছে যারা নিজেদেরকে মডরেট বলে পরিচয় দেয়। এদের চেয়ে সুবিধাবাদী ভেজাল প্রজন্ম বোধহয় পৃথিবীতে নেই। মডরেট ভাই ও বোনেরা, তারা যেকোন ভাবেই এ প্লাস বি হোল স্কয়ারের ফমূর্লায় ফেলে সবকিছুকেই। ইসলামে লেখালেখি, ছবি আঁকাআকি যে নিষিদ্ধ নয় সেটা প্রমাণ করে দিতে তারা বদ্ধ পরিকর। কোরানে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞান ইঙ্গিতে, ইশারায় বলা আছে যেগুলো আবার রাসূল হাদীসে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সেসব বুঝতে হলে সবাইকে অনেক পাক দিলে ইসলামিক লাইনে পড়াশোনা করতে হবে, বিভিন্ন কিতাব পড়তে হবে। অশিক্ষিত হুজুরদের কিংবা কাফেরদের ভুল ব্যাখ্যায় পড়লে চলবে না। সে সব বলতে বলতে হয়রান হয়ে মুখে ফেনা তুলতে থাকেন।
সাইদ বিন আব আল হাসান বর্ণনা করেন যে তিনি যখন ইবনে আব্বাসের সাথে বসেছিলেন তখন এক লোক তার কাছে আসেন এবং বলেন,’হে আব্বাসের পিতা, আমি ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করি।’ইবনে আব্বাস বললেন,”আমি সেটাই বলব যা আমি আল্লাহর নবীর কাছ থেকে শুনেছি। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে লোক ছবি আঁকে তাকে আল্লাহ শাস্তি দেবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাতে জীবন দিতে পারে এবং সে সেটা করতে কখনওই সক্ষম হবে না।” এটা শুনে সেই লোকটার মুখ শুকিয়ে গেল। ইবনে আব্বাস তাকে বললেন,”কি দুঃখের কথা! যদি তুমি ছবি আঁকতেই চাও তাহলে আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে গাছপালার ছবি বা অন্য কোন জড় বস্তুর ছবি আঁকতে পারো।”
সুতরাং মানুষ কোন জীব বা জন্তুর জীবন দিতে পারে না। আল্লাহই একমাত্র সেই ক্ষমতার অধিকারী তাই মানুষকে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ জীব জন্তুর ছবি আঁকতে নিষেধ করেছেন। ঠিক একারণেই মোমিন মুসলমানেরা কখনওই তাদের ঘরে কারও ছবি রাখে না। -সহি বুখারি, ভলিউম- ৩, বই – ৩৪, হাদিস – ৪২৮।
এখন প্রশ্ন হলো- ছবি আঁকা ও তোলা কি এক জিনিস?
কারণ, ফেসবুক হিজাবধারী রমণীদের বিভিন্ন লাস্যময়ী ভঙ্গিমার প্রোফাইল পিকচারের ভারে নাজুক অবস্থায় আছে। হিজাবী সেলফি একটা মারাত্মক ডাইনামিক মাত্রা যোগ করেছে ফটোগ্রাফী শিল্পে।
সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে আসলে এক জিনিস। মানুষ হাত দিয়ে কোন লোকের হুবহু ছবি আঁকতে পারে আবার ক্যমেরা দিয়ে হুবহু ছবি তুলতে পারে। উভয় কাজের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই তা হলো কোন লোকের হুবহু প্রতিকৃতি তৈরী। একটা হাত দিয়ে আর অন্যটা যন্ত্র দিয়ে। কিন্তু যেভাবেই হোক একজন লোকের প্রতিকৃতি তৈরী করলে সেটাতে কেউ জীবন দিতে পারবে না আর তাই উক্ত হাদিস মোতবেক তা নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে আরও একটা হাদিস দেয়া যেতে পারে;-
“জিব্রাইল মুহাম্মদকে বলছে, যে ঘরে কুকুর বা কোন ছবি থাকবে সেই ঘরে ফিরিশতারা প্রবেশ করে না।”
download (1)
download
lulu1
এখানে ছবি বলতে জীব জন্তু বা জড় বস্তু কোনো কিছুই বলা হয় নি। তবে জড় বস্তুকে যদি এর আওতার বাইরে রাখি তাহলে দেখা যাচ্ছে কোনো জীব জন্তুর ছবি আঁকা নিষেধ। আর তাই তাদের ছবি তোলাও নিষেধ। ভিডিও ছবি যেহেতু স্থির ছবিরই অপর রূপ অর্থাৎ হাজার হাজার স্থির ছবি তুলে যদি নির্দিষ্ট গতিতে চালনা করা হয় তখন সেটা গতিশীল দেখায় যা সেই ছবি তোলারই নামান্তর মাত্র। সুতরাং ভিডিও ছবিও তোলা যাবে না, আর তাই যাবে না সিনেমা বা টিভি দেখা।
এখন কেউ এসে যদি ফতোয়া দেয় যে নবীর আমলে তো ছবির দরকার ছিলো না, এখন তো মানুষের ছবি তোলা দরকার বহু দালিলিক কাজে যেমন- আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদিতে তাই এখন এটা বৈধ। সেটা হবে চূড়ান্ত রকম মুনাফিকি ফতোয়া কারণ হাদিসে পরিস্কার ভাবে বলা হয়েছে ছবি আঁকা যাবে না। যুগের পরিবর্তনে তো আর মহানবীর কথার নড়চড় হতে পারে না বা পারে না ইসলামের বিধি বিধানের পরিবর্তন। সুতরাং যারাই নিজেদের ছবি আঁকবে তা সে যতই দরকার হোক না কেন, অথবা যারাই সিনেমা টেলিভিশন দেখবে তারা মহা গুনাহগার বা মুনাফিক এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
এখন শুধু শোয়ার্জকফের ভাতের থালা, বাসায় পাখির ছবি, শাড়িতে প্রজাপতির ছবি এড়ালেই কি এই পৃথিবী বাসযোগ্য হবে? হলিউডের স্টুডিও, বলিউডের স্টুডিও, ল্যুভরের মোনালিসা সবই পৃথিবিতে ফেরেশতাদের চলাফেরায় বাঁধা দিচ্ছে। অবশ্য তার একটা বন্দোবস্ত শীঘ্রই করে ফেলতে অনেকেই সক্রিয় আছেন। বাংলাদেশ সমস্ত মূর্তি ভেঙে এ-ব্যাপারে পৃথিবীতে দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করছে। অন্যদিকে না হোক, এ দিকে কেউ যেন বাংলাদেসীদের হারিয়ে প্রথম স্থান দখল করতে না পারে সেদিক তারা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। সম্প্রতি ব্রাক্ষনবাড়িয়াতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এর স্মৃতি বিজরিত যাদুঘরটি ধ্বংস করে এপথে আরও কয়েক কদম তারা অগ্রসর হয়েছে।
সাজিয়া, নিজেকেই নিজে বলে, মানুষই কি এমন না ধর্মই এমন!

Wednesday, 13 January 2016

টুকরো টাকরা যান্ত্রিক প্রেম

১ :
জীবন গতানুগতিকতার যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়, প্রতিদিনের অনেক পাওয়া না পাওয়ার ব্যর্থতা আস্তে আস্তে গ্রাস করে নেয় মনটাকে। আশপাশের সবাই – সব কিছু শ্বাসরুদ্ধ করে দেয়, অর্থহীন অসাড় মনে হতে থাকে প্রতিটি মুহূর্ত।
হৃদয় ফেটে যাওয়া আকন্ঠ তৃষ্ণায় কোথাও এক বিন্দু স্বস্তির জল নেই, নেই কোন আশ্বাস। যতো দূর দৃষ্টি পৌঁছায়, শুধুই নির্মম বাস্তবতা। লাভ-লোকসানের রাজ্য, এখানে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গান নেই, জয় গোস্বামীর কবিতা নেই, নেই ঝুম বৃষ্টিতে কারো হাত ধরে ছাদে ভেজার কোন আহবান।
মনে পড়ে যায় সেই কিশোরীকে, যার লাজুক চঞ্চল চোখে কখনো অনেক বলতে না পারা কথামালা ছিল।
প্রতিদিনের সেই অতৃপ্তিকে পিছু ফেলে আবার নতুন করে বেঁচে ওঠার লক্ষ্যে, তাজা নিঃশ্বাস নিতে মুঠো ফোনটি তুলে নেয় হাতে। আলতো করে ছোঁয় সেই প্রিয় নম্বরটিকে। ঠিক যেমন করে এক সময় তার আঙ্গুল সেই কিশোরীর ঠোঁট ছুঁয়ে দিতো।
উচ্ছল সেই গলার রিনিক ঝিনিক ধ্বনি তার কানে আসতেই আকুল কন্ঠে আত্মসমর্পন করে বলে, “জান, তোর কপালে একটু ঠোঁট ছুঁয়ে দিই”

২৬/১২/২০১৩ 

Monday, 28 December 2015

হোয়াইট সান্টা আর ব্ল্যাক পিটের গল্পটি

উত্তর আমেরিকার সান্টা ক্লজের ওলন্দাজ রূপটি হলো ‘সিন্ট নিকোলাস’ বা ‘সিন্টারক্লাশ’। যদিও আজকাল আমেরিকার দখলে সান্টা ক্লজ কিন্তু সান্টা ক্লজের আদি দাবিদার কিন্তু ওলন্দাজরা। বলা হয়ে থাকে, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সমসাময়িক কাল থেকে, নিউ ইয়র্কের ওলন্দাজ কলোনিতে (নিউ আমর্স্টাডামে) বসবাসকারী অভিবাসী ওলন্দাজ নাগরিকরা সেখানে এই রীতিটির পালন পুনরায় শুরু করেছিলেন। আজকের এই আনন্দময় রীতিটির পেছনের গল্পটিই এখানে বলব। কেমন করে সান্টা সব বাচ্চাদের আপন হলো।
প্রতি বছর শীতের শুরুতে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাচ্চাদের আর দোকানীদের মধ্যে হুল্লোড় পড়ে যায় সিন্ট নিকোলাসের উপহার আর বড়দিনের উপহার কেনাবেচা নিয়ে। আমিও তখন ভাবি এবার ওলন্দাজ এই রীতিটি নিয়ে কিছু লিখেই ফেলব। তারপর আলসেমি আর নানাবিধ অন্যান্য ব্যস্ততায় দিনটি চলে যায় আর আমিও ভুলে যাই। আবার কখনো ভাবি, ঠিক আছে; সামনের বছর ঠিকই লিখে ফেলব। এই ভাবতে ভাবতেই নিজের মেয়ে বড় হয়ে গেল আর জেনে গেল, সিন্ট নিকোলাস নামের কেউ আসলে ঘোড়ায় চড়ে স্পেন থেকে উপহার নিয়ে আসে না, বাবা-মাই বাচ্চাদের জুতোয় ঢুকিয়ে রাখা ‘উইশ লিস্ট’ পড়ে বেছে তার থেকে উপহার কিনে দেয় ছেলেমেয়েদের। মাঝখানে ক’দিন সিন্ট নিকোলাস থেকে ‘দ্য ভেরি বেস্ট’ উপহার পাবে আশায় বাচ্চারা তাদের মারামারি, দুষ্টুমি, মিথ্যে বলা, ঝগড়া করা কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে রাখে।
পাঁচ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা নেদারল্যান্ডসের জাতীয় জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন দূর দূরান্ত থেকে পরিবারের সবাই একসাথ হয়, খাওয়াদাওয়া সেরে তারপর সবাই নিজেদের মধ্যে উপহার বিনিময় করে। এই দিনটিকে ঘিরে বেশ পূর্ব প্রস্তুতি থাকে। সাধারণত যেসব বাড়িতে বাচ্চা থাকে অন্যান্য উৎসবের মতো এই উৎসবটিও সে বাড়িতে বেশি প্রাণ পায়। তবে বাচ্চা বড় হয়ে গেলেও ঐতিহ্য বজায় থাকে। বাচ্চারা প্রি-স্কুলে যাওয়ার সময় থেকে, নভেম্বরের এই সময়ে তাদের স্কুলে পড়ানো ছড়া, গল্প, টিভিতে দেখা কার্টুন থেকে এ-সম্বন্ধে ধারণা পেতে থাকে। ধরতে গেলে, প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া সব বাচ্চা নভেম্বরের এগার তারিখ থেকে শুরু করে ডিসেম্বরের চার তারিখ অবধি সিঁড়ির ওপরে জুতো রেখে দেয়। বাড়ির চিমনি দিয়ে সিন্ট নিকোলাস বাড়িতে ঢুকে কিছু উপহার রেখে যাবে সেই আশায়। জুতোর পাশে থাকে নিকোলাসকে লেখা তাদের আধো আধো হাতের চিঠি, ছড়া, গাজর আর চিনির কিউব। নিকোলাসের ঘোড়া চিনি আর গাজর খেতে ভালোবাসে।
বাবা মায়েদের সে ক’দিন একটু বেশি সর্তক থাকতে হয়। বাচ্চারা ঘুমোলেই গাজর, চিনি, চিঠি সব সরিয়ে রাখতে হয় যাতে বাচ্চারা বুঝতে না পারে। আর জুতোর মধ্যে উপহার রেখে দিতে হয় যাতে সকালে উঠেই উপহার হাতে পায়। এই ক’দিন বাচ্চাদের ঘুম থেকে ওঠাতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। নিকোলাসের কথা বললে ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে দৌড় দেয় সিঁড়ির কাছে। কী পেল আজ রাতে নিকোলাসের কাছ থেকে। বেশিরভাগ সময় হতাশ হয় সেই একই কুকিস কিংবা চকোলেট পেয়েছে বলে। সপ্তাহ জুড়ে কেন একই জিনিস? কেন নতুন কিছু নেই! নিকোলাসের দেয়া অন্যতম উপহারগুলো হলো, চকোলেটের বর্ণ (সাধারণত বাচ্চার নামের আদ্যক্ষর) পেপারনোটেন (pepernoten), ক্রাউডেননোটেন (kruidennoten), স্পেকুলাস (speculas), কমলা, চকোলেট কয়েন্স, ইত্যাদি। সপ্তাহান্তে অবশ্য একটি ছোট খেলনা কিংবা ছবি আঁকার বই, রঙ পেন্সিল ইত্যাদি কিছু পাওয়া যায়। এভাবে করে পাঁচ ডিসেম্বর চলে এলে, বাচ্চাদের উইশ লিস্ট তো আগেই দেওয়া থাকে নিকোলাসকে, সেখান থেকে দেখে নানা-নানী, দাদা-দাদী, চাচা, খালা, বাবা-মা সবাই উপহার কিনে আনে আর তা দিয়ে উদযাপিত হয় ‘উপহার সন্ধ্যা’ তথা ‘গিফট ইভনিং’।
এরা ক্রিসমাসে নয়, পাঁচ ডিসেম্বেরই উপহার বিনিময় করে, ক্রিসমাসকে ওলন্দাজরা ‘সিন্টারক্লাশ’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে। সন্ধ্যায় প্রথমে বাচ্চাদের পর্ব। সেটা শেষ হয়ে গেলে তারপর বড়রা করে। বাচ্চাদের উপহার পাওয়ার পর্বটা আকর্ষণীয় করার চূড়ান্ত চেষ্টা থাকে বড়দের মধ্যে। সাধারণত দেখা যায় বাসার কোথাও ব্ল্যাক পিট একটা চিঠি রেখে যায়, যেখানে লেখা থাকে উপহার কোথায় রাখা আছে। আসলে আগেই উপহারটি সেভাবে লুকিয়ে রাখা হয়। বাচ্চারা সেখানে গিয়ে খুঁজবে সেই আনন্দে। সন্ধ্যা থেকে বাচ্চারা পিটের অপেক্ষায় তার জন্যে চকোলেট দুধ গরম করে তাতে ক্রিম মিশিয়ে রাখে, গরম কফি বানিয়ে বসে থাকে এবং আরো কত কী! আবার অনেক বাসায় সন্ধে বেলায় প্রতিবেশি পিট সেজে এসে বেল বাজিয়ে উপহারের বস্তাখানি দরজার সামনে সাজিয়ে রেখে যায়। সবার চেষ্টা থাকে নতুন কোনোভাবে উপহার আদান প্রদানের ব্যাপারটিকে উপস্থাপন করার। উপহারগুলো সাজানোতে অভিনবত্ব আনার চেষ্টা করা হয়। উপহারের সাথে প্রায়ই একটা কবিতা কিংবা গান থাকে। সাধারণত যার জন্যে উপহার তাকে নিয়ে মজা করে কিছু লেখা হয়ে থাকে, তাকে খ্যাপানোর চেষ্টা থাকে।
শুধু বাড়িতে নয় স্কুলেও বাচ্চারা উপহার পায়। সুপারমার্কেটে জুতা রেখে আসতে পারে। সেখানেও ছবি আঁকা, রং করা ইত্যাদি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাচ্চাদের উপহার দেওয়া হয়। অনেক কোম্পানি এই দিনটিকে কেন্দ্র করে একটি পারিবারিক মিলন মেলার আয়োজন করে। কোম্পানিতে কাজ করা সব মানুষকে নিয়ে কিছু ইভেন্ট হয় তারপর খাওয়া দাওয়ার পার্ট চুকিয়ে উপহার পাওয়ার পালা। পাঁচ ডিসেম্বের অনেক শহরে সন্ধ্যায় দোকানপাট বন্ধ থাকে। অনেক সময় কিছু রেস্তোরাঁও বন্ধ থাকে কারণ ‘পাকইয়েজ আভোন্ড (pakjes avond)—দ্যা গিফট ইভনিং’। কুসংস্কারও আছে ওলন্দাজদের মধ্যে; সিন্টারক্লাশের আগে ক্রিসমাস ট্রি বাসায় সাজাতে হয় না, তাতে অমঙ্গল হয়।
এবার একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই; কোথা থেকে এলো ‘সিন্টারক্লাশ’ আর ‘ব্ল্যাক পিট’? এটি একটি কাল্পনিক ঐতিহাসিক চরিত্র, লোকগাঁথা থেকে উঠে আসা বলা যায়। রোমান ক্যাথলিকদের মতে পাঁচ ডিসেম্বর রাতে নেদারল্যান্ডসে উপহার বিতরণ করে ছয় তারিখ সকালে বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ হয়ে ফ্রান্সের দিকে যায়। তবে আরুবা, বোনার, কুরাসাও ইত্যাদি ডাচ কলোনিগুলোতেও ‘সিন্টারক্লাশ’ জনপ্রিয় আর পরিচিত চরিত্র। তাকে জনপ্রিয় ক্রিসমাস আইকনও বলা যায়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইটালি, সুইটজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, গ্রিস-সহ আরো অনেক দেশের বেশ কিছু অংশে ‘সিন্টারক্লাশ’ উদযাপিত হয়ে থাকে।
সিন্টারক্লাশ একজন গুরুগম্ভীর মহিমান্বিত বৃদ্ধ যাঁর বেশ লম্বা সাদা দাঁড়ি আছে, মাথার সব চুলও সাদা। তিনি মাথায় একটি খুব দীর্ঘ লম্বা লাল টুপি পরেন, গায়ে থাকে ঐতিহ্যবাহী বিশপের কাপড়। সাথে কখনো কখনো লাল স্টোল, আঙ্গুলে লাল রুবীর আংটি আর সোনালি রঙের বিশপের দণ্ড থাকে তাঁর হাতে। ঐতিহ্যগতভাবে তিনি ঘোড়ায় চেপে আসেন, ঘুরেন, বেড়ান। নেদারল্যান্ডসে উনার ঘোড়ার নাম—‘এমেরিগো’ আর বেলজিয়ামে ঘোড়ার নাম—‘স্লেক্ট উইয়ার ভানডাগ’। সিন্টারক্লাশের হাতে একটি বিশাল বড় খাতা থাকে। কথিত আছে, সেই খাতায় প্রত্যেকটি শিশুর নাম লেখা আছে আর সাথে লেখা আছে, শিশুটি কি সে বছর বেশি দুষ্টুমি করেছে নাকি বেশি লক্ষ্মী ছিল—তার হিসাব।
সিন্টারক্লাশের চিরন্তন সহকারী হলো ব্ল্যাক পিট। যার কালো কোঁকড়ানো চুল, গলায় লেস বসানো পোশাক, মাথার টুপিতে পালক গোঁজা ঠিক যেমনটা সতেরশ’ শতাব্দীর পোশাকগুলো হতো। ১৮৫০ সালে আমস্টার্ডামের স্কুল শিক্ষক ইয়ান স্ক্যাঙ্কারমান প্রথমে ব্ল্যাকপিটের চরিত্রটিকে ঐতিহাসিকভাবে আঁকেন, যদিও তখন ব্ল্যাক পিট নাম তার ছিল না। জনৈক দাস হিসেবে চরিত্রটি প্রথমে আঁকা হয়। ঊনিশ শতকের দিকে ব্ল্যাক পিট নামের চরিত্রটি সিন্টারক্লাশের সহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
হেলেন এডেলিন গার্বার (Hélène Adeline Guerber) এবং অন্যান্য আরো অনেকের মতে সিন্টারক্লাশ আর তার সহকারীদের এই গল্পটি কোনো না কোনোভাবে ‘ওয়াইল্ড হান্ট ও উডেন’-এর গল্পটির সাথে জড়িত। ওয়াইল্ড হান্টের গল্পের ‘স্লেপনির’ চরিত্রটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে বাতাসের বেগে চলাফেরা করত আর তারও দুটো কালো বর্ণের কোঁকড়া চুলের সহচারী ছিল; হাগিন এবং মুনিন। তারা ব্ল্যাক পিটের মতো বাড়ির ছাদের কাছের চিমনিতে বসে থাকত আর তাদেরও কাজ ছিল ‘উডেন’কে পৃথিবীর মানুষের ভালো আর মন্দ কাজ নিয়ে অভিহিত করা। তবে এগুলো সবই কল্পনার চরিত্র। ইতিহাসের পাতা কিংবা ধর্মগ্রন্থে এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। সিন্টারক্লাশ আর ব্ল্যাক পিটের কাজ হলো লক্ষ্মী বাচ্চাদের জন্য বস্তা ভর্তি করে চকলেট নিয়ে আসা আর মুঠো মুঠো করে সেই চকোলেট তাদের বিলানো। আর দুষ্ট বাচ্চাদের পেছনে উইলো গাছের শাখা দিয়ে তৈরি বেত দিয়ে মারা। কথিত আছে লক্ষ্মী বাচ্চাদের চকোলেট বিলানো শেষ হলে সেই বস্তায় ভরেই দুষ্ট বাচ্চাদের স্পেনে নিয়ে যাওয়া হতো।
পিট কেন ব্ল্যাক? হ্যাঁ আধুনিক কালে এই নিয়ে সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, টকশো, বিতর্ক, ডকুমেন্টারি, বিক্ষোভ ও উৎসবে এমনকি সহিংস সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও আধুনিক কালে বলা হয় চিলেকোঠার চিমনি দিয়ে পিট বারবার উপহার নিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে পুড়ে কালো হয়ে গেছে, কিন্তু সত্যি হয়ত সেটা নয়। পিটকে স্পেনের একজন নিগ্রো ক্রীতদাস ভেবে নিয়েই সেই সময়ে চরিত্রটি আঁকা হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসে ছুটি এবং পিট দুটোই সমান জনপ্রিয়। ২০১৩ সালের এক জনমত জরিপে দেখা যায় বিরানব্বই ভাগ ওলন্দাজরা ব্ল্যাক পিটকে দাস কিংবা বর্ণ বৈষম্যের স্বীকার বলে মনে করেন না আর একানব্বই ভাগ ওলন্দাজ পিটের বর্ণ পরিবর্তনের বিপক্ষে। কিন্তু কালো অভিবাসীদের চরম আপত্তির মুখে জাতিসংঘ বলেছে, “নেদারল্যান্ডসে এখন ব্ল্যাক পিটের আসর বন্ধ করা উচিত।” একবিংশ শতাব্দীতে দাস প্রথা নিয়ে উৎসব প্রার্থিত নয়। ওলন্দাজরা এর ঘোর বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, হাজার বছর ধরে চলে আসা এই উৎসবের সাথে বর্ণ বৈষম্যকে মেলানো ঠিক না, বিদেশিরা তাদের সংস্কৃতির মর্ম বোঝে না। এখনো এই দ্বন্দ্ব চলছে; ভবিষ্যতে পিটের রঙ কী হবে? কালো হবে নাকি সাদা? ভবিষ্যতই সেটা ঠিক করবে।
ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি বছর সিন্টারক্লাশ এগারো নভেম্বরের পরের শনিবারে স্পেন থেকে বাষ্পচালিত জাহাজে চড়ে নেদারল্যান্ডসের নদী বা সমুদ্র নিকটবর্তী কোনো শহরে অবতরণ করেন। সিন্টারক্লাশ কোন শহর দিয়ে সে বছর নেদারল্যান্ডসে প্রবেশ করবে সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে ঠিক করে দেওয়া হয় বছরের শুরুর দিকে এবং সে অনুযায়ী শহরের মেয়ব আর জনগণেরা সারা বছর প্রস্তুতি নেয়। সাজানো গোছানো শহরে, উৎসব মুখর পরিবেশে ঘোড়ায় চড়ে সিন্টারক্লাশ প্যারেড করে এগিয়ে চলেন। সব বাচ্চারা সিন্টারক্লাশের গান গেয়ে তাকে উৎফুল্ল চিত্তে বরণ করে নেয়। ব্ল্যাক পিট পাশ থেকে সবার মাঝে মুঠো মুঠো চকোলেট, পেপারনোটেন, ক্রাউডেননোটেন ছিটিয়ে দেয়। পুরো অনুষ্ঠানটি নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে। যে শহরে সিন্টকে জাতীয়ভাবে বরণ করা হয় সে শহর ছাড়া অন্য শহরগুলোতেও স্থানীয়ভাবে নিজেরা সিন্ট উৎসব পালন করে থাকে। শনিবারে পৌঁছানোর পর রোববারে অনেক সময় সিন্ট ট্রেনে করে, ঘোড়ায় চড়ে কিংবা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে পাশের শহরগুলোতে বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে যায়। আর এভাবেই জিঙ্গেল বেল জিঙ্গেল বেল বাজতে বাজতে এসে পরে ক্রিসমাস—নিউইয়ার উৎসব… ঘুরে যায়, বদলে যায় ক্যালেন্ডারের পাতা।

Thursday, 12 November 2015

একটি ছহি নুডলসবিক্রেতা কোপানিবৃত্তান্ত

পৃথিবীর এক কোনায় একটি গ্রাম ছিলো, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা। সেই গ্রামের লোকেরা মাছ দিয়া ভাত খাইয়া, জারি-সারি গান গাহিয়া মনের সুখেই দিনাতিপাত করিত। কিছু কিছু মানুষ অবশ্য ভাতের বদলে তখন রুটি কিংবা নুডলস এই জাতীয় দ্রব্যাটি খাইত। যাহারা ভাতে অভ্যস্ত তাহারা তাহাতে আঁৎকাইয়া উঠিতো। রুটি না হয় সহ্য করা গেলো, ভাতের পাশাপাশি তাও চলিয়া যায়, তাহাদের মতই দেখিতে অন্য গোত্রের মানুষরা সেইটা খায়। তাই বলিয়া নুডলস! সেতো পুরোই অশাস্ত্রীয় অনাচার!
জন্মের পর হইতে তাহারা তাহাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা-খালা-ফুপু, ওমুক তমুক চৌদ্দগোষ্ঠীকে নানা রকমে ভাত খাইতে দেখিয়াছে। পার্বণবিশেষে ভাতকে খিচুড়ি কিংবা পোলাও-বিরিয়ানিতে রূপান্তরিত হইতে দেখিয়াছে, তাহারা তাতেই অভ্যস্ত। বরং মাছের বদলে তাহারা মাংসের দিকে দিনে দিনে আগাইয়া গেলো। বিভিন্ন আবরণে, পর্দায় ঢাকিয়া তাহারা মাংস সহকারে ভাতই খাইবে। যাই হউক, যাহারা নিয়মিত ভাত খাইত তাহারা নুডলস খাওয়া ঠিক সুনজরে না-দেখিলেও ব্যাপারটি সহ্য করিয়া কিংবা মানিয়া লইতো।
কিন্তু হাল্কাপুল্কা নুডলসখানেওয়ালাদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়িয়া যাইতে লাগলো। তিন বেলা ভাত খাওয়ার অপকারিতা সম্বন্ধে এক বেলা নুডলসখানেওয়ালারা লেখালেখি করিতে লাগিল। ভাতে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা থাকে, ডায়বেটিস শরীর নরম করিয়া দিলে অন্য রোগ ব্যাধি জাঁকাইয়া বসিয়া শরীর কাবু করিয়া ফেলিতে পারে, তাহাতে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়িয়া যায়। ভাত উৎপাদন ও রন্ধনের প্রক্রিয়া মোটেও বৈজ্ঞানিক নহে, অর্থনৈতিকও নহে। ভাত শরীরকে অলস করিয়া দেয়, তাহাতে কর্মক্ষমতা এবং স্পৃহা কমিয়া যায় ইত্যাদি যখন তাহারা যুক্তি সহকারে লিখিতে লাগিল, তখন জনম জনম ধরিয়া যাহারা ভাতের ব্যবসা করিত আর যাহারা ভাত খাইত, তাহারা খুবই ভয় পাইয়া গেলো। তাহারা নুডলসকে বিগ্রামীয় সংস্কৃতি আর খাবার আখ্যা দিয়া উঠিয়া পড়িয়া তাহার বিরুদ্ধে লাগিল।
নুডলসটা দেখিতে কেমন যেনো লম্বা লম্বা কৃমির মতন, কিংবা বাঁকা বাঁকা প্যাঁচানো। মাছ দিয়া সেই ভাবে এইটা ঠিক করিয়া জুইত মত মাখা যায় না। কাঁটাচামচ দিয়া খাইতে হয়, হাতে ঠিক সুবিধা হয় না। আর এইসব এই গ্রামের সংস্কৃতির সাথে ঠিক মানানসই নয় বলিয়া প্রথমে ফতোয়া জারি করিল। প্রাণ যায় যাক, কিন্তু গ্রামের সংস্কৃতি নষ্ট হইতে দেয়া যাইবে না। হাত দিয়া মাখিয়া মাখিয়া ভাত খাইয়াই আমরা জীবনপাত করিব ইহাই আমাদের অঙ্গীকার, কহিল তারা। আর যাহারা এই কথা না মানিবে দরকার হইলে তাহাদের হত্যা করিয়া আমরা আমাদের অঙ্গীকার রক্ষা করিব। গ্রামের এই উত্তেজনা নিয়া গ্রামের জমিদার পক্ষ তখনও উদাসীন।
নুডলসখানেওয়ালারা কিংবা বিক্রেতারা ভাত ব্যবসায়ীদের এই হুমকি ঠিক ততোখানি গুরুত্বের সহিত দেখিলেন না, তাঁহারা তাঁহাদের নিজের চরকায় তৈল দিতে থাকিলেন যেমন পূর্বেও থাকিতেন। ইটালীয় নুডলসের পাশাপাশি বরং চৈনিক বিভিন্ন প্রজাতির নুডলস মিশিয়া তাহাদের মালামালের সম্ভার আরো বাড়িয়া গেলো।
উপায় না-দেখিয়া একদিন সত্যি সত্যিই এক নুডলস বিক্রেতাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় চাপাতি দিয়া কোপাইয়া খুন করিয়া ফেলিলো ভাত ব্যবসায়ী এন্ড করপোরেশন। খুন করিয়া দম্ভভরে ঘোষণা করিয়া জানাইল, ইহা তাহাদেরই কাজ। কথা না শুনিলে এখন থেকে কোপাইয়া মুখ বন্ধ করিয়া দিবে সকলের। নুডলস পক্ষ হতবাক হইয়া গেলো। কিন্তু তাহারা দমিয়া গেলো না, তাহারা তাহাদের মতই নিজের কাজ করিয়া যাইতে লাগিল।
গ্রামের জমিদার তখনও উদাসীন। গ্রামের জমিদার কর্তৃপক্ষ তখন গ্রামের আপামর জনগণের মনোভাব বুঝিতে ব্যস্ত। কে মরিল কিংবা কে থাকিল তাহা দিয়া আসলে তাহাদের কিছু যায় আসে না। যাহারা খাজনা দিবে তাহাদের মধ্যে কাহাদের শক্তি আর সামর্থ্য বেশি, নুডলস না ভাত, ইহাই তাহাদের মুখ্য বিচার্য বিষয়। ভাতখোরেরা ইহা বুঝিয়া সানন্দে একের পর এক নুডলসবিক্রেতা ও ভোক্তা খুন করিয়া যাইতে লাগল।
আগে রাস্তা-ঘাটে, মেলায় তাহারা নুডলসপক্ষের অপেক্ষা করিত। এখন আর তাহার প্রয়োজন নাই বুঝিয়া, নুডলসপক্ষীয়দের বাসা বাড়ি, অফিসে ঢুকিয়া কোপাইতে লাগিল। ভাতের আধিপত্য কমিয়া গেলে তাহাদের ব্যবসায় অসুবিধা হইতে পারে ভাবিয়া, কোপানোর ভয় দেখাইয়া মানুষকে ভাতের দিকে টানিয়া রাখিতে সক্রিয় হইলো ভাত ব্যবসায়ী এন্ড কোং।
এক গ্রামের শান্তি বিনষ্ট হইলে অন্য গ্রামেও তাহার প্রভাব পড়ে। এক গ্রামবাসীর আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব অন্য গ্রামেও আছে। দূরে খুব উন্নত একখানি গ্রাম ছিলো, যেখানে সকলেই যাহা ইচ্ছা খাইতে পারে, নুডলস, ভাত, রুটি, স্যুপ। ইহা লইয়া সেই গ্রামে বসবাসকারীদের মধ্যে তেমন মাথা ব্যথা ছিলো না। সকলেই মিলিয়া মিশিয়া থাকিত। সেই গ্রামে এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের জমিদারের নাতি থাকিত। কারণ, সেইখানে প্রাণ ভয় ছিলো না। তাই সেই গ্রামের সুন্দরী এক নুডলস তরুণীকে বিবাহ করিয়া জমিদার নাতি সেখানেই স্থায়ী হইয়া গেলো।
সেইখানে একদিন তাহাকে কেউ জিজ্ঞাসা করিল, ওহে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের জমিদার নাতি, তুমিতো এইখানে রয়েছে মহাসুখে অট্টালিকা পরে, ঐখানে তোমার নানার গ্রামে যে লোকে কাঁদিয়া ভাঙিয়া পরে/ খুন হইয়া মরে।
মুখ আমসি করিয়া নাতি চিবাইয়া চাবাইয়া কহিল, আসলে আমার মাতা যাঁহারা নুডলস খাইয়া খুন হইতেছেন তাঁহাদিগের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল, কিন্তু ভাত হইলো আমার মায়ের ভোটের আধার, তাই তাঁহার নির্দেশে এই সকল মৃত্যু নিয়া সকলেই মুখে কুলুপ আঁটিবো বলিয়া ঠিক করিয়াছি। তাহারা মৃত্যুবরণ করুক ইহা আসলে আমরা চাই না, কিন্তু আমরা কী করিব বলুন? আমরাতো তাহাদিগকে নুডলস খাইতে বলি নাই। নুডলস লইয়া কথা কহিয়া আমরা ভেতো গ্রামবাসীর বিরাগভাজন হইতে চাই না। সেই গ্রামে ভাত আছে, ভাত থাকিবে, ভাতই তাহাদের নিয়তি। আমরাতো বাহিরের উন্নত গ্রামে ভিনগ্রামের স্ত্রীর সহিত স্যুপ, পাস্তা, পিজা খাইতে পাইতেছি, আমাদের সমস্যা কোথায়? সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদিগের গ্রামে নুডলসপক্ষীয়দের নিজেদেরও সমঝিয়া চলিবার প্রয়োজন আছে বৈকি। গ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এমনই সংকটাপন্ন যে এইসব লইয়া কথা কহিলে সমস্যা বৃদ্ধি পাইতে পারে। মানি যে ভাতখোরদিগের নুডলসপক্ষীয়দের কোপাইয়া কেষ্টপ্রাপ্তি করানো উচিত হয় নাই, কিন্তু নুডলসপক্ষীয়দিগেরও বুঝিতে হইবে ভাতখোরদিগের অনুভূতি, তাহাদের ভাতানুভূতিতে আঘাত দেওয়াটা তো মোটেও উচিত কর্ম নহে।
যখন প্রশ্ন করা হইলো, কিন্তু নুডলসপক্ষীয়েরা তো তাহাদের মত প্রকাশ করিতেছে মাত্র, এই অপরাধে কাহাকেও হত্যা করা যায় কিনা! ইহার উত্তরে শ্রীমান নাতি অতি উচ্চাঙ্গের হাসি (যারে কয়, হাই ক্লাস) দিয়া কহিলেন যে, এই অপরাধের ব্যাপারে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠিত হইয়াছে, অপরাধী ধরা পড়িল বলিয়া, দোষ করিলে কাহাকেও রেহাই দেওয়া হইবে না। তবে নুডলসপক্ষীয়দের অনুরোধ রহিল যেন তাঁহারা ভাতখোরদিগের ভাতানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, এবং ভাতখোরেরাও যেন নুডলসপক্ষীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। এইভাবে, ভাতের ভিতর নুডলস মাখিয়া ও মিশাইয়া হাজার বছরের সংস্কৃতি রক্ষা পাইবে। এই মহাবাক্য শুনিয়া রাজভাতখোর সর্বসেঁচি (ব্যাদড়া বালকগণের মুখে, সর্বখেঁচি) কবি কাব্যকম্বুকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, গ্রামে শান্তির সুবাতাস বহিতেছে। জয় শান্তি, জয় উন্নয়ন, জয় মানবপ্রেম!
প্রথমে গেল নুডলসখানেওলা, তাহার পর নুডলস বিক্রেতা, নুডুলসের সহিত যে টমেটো সস খাওয়া হইতো সেই সস বিক্রেতা, এরপর নুডলস রান্না করার জন্যে কড়াই যাহারা বানাইয়াছিলো, একে একে সবাইকে কোপাইতে লাগিল ভাতখোরগণ, যাহাকে বলে প্রায় বিনা বাধায়। ক্রমাগত কোপাকুপিতে আশেপাশের গ্রামের লোক চিন্তিত হইয়া পড়িল। দশ গ্রামের মুরুব্বিদের তরফ হইতে ঠিক করা হইলো জমিদারতনয়ার সহিত এই ব্যাপারে বাতচিতের দরকার। কিন্তু জমিদার তনয়া নানা সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক ব্যাপারে ব্যস্ত থাকায়, এই ব্যাপারে সরাসরি কথা কহিতে অস্বীকার করিলে মুরুব্বীরা তনয়ার একান্ত মোসাহেবের সাথে যোগাযোগ করিতে বাধ্য হইলেন।
সে অতি ফাজিল আর স্মার্ট ছোকরা নাম যাহার জালালুল হক কফিল। সে কহিলো, ব্যক্তিগত জীবনে জমিদারতনয়া খুবই সাদামাটা নির্বিরোধী মানুষ। তিনি তিন বেলা নিয়ম করিয়া ভাত খান। মাঝে মাঝে মাঝরাতে উঠিয়াও পানি দিয়া ভিজাইয়া রাখা ভাত নিজের হাতে পেঁয়াজ মরিচ ডলিয়া খাইয়া নেন। শান্তির জন্যে ভাত সম্বন্ধে লেখা যেকোন বই তিনি পড়েন, সুর করিয়া ভাত লইয়া লেখা বই পড়া দিয়া তাহার সকাল শুরু হয়। ভাতকে তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুস্বাদু খাদ্য বলিয়া মনে করেন। কিছু কিছু চাল যখন ভাত হইয়া ফুটিয়া উঠে তখন চারিপাশে মৌ মৌ সুগন্ধে ভরিয়া যায় আর পেটের মধ্যে খিদা কেমন চনমন চনমন করিয়া উঠে। আছে নুডলসে সেই সুগন্ধ? তাহলে কি করিয়া যুগ যুগ ধরিয়া সগৌরবে আর সদম্ভে ভাত টিকিয়া রহিলো পৃথিবীতে?
নুডলসখানেওয়ালাদের ওপর তিনি যথেষ্ট বিরক্ত। নুডলস লইয়া বাড়াবাড়ি না করিতে তিনি কয়েকবার হুশিয়ারি উচ্চারন করিয়াছেন। লম্বা লম্বা কিংবা বেঁকা বেঁকা নুডলস যাহারা খাইবে তাহারা তাহাদের ঘরে বসিয়া চুপচাপ খাইবে, দানা দানা ভাতের লোকমা যাহারা মাংস সহকারে ভক্ষণ করিবে তাহাদের ‘ভাতানুভূতিতে’ আঘাত করা চলিবে না। তাহার ওপর নুডলস একখানি বিদেশি খাবার, ইহা দিয়া এই দেশীয়দের শান্তিভঙ্গ করা চলিবে না।
দশ গ্রামের মানুষজন অবাক হইয়া কহিলো, কিন্তু নুডলসের দেশে যে তাঁহার আত্মীয় পরিজন আছে, তাঁহার ছেলে মেয়ে সেখানে সুখে ঘর করিয়া দিনাতিপাত করিতেছে, তাহার বেলা?
জালালুল হক কফিল রাগিয়া কহিলো, ওতো পাকনা কথায় আপনাদের কাম কী মশাই! ঐগুলো সব রাজরাজরাদের ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর, তিনি নিজের যোগ্যতাতেই সেখানে থাকিবার ক্ষমতার্জন করিয়াছেন। পারিলে আপনারাও সেখানে হিজরত করুন, কে মানা করিতেছে? কিন্তু এই গ্রামে থাকিতে হইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদের ভাতানুভূতিতে কোনোক্রমেই কোমল পুষ্পকোরকের টোকাটিও দেওয়া চলিবে না, হুম! যত্তসব! গ্রাম উন্নতির দিকে আগাইয়া যাইতেছে মহাসমারোহে, সেইখানে এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা বলিয়া আপনারা কিন্তু গ্রামের শান্তি, উন্নয়ন ও অপরাধীদিগের বিচারকার্য নিয়া বাধা সৃষ্টি করিতেছেন বলিয়া রাখিলাম! ইতিহাস আপনাদিগকে ক্ষমা করিবে না, গ্রামের জনসাধারণও করিবে না।
এইমতে ভিনদেশি বর্গি তাড়াইয়া গর্বে ও বিরক্তিতে নুডলস কোম্পানির বানানো খোমাখাতায় কফিল লিখিল, আর শুনিয়া রাখ ফোপর দালালরা, ভাত হইলো ভাত। নিজের স্বার্থ ও সুবিধানুযায়ী ইহাকে গরম খাওয়া যায়, ঠান্ডা খাওয়া যায়, তেলে ভাজিয়া ফ্রায়েড রাইস করা যায়, ঘিয়ে ভাজিয়া পোলাও রাইস করা যায়, চিনি দিয়া জর্দা, গুড় দিয়া পায়েস কি না করা যায়? ভর্তায় খাওয়া যায়, ভাজায় খাওয়া যায়, তরকারিতে যায়, চাটনিতে যায়, ডালে যায়, অম্বলে যায়, শত শত বছর ধরিয়া কি এমনি এমনি ভাতের গুণগান হয়? ভাতের ওপর খাদ্য নাই। এতসব জানিয়া শুনিয়া বেয়াড়া লোকটি ভাত না-বেচিয়া কেন নুডলস বেচিতে গেলো? শত শত বছরের ভাতৈতিহ্য ভাঙ্গে কোন সাহসে? কেন এই অপরাধে তাহাকে তাহা হইলে কোপানো হইবে না?
ভাতগুরুদিগের সমাবেশে নুডলসপক্ষীয়দের বিপক্ষে বিষোদ্গার পূর্ব হইতেই ছিল, কোপানোর পরও তাহারা থামে নাই, বরং তাহাদিগের কর্মের প্রতিফলস্বরূপই যে তাহার খুন হইতেছে, এই সারসত্য সবাইকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুঝাইয়া দেওয়া হইল। বেশিরভাগ ভাতখোরেরাই ইহা মানিয়া ভাতের নিচে রক্ত চাপা দিয়া ভাত খাইয়া ও ইহার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদী জানিয়া হৃষ্টমুখে দিবাভাগে কর্ম ও রাত্রিভাগে নিদ্রাযাপন করিতে লাগিল। উগ্র নুডলসপক্ষীয় বা ভাতখোরদিগের কেহ কেহ বিবেকদংশনে দুচারিটি কথা বলিলেও বাকি প্রায় সবাই “চুপ, চুপ” বলিয়া তাহাদিগের গলা চাপিয়া ধরিয়া, হাজতে পাঠাইয়া, দণ্ডপ্রদান করিয়া গ্রামে কবরের শান্তি আনিয়া উল্লসিত হইল।
বাইরের মুরুব্বিরা ব্যাজার মুখে চলিয়া গেলো। সারা পৃথিবী যখন দ্রুত বেগে নুডলস সঙ্গী করিয়া সামনের দিকে ধাবিত হইতেছে, তখন তাহারা ভাত বুকে করিয়া এক জায়গায় স্থির থাকিতে বদ্ধপরিকর। সামনে যাওয়ার কোন আগ্রহ তাহাদের নাই। কিন্তু তাহাতেই কি রক্ষা পাইলো সকল? সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদিগের হাতে একের পর এক নুডলসপক্ষীয় খুন হইবার পর, আর কোন নুডলসপক্ষীয় বাকি রইলো না। কেহ ভিনদেশে পলাইয়াছে, কেহ পাশের দেশ গা ঢাকা দিয়াছে, দেশের ভিতর যাহারা ছিল, তাহারা চুপ থাকিয়া, এমনকি মাফ চাহিয়া ভাতের গুণগান করিয়াও রেহাই পায় নাই। কিন্তু ভাতখোরদিগেরতো ফিনকি দিয়া বাহির হওয়া তাজা রক্তের নেশা চাপিয়া গেছে। ফি সহিহ ভাতমোবারকবারে তাজা রক্ত না দেখিলে নিজেকে পরিপূর্ণ মুজাহিদীন, মুমিন, জিহাদী বলিয়া মনে “জিহাদানুভূতি” আসে না।
তাহার পর শুরু হইলো লাল চাল, মোটা চাল, আতপ চাল, চিকন চালের মধ্যে লড়াই। একের পর এক এই লড়াইতে গ্রামটি একদিন ধ্বংসের শেষ মাথায় অন্ধকারে তলাইয়া গেলো। আলো জ্বালিবার জন্যে কেউ আর রহিল না।
শুধু গ্রামের প্রান্তসীমায়, বনের কাছে একঘর ‍বৃদ্ধবৃদ্ধা তাহাদিগের অন্ধের নড়ি, একমাত্র যুবক সন্তান, সেই নুডলসবিক্রেতার বিয়োগব্যথায় কাঁদিয়া কাঁদিয়া অন্ধ হইয়া গেল।
তানবীরা
০৯/১১/২০১৫
http://www.sylhettoday24.com/news/details/Literature/11732