Sunday, 7 August 2016

মানুষ মানুষের জন্যে ২

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের শিক্ষামন্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, আইজিপি সহ অনেক মান্যবর ব্যক্তিত্বই সমানে মানব জীবনে ধর্মীয় শিক্ষার অপার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন আজকাল বলে যাচ্ছেন, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়াকোন শিক্ষা পূর্নাংগতা পায় না তারা কোন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পূর্নাংগ ধরে এই সিদ্ধান্তে আসলেন জানতে ইচ্ছে করে

সেন্ট্রাল ইউরোপ, মূল ইউরোপের ধনী শ্রেণি এদিকের বেশীর ভাগ মানুষই ধর্মহীন এখানে কোন স্কুলে, চার্চে ধর্ম শিক্ষা দেয়া হয় না। ক্রিসমাস, ইস্টারেও কেউ সাধারণতঃ চার্চে যায় না। অথচ, ইউরোকে মান ধরলে ডলারকে পেছনে ফেলে দিয়ে চলছে এরা অনেকটা সময় ধরে। এরা নিজেরা তো ভাল আছেই, মারা যাবে জেনেও সমানে শরনার্থীদের সাহায্য দেয়া থেকে শুরু করে এমন কোন মানব হিতকর কাজ নেই যাতে এরা পিছিয়ে আছে। তাহলে কী ধরে নেবো অপূর্নাংগ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই এই মানবিকতা, কর্ম দক্ষতা, পরোপোকারীতা’র মত মহৎ গুন গুলো উঠে আসছে। পূর্নাংগ শিক্ষা ব্যবস্থা তাহলে স্বার্থপরতা শেখায়? দরকার হলে নিজে মরে ও অন্যকে মেরে দাও তাহলে পরকালে তোমার অনন্ত জীবনের ইন্স্যুরেন্স হয়ে গেলো!

নেদারল্যান্ডসে প্রাইমারী স্কুলে বাচ্চাদের গার্জিয়ানদের নিয়ে কমিটি থাকে যারা স্কুলের সাথে মিলে বাচ্চাদের ক্যাম্পিং, কার্নিভাল, ক্রিসমাস পার্টি এগুলোর আয়োজন করে থাকে। ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে কোন প্রার্থণা বা ধর্মীয় উৎসব থাকে না স্কুলে। শুধুমাত্র স্কুল সাজানো হয়, যার মধ্যে আলোকসজ্জাটাই থাকে প্রধা আর সাথে ক্রিসমাস ট্রীনভেম্বর – ডিসেম্বরে এখানে এত্তো ঘুটঘটি অন্ধকার যে আলোকসজ্জাটাই এখানের প্রাণ থাকে। ক্রিসমাস পার্টির আয়োজন উপলক্ষ্যে বাচ্চারা নানা ধরনের হাতের জিনিস বানায়, যেমন, ক্যান্ডেল স্ট্যান্ড পেইন্ট করে কিংবা মাগে আঁকে, ওয়াল হ্যাঙ্গিং জাতীয় কিছু বানায়। 

এগুলো ক্রিসমাস ফেয়ারে তারা বিক্রি করবে তাদেরই বাবা মায়ের কাছে। প্রত্যেকটি প্রাইমারি স্কুলে দেখা যায় প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো ছাত্র ছাত্রী থাকে। ক্রিসমাস ফেয়ারে প্রায় প্রতিটি পরিবার তিন থেকে পাঁচ টাকা স্কুলে খরচ করে, দেখা যায় হাজার ইউরোর মত টাকা উঠে যায়। আর সেই টাকা দান করা হয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, সিরিয়া, কেনিয়া, মাদাগাস্কার বা অন্য কোন দেশে। পুরো স্কুলের বাচ্চারা গর্ব নিয়ে হাসি হাসি মুখে সবাইকে জানায় এতো টাকা আমরা ওদেরকে সাহায্য পাঠিয়েছি, আমাদের অনেক আছে, ওদের দরকার। জানি না এই শিক্ষা পূর্নাংগ কীনা। পরের কারণে স্বার্থ দেয়ার এই শিক্ষা তারা চার বছর থেকে অনুশীলন করে ...


বাংলাদেশে যারা সারাক্ষণ ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে যায়, আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, তাদের ছেলে মেয়ে পড়ে বিদেশের কনভেন্টে। বিয়ে করে বিদেশী, বাস করে বিদেশে। জানতে ইচ্ছে করে, অন্যদের ছেলেমেয়েদের জন্যে যা প্রয়োজনীয় ভেবে দিনরাত উপদেশ দিয়ে যায়, তারা নিজেদের ঘরের ব্যাপারে কী করে এতো উদাসীন থাকে? তাহলে কী তারা যা বলে তাতে নিজেরাই বিশ্বাস করে না? গরীব, অশিক্ষিত ভোট ব্যাঙ্ক জনগনের জন্যে এক ব্যবস্থা আর নিজেদের জন্যে অন্য রকম? 

Saturday, 9 July 2016

ফিরিয়ে দাও, আমার প্রেম - আমার ঢাকা



কদিন ধরেই ক্রমাগত যা হয়ে যাচ্ছে দেশে তাতে সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফেরা ঘর্ম ক্লান্ত মাঝির মত মন বড্ড ক্লান্ত মনের সেই ক্লান্তি কর্কট রোগের মত এখন দেহেও ছড়িয়ে গেছে বেশ জন বলেছে, “আপনার একটা লেখা আশা করেছিলাম ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলেছি, লেখার মত মন নেই, আগ্রহ বা তাগাদাও অনুভব করি না ভেতর থেকে, লেখাকে তো আসতে হবে তাছাড়া সম্ভাব্য যা যা লেখা যায়, ফেসবুকে মোটামুটি সবাই তা লিখেও ফেলেছেন কিন্তু যে নীল কষ্টটা হৃদয়টাকে আঁকড়ে ধরে আছে সে তো পুরনো প্রেমের মত পিছু ছাড়ে না সকালের পূজোর ফুলের গন্ধে মিশে কিংবা সন্ধ্যার আহ্নিকে কাঁসার ঘন্টিতে ঘুরে ফিরে মনে আসে 

যেখানেই বেড়াতে যাই না কেন, লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক, আমাস্টার্ডাম কিংবা ডিজনীল্যান্ড, মনের গহীনে ঘুরে ফিরে সেই কৃষ্ণ নাম, ঢাকা – ঢাকা – ঢাকা ... যেখানে হৃদয় গাঁথা, নাড়ি পোতা।

ঢাকা মানে ধানমন্ডি পাঁচ নম্বর, মহুয়া চটপটি, দিন মিলিয়ে নামা সেই নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায় ... আমরাও পথ হারা ক’টি তরুনী মিলতাম সেখানে, ঝাল, টক, ফুচকা-চটপটির নেশায়। সারাদিনের তাপদাহের পর মাত্র একটু ছায়া নেমেছে, গরম কমেনি তার মধ্যেই ঘেমে নেয় চলেছে আমাদের কাকলী। চারপাশে কি হচ্ছে তা আমরা থোড়াই কেয়ার করছি, আমরা তো ভেসে যাচ্ছি আমাদের সুরে – ছন্দে, আনন্দে – স্বপন কথাকলি ফুটবে কি ফুটবে না সেই ছায়া কাজল চোখে মেখে

বারিকিউ টুয়েন্টি, সাত মসজিদ রোডে ... যেয়ে বসলে আমাদের এনে দিতো তাদের ফুল তোলা থালা। অনেক সময় চারজনের জন্যে দু’রকমের থালা। আমরা থালার ফুলের ডিজাইন নিয়ে হাসতে হাসতে অস্থির হতাম, থালায় লেখাও খুঁজতাম, “যাও পাখি বলো তারে, সে যেনো ভোলে না মোরে” টাইপ কিছু। এমনও হয়েছে হাসির দমকে চেয়ার থেকে পরে ও গেছে কেউ ... সেখানে যারা খাবার পরিবেশন করতেন, কী ভয়ঙ্কর রাগী রাগী চোখের আমাদের দিকে তাকাতেন। তাদের রাগান্বিত ভাব ভঙ্গীতে আমাদের আনন্দ বেড়ে যেতো আরও কয়েক গুন। অন্যান্য টেবল থেকেও অনেকেই তাকাতো এ টেবলের দিকে ... এখানে এসে মিলেছে আজ দুষ্ট ক’টি মেয়ে ... নেহাত ... বের করে দিতে পারত না ... ভালবাসার মানুষেরা এক সাথে সবাই থাকলে কী সে না আনন্দ হয়

রবীন্দ্র সরোবরে নিয়ে মেঘ কে ছেড়ে দিলে, মেঘ দিকবিদ্বিক হারা হরিণ ছানা হয়ে একটা দৌড় দিতো। তার ভাব এমন, ও এসে গেছি আমার জায়গায়। হ্যাঁ, আমার আর মেঘের চিরপরিচিত প্রিয় সেই চত্বর। নাম না জানা কত ছেলে মেয়ে আমার মেঘের গাল টিপে আদর করে গেছে। মেঘের এমন গজগামিনী ভাব, আমাকে তো আদর করবেই। তা দেখে ওরাও হাসতো। সেই নানা বর্ণের ডিজাইন করা ছোট ছোট জুতো পায়ের আমার মেঘ, কত বড় হয়ে গেছে আজ। কিছু স্মৃতি মনে করতে পারে, কিছু পারে না। কিন্তু মায়েরা তো স্মৃতিতেই বাঁচে। রবীন্দ্র সরোবরে ক্লান্ত হয়ে গেলে ফেরার পথে ডিঙ্গি। এক সময় আমি আর মেঘ ছিলাম ডিঙ্গির পরিচিত মুখ। আমাদের দেখলেই সেখানকার লোকেরা এক গাল হাসি দিতেন।

ভাইয়া আম্মির জন্যে “কানের তুলো” বানাতো বড় করে। আব্বু সাভারে ছোট একটু বাগান বানিয়েছে, ছেলে মেয়েদের তাজা সব্জি করে খাওয়াবে বলে। আমরা সাভার যাবো, অনেক জোরে গাড়িতে গান বাজবে, আম্মি যেনো আপত্তি না করতে পারে, তাই ভাইয়ার পূর্ব সতকর্তা। আহা, ঢাকা টু সাভার ... পথ ভর্তি আনন্দ, দু হাতে কুঁড়াতে কুঁড়াতে, বিলাতে বিলাতে যাওয়া। সাভারের বাগানে ঘোরাঘুরি হয়ে গেলে, বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করতো না, মন ভর্তি বাকবাকুমচল যাই, গুলশানে আইসক্রীম খেতে। আমাদের পুরনো মডেলের গুলশানের বাসিন্দাদের তুলনায় কম দামী গাড়ি, ভাইয়া বেপরোয়া চালাতো। নাম দিয়েছিলাম আমরা “ভয় দেখানো” খেলা। আমাদের গাড়ি বদলানোর রাস্তায় পরে আছে, টাকা আর গাড়ির কম্বিনেশান মেলার অপেক্ষায়, কিছু গুঁতো ফুতো লাগলে সমস্যা নেই। গুলশানের নতুন মডেলের, দামী গাড়ির ড্রাইভারদের আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা, গাড়ি নিয়ে কোথায় তারা চাপবে, আহা – আমাদের আনন্দ দেখে কে।

ঢাকা মানে বসুন্ধরা, এলোমেলো হাঁটা,
যা মনে চাওয়া-খাওয়া তারপর
অন্তত জলিলের মুভিতে প্রাণ ভরে হাসাহাসি।
পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূল
আর চারুকলা টি।এস।সি।
বাম্ববার কনসার্টে প্রিয় গানে সুর তোলা
হাতে হাত, চোখে চোখ, ভালবাসা-বাসি।
লং ড্রাইভে বাইরে যাওয়া সাথী আন্তাক্ষারী
সুখ সকল স্মৃতি দুহাতে হৃদয় মন ভরি

... এই আতঙ্ক জড়ানো, মৃত্যু শীতল যানজটে পূর্ণ উন্নত ঢাকা আমার মত অনেকের অপরিচিত এখানে সেই মন উড়ানো খোলা বাতাস কোথায় যা দিন কিংবা সন্ধ্যে উড়িয়ে নিয়ে যায় ... তরুন তরুণীদের কল কাকলি কোথায় যা শত না পাওয়ার মাঝেও বাঁচতে শেখায়।

ঢাকা জানি আমি বন্ধুদের সাথে ফুচকার টেবলে, কবিতা উৎসবে, কনসার্টে। ঢাকা জানি আমি রেস্টুরেন্টে বোনদের সাথে খুনসুঁটিতে, ভাইয়ের সাথে নিরাপদে পথ চলায়

ঢাকা বলতে যে ছবি মনে আসে, বাবার ছায়া, মায়ের আদর, ভাইয়ের স্নেহ মাখা প্রশ্রয়, চিরকালের আনন্দ বেদনার সাথী বোনেরা। ঘুড়ি ওড়ানো, বিদ্যুৎহীন গান গাওয়া সন্ধ্যা মাখা যে ঢাকা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে, তা ফিরিয়ে দাও ... সেই নিরাপদ ঘর, সেই নিরাপত্তা ফিরে চাই ... বার বার। “প্রিয়মান ঢাকা”, তোমাকে সেই বেশ ফিরে চাই ...

০৮-০৭-২০১৬
তানবীরা




Friday, 1 July 2016

বুনোলতা ১

তুমি বড্ড ভাগ্যবান শুভঙ্কর।

হঠাৎ এতো উদাস কেনো নীরা?

শুধুমাত্র সৌভাগ্যবানরাই ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়ের গ্রামে জন্মানোর সুযোগ পায়।

যেখানে অবারিত সবুজের প্রান্ত ছুয়ে,
নির্ভয়ে নীলাকাশ রইবে নুয়ে

নীল আকাশের নীচে অসীম প্রান্ত ধরে দৌড়ে ফড়িং ধরবে, পুকুর বা নদীর অথৈ পানিতে অবাধ্য ঝাপাঝাপি করে সাঁতার কাটবে।

মন উদাস হলে খেয়া নৌকায় বসে বাঁশি বাজিয়ে চলে যাবে কোন গহীন প্রান্তরে, যেখানে গাছের লতা তাকে আড়াল করে রাখবে সারা পৃথিবীর নির্মমতা থেকে। হালকা লিলুয়া বাতাস লজ্জাবতী লতা হয়ে গা ছুঁয়ে যাবে আর বাঁশির করুন সে সুর উন্মনা করে তুলবে না দেখা কোন কিশোরীর শিমূল তুলো সম নরম হৃদয়কে

আমি নিতান্ত শহুরে মেয়ে, বদ্ধ দেয়ালে কেটে গেছে জীবন। খোলা আকাশ দেখেছি, বাড়ির জানালা দিয়ে। সবুজ পাতার সজীবতা ছুঁয়েছি টবে লাগানো গাছে। সাজানো গোছানো সে জীবনে প্রকৃতির উদ্দামতার ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে ...

গ্রামকে পাগলের মত ভালবাসি আমি।

গ্রামের বৃষ্টি কী সুন্দর হয়, জানো নীরা? একটানা মুষল ধারে ঝরে যেতেই থাকে। চারধারে যা ধূলো জমে থাকে তা কেটে প্রকৃতি হয়ে যায় একদম সদ্য জন্মানো শিশুটির মত নিস্পাপ আর পবিত্র। সবুজ পাতা ছুঁয়ে টপ টপ করে পরতে থাকে সেই জল। রাস্তা ঘাট জল কাঁদা মগ্ন। মাটি ছেড়ে উঠে আসে অদ্ভুত নাড়ি ছেড়া এক সোঁদা গন্ধ।

গ্রামের ছেলেরা কী করে জানো? এক সাথে সবাই ফুটবল খেলে। জল – কাঁদা মেখে খেলার সে কী উত্তেজনা। আমরাও খেলতাম মনসা পূজার সময়। গোটা পরিবার পূজো উপলক্ষ্যে এক হতাম।
একবার মনসা পূজায় তোমাকে নিয়ে যাবো আমাদের গ্রামের বাড়িতে। দোতলা বাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। তোমার খুব ভাল লাগবে দেখো। কাকিমা – জেঠিমাদের সাথে তুমি উনোনের ধারে থাকবে, পাট ভাঙ্গা শাড়ি আর হাত রাঙা করে চুড়ি পরে। আমি ফুটবল খেলে সারা গায়ে কাঁদা মেখে এসে তোমাকে জড়িয়ে ধরবো .........

উচ্ছসিত শুভঙ্করের বন্য প্রতিশ্রুতিতে নীরা ভাল লাগায় মিশে গেলো। হারিয়ে গেলো সে না দেখা সেই গ্রামের তেপান্তরের মাঠে, বৃষ্টি, কাঁদায়। যেখানে ঝপ ঝপ করে ঝরে পরা বৃষ্টির জল পুকুরের বুকে মিলে মিশে লীন হয়ে যায়।

মধুর সে দৃশ্য কল্পনায় বিভোর নীরা কোন জবাব দিতে পারলো না

এখনো আকাশ যখন সব কিছু হারানোর বেদনায় ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে ... দিন রাত একটানা কান্নায় রাস্তা ঘাট সব প্লাবিত হয়ে যায়, নীরা জানালার গ্রীল, বারান্দার গ্রীল ধরে অপেক্ষা করে থাকে ......

একজন বলেছিলো, গায়ে কাঁদা মেখে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে --- সে দিনের অপেক্ষায় আমি আজও আছি

সে ভুলে গেছে ...।

সে ভুলে ভুলুক,
কোটি মন্বন্তরে আমি ভুলিব না,
আমি কভু ভুলিব না ।


তানবীরা
৩০/০৬/২০১৬ 

Friday, 24 June 2016

বনস্পতির ছায়ায় এক জীবন

বাবা দিবসের লেখাটি শুরু করতে চাই সঞ্জয় সরকারের কবিতাটি দিয়ে
"যেদিন আমি ছোট ছিলাম,
যুবক ছিলেন বাবা।
সেদিনটি আসবে ফিরে
যায় কি তা আজ ভাবা?
বাবার কাছেই হাঁটতে শিখি,
শিখি চলা-বলা।
সারাটি দিন কাটতো,
আমার জড়িয়ে তার গলা।
বাবার হাতেই হাতেখড়ি,
প্রথম পড়া-লেখা।
বিশ্বটাকে প্রথম আমার,
বাবার চোখেই দেখা।"
আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই বাবা নিয়ে ভাবলে বোধহয় ওপরের কবিতাটার মতো এ ধরনের কিছু স্মৃতিই মনে আসবে। বাবা-মা'কে আমরা রোজই ভালোবাসি, তাহলে কেনো আলাদা 'বাবা দিবস', 'মা দিবস' এলো?
হ্যাঁ, প্রতিদিনের আটপৌরে ভালবাসার ফাঁকে তাদেরকে কখনওই কী সেভাবে জানানো হয়, তারা যে আমাদের জীবনের বিশেষ মানুষ? সেই “বিশেষ” অনুভূতিটি মা-বাবাকে উপহার দেওয়ার জন্যে মাঝে মাঝে আলাদা করে জানানোর প্রয়োজন আছে বৈকি।
উন্নত বিশ্বের সাথে আমাদের যোগাযোগ আজ প্রতি দিনের। তাদের জীবন যাপন, সিনেমা, গান, উৎসব অনেক কিছুই আমাদের সমাজে, আচার-আচরণে, জীবনযাপনে মিশে গেছে। বাবা দিবস তেমনই একটা উপলক্ষ। ছবি এঁকে, উপহার কিনে আমাদের বাচ্চারাও আজকাল বাবাকে নিয়ে একটু বিশেষভাবে বাবা দিবসটি উদযাপন করে থাকে, কিন্তু উৎসব মানে তো শুধু উদযাপন নয়, তার পেছনের ঘটনাটা বা ইতিহাসটা জেনে নেয়াও জরুরি।
মা দিবস উদযাপন শুরু হওয়ার পরেই ঝপ করে বাবা দিবস পালন করাও শুরু হলো। এ নিয়ে বেশ কয়েকটা গল্প প্রচলিত আছে যার মধ্যে দুটো বেশ প্রসিদ্ধ।
১৯শে জুন ১৯০৮ সালে প্রথম বাবা দিবস উদযাপন হয়। এর পুরো কৃতিত্ব সোনারা স্মার্ট ডোড এর। ওয়াশিংটনের স্পোকানে তিনিই প্রথম এই দিবসটির জন্যে প্রচার, প্রচারণা এবং আয়োজন শুরু করেন। তার কয়েক সপ্তাহ পরে আবার ৫ জুলাই ফেয়ারমন্ট পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে দিবসটি উদযাপিত হয়।
গ্রেস গোল্ডেন কেটনের দক্ষিন উইলিয়াম মেমোরিয়াল মেথোডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চ-এ উইলিয়াম স্মৃতিসৌধের যাজক বার বার জনসমক্ষে জানাচ্ছিলেন, ৩৬১ জন মানুষ যাঁরা ইটালি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করছিলেন, মনোনগা শহরের কাছে তাঁদেরকে একটি বিস্ফোরণে মেরে ফেলা হয়। যাঁদের মধ্যে অনেক ফাদারও ছিলেন। সেই থেকে পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে সরকার বাবা দিবসটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
শতাব্দীর পালা বদলে গোটা আমেরিকাতে মা দিবস উদযাপন নিয়ে আলোচনা আর ধুম চলছিলো। আমেরিকান সরকার তখনও মা দিবসকে স্বীকৃতি দেয়নি কিন্তু অনেক রাজ্যই প্রতি বছর মে মাসের ৩য় রবিবারে মা দিবস উদযাপন করে মা-দেরকে সম্মান জানাচ্ছে। ১৯০৮ সালে যখন চার্চে মা দিবস উদযাপিত হচ্ছিল, সোনারা স্মার্ট ডোড তখন বাবাদের জন্যেও একটা দিন নির্দিষ্ট করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
যখন সোনারা মাত্র ষোল বছরে তখন তার মা ৬ষ্ঠ পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। বাকি পাঁচ ছেলেকে একা হাতে মানুষ করা, সোনারা বা তার বাবার জন্যে মোটেই কোন সহজ কাজ ছিলো না সেই তখনকার দিনেও। যদিও জনাব স্মার্ট খুব ভাল ভাবেই সে দায়িত্ব সম্পন্ন করেছিলেন। বাবার প্রতি সেই ভালবাসা আর শ্রদ্ধা থেকে সোনারা ভাবতো বাবাদের জন্যেও খুব বিশেষ কিছু করা দরকার ঠিক যেমন মায়েদের জন্যে মা দিবসে করা হয়।
১৯০৯ সালে সোনারা স্পোকানের ওয়াইএমসিএ আর স্পোকানের মিনিস্টার এলাইয়েন্সকে বাবা দিবসের প্রস্তাবটি পাঠায়। ওয়াইএমসিএ ৫ই জুন বাবা দিবস উদযাপন করলেও স্পোকানের মিনিস্টার এলাইয়েন্স উদযাপন করে ১৯শে জুন, কারণ প্রস্তুতির জন্য তাদের বেশি সময়ের দরকার ছিলো।
ওয়াশিংটনে ১৯১০ সালের ১৯শে জুন প্রথম বাবা দিবসটি উদযাপন করা হয়। সরকারিভাবে বাবা দিবস উদযাপনের অভিপ্রায়টি খুব দ্রুতই সারা আমেরিকাতে জনপ্রিয়তা পেলো আর একের পর এক অনেক রাজ্যই বাবা দিবস উৎসবটির সাথে যোগ দিল। ১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্ট কেভিন কোলেজ সরকারিভাবে জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে বাবা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন আর সব অঙ্গরাজ্যগুলোকে উৎসবটি পালন করার জন্যে উৎসাহ দেন। ১৯৫৬ সালে একটি যৌথ অনুবন্ধনের মাধ্যমে কংগ্রেসও এই দিবসকে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৬৬ সালে, দশ বছর পরে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন, জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে “বাবা দিবস” ঘোষণা দিয়ে একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন স্থায়ী ভাবে গোটা আমেরিকাতে বাবা দিবসের রীতি প্রচলন করেন।
সোনারা স্মার্ট ডোড তার প্রচেষ্টার সফল বাস্তবায়ন দেখে যেতে পেরেছিলেন। ৯৬ বছর বয়সে ১৯৭৮ সালে তিনি পরলোকগত হয়েছিলেন।
বাবা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা সবাইকে। পৃথিবীর সব বাবা-মা, ছেলে মেয়েরা মিলে আনন্দের সাথে এই দিনটি উদযাপন করুক। মঙ্গলবারতা ঘিরে থাকুক সবাইকে। বাচ্চারা তাদের হাতে বানানো ছোট ছোট উপহার দিয়ে, ছবি এঁকে বাবাকে বুঝিয়ে দিক,'বাবা, আমিও তোমাকে ততোটাই ভালবাসি যতোটা ভালোবাসো তুমি আমাকে।'
http://m.banglatribune.com/lifestyle/news/115183/%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8

Sunday, 12 June 2016

বঞ্চনা থেকে নিজেকে দু'দন্ড সরিয়ে রাখতে সাহিত্যেই বড় অবলম্বন

* আপনার গল্প লেখার শুরু কখন, কীভাবে?

আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা দুইই শহরে। শহর মানেই আবব্ধ, ছেলেধরা নিয়ে যাবে কিংবা অচেনা লোকের কাছ থেকে কিছু খাওয়া নিষেধ, তাদের সাথে কথা বলা নিষেধ এভাবেই শুরু হয় শহুরে বাচ্চাদের জীবন। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। এই বদ্ধতার মধ্যে মনের জানালা খোলার একটি মাত্র উপায় ছিলো “বই”, খুব ছোটবেলা থেকেই পড়তে ভীষন ভালোবাসতাম। ইত্তেফাক পত্রিকায় দাদাভাইয়ের পরিচালনায় কচিঁকাচার আসরের নিয়মিত পাঠক ছিলাম, সাথে শিশু, নবারুণ পত্রিকার। পড়তে পড়তেই আসলে লেখার আগ্রহ জন্ম নিলো, বাড়ি থেকে উৎসাহও ছিল লিখতে চেষ্টা করার। সেসব চেষ্টা থেকে একটি গল্প ছোটবেলায় “শিশু” পত্রিকায় ছাপা হয়, এভাবেই হাতেখড়ি

* গল্প লেখেন কেন?

অক্ষমতার ক্ষোভ মেটাবার জন্যে হয়তো অনেকটা। চারদিকে এতো অন্যায়, অবিচার, ভন্ডামী, মুখোশে মুখোশে ঢাকা মানুষ। সবসময় যতোটা প্রতিবাদ করা উচিৎ ঠিক ততো করতে পারি না বলে, নিজের অভিজ্ঞতাগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করি। আমি আসলে ঠিক কল্পনা আশ্রিত কোন গল্প লিখি না। আমার চারপাশের জীবনের রোজকার গল্পগুলোই লিখে রাখার চেষ্টা আমার।

কী ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

চেনা জীবনের চেনা বাস্তবতাই আমার লেখার বিষয়। কল্পনা করে বানিয়ে বানিয়ে গল্প আমার লেখা হয়ে ওঠে না। একটু সহজ কিংবা কঠিন করে বললে, চারপাশে যা দেখি আসলে তাই লিখি।


* পাঠকদের ওপর আপনার গল্পের প্রভাব কেমন?

যেসব পাঠকরা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে চান না তাদের হয়তো একটু রুঢ় সত্যি লাগতে পারে। তবে বেশির ভাগ পাঠকদের ভালো লাগে। কিছুদিন আগে এক পাঠিকার টেলিফোনে শনিবার সকালের ঘুম ভাঙলো। রাতে তিনি আমার “একদিন অহনার অভিবাসন” উপন্যাসটি পড়ছিলেন। প্রথমে ভাবছিলেন এটা আমার গল্প, পড়তে পড়তে তার মনে হলো তার গল্পটি লেখা হয়েছে। সারা রাত পড়ে বইটি তিনি শেষ করেছেন, হাত থেকে রাখতে পারছিলেন না বলে জানালেন। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া লেখক মনকে সজীব করে।

গল্প লেখার সার্থকতা খুঁজে পান?

গল্প লিখে সামাজিক বিল্পব ঘটানোর মত কোন পরিকল্পনা আমার নেই। অনেকসময় নিজের বা নিজের খুব কাছের কারোর দুঃখ, বেদনা গুলো যা প্রকাশ করতে পারা যায় না, লুকিয়ে ফেলতে হয়, সেগুলো লিখে ফেলতে পারলে মনে হয় কাউকে বলতে পেরেছি, মনের ভার নেমেছে, হালকা হয়েছি। সে লেখাটা পড়ে অচেনা অজানা কেউ যখন ইনবক্সে ম্যাসেজ দেয় কিংবা মেইল করে জানায়, মনে হচ্ছে আমার কথাগুলোই লিখেছেন, লেখাটা পড়ে সারাদিন ভাবছি কী করে বুঝতে পারলেন বা জানলেন আমার কথাগুলো, পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসছে ইত্যাদি ইত্যাদি তখন মনের কোথাও প্রশান্তি আসে, মনে হয় লেখার মাধ্যেমে কারো অন্তর ছুঁয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে পেরেছি। তার কাছাকাছি আসতে পেরেছি, কোথাও কিছু রেখে গেলাম হয়তো।  

* প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সমাজে গল্প পাঠের প্রাসঙ্গিকতা কী?

সমাজ যেমন প্রতি নিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, সাহিত্যও ঠিক তার তালেই পরিবর্তন হচ্ছে। সাহিত্য হচ্ছে সমসাময়িক সমাজের দর্পন। কোন একটা সময়কে জানার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে সে সময়ের সাহিত্য। বঙ্কিম, শরৎ কিংবা রবীন্দ্রনাথ না পড়লে আমরা কী করে জানতাম সে যুগে বাঙালী তথা ভারতীয় মেয়েদের সমাজে কী রকম দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হতো।


* একজন পাঠক আপনার গল্প পড়বে কেন?

একজন পাঠককে আমার লেখা পড়তেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। পড়ার মূল কথা হলো জানার আগ্রহ। জানতে চাইলে পড়তে হবে, সে আমার লেখাই হোক কিংবা অন্য কারো। সাহিত্য আসলে বানিজ্যের বিষয় নয় যে, উপাদান বর্ননা করে বলা যাবে, এই এই ম্যাটেরিয়াল আছে এই প্রোডাক্টিতে তাই কনজুমারকে এই জিনিসটিই কিনতে হবে। এখানে ঘটনাটা পুরোই মানসিক, যার লেখার সাথে যে নিজেকে রিলেট করতে পারে, তার লেখাই সে পড়ে। পাঠক হিসেবে আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম নই। অনেকেই যারা আমার সহজ সরল ভাষায় লেখা বাস্তব ঘটনাগুলোর মাঝে নিজেকে দেখতে পান, তারা আমার লেখা পড়েন এবং হয়তো ভবিষ্যতেও পড়বেন।

বাংলা সাহিত্যে গল্পের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে আপনার লিখন প্রস্তুতি কী রকম?

প্রস্তূতি নিয়ে, প্লট ভেবে, হিসেব নিকেশ করে, চরিত্র এঁকে আমার এখনো কিছু লেখা হয়নি। কোন ঘটনা যখন আমাকে পীড়া দেয়, আমার বিবেককে আহত করে, আমার মনে কিছু গুমরাতে থাকে সেগুলোই একটা সময় আমার খাতায় ঝরে পরে। তাই কোন ধারার সাথে সংযুক্ত হয়ে কিছু লেখা বোধহয় আমার আর হয়ে উঠবে না। আমি আমার ধারাতেই লিখে যাবো হয়তো।

* গল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

আমি আশাবাদী মানুষ। সাহিত্য আশার নাম, প্রেরণার নাম। দিনে দিনে লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, মানে পাঠক বাড়ছে। অন্তর্জালের কারণে পড়ার সুযোগও অনেক সহজ হয়েছে। সংসারে পাওয়া না পাওয়ার বঞ্চনা থেকে নিজেকে দুদন্ড সরিয়ে রাখতে সাহিত্যের চেয়ে বড় অবলম্বন আর কী হতে পারে? বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভবিষ্যতে আরো অনেক এক্সপেরিমেন্ট হবে সে বলাই বাহুল্য।

* বিশ্বসাহিত্যে বাংলা গল্পের অবস্থান কোথায়?

বাংলা গল্পের অবস্থান আসলে বাঙালীদের কাছে। সাহিত্যের আঁধার হলো, ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি। নিজ ভাষার, নিজ সমাজের গল্প মানুষকে যতো কাছে টানবে অন্য ভাষা সংস্কৃতির মানুষের কাছে সেটা কল্পনা করা বৃথা। রবীন্দ্রনাথের “গীতাঞ্জলী” নোবেলের জন্যে অনুবাদ করা ছাড়া বিদেশীদের খুব একটা বাঙলা সাহিত্য নিয়ে মাতামাতি করতে শোনা যায়নি। সেদিক থেকে ব্লগের অবস্থান ভাল। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের ওপর লেখা ব্লগগুলো সেদিক দিয়ে অনেক বেশি বহিঃ বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

* আপনার গল্প লেখার প্রেরণা কী?

আমার বা আমার বন্ধুদের না বলা কথাগুলো কিংবা না বলতে পারা কথাগুলোই আমাকে লিখে ফেলার প্রেরণা যোগায়।

* আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশের নেপথ্য গল্প কী?

তেমন উল্লেখযোগ্য কোন গল্প আসলে নেই। অনেকদিন ধরে ব্লগে লেখালেখি করি, কিছু কিছু লেখা মাঝে মাঝে পত্রিকায়ও ছাপা হয়। প্রথম বইয়ের প্রকাশক নিয়মিত ব্লগ পড়ে থাকেন। তিনি ভাবলেন, নির্দিষ্ট কিছু গল্প একসাথে করে একটি বই করা যায়, তিনি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে বইটি প্রকাশ করেন, “পাহাড় আর নদীর গল্প”। তবে  হঠাৎ করে তিনি তার এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে বেশ একটি চমক দিয়েছিলেন, সেই অনুভবটুকু অসাধারণ ছিলো। অনেকের সাথে গল্প সংকলনে আমার লেখাও ছিলো আগে কিন্তু শুধু নিজের লেখাগুলো দিয়ে একটা আলাদা বই, বেশ অন্যরকম অনুভূতি বটে।

* আপনার প্রিয় গল্পকার কারা, কেন প্রিয়?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার প্রিয় গল্পকার। তার লেখা ছোটগল্প গুলো বিষয় বৈচিত্র্য ও লেখার গুনে অনবদ্য। বনফুল, প্রতিভা বসু, হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা কিছু অনবদ্য গল্প আছে যা আমাকে ছুঁয়ে গেছে। কেনো কিছু খুব প্রিয় কেন হয়ে যায় সেটা পোস্টমর্টেম করা আসলে মুশকিল, যা ভাল লেগে যায় তা শুধু ভাল লেগে যায়। এদের প্রত্যেকেই এতো সহজ ভাষায় জীবনের গল্প বলে গেছেন যে তা থেকে দূরে থাকা আমার জন্যে কঠিন।




Tuesday, 7 June 2016

প্রিয় গল্পগুলো

প্রিয় গল্পটি নিয়ে লিখতে বসা বড্ড কঠিন।

আমি অসংখ্যবার আমার অন্যান্য লেখায় এ-কথাটি উল্লেখ করেছি যে, এতো এতো মনোমুগ্ধকর লেখা ছড়িয়ে আছে চারপাশে, তার মধ্যে থেকে একটিকে প্রিয় বলে বেছে নেয়া অনেক শক্ত, অন্তত আমার জন্যে। এছাড়া  সময়ের সাথে, মানসিক অবস্থার সাথে, বয়সের সাথেও রুচি, পছন্দ, মন বদলাতে থাকে। দিনে দিনে দেশ বিদেশের নানা লেখকদের নাম যোগ হয়ে প্রিয় গল্পের তালিকাও দীর্ঘ হতে থাকে।

এমনিতে আমি আমার নিজের ভাষার বই পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, বাংলা সাহিত্যের বিশাল সম্ভার উপচে পড়ছে বিভিন্ন কৃতি লেখকদের অসামান্য সৃষ্টিতে। তার ওপর যতোদিন যাচ্ছে ততোই না-পড়া বইয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে কতো কী জানি না, পড়া হয় নি কিংবা হবে না তার হতাশা জাপটে ধরছে ক্রমশ।

সেই কঠিন কাজের ভার নিয়ে ভাবতে ভাবতে হারিয়ে গেলাম ছোটবেলায়। প্রিয় যা ছিল, প্রিয় তাই আছে। কিছুই হারায় নি, হয়তো হারাবেও না। সেই জ্বলে-ওঠা নিভে-যাওয়া জোনাকি পোকা, আমসত্ত্ব, চালতার আচার, সারা গায়ে সুর মেখে বৃষ্টিতে-ভেজা। না হারিয়েছে গান বা কবিতা, না সেই কাউকে নাম না-বলা হৃদয়গহিনে লুকিয়ে থাকা মানুষটা, চোখের কাজল কিংবা খোঁপার কাঁটা, তেঁতুল বনে জ্যোৎস্না দেখা কিংবা কপালে কারো নামের টিপ-আঁকা। সময়ের সাথে প্রিয় থেকে আরো প্রিয়তর হয়েছে সমস্ত কিছু

অনেকে বেশ বলেন, ছোটবেলায় এঁর লেখা আমার ভাল লাগতো, কিংবা গান বা খাবার। আমি এমন কিছু শুনলে সংশয়ে পড়ে যাই, আমার কি তাহলে কোন অতীত নেই! বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছোটবেলার ভালোলাগার রেশ আজোও আমাকে ছুঁয়ে রেখেছে। উন্মাদ কিংবা টিনটিন সামনে পেলে না-উলটে পারা যায়? কঠিন সময় হয়তো বদলে দেয় অনেককিছুই, শুধু পারে না হয়তো ভেতরের মানুষটাকে একেবারে বদলে ফেলতে তাই ছোটবেলার ভাল লাগার রেশ কোথাও না কোথাও রয়েই যায়। মানসিকতা, রুচি বদলে গেলেও, ভেতরে আবেশটা কোথাও রয়ে যায়।

আনমনে প্রিয় তালিকা ওল্টাতে ওল্টাতে যে-নামটি প্রথম মনে এলো, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা আমাদের আটপৌরে বাঙালিদের সবচেয়ে কাছের যে-মানুষটি, সেই রবি ঠাকুর। গল্পগুচ্ছের মোহে বয়ঃসন্ধিকাল কাটায় নি এমন বাঙালি খুব কম পাওয়া যাবে। বিভিন্ন স্বাদের গল্পে ঠাসা প্রায় সাতশ পৃষ্ঠার এই বইটি নেই এমন খুব কম বুকশেলফ আছে বাঙালি বাড়িতে। কাবুলিওয়ালা, গুপ্তধন, পোষ্টমাষ্টার, ল্যাবরেটরি, হৈমন্তী, নষ্টনীড়, মধ্যবর্তিনী, কঙ্কাল, সমাপ্তি প্রায় প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে ফিরে।

সেই গেরুয়া দুই মলাটের ভেতরে অজস্র কাব্যিক ও বাস্তবের চরিত্রের রূপমহলের চলচ্চিত্রে চোখ ধাঁধায়। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেও এখনো যার মুখ সবার প্রথমে আমার মনে ভেসে ওঠে সে হলো ‘মিনু’। মৃন্ময়ী বললেই বেশি কাব্যিক শোনায় কিন্তু তাতে সে বড্ড দূরের হয়ে যায়। মিনু’ বললে বুদ্ধিদীপ্ত দুষ্ট চোখের যে-নিষ্পাপ চেহারাটি মনে ভেসে ওঠে, সে যেন বড্ড চেনা, পাশের বাড়ির মেয়েটি। পিঠ পর্যন্ত ছোট ঈষৎ কোঁকড়ানো রুক্ষ চুলের শ্যামলা মেয়েটি উঁচু করে বাঙালি কায়দায় শাড়ি পরে বনে বাদাড়ে, উঠোনে মাঠে, গাছে, নদীতে, ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, আপন মনে নেচে বেড়াচ্ছে যা হলো গেছো মেয়ের রাবীন্দ্রিক প্রতিকৃতি

বিভূতিভূষণের ‘দুর্গা’-র আদল কি খানিকটা ‘মিনু’-তে ছায়া ফেলে? নাকি মিনু সেই লৌকিক দেবী বনদুর্গার রূপায়ণ?

বাংলার শাশ্বতরূপ মেনে সে বাপের আদরের মেয়ে। কিন্তু গতানুগতিক ধারার চেয়ে আলাদা, সাধারণের চোখে লক্ষ্মীছাড়া, দুরন্ত। যেসব কাজে সাধারণ মেয়েরা লজ্জা পেয়ে গায়ের কাপড় দিয়ে নাক মুখ ঢেকে ফেলে, সেসব ঘটনা সে কোঁকড়া চুল পিঠে দুলিয়ে, নিষ্পাপ হরিণ চোখ মেলে, নিদারুন কৌতূহলী চোখে কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। তারপর নিজের বালক সঙ্গীদের কাছে নিজের কল্পনার রঙ মিশিয়ে নিজের ভাষায় বর্ণনা করে।

এই যে শ্রীমান অপূর্বকৃষ্ণ-এর গ্রামে ফেরার ঘটনাটাই ধরা যাক। গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে অপূর্ব কোলকাতায় থেকে পড়ে, তাকে গ্রামসুদ্ধ কে না চেনে। ছুটিতে গ্রামে ফিরে এসে অনেকদিনের অনভ্যস্ততায় সে স্যুটকেস হাতে জুতোশুদ্ধ নৌকোঘাটের কাদায় পড়ে গেলে অন্য মেয়েরা এ-দৃশ্য দেখে লজ্জায় হয়তো পালিয়ে যেতো কিংবা দেখেও না-দেখার ভান করতো। কিন্তু মিনুর দ্বিধাহীন বাঁধভাঙা উচ্চহাসিতে অপূর্বই হয়ে গেলো অপ্রস্তুতসত্যজিতের চলচ্চিত্রে এই দৃশ্য যেন সরাসরি গল্পগুচ্ছের পাতা থেকে উঠে-আসা।

সমবয়েসি মেয়েদের সাথে মিনুর ততো ভাব নেই। গ্রামের গুরুজনস্থানীয় পুরুষেরা তাকে স্নেহের চোখে দেখলেও বয়স্থা নারীরা তার ওপর নিদারুণ বিরক্ত ছিল। মিনুর মা এ সমস্ত নিয়ে দারুণ বিপাকে ছিলেন কিন্তু মিনুর বাবা দূরে থাকে, মেয়েকে যারপরনাই স্নেহ করে, তাই মিনুর মা পারতপক্ষে হাত তুলতো না মিনুর গায়ে  

আচ্ছা, এতো এতো গল্প বা চরিত্র থাকতে হঠাৎ ‘সমাপ্তি’ মানে অপূর্ব-মিনুই বা কেন মনে ভাসলো? তা কি এই অস্থির সময়ের কারণে?

যে-সময়ের মধ্যে আমরা এখন বাস করছি তার সাথে সেই সময় কি আসলে মেলানো যায়? অনেকদিনের চেনাজানা, পছন্দের সহপাঠী কিংবা সহকর্মী যখন জীবনসাথীতে রূপ নেয়, অনেক সময় দেখা যায় তারপর সে এক ভিন্ন মানুষ। যে-মানুষটিকে চিনে দুজন দুজনের কাছে এসেছিলো, এ আসলে সে নয়। যে-সময়ে দুজন মানুষ দুজন মানুষকে মতের কিংবা মনের অমিলের কারণে বরদাস্ত করতে পারে না, সেসময়ে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতেও কষ্ট হয় অপূর্ব একবুক ভালোবাসা নিয়ে নীরবে তার বালিকা বধূর পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। অপূর্ব তার বউকে কোন সময় বেঁধে দেয়নি, শর্ত দেয় নি, দিয়েছে একবুক শর্তহীন ভালবাসা।

কিন্তু সব ঘটনার সমাপ্তিই কি ঠিক এরকম মধুর?
সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলীও বালিকা বয়সে বউ সেজেছিলো, মাত্র এগারোতে তাকে বড় ঘরের রুগ্ন একটি পাত্রের হাতে তুলে দেয়া হয় যে নিজের অসমর্থতা ঢাকতে দীপাবলীর ওপর প্রথম রাতেই হামলা করে। পাত্রের ওপর তার পরিবারের চাপ ছিলো যেকোনো ভাবেই দীপাবলীকে গর্ভবতী করতে হবে। মাত্র বাহাত্তর ঘন্টা সে বিবাহিত ছিলো তারপরই বিধবা। শুরু হলো সংগ্রামী জীবন যা তাকে বালিকা থেকে এক ধাক্কায় পরিণত মানুষে পরিবর্তিত করে ফেলে। দুঃস্বপ্নের এই নিষ্ঠুর অতীতের কৃষ্ণচিহ্ন মুছে ফেলে সে শুরু করতে চেয়েছিল নতুন জীবন, জয় করতে চেয়েছে নিজের ভাগ্য। আর সেই চলার পথেও কাছের মানুষের বীভৎস, লোভী চেহারা তাকে বার বার আঘাত করে, কিন্তু পারে না পর্যুদস্ত করতে। তার জীবন এসে মেশে নাটকে, আবার জীবন কেবলই ছাপিয়ে যায় নাটকে। মিনু বয়ঃসন্ধিকালের যে সমস্ত ভালোবাসা আর আনন্দের সমাপ্তির মাঝে দিয়ে গেছে সেরকম কিছুতে কি অধিকার ছিলো না দীপাবলীরও? 

সমরেশ মজুমদারকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘দীপাবলী’ তিনি কেন আঁকলেন? লেখক জবাব দিয়েছিলেন, তিনি একবার তরুণ বয়সে জলপাইগুড়ি জঙ্গলে হাঁটছিলেন, সেখানের চা বাগানে বছর দশ/এগারোর একটি বেশ হাসিখুশী বিধবা মেয়েকে দেখেছিলেন সপ্রতিভ মুখে হাসছে, বেড়াচ্ছে, ঘুরছে। কেনো যেনো সেই মেয়েটির ছবিটি তাঁর মাথায় গেঁথেছিলো। সেই মুখটি মনে করেই ‘দীপাবলী’-কে রচনা আর কিছুতেই তিনি তাঁর উপন্যাসের ‘দীপাবলী’-কে হারতে দিতে চাননি তার জীবন সংগ্রামে, তাই ‘সাতকাহন’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শান্তিনিকেতনে জানিয়েছিলেন ‘সমাপ্তি’ গল্পের পটভূমির কথা। রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁর জমিদারি দেখা উপলক্ষে একটি নদীর তীরে নৌকা লাগিয়েছেননৌকায় বসে তিনি কাজ করছিলেন। দেখলেন একটি বেশ বড়ো মেয়ে, অবিবাহিত, নদীর তীর থেকে তাঁর নৌকার দিকে দেখছে। তার সরল সতেজ দৃষ্টি, চলাফেরার মধ্যে একটি সহজ ফূর্তির ভাব দেখে রবীন্দ্রনাথের খুব ভাল লাগলো। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে সেরকম ভাব তিনি দেখেনই নি বলা চলে। তারপর দিন দেখলেন তাঁর পাশের নৌকায় চাল, ডাল, তেল, নুন মশলা বোঝাই হচ্ছে আর সে মেয়েটিকে কনে সাজিয়ে অনেকে মিলে তার পাশের নৌকায় নিয়ে আসছে। মেয়েটি কিছুতেই নৌকায় উঠবে না, তাকে অনেক জোরজার করে নৌকায় তোলা হলো।

সচরাচর মেয়ে পাঠাবার সময় যে কান্নাকাটি হয় তার কিছুই সেখানে ছিলো না। বরং অনেকের মধ্যে বেশ আমোদের ভাব ছিলো। পাশের নৌকাটি ছেড়ে গেলে, তীরের স্ত্রীলোকেরাও চলে গেলেন। দূর থেকে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুনতে পেলেন, একজন স্ত্রীলোক আর একজনকে বলছেন, “ওকে তো জানো বোন, ও ওই রকমই। কত করে বললাম, পরের ঘর করতে যাচ্ছিস, বেশ সাবধানে থাকিস, ঘাড় হেঁট করে থাকিস, উঁচু করে কথা বলিস নে, কিন্তু সে কি তা পারবে” ইত্যাদি ইত্যাদিএই ঘটনাটিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ লেখার পটভূমি। কিন্তু নৌকোঘাটে দেখা সেই তেজি মেয়েটির ‘সমাপ্তি’ কি রবীন্দ্রনাথের কল্পনার ‘সমাপ্তি’-র মতো হয়েছিলো? তার স্বামী কি তার মন বোঝার চেষ্টা করেছিলো? নাকি বাকি হাজার হাজার লুকনো কান্নার গল্পের মাঝেই মিশে গেলো সেই গল্পটি? অজানাই হয়তো রয়ে গেলো সেই কাহিনি

উপন্যাস কেনো শুধু, যদি আমাদের চারপাশে তাকাই বাংলাদেশের অনেক মেয়ের জীবনেইতো বয়ঃসন্ধিকালের সমাপ্তি অনেক করুণ। যদিও আমরা বাঙালি মেয়েরা আমাদের একান্ত ব্যাপারগুলো বাইরে বলতে ভয় পাই, এড়িয়ে যাই কিন্তু এর ভেতরও কেউ কেউ প্রথা ভেঙে কিছুতো লিখছেনতসলিমা নাসরিন তাঁর ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটিতে লিখেছেন তাঁর বয়ঃসন্ধিকালের এবং তারও আগের অনেক নিপীড়নের কথা। লোভী পুরুষের অনেক অযাচিত স্পর্শ শিশুকালেই নিজের শরীর সম্পর্কে মেয়েদের মনে অজানা ভয়, ক্ষেত্রবিশেষে খানিকটা বিতৃষ্ণা এনে দেয়। পদে পদে মেয়েদেরকে ঘরেই করা হয় বঞ্চনা, নিপীড়ন। ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করে, মেয়েকে পশ্চাৎপদ করতে প্রথমে উদ্যত হয় তার একান্ত আপনজনেরা। সবার কি আর মিনুর মতো অবাধ স্বাধীনতায় পাখা মেলে হাওয়া কাটার সুযোগ হয়? নাকি অপূর্বেরা গল্প উপন্যাস ছেড়ে বাস্তবের স্ত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ায় অপূর্ব-পছন্দ নিয়ে?

এতো বড় ঘরে সেধে বিয়ে হলো মিনুর, কিন্তু বেচারি বুঝতেই পারে নি কী সে পেলো। বরং তার খেলাধূলা, ঘোরাফেরাতে বাধা-পড়ায় সে আরো বিরক্ত হয়ে উঠলো। অপূর্বকে সে তার জন্যে দায়ী করে তাকে দূরে ঠেললো। অপূর্ব মিনুর ভুল ভাঙানোর জন্যে, তার কাছে যাওয়ার জন্যে মিনুর সব খেলার, কাজের, দুষ্টুমির সহচর হলো। যেভাবেই হোক বউয়ের মন তাকে জয় করতে হবে। মনে মনে অপেক্ষা করতে থাকলো সে, কখন মিনু বুঝতে শিখবে, সংসারের দায়িত্ব নেবে নিজের মনে করেছুটি ফুরিয়ে আসাতে, মিনুকে তার মায়ের কাছে রেখেই অপূর্ব কোলকাতা রওয়ানা হলো। যাওয়ার সময় স্ত্রীর কাছে একটি ‘চুম্বনের’ আবদার করেও অবুঝ মিনুর কাছে নিরাশ হলো। মিনু উপলব্ধিই করতে পারেনি স্বামী তার কাছে কী চেয়েছে। মিনু জানে অপূর্ব তার সকল দুষ্টুমির সহচারী যে তাকে তার বাবার মতো সবকিছুতে প্রশ্রয় দিয়ে যাবে, বিনিময়ে কিছুই চাইবে না।
অপূর্ব ও মৃন্ময়ীর তখনকার মানসিক অবস্থা রবীন্দ্রনাথেরই লেখা “নববঙ্গদম্পতির প্রেমালাপ  কবিতা থেকে আমরা অনুভব করতে পারি,
বর।         তোমার অপার প্রেমপারাবার,
            জুড়াইতে আমি এনু তাই।
       বলো একবার আমিও তোমার,
            তোমা ছাড়া কারে নাহি চাই।
       ওঠ কেন, ওকি, কোথা যাও সখী?
                     
                   সরোদনে
কনে।
       আইমার কাছে শুতে যাই!

দু-দিন পরে

বর।  কেন সখী, কোণে কাঁদিছ বসিয়া
              চোখে কেন জল পড়ে?
              বসন্ত কি নাই, বনলক্ষ্মী তাই
              কাঁদিছে আকুল স্বরে?

কনে      পুষি মেনিটিরে
              ফেলিয়া এসেছি ঘরে

বর   গুন্গুন্ছলে  কার নাম বলে
            চঞ্চল যত অলিকুল?
        কানন নিরালা,  আঁখি হাসি-ঢালা,
            মন সুখস্মৃতি-সমাকুল
        কী করিছ বনে কুঞ্জভবনে?
কনে
       খেতেছি বসিয়া টোপাকুল

বর   জগৎ ছানিয়া কী দিব আনিয়া
            জীবন যৌবন করি ক্ষয়?
       তোমা তরে, সখী, বলো করিব কী?
কনে
       আরো কুল পাড়ো গোটা ছয়

বর   তবে যাই সখী, নিরাশাকাতর
            শূন্য জীবন নিয়ে
        আমি চলে গেলে এক ফোঁটা জল
            পড়িবে কি আঁখি দিয়ে?
বিষাদিনী বসি বিজন বিপিনে
            কী করিবে তুমি প্রিয়ে?
       বিরহের বেলা কেমনে কাটিবে?
কনে
       দেব পুতুলের বিয়ে

অপূর্ব যখন ছিলো তখন অপূর্বের জন্যে বিশেষ কিছু অনুভব না করলেও, অপূর্ব চলে যাওয়ার পরে তার শূন্যতা মিনুকে অন্য মানুষে রূপান্তর করে দিলো। পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলার চেষ্টা করে দেখলো মন বসে না, নিজে নিজে একা একা বাগানে ঘুরে দেখলো আগের মতো ফুল চুরি কিংবা ফল চুরি কোনটাই তাকে আনন্দ দেয় না। বন্ধুদের সঙ্গও পানসে হয়ে গেলো। অপূর্বের জন্যে তার সারাবেলা মন কেমন করতে থাকলো সেটা সে কাউকে বলতেও পারলো না। এই প্রথম সে লজ্জা অনুভব করলো, জানলো সব কথা সব সময় মুখ ফুটে বলা যায় না।

সংসার কী জিনিস যে কখনো জানতোই না, সে ঘরের কাজে মন দিলো, শেখার আগ্রহ তৈরি হলো ভেতর থেকে। আস্তে আস্তে শুরু হলো মিনুর বালিকা বেলার সমাপ্তি। মিনু অপূর্বের চিঠি কিংবা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনে যাচ্ছে সারাবেলা। শুধু আচার রোদে দিয়ে আর প্রদীপের সলতে পাকিয়ে কী করে সারাদিন কাটাবে সে! বিরহে কাতর তার প্রতিটি প্রহর, কাটছে একেলা বিরহের বেলা, কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারছে না। মনে মনে ভেবে যাচ্ছে হয়তো অপূর্ব তার ওপর ভীষণ রেগে আছে, অভিমান তো সে অনুভব করতেই পারছে।

অপূর্ব ধনীর তনয়। ছুটিতে বাড়ি না-আসায় অপূর্বের মা তার স্ত্রীকে নিয়ে কোলকাতা যেয়ে ছেলের মানভঞ্জন করে। মায়ের সাথে পুত্রের মান অভিমানের সমাপ্তি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অশ্রুসিক্ত আবেগপূর্ণ চুম্বনে স্ত্রী হিসেবে মিনুকে কাছে পাওয়ার আকুলতার সমাপ্তি। দুরন্ত মিনুর সদর্প সংসারে প্রবেশের মাঝে দিয়ে কৈশোরের সমাপ্তি। আর তারপর হ্যাপিলি এভার আফটারল্যান্ডের সুবাতাস।

আর এখন চারদিকে এতো পাওয়া না-পাওয়ার মধ্যে দিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের জীবন কাটছে। সম্পর্ক মানেই বেশির ভাগ সময় বিশ্বাস অবিশ্বাসের অম্লতিক্ত দোলাচলঅনেক প্রতীতি নিয়ে শুরু করা সম্পর্কেরও সমাপ্তি হয় বিচ্ছেদে। তাই কঠিন বাস্তব থেকে ছুটি পেতে গল্প হলেও খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে অপূর্ব মৃন্ময়ীর মিলনমধুর ‘সমাপ্তি’-কে।

তানবীরা
১৮/১১/২০১৪