Monday, 30 March 2020

অন্তর মম বিকশিত কর

করোনা”কে উপলক্ষ্য করে নানারকম ভিডিও, মীম ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। কিছু উপদেশমূলক, কিছু শিক্ষনীয়, কিছু ফান আর কিছু অবমাননাকর। আজকে একটা অবমাননাকর ভিডিওর কথা বলবো। একজন বেশ বয়স্ক মুরুব্বী শ্রেণীর ভদ্রমহিলা “করলা” নিয়ে অনেককিছু শুনছেন বলে এখন “করলা” খান না। ক্যামেরার পেছনে যে আছে তিনি বেশ হেসে হেসে তাকে দিয়ে এটি তিন-চার করে বলাচ্ছেন, ভদ্রমহিলা দেখছেন তাকে নিয়ে মজা হচ্ছে, ক্যামেরাও রেকর্ড হচ্ছে কিন্তু তিনি নিরুপায় তাই ইচ্ছে না থাকলেও হেসে হেসে একই কথা বলে যাচ্ছেন, সায় দিয়ে যাচ্ছেন।


এখানে আসলে একজন অসহায় মানুষ যাকে ঐ বাড়িতে হয়ত কাজ করে কিংবা সাহায্য নিয়ে থাকতে হবে তার নিরুপায়তাকে ভিডিও করা হয়েছে, এটা কোন ফান নয়, অন্তত আমি পাই নি। ঐ বয়সী মুরুব্বী আমার আপনার পরিবারে, আশেপাশে নিশ্চয় আছে, যারা করোনাকে “করলা” না ভাবলেও, করোনা নিয়ে আমার আর আপনার চেয়ে হয়ত কম জানে, কিংবা মনের ভুলে করোনাকে, “করোলা” বলেও ফেলেছে দু’চারবার। আপনি ঐটার ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপ করেন তো। কানের গোড়ায় ঠাটিয়ে দুটো দিয়ে রক্ত বের করে দেবে। আপনি ঐ ভদ্রমহিলার মেঝেতে বসা অবস্থানটাকে ভিডিও করেছেন, আপনি চেয়ারে বসেন সেই সুযোগটা নিয়েছেন, দ্যাটস ইট।


বাংলাদেশ সরকার “লকডাউন” ঘোষনা করার পর ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে পরিবারমুখী মানুষের ভীড়। সংকটে আপনজনের পাশে থাকার তাড়না তো চিরন্তন। প্রবাসীরাও হয়ত সেই প্রেষণা থেকেই বাড়ি ফিরেছিলেন। সারাজীবন পরিবারে জন্যে খেটেছেন, এই বিপদের দিনে তাদের কাছে ফিরবেন না তো ফিরবেন কোথায়? যাই হোক, মুহূর্তে সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলো, সাথে বিভিন্ন টিকাটিপ্পনী। হ্যাঁ বটেই, পরিবার ছেড়ে তো থাকেই সেসব শ্রেণি পেশার লোক যাদের অবলীলায় গালি দেয়া যায়। আমরা যারা গালি দিতে পারি তারা মোটামুটি সবাই পরিবার নিয়েই বাস করি। সাথে সরকারের “কান্ডজ্ঞানহীনতা”র সমালোচনা। মানলাম সরকার কান্ডজ্ঞানহীন, সরকারের উচিৎ ছিলো প্রথমে দেশ জুড়ে “কার্ফিউ” ঘোষনা করে তারপর “লকডাউন” করা। কিন্তু আমি আর আপনিই কতটা দায়িত্বশীল? দেশ জুড়ে এই মহামারী মোকাবেলা করা কি সরকারের একার দায়িত্ব? আমার-আপনার কোন দায়িত্ব নেই? আমাদের দায়িত্ব কি শুধু ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করা আর জনগনকে গালি দেয়া? গালি দিয়ে বিপ্লব হয় না। বিপ্লব করতে হলে, মাঠে নামতে হয়, ঐ মানুষ গুলোর পাশে দাঁড়াতে হয়, তাদের কাঁধে কাঁধ রেখে, চোখে চোখ রেখে তাদের বেদনা জানতে আর বুঝতে হয়। আপনি যেতে পারতেন স্টেশনে, বোঝাতে পারতেন এতে কি ক্ষতি হতে পারে, নামতেন রাস্তায়, নামেন মাঠে, ঘাটে কিংবা বন্দরে -----



অভিজিত রায় খুন হওয়ার পর বিডি নিউজ থেকে প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ডাঃ অজয় রায়ের একটি সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছিল, জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বাবা আর ছেলে দুজনেই সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন, সেই লক্ষ্যে কাজ করেছেন, কে বেশি সফল? (স্মৃতি থেকে লিখছি, হুবহু না’ও হতে পারে)

অজয় রায় স্যার জবাব দিয়েছিলেন, অবশ্যই আমি, আমি লড়েছি রাজপথে। অভির যুদ্ধ ছিলো কলম দিয়ে। রাজপথে লড়াই করতে অনেক বেশি সাহস আর শক্তি লাগে, কলম সেই বিপ্লব আনতে পারে না।

আমিও স্যারের মত বলবো, মানুষকে ভালবাসলে রাস্তায় নামেন, গালি দিয়েন না। যদিও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জানি, ওয়েল কর্নসার্নড বলেই আমার বন্ধুরা এভাবে তাদের টেনশান প্রকাশ করেছে, কিন্তু একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে হয়ত নিজেই অনুভব করবেন, দিজ মাইট নট বি দ্যা প্রপার ওয়ে।

এই যে ক্ষমতাসীন ভদ্রমহিলা, দুই মুরুব্বীকে কানে ধরিয়ে সর্গবে তার মোবাইলে তা ভিডিও করছেন। যা দেখে আমাদের সবার বিবেক নড়ে গেছে, ছিঃ ছিঃ করছি। এই ভদ্রমহিলা আকাশ থেকে টুপ করে বাংলাদেশে পরে নি। উনি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার অংশ, আমাদের মানসিকতার প্রতিফলন। রিকশাচালক, গৃহকর্মীদের তুই তোকারি করা, গায়ে হাত তোলা, অবলীলায় মাটিতে বসানো, গালি দেয়া, আমাদের মানবিকতাবিহীন শ্রেণি বিন্যস্ত সমাজের তিনি একজন প্রতিনিধি মাত্র। আমাদের লুকানো মুখোশের একটি নির্লজ্জ প্রকাশ।

আগে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি, হয়ত দেখবো, চারপাশ খানিকটা এমনিই বদলে গেছে … বদলানো শুরু হয়েছে

Friday, 27 March 2020

শেষ “করোনা”, শুরুতে খেল দিয়েছো খতম করে

শেষ “করোনা”, শুরুতে খেল দিয়েছো খতম করে
রোগ পাঠিয়ে এখন ফাইজলামি “করোনা”

চায়নীজরা প্রথমে সারা বিশ্বজুড়ে “করোনা” ছড়িয়েছে, এখন তারা গোটা পৃথিবীকে “মাস্ক”, “কিট”, “ট্রিটমেন্ট” এন্ড “টেকনোলোজী” সাপ্লাই ও সাপোর্ট দিচ্ছে। পুরাই “চায়নীজ ট্রিক”। একসময় ইউরোপীয়ানরা উপনিবেশ গড়েছে এখন চায়নীজরা রিভার্স খেলছে। “এশিয়ান ফ্লু” নিয়ে যেহেতু ইউরোপীয়ানদের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান কম, এটা দিয়ে ইউরোপকে দখল করা ইজি হবে। বছর বছর চায়না যদি বানিজ্যের প্রসারে নতুন নতুন “ফ্লু” এদিকে সাপ্লাই দিয়ে মার্কেট দখলে রাখে, অবাক হবার কিছুই থাকবে না।
আমার ধারনা, জাপান আফশোস করতেছে, হাতের কাছ থেকে বানিজ্য ফস্কে গেলো, এরপর তারাও কোমর বেঁধে লাগবে, টয়োটা, মিটসুবিশি, লীন-মুডা ট্রেইনিং এর পর আর নতুন কি প্রোডাক্ট রপ্তানী করা যায়।

ভারতীয়রাও পিছিয়ে থাকবে না। আইটি সেক্টর তো পুরাই কব্জায় এখন মেডিক্যাল সেক্টর। স্পেশালিস্টরা অন সাইট আর সাধারণরা অফ সোর। ফ্লু হলে ব্যাঙ্গলোরে হেল্প লাইনে ভিডিও কল দিয়ে ট্রিটমেন্ট নেবো।

অর্থনীতি নতুন মোড় নেবে, এশিয়া নির্ভর ইউরোপ। তবে সবদিক দিয়ে আমরা ধরা। ইউরোপ যখন এশিয়াতে উপনিবেশ বানিয়েছিলো তখন ভুগেছে আমাদের পূর্বপুরুষ, এখন চায়নীজরা এসে ইউরোপকে ধরেছে এখন ভুগবো নিজেরা। গরীব যেদিকে যায়, সাগর শুকাইয়া যায়।

বাংলাদেশ অবশ্য সবসময়ই দুধভাত, তারা কোন প্রতিযোগিতায় বা ট্রেন্ডে বিশ্বাসী নয়। আন্তর্জাতিক অংগনের ক্রিকেট এক্সপিরিয়েন্স নেয়ার মত তাদের এই বিশ্বের বানিজ্যের ভাবগতিক বুঝতে বুঝতে কেটে যাবে আরও পঞ্চাশ বছর।

এমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠোঁট গোল গোল করে যখন বলেন, “চায়নীজ ভাইরাস”, খুবই কিউট লাগে, জাস্ট লাভিট।

করোনা প্রমাণ করলো, দিনের পর দিন অফিস, স্কুল, বাজার, সব বন্ধ থাকলেও জীবন চলে। সবকিছু অনলাইনেই সম্ভব। অফিস প্লেস হায়ার না করেও বিজনেস রান করা যাবে, এবং ভালই যাবে। স্কুল চলবে এবং শপিং ও। “কস্ট কাটিং” ইউরোপ এবার তাদের জীবন ব্যবস্থাকে আবার নতুন করে ঢেলে সাজাবে। ওয়েটিং ইগারলি টু মীট দ্যা নিউ চেঞ্জেস হুইচ আই উইল কল “আফটার করোনা ইফেক্ট” অর “করোনা ইনভেশান”। ইতিমধ্যে পলিসি মেকাররা হয়ত লেগে পরেছে। নদীর একূল ভেঙেছে ওকূল গড়া হচ্ছে। হাজার লোকের যেমন চাকুরী যাবে তেমনি শত লোক আবার ওভারটাইমও কাজ করবে, তাদের মরার সময় নেই, বাজারে আসবে নতুন পলিসি।

লেসন অফ করোনাঃ অল্প কিবা বেশি, সবভাবেই জীবন কেটে যায়। সব পরিস্থিতিই একসময় স্বাভাবিক লাগে। মানুষ মানিয়ে নেয়ার অদ্ভূত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, আড্ডা, পার্টি, মুভি, রেস্টুরেন্ট এগুলো ছাড়া কি করে বাঁচবো? কিন্তু এই যে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার কোন তাড়া নেই, নেলপালিশ ম্যাচ করার টেনশান নেই, বেশ ভালই বেঁচে আছি। জানুয়ারী মাসে হলিডে বুক করার সময় বললাম, আগস্টের পর আর কোন হলিডে করি নি, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এখন হলিডে ক্যান্সেল, আবার কবে হবে তার কোন সম্ভাব্য পরিকল্পনার ও সুযোগ আপাতত নেই, কিন্তু দিব্যি ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আপাতত জুন পর্যন্ত সব বন্ধ তারপর কি হবে সেটা এখনো কেউ জানে না।

অবাক করার ব্যাপার বেশ ভালই কাটছে দিন, অফিস করছি, রান্না করছি, মুভি দেখছি, ফেবু করছি রোজদিন একই রুটিন তারপরও বেশ লাগছে। একটা অন্যরকম সময় পার করছি, চেনা জীবনের সাথে এর তেমন কোন মিল নেই। অনেকটা প্রেগন্যান্ট থাকার অনুভূতি, সাবধানে থাকতে হবে, এটা ধরো না, ওটা করো না টাইপ ব্যাপার। বিশ্বজুড়ে “হোম কেয়ারান্টিন” চলছে, এমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া। পরিবারের সবাই ধরতে গেলে একসাথে আছি কিন্তু যার যার বাসায়। ভিডিও কলে গল্পসল্প শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় গানের আসর। কবে এমন রুপকথার দিন কাটিয়েছি!



ইহা একটি অতিশয় লেইম পোস্ট।

03/25/2020

Thursday, 26 March 2020

“তবুও বৃষ্টি নামে”

নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ,
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে- শেষ হইয়াও হইলো না শেষ..."
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“তবুও বৃষ্টি নামে” নূরুন নাহার জুঁই যাকে আমরা ছোট করে ডাকি জুঁই, এর লেখা ছোট গল্প সংকলন। ওপরে উল্লেখ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সার্থক রুপায়ন। ছোট জুঁইয়ের লেখা বইটির কলেবরও ছোট, প্রচ্ছদ, সূচী, উৎসর্গ সব মিলিয়ে মাত্র সাইত্রিশ পৃষ্ঠা। গল্প আছে মোট সাতটি। কেউ যদি ভাবেন, এক ঘন্টা কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করবেন, এক কাপ ধূমায়িত গরম পানীয় নিয়ে বসে যান, “বিফলে মূল্য ফেরত” গ্যারান্টি।
প্রতিটি গল্পেই টুইস্ট আছে। ঝরঝরে বর্ননা, গল্পের নির্মান, পড়তে কোথাও থামতে হবে না, ধাক্কা খেতে হবে না। ধাক্কা থাকবে প্রতিটি গল্পের শেষ লাইনটিতে। যেমন, বইয়ের দ্বিতীয় গল্পটি “পরিপ্রেক্ষিত” তাতে বাসে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুই পুরনো বন্ধুর দেখা হয়, যারা এখন সম্পর্কে “দেবর-ভাবি”। ক্লান্তি কাটিয়ে দুই বন্ধু জমে ওঠে ফেলে আসা দিনের গল্পে। এ পর্যন্ত পড়লে মনে হবে একটা জাস্ট গল্প পড়ছি, তারপর জুঁইয়ের ভাষায় লেখা শেষ বাক্যটি, “বাসায় ফিরে যখন ফাল্গুনী বরকে শোনাচ্ছিল দেবরের সাথে দেখা হবার গল্প, কিংবা রুদ্র ফোনে মার সাথে বলছিল ভাবীর সাথে দেখা হবার কথা, তখন দুজনের কেউ কি জানতো, ঠিক ঠিক বারো বছর আগে দুজনের কেউ একজন আর অল্প একটু সাহসী হলে আজকের গল্পটা হয়ত অন্যরকম হতো?” তখন আবার অন্য ভাবনা কি মাথায় আসে না? কল্পনা অনেকদূর ডানা মেলে দেয় না?
পাঠকের পছন্দের বিচারে আমার কাছে সবচেয়ে মিষ্টি লেগেছে সবচেয়ে কলেবরে ছোট গল্পটা “কথার গান”। আবারও সেই শেষ বাক্যটিই, “মানুষ যা চায়, তার সব কিছু যে এক জীবনে পাওয়া হয় না!”
অনেক অনেক ধন্যবাদ জুঁই, বইটি আমাকে উপহার পাঠানোর জন্যে। পড়ে ফেলেছি অনেক আগেই প্রায় এক নিঃশ্বাসে কিন্তু রিভিউ লিখতে দেরী হলো, চিরাচরিত সেই আলসেমী। রেগে যাবে না, সেই আশা ছিলো। ভালবাসা অফুরান তোমার জন্যে, তোমার উত্তরাত্তর সাফল্য কামনা করছি। আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশী পরিবারে তুমি নতুন সদস্য, নেদারল্যান্ডস বসবাস আনন্দদায়ক হোক।


সেই ছোটবেলায় যখন উইলামস্ট্রাট এর ফ্ল্যাটে পা রেখেছিলাম প্রায় প্রতিটি দিনই ছিলো বিভীষিকা। বাড়িতে মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদু, বাড়ি থেকে দু'পা ফেললেই কাজিন, বন্ধু। এছাড়া আজকে ক্রিকেট তো কালকে ফুটবল, পরশু কনসার্ট তারপর দিন হরতাল। কি নেই, ভরপুর ছিলো জীবন। আর এখানে নিস্তব্ধতা, শুধু আমি আর আমি। কোথাও যাওয়ার নেই, করারও কিছু নেই। টিভি বলতে বিবিসি, সিএনএন, এমটিভি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি নয়তো ডিস্কোভারী। পেপার পড়ার কোন সুযোগ নেই, ফ্রীতে পেপার দিয়ে যায়, উল্টেপাল্টে ছবি দেখে রেখে দেই। ফ্ল্যাটের বাইরের পৃথিবীতে কি হচ্ছে তার কোন আঁচ ঐ ফ্ল্যাটের ভেতরে এসে লাগে না। বাইরের পৃথিবী বলতে ডাচ ক্লাশ। তখনও বাংলাদেশের কোন সংবাদপত্রের কোন ওয়েবসাইট নেই।

সেসময় কোথাও থেকে বেশ সস্তায় অনেক রঙ পেন্সিল কিনেছিলাম। প্রতিদিন একটু পর পর ঘড়ি দেখতাম, কতটা সময় গেলো, দিনটা কি শেষ হলো? সোমবার কি মংগলবারে গড়ালো? দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের তারিখগুলো দুপুরে এক কালার দিয়ে ক্রস করতাম, দুপুর কেটে গেলে সন্ধ্যায় আবার অন্য কালার দিয়ে ক্রস করতাম তারপর আবার রাত। বেশীর ভাগ দিন চারটা রঙের ক্রস থাকতো, একটা দিন কাটলো।

সেই থেকেই রঙ পেন্সিল অনেকটা সাথী। তবে এখন আর সময় নিয়ে এত ভাবতে হয় না। একাকীত্বও খানিকটা অভ্যাসের ব্যপার। সাঁতার শেখার মত, একবার পানি খেয়ে শিখে গেলে, তারপর ভেসে থাকা যায়। একা থাকা একবার অভ্যাস হয়ে গেলে, কিছুক্ষণ রঙ, কিছুক্ষণ বই সময় বেশ যায়, মন্দ না

কেয়ারন্টিনে থাকা অবস্থায় কি কি করতে পারেনঃ

যতবার হাত ধোবেন, সাথে দুটো করে বাসন ধুয়ে ফেলতে পারেন। সংসারে শান্তি বিরাজ করবে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। ব্যস্ততায় সাধারণতঃ যাদেরকে ফোন করা হয় না, ফোন করে তাদের খোঁজ খবর নিলেন। আপনার যে বোর লাগছে সেটা ছাপিয়ে আপনি কত কেয়ারিং, “করোনার” দিনে খোঁজ নিচ্ছেন সেটাই ফুটে উঠবে।

যেই মুভিগুলো দেখি দেখি করে দেখা হয়ে উঠছিলো না, সেগুলো দেখে ফেলতে পারেন। “Contagion” অবশ্যই এই লিস্টে থাকতে হবে। আগে দেখা হয়ে থাকলে আবার দেখবেন। মুভি দেখা হয়ে গেলে রিভিউ দিয়ে অন্যান্যদের জানাবেন।
একাত্তরের দিনগুলির মত বায়োগ্রাফী লিখতে পারেন, “কেয়ারন্টিনের দিনগুলো”

নার্গিস কোফতা, মালাইচপ, চমচম, রসমালাই, কিংবা তিন লেয়ারের চকলেট কেক বানাতে পারেন উইথ ফ্রেশ ফ্রুট এন্ড ফ্রেশ ক্রীম। বানানোর পর সবচেয়ে জরুরী যে কাজ, ফটো তুলে ফেসবুকে দেয়া সেটা ভুলবেন না। মিষ্টি বানালে রসটা ফেলবেন না, তাতে কাঁচা আম, আপেল, আনারস কিংবা পিয়ার ফেলে বানিয়ে নিন মজাদার চাটনি।
“শার্লক হোমস অমনিবাস” কিংবা “মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসসমগ্র” টাইপ বই পড়তে পারেন।
ইনবক্সের যেসব ম্যাসেজের উত্তর সময়াভাবে দেয়া হয় না সেগুলোর উত্তর দেয়া যেতে পারে। তবে “করোনা” সম্পর্কে কিছু বলতে ও শুনতে চান না সেটা উল্লেখ করে দেয়া ভাল।

স্কুল,অফিস, উইকএন্ড আড্ডা, পার্টির ভিড়ে পরিবারের সাথে সেভাবে সময় কাটানো হয় না। এই সুর্বণ সুযোগে রোজ রোজ ভাল ভাল লাঞ্চ আর ডিনারের আয়োজন করতে পারেন। বিন্দাস খাবেন কিন্তু ভুলেও ওজন মাপার যন্ত্রের ওপর দাঁড়াবেন না। “দুনিয়া কয়দিনের, আজকে করোনায় ধরলে কালকে দুইদিন” মনোবল থাকা বাঞ্ছনীয়। আজাইরা স্ট্রেস জীবনে যোগ করা কোন কাজের কথা নয়।

মাকরসা’র ঝুল, ঘরবাড়ি ঝেড়ে সাফা করে ফেলতে পারেন, সাথে জামা-কাপড়ের আলমারি। পুরানগুলো ফেলে দিয়ে অনলাইনে নতুন অর্ডার করাই আকলমন্দের পরিচয়।

আবহাওয়া চমৎকার, শশা, স্কোয়াশ, টমেটো, বেগুন লাগানো শুরু করা যেতে পারে।
নানারকম নেইল আর্টের এটাই সুযোগ। ডিজাইন সবার সাথে শেয়ার করে নিন।

লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট, এরকম একটা লেইম পোস্ট লেখা যেতেই পারে।
বাই জো, পেনশন লাইফ কাটানোর ট্রেনিং হয়ে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্রে “পুরানো চাল ভাতে বাড়ে” পন্থা



তুম হোতি তো ক্যায়সা হোতা
তুম ইয়ে কেহতি, তুম ওহ ক্যাহতি
তুমি ইস বাত পে হ্যায়রান হোতি
তুম উস বাত প্যায় কিতনি হাসতি
তুম হোতি তো এয়সা হোতা
তুম হোতি তো ভ্যায়সা হোতা


‘সিলসিলা’ সিনেমার বিখ্যাত এই গান গেয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন নিজেই। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সেই কালজয়ী উপন্যাসগুলো যদি আজ লেখা হতো, তাহলে কেমন হত? রবীন্দ্রনাথ চারুলতাকে কীভাবে শাড়ি পরাতেন, কোন আঙ্গিকে সাজাতেন? কিংবা ‘বৃন্দা’? রবীন্দ্রনাথ কি ‘চারুলতা’ই নাম দিতেন তার চরিত্রের নাকি চৈতি? না, সে আজ আর আমাদের জানার উপায় নেই কিন্তু ওপরের গানের থিমটির মতো কোলকাতায় বেশ ট্রেন্ড হয়েছে পুরানো উপন্যাসগুলোকে আজকের আলোকে চিত্রায়িত করার।
সিনেমাগুলো থেকে অবশ্য ধারণা করতে পারি আজ হলে উপন্যাসগুলো কেমন ভাবে লেখা হতো। ‘ভিজুয়ালাইজেশন’ চিরকালই একটি খুব শক্তিশালী মাধ্যম। নিজেদের কল্পনা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যদের কল্পনা উসকে দিতে এর জুড়ি নেই।
এই ট্রেন্ডটির প্রথম সিনেমাটি সম্ভবত ঋতুপর্ণা অভিনীত ‘চারুলতা’। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’কে আজকের প্রেক্ষাপটে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মূল গল্পটি কিংবা ভাবটি একই শুধু বদলে গেছে নায়ক-নায়িকার সাজ পোশাক, সংলাপ, যোগ হয়েছে মোবাইল, ফেসবুক ইত্যাদি।
তবে সময়টা যেহেতু ২০১১, তাই চরিত্রগুলোও অন্যরকম। স্বামী বিক্রমের চরম উদাসীনতা থেকে মুক্তি পেতে ইন্টারনেটে নিজেকে খুঁজতে হন্যে চৈতি, তখনই প্রায় তল পাওয়ার মতো হাজির সঞ্জয়। মানে ‘অমল’। ইথারের তরঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্য। অগ্নিদেব চ্যাটার্জির পরিচালনা, সুদীপা মুখোপাধ্যায়ের চিত্রনাট্য, ঋতুপর্ণা, দিব্যেন্দু, অর্জুন এর অভিনয়ে এক অনবদ্য সিনেমা।
এরপর শংকরের উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’র আধুনিক চিত্রায়ণ সৃজিতের হাত ধরে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’। এই ছবি আপাদমস্তক সৃজিতের ছবি। শঙ্করের গল্পের কেবল আদলটাই রয়েছে, বাকি চরিত্রদের নাম বদল করে তাঁদের পর্বগুলিকেও নিজের ছকে সাজিয়ে নিয়েছেন সৃজিত।
ছবির শুরুতেই ‘রুদ্র’ চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, এই ছবির সব চরিত্রেরই অদলবদল ঘটে গিয়েছে।
ছবির শেষের অংশটা সত্যিই অসাধারণ। ২০১৯-এর ক্রাইসিসগুলোকে চৌরঙ্গীর চরিত্রদের মুখ দিয়ে যথাযথভাবে বলানোর চেষ্টা করলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে যে সংলাপটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে, ‘কাটা দাগ মিলিয়ে যায়, নাকি আরও একটি বড় দাগ এসে আগেরটাকে ছোট করে দেয়’।
গুমনামি সিনেমার মতো, ছোট একটি চরিত্রে, এই সিনেমাতেও সৃজিত নিজে অভিনয় করেছে। দুটো সিনেমায় অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, সৃজিত ক্যামেরার পেছনেই অনায়াস, ক্যামেরার সামনের জায়গাটা হয়ত তার জন্যে নয়।
এই ট্রেন্ডের সম্ভবত সর্বশেষ সংযোজন হল অপর্ণা সেনের ‘ঘরে বাইরে আজ’৷ বৃন্দার চরিত্রে তুহিনা অসাধারণ। বৃন্দাকে কাঠগড়ায় তোলেননি পরিচালক। এই শতকের বৃন্দা সে! সব অর্থেই স্বাধীন। অভিনয় সাজ রুচি, সব মিলিয়ে অপর্ণার ‘বিমলা’ আর ছবির ‘বৃন্দা’ হয়ে উঠেছেন।
বৃন্দার মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন বেশ সফলভাবে পরিচালকের নির্মাণে ধরা পড়েছে। উপন্যাসের চরিত্রগুলির আধুনিকীকরণের যে প্রচেষ্টা করেছেন পরিচালক, সে কাজে তাঁকে সফলই বলা যায়।
ছবির নিখিলেশ উদারনৈতিক চিন্তাধারায় পুষ্ট, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে সে ভয় পায় না। আবার জনস্বার্থে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে সে এগিয়ে আসে সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে। সন্দীপের মতো বুলি আওড়ানো ‘ন্যাশনালিস্ট’-দের প্রতি তার প্রতিবাদী স্বর ছিল অব্যাহত।
সিনেমাপ্রেমীদের জন্যে সিনেমাগুলো ‘মাস্ট সি’। তাই স্পয়লার দিলাম না।

তওবা তওবা ঈশক ম্যায় কারিয়া

তওবা তওবা ঈশক ম্যায় কারিয়া

প্যানডেমিক এই সংকটের যুগে সবাই সবার খোঁজ খবর নিচ্ছে, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিকতা তো বটেই। নেদারল্যান্ডসের করোনা পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ, ইউরোপের মধ্যে ডেথ রেট বেশ ওপরে। প্রতিদিন এই মিছিলে কিছু সংখ্যা যোগ হয়েই যাচ্ছে।

আমাকে একজন বললো, নেদারল্যান্ডসে তো করোনা হিট, তোমার কি অবস্থা?
জবাব দিলাম, সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়? হিট-রান এন্ড গন, এই নিয়তেই আছি।
জবাব এলো, তওবা করে নাও আগেভাগে
আমি বিস্ফোরিত নেত্রে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ওপর দয়া করবো বলে ঠিক করলাম। কনভার্সেশানের ইতি টানার উদ্দেশ্যে একটা স্মাইলি দিয়ে উইন্ডো ক্লোজ করলাম।
কিছুক্ষণ পর দেখি লাল টিপ ভেসে উঠেছে, উইন্ডো খুলে দেখি,
হাসির কি হল?
চীনে বৌদ্ধরা কেউ কলেমা পড়ছে কেউ না বুঝে নামাজ পড়ছে। স্পেনে বাড়ি বাড়ি আযান দিচ্ছে। ইউরোপের আর কোন দেশে রাস্তায় কলেমা পড়ছে কোরাস এর সাথে। সো, সময় থাকতে তওবা করে নিও।

আমি বাক্যরহিত হয়ে এক লক্ষ একবারের মত মনে মনে আবারও বললাম, এদের জ্ঞান দাও প্রভু এদের ক্ষমা করো। তারপর পাঁচ কাউন্টে নিঃশ্বাস নিয়ে তিন কাউন্টে ছেড়ে কাম মাইন্ডে লিখলাম,

মক্কা-মদীনায় স্বয়ং আল্লাহর ঘরে যে করোনার ভয়ে নামাজ বন্ধ করে দিলো, বললো বাড়ি বসে নামাজ পরো। সেই শক্তিশালী করোনা স্পেনের রাস্তায় এসে কেমনে এত দুর্বল হলো যে আজান শুনেই বেহুঁশ হয়ে গেলো?
সার্চ করো নেটে। তোমার নেটওয়ার্ক তো বিশাল। পেয়ে যাবা... উইথ লটস অব ট্রল

তো তুমি বলছো, তওবা করলেই একাউন্ট ব্যালেন্স হয়ে যাবে? ডেবিট-ক্রেডিট সমান সমান? ঝামেলা থাকবে না আর কোনো?
অনুতাপের সাথে করলে অবশ্যই কবুল হবে

এত সোজা বেহেস্তে যাওয়া? এটা তাহলে মিস করা ঠিক হবে না। বাটপারি-চুরি যাই করি না কেন, এট দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, প্রথমে তওবা তারপর সোজা বেহেস্ত
সত্যিকারের অনুতাপদগ্ধ তওবা মানেই তুমি নিউবর্ণ সোল, তা সে যে বয়সেই কর।
কুল, এখন যাই মুভি দেখি
হেদায়েত নসীব হোক তোমার.
*****

বাই দ্যা ওয়ে, এই কথোপকথন যার সাথে হয়েছে তিনি বাংলাদেশের ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা। এখন হেটার্সরা বলতেই পারে, মিরপুরে থাকে বলে কি তিনি নেদারল্যান্ডসের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে না? না, মানে, নিশ্চয় পারে। মেঘু অকারণে ঘ্যানঘ্যান করলে আমি বলি, কেন আমাকে এটা বলছো? মেঘ জবাব দেয়, জাস্ট বলছি আর কি। আমিও তেমন জাস্ট বলছি আর কি।
কথা হচ্ছে কথা এটা না। মেঘ ছোট থাকতে, নানা গান বাজিয়ে ওকে ভাত খাওয়াতাম। বিবেক ওবেরয়, লারা দাত্তা, এশা দেওল আর জন আব্রাহামের একটা মুভি ছিলো “কাল”। ওটাতে একটা গান ছিলো, তওবা তওবা ইশক ম্যায় কারিয়া। গানটা কোথাও বাজলেই মেঘ আমাকে ডাকতো, মামি, তওবা তওবা। এই কনভার্সেশানের পর থেকে ননস্টপ এই গান আমার মাথায় বেজে চলছে।

ওয়েল, জোক্স আপার্ট, একজন কাউকে আপনি মারা যাবেন তাই তওবা করে ফেলেন জাতীয় কথা বলাকে আমি নিতান্তই অমানবিকতা বলে মনে করি। আর ধর্ম নিয়ে অতিরিক্ত কনসার্নড মানুষেরা, অন্যদের উপকার করার উসিলায়, এমন অমানবিক কাজ গুলো নিরন্তর করে যান।