Thursday, 10 October 2019

আসুন, আজকে শিখি কি করে একজন “সাহী” আওয়ামী লীগার চেনা যাবেঃ

দেশের চলমান কোন জাতীয় ইস্যুতে হয়ত আপনি আপনার ক্ষোভ বা বেদনা বলেছেন, সাথে সাথে শুরু হবে, বিএনপি’র আমলে কি হয়েছিলো। এখন তো আসামী অন্তত ধরা পড়ছে, তখন কি দলের কাউকে ধরা হইছিলো, হ্যাঁ হইছিলো? আপনি যদি মিনমিন করে বলার চেষ্টা করেন, অভি-নীরুকে তো খালেদা জিয়াও বহিস্কার করেছিলো, বাংলা ভাইকে মারা হয়েছিলো, তখন শুরু হবে আরও শাণিত আক্রমন, কারণ তাদের সব কম্পিটিশান বিএনপির সাথে! কথায় কথায় বিএনপি টেনে আনবে, জনগন ভুলে গেলেও তারা ভুলবে না। সেদিন হয়ত আপনি বেশিই দুঃখী, আর একটু ঘাড়াইলেন তারপর যাবে, এরশাদ, এরশাদ থেকে আইয়ুব খান, আইয়ুব থেকে ইয়াহিয়া, এভাবে অতীতের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ব্রিটিশ, মোগল, তুর্কি, কারবালা হয়ে ওহুদের যুদ্ধ, বদরের যুদ্ধে পৌঁছে যাবো। এবং এক বাক্যে স্বীকার করে নেবো আমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ থেকে নিশ্চয়ই ভাল আছি।
এই যে কোন চিপায় দাঁড়াইয়া, নিজস্ব কল্লা কাঁধে নিয়া, আপনার চির পরিচিত বাংলাদেশের নাগরিক মানুষ ভাইটি যে হঠাৎ লীগার হয়ে গেলো তার সাথে আপনি আপনার মনের দুঃখ কওয়ার সুযোগ পাইছেন এটাই বড় গনতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, এর চেয়ে বেশি আপনি আপনার এই মানব জীবনে কি আশা করতে পারেন?
আমাদের কোন ভবিষ্যত নেই, আমাদের আছে পরস্পরকে দোষারোপ করার গৌরবময় অতীত। শুধুই আঙুল তুলবো অপরের দিকে আর বেহায়ার মত নিজের দিকে তাকিয়ে হায়েনার হাসি হেসে যাবো।
তারপর তারা শুরু করবে নানা উন্নয়নের ফিরিস্তি, যার কিছুই আপনি আপনার ব্যক্তি জীবনে খুঁজে পাবেন না। কারণ আপনি আপনার জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত, যেই বাড়িতে যেই হালতে ছিলেন আজও তাই আছেন। পড়াশোনা করেছেন আর সব সাধারণ নাগরিকরা যেমন করে, বাহাত্তরটা ইন্টারভিউ দিয়ে একটা চাকুরী পেয়ে জীবন ধারণের মত বেতন পেয়ে জীবন ধারন করছেন আর সবার মত। হ্যাঁ এর মধ্যে প্রয়োজনে হয়ত আপনার বাসার সোফা পরিবর্তন হয়েছে, ঘরে এসি এসেছে কিন্তু এর মধ্যে বাত্তি দিয়ে খুঁজলেও আপনি এরশাদ, হাসিনা কিংবা খালেদার অবদান বের করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি চুপ থাকবেন, কারণ আপনি জানেন, এই উন্নয়ন কার কার বাড়িতে, ঘরে হচ্ছে এবং হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে উন্নয়ন তো প্রতি সরকারের আমলেই কিছু জনগোষ্ঠীর বাড়িতে হয়েই যাচ্ছিলো! সরকার বদলায়, গোষ্ঠী বদলায় আর উন্নয়ন বদলায় কিন্তু সাধারণ মানুষের কিছু কি বদলায়?
এদের অন্যান্য প্রধাণ বৈশিষ্ট্যের মাঝে আছে, এরা প্যারানয়া’তে ভোগে, এরা দেশ ও দেশের মানুষের ওপরে “দল”কে রাখে এবং গনতন্ত্র বলতে এরা একনায়কতন্ত্র আর দেশ চালনা বলতে জমিদারী বোঝে। এরা জনগনের যেকোন দুঃখ কষ্টকে প্রজাদ্রোহিতার শামিল ভেবে নিয়ে দমন-পীড়নে নামে। এরা নিজেরা সারাবেলা খাইয়ালামু, মাইরালামু, ফাইরালামু করতে পারবে কিন্তু সে একই কাজ যখন বিএনপি কিংবা অন্য কেউ করবে তখন তারা সরকার পতনের গভীর ষড়যন্ত্র খুঁজে পাবে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে, গনতান্ত্রিক দেশে কখনও সরকার পরিবর্তন হয় না, হতে পারে না, সেসব হলো ষড়যন্ত্র। একজন সাধারনস্য সাধারণ মানুষ হিসেবেও যদি আপনি ফেসবুকে দু-লাইন লিখে ফেলেন, কিংবা হয়ত দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে ফেলেন, এর চেয়ে আগের দিন গুলাই ভাল ছিলো। সাথে সাথে প্যারানয়িক লীগের সৈন্যরা এরমধ্যে “সরকার পতন আন্দোলনের” তীব্র গন্ধ পেয়ে যাবে। ফেসবুকে আপনাকে হুঁশিয়ারি দেবে, বড্ড বেশি স্বপ্ন দেখা হয়ে যাচ্ছে।
এই যে আপনি দু’বেলা দু মুঠো খেয়ে, বাংলাদেশের তেষট্টি জেলার কোথাও মাথা গুঁজে মোবাইলে থ্রি জি, ফোর জি ইউজ করে ফেসবুক গুতান, এ সবই তাদের অবদান, বলেন, কল্লা কাঁধে নিয়ে বেঁচে আছি, আলহামদুল্লিলাহ। বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হচ্ছে, ফেসবুকে শুধু ছবি পোষ্ট করবেন আর দোয়া শেয়ার করবেন, নিজে কখনো কিছু লিখবেন না, অন্য কারো লেখায়ও কোন লাইক বা কমেন্ট করবেন না, নিশ্বাস নেয়ার জন্যে নাক ব্যবহার করবেন আর খাওয়ার জন্যে মুখ, বলেন, সুবানাল্লাহ।

০৯/১০/২০১৯

Friday, 4 October 2019

স্বপ্নজাল


আমারে উড়াইয়া দিও , পালের বাতাসে,
আমারে ভাসতে দিও , একলা আকাশে।


রাইখো বন্ধু আমায় , তোমার বুকেরও পাশে,
সুখের আগুন নিভা গেলে , দুঃখের হুতাশে।


মেয়ে বড় হয়ে গেছে, অখন্ড অবসর আমার। “রয়্যাল ডিষ্টিক নোয়াখালী” নাটকের বড় জামাইর মত সিনেমা দেখায় গিনিস বুকে নাম তুলবো বলে পণ করেছি।  বহুদিন ধরেই “স্বপ্নজাল” নিয়ে মিডিয়াতে আলোচনা পড়ে যাচ্ছিলাম। প্রবাসী হওয়ার নানাবিধ অসুবিধার মধ্যে এটি একটি অন্যতম অসুবিধা যে সিনেমা মুক্তি পেলে সাথে সাথে দেখে ফেলার সুযোগ খুব সীমাবদ্ধ। হিন্দী সিনেমার বেলায় এই অসাধ্য সাধন হয়ে যায়, শুক্রবার সকালে মুক্তি পেতেই ইউরোপে রাত হতে হতে মোবাইল ক্যামেরায় তুলে সিনেমা সাইটে আপ্লোড হয়ে যায়, অন্য ভাষার সিনেমাতেই এই ব্যাপারটা অসাধ্য, সিনেমা চুরিটি ঠিক করে রপ্ত হয় নি তাদের। গিয়াসউদ্দিন সেলিমের লেখা ও পরিচালনায় দ্বিতীয় ছবি “স্বপ্নজাল”। প্রায় সবাই লিখছিলেন “মনপুরা” থেকে ভাল হয়েছে। “মনপুরা” আমার কাছে ঠিক ক্লাসিক কিছু মনে হয় নি, তবে ভাল লেগেছিল, গতানুগতিক ধারার বাইরে ছিলো আর হ্যাঁ গান গুলো তো সবই অসাধারণ। নয় বছর সময় নিয়ে “স্বপ্নজাল” তৈরী করছেন তিনি।

অপু কোলকাতা যেয়ে শুভ্রার সাথে দেখা করা পর্যন্ত গল্পটা প্রচণ্ডভাবে মাটিতে ছিলো। সিনেমা মনে হয় নি। মনে হচ্ছিলো যেনো কোন ডকুমেন্টরী দেখছি। প্রভাবশালী মুসলমানদের হাতে, ধনী হিন্দু ব্যবসায়ী হীরন সাহা’র অপহরণ তারপর খুন যেনো পত্রিকায় পড়া সেসব না দেখা লোমহর্ষক ঘটনার জলজ্যান্ত প্রতিনিধিত্ব করছে। তারপর তার পরিবারকে কোলকাতায় পাঠানো, সম্পত্তি দখল যেমন হরহামেশা বাংলাদেশে হয়েই থাকে, শুধু সমতলে নয় পাহাড়েও ঘটছে।  সিনেমার দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব থেকে শুরু হয় গল্পের গরুর গাছে ওঠা।

চাঁদপুরে জন্ম হওয়া, বড় হওয়া মেয়ে, সে যতই গান, নাচ শিখুক না কেন কোলকাতায় যেয়ে একটি চালু থিয়েটারে “রক্তকরবী” নাটকে “নন্দিনী”র চরিত্রে নির্বাচিত হওয়া! আঞ্চলিকতা, স্মার্টনেস এগুলো সব বাদ? কোলকাতা থেকে ফিরে এসে প্রতিবেশী একটি বাচ্চা ছেলের সহায়তায় হীরন সাহার বিধবা স্ত্রী, নাবালক ছেলে আর অনুঢ়া সুন্দরী কন্যা তাদের সব সম্পত্তি উদ্ধার করে ফেললো? বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম ঘটেছে বলে জানি না। যা যায় তা যায় বলেই জানি, আদালতের রায় নিয়েও তো সম্পত্তি উদ্ধার করতে পারে না। তাছাড়া, হীরন সাহাকে খুন করার আত্মগ্লানি থেকে আয়নাল গাজী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গেলো এটাও রূপকথার মতই লেগেছে খানিকটা। বাংলাদেশে যে হারে খুনোখুনি হয় তার প্রেক্ষাপট ধরলে এই ব্যাপারটা খানিকটা হাস্যকরও বটে। আমার ধারনা এই ব্যাপার গুলোতে আর একটু যত্নবান হলে, “মেঘের অনেক রঙ” কিংবা “সীমানা পেরিয়ে” এর মত ক্ল্যাসিকে “স্বপ্নজাল” এর নাম যোগ হতে পারতো।   


শেষ পরিনতির দিকে যাওয়ার তাড়াহুড়ো থেকে এই জিনিসগুলো এসেছে বলে ধারনা করি। আমার দৃষ্টিতে শুভ্রাকে কোলকাতায় রেখেও অপুকে চাঁদপুরের পদ্মায় ফেলে মারা যেতো। ঘটনা সেদিকেই যাচ্ছিলো আর সেটাই হয়ত বাস্তবসম্মত হতো। গিয়াসউদ্দিন সেলিমের আগের সিনেমায় ও বিয়োগান্তক সমাপ্তি ছিলো, এটাতেও তাই। তাহলে কি ধরে নিতে হবে, তার সিনেমা মানেই মারাত্বক সুন্দর একটা গল্প থাকবে যার পরিনতি বিয়োগান্তক হবে, সেলিম সিগনেচার মার্ক? বুদ্ধদেব গুহের উপন্যাসের মত, কখনোই মিলন নেই? সেট নির্বাচন, জামাকাপড়, দৃশ্য গ্রহন এক কথায়, অপূর্ব। সিনেমাটোগ্রাফার কামরুল হাসান খসরু  ‘ভিউ কার্ড’ এর মতো একটি একটি করে ছবি দেখিয়ে যাচ্ছেন। এটাও তার সিগনেচার মার্ক হতে পারে, মনপুরার ও প্রাকৃতিক দৃশ্য সব অসাধারণ ছিলো। একটা চরম বাস্তব হলো, অতো অল্পবয়সেই প্রেমের কারণে ছেলেমেয়েরা এভাবে প্রাণ দিতে পারে, বড় হয়ে গেলে, প্রেম হয় হিসাব-নিকাশ।   


ফজলুর রহমান বাবু জাত অভিনেতা কিন্তু স্বপ্নজালে তিনি যা অভিনয় করেছেন তা তাকে চিরস্মরনীয় করে রাখবে। নিসন্দেহে তার জীবনের অন্যতম মাস্টারপিস এটি। পরীমনি নামটি অনেক শুনেছিলাম কিন্তু কোন সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে নি এর আগে। তিনি তার নাম সার্থক করার মতই সুন্দরী, অভিনয়ও দূর্দান্ত করেছেন। নায়ক হিসেবে যশ/ইয়াশ রোহান ঠিকঠাক ছিলেন। অভিনয় স্বতঃর্স্ফূত ছিলো। তবে এত সুন্দরী নায়িকার জন্যে আর একটু হ্যান্ডশাম ছেলে খোঁজাই যেতো। বাস্তব তো না সিনেমাই তো, সুন্দর নায়িকারা সুন্দর নায়ক পেতেই পারেন। মেসো-মাসী, বিসম্বর বাবু সবাই ঠিকঠাক ছিলেন, অভিনয়ও সাবলীল ছিলো সবার।

পরিবারের সবার দেখার মত পরিচ্ছন্ন কিন্তু প্রেমের ছবি। নির্দ্বিধায় বলা যায়, “মনপুরা” থেকে অনেক গুন এগিয়ে “স্বপ্নজাল”।

গানগুলো অসাধারণ। ক’দিন ধরে দুই বাংলার বেশ কয়েকটা মুভি দেখলাম, গান গুলো খুব যত্ন নিয়ে করছে আজকাল। সিনেমা শেষ হয়ে যায় কিন্তু মনে গানের রেশ রয়ে যায়, দিনভর মাথায় ঘুরতে থাকে। 

ধন্যবাদ
তানবীরা
০৩/১০/২০১৯


Tuesday, 17 September 2019

আজ রবিবার


আজ রবিবার

রোববার দিনটা নীপা’র খুব পছন্দ। তেমন কোন কাজ রাখে না সে, বেলা করে ঘুমিয়ে, আলসেমী করে, গড়িয়ে কাটায়। চারপাশ  নিস্তব্ধ থাকে,  বাতাসের প্রেম স্পর্শে কাতর হওয়া পাতার কাঁপুনি শুনে, কিংবা বিরহ কাতর নাম না জানা কোন পাখির অভিমানী কন্ঠের গান শুনে দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। আকাশ কুসুম সব ভাবতে ভাবতে বিছানায় এপাশ ওপাশ গড়াতে গড়াতে প্রায় প্রতি রোববারের সকাল তার দুপুরে মিলায়। ক’দিন একটানা বৃষ্টির পর আজ সূর্য উঠেছে, পর্দা সরাতেই, ছ’তলার ওপরের এই ফ্ল্যাটটা, একরাশ আলোয় উজ্জল হয়ে উঠলো। সাথে সাথে নীপাও চনমন করে উঠলো, রনি বাথরুমে ঢুকেছে, একটা কিছু ভাল নাস্তা বানিয়ে, দিনটা দুজনের ভাল করে শুরু করা যাক। ছেলেটা এমনিতে খেতে এত ভালবাসে কিন্তু সারা সপ্তাহ দু’জনকেই অফিসে দৌড়াতে হয় বলে, সকালে ঠিক করে একসাথে বসে আয়েশ করে নাস্তা খাওয়া হয় না। সেই পাউরুটি, মাখন, জ্যাম কিংবা দুধ সিরিয়াল, ঝটপট কিছু। ফ্রিজ খুলে নীপা, মাশরুম, ডিম, ধনেপাতা আর কাচামরিচ বের করলো, হাত বাড়িয়ে ঐদিক থেকে পেয়াজ তুলে নিলো, স্প্যানিশ ওমলেটের মত খানিকটা পুরু করে মাশরুম ওমলেট বানাবে, ফ্রোজেন পরোটা আছে তা ভাজবে আর কড়া করে চা। রনি’র কড়া চা, খুব পছন্দ। কাজ করতে করতে জানালা খুলে দিলো, খুলে দিতেই পাগলা হাওয়া সুযোগ পেয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে নীপাকে জড়িয়ে ধরলো। ভাল লাগায় বুঁদ হয়ে নীপা মোবাইলটা হাতে নিলো, খুব আস্তে করে গান প্লে করলো, লতা গাইছে, আমার মালতীলতা কি আবেশে দোলেএএএ  


রোববার অনেক সময় নিয়ে রনি গোসল সারে। ডিয়ার মিস্টার হ্যান্ডসামের সমস্ত রূপচর্চা সারার আজকেই সময় কি না। তিনি তাই এখনও বের হন নি। কড়া করার জন্যে, চা’টাকে জ্বালে বসিয়ে রাখলো নীপা, গানের সাথে সে নিজেও গুন গুন করছে, হঠাৎ ফেসবুকের নোটিফিকেশান এলো, রাসেল, রনির ছবিতে কমেন্ট করেছে। কাজ নেই, বসে আছে, ঢুকলো ফেসবুকে, ওহ, কাল রাতের পার্টির ছবি নিশো আপ্লোড করে রনিকে ট্যাগ করেছে, তাতে অন্যেরা মন্তব্য করছে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে নীপার মাথায় আগুন জ্বলতে লাগলো, দুটো ছবিতে হাঁদা রনিটা একেবারে আদনানের গা ঘেঁষে বসে ছবি তুলেছে, কোন আক্কেল যদি থাকে গাঁধাটার। এইটা কিছু হলো? বিরক্তি যখন চরমে তখন মাথা মুছতে মুছতে টাওয়াল নিয়ে রনি হাজির।


গরম গরম নাস্তা দেখে আনন্দের গলায় বললো, ওয়াও সুইটহার্ট, সকালে উঠেই এত কিছু?
নীপা সেসবের ধার ধারলো না, পুরোদস্তুর খ্যাঁক করে উঠলো, কি ছবি তুলেছিস তুই? আক্কেল কি বালতিতে রেখে গেছিলি?
নীপার মেজাজের কোন হেতু রনি ধরতে পারলো না। এই সাত সকালে, কিসের ছবি, কেন ছবি, কোথায় ছবি। শান্ত গলায় বললো, ছবি মানে?
ঝাঁঝিয়ে উঠে নীপা মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বললো, এই দ্যাখ মানে
টেবলের এই পাশ থেকে রনি উঁকি দিয়ে ছবি দেখে অবাক গলায় বললো, কি হয়েছে এই ছবিতে? এর মধ্যে আবার কি পেলি তুই!  
কি পেলাম মানে? উত্তেজিত গলায় নীতু, তুই সরে বসতে পারিস না, যার তার সাথে ওতো ঘেঁষাঘেষি কি তোর?
নীপার উত্তেজনা দেখে হেসে ফেললো রনি। এই নীপা রেগে কাই, পর মুহূর্তেই ঠান্ডা পানি। পুরো উত্তর থেকে দক্ষিণ হতে সময় নেবে না। কি থেকে যে রাগবে, কি নিয়ে হাসবে, বলা মুশকিল। তবে একটা ট্রিক সে জেনে নিয়েছে, রাগ যতই হোক, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে, ঘাড়ে আলতো চুমু খেয়ে, ভালবাসি বললেই, বউ ঠান্ডা।  
হাসতে হাসতে বললো, ছেলের পাশে বসাতেই তুই এত পজেসিভ আর মেয়ের পাশে বসলে তো তুই আমাকে আস্ত রাখতি না রে।
মুখ ভেংচে নীপা বললো, আহা, সেই আনন্দে তুই আর কূল পাচ্ছিস না, না? ছেলে তো কি হয়েছে, মানুষ না?
আচ্ছা আচ্ছা, ঠিকাছে, চল, এবার নাস্তা খাই, তোকে বাদ দিয়ে আর কারো এত কাছে বসবো না, ঠিকাছে, পাগল একটা তুই। 
নীপা যতই রাগছে, রনি ততই হাসছে, কিছুতেই ওর রাগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, সেটা আর নীপার সহ্য হলো না। দাঁড়া, খাওয়াচ্ছি নাস্তা বলে, হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে, ওমলেট ভাজার পর যে চারটা ডিম ছিলো তার দুটো প্রথমে ছুঁড়ে মারলো
এই দাঁড়া, এই দাঁড়া, বলতে না বলতেই ডিম মাথায় লেগে, ভেঙে, কুসুমে চুলে মাখামাখি হয়ে, কান বেয়ে বেয়ে নিচে পরে রনি একদম একশা। এবার নীপা বেশ মজা পেয়ে, খিলখিল হাসতে হাসতে বাকি দুটো ডিমও ছুড়ে মারলো। নীপার পাগলামিতে রনি কাহিল কিন্তু ছেড়ে দিলে চলবে না, এই কুসুম মাখা মাথা, শরীর সে নীপার গালে, মুখে, বুকে সব জায়গায় ডলে দিলো। ডিমে মাখামাখি হয়ে, জড়াজড়ি করে দুজনেই হাসতে লাগলো।
গাঢ় গলায় রনি বললো, মাথা ঠান্ডা হয়েছে এবার সোনাবৌ?
আদর গলায় বললো নীপা, হু।


সূর্য কখন আবার ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে, কেউ টের পায় নি। আকাশ আদরের চাদরে এদের ঢেকে রাখবে বলে, কালো পর্দা দিয়ে চারপাশ ঢেকে ফেলেছে। ঠান্ডা বৃষ্টির ছাঁট জানালার গ্রীল ভেদ করে যখন ওদের স্পর্শ করলো, ওদের মনে হলো, রোববার হলেও আজ আরও কিছু কাজ বাকি আছে। বৃষ্টিতে ঘর, বিছানা সব ভিজে যাওয়ার আগেই জানালা বন্ধ করতে হবে, বারান্দা থেকে কাপড় তুলতে হবে, আরও কত কি।

তানবীরা
১৬/০৯/২০১৯

Sunday, 15 September 2019

অসহনীয় যানজটের নগর – ঢাকা


অসহনীয় যানজটের নগর – ঢাকা


পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি
তারসাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি
রঙ ভরা এই শহরে যতই দেখেছি
আরে গোলক ধাঁধার চক্করে ততই পড়েছি


ঢাকা নগরীর প্রধান কিংবা আপাতত একমাত্র সমস্যা কি কাউকে জিজ্ঞেস করলে, এক কথায় যার উত্তর মিলবে, “যানজট”।

বাংলাদেশের মানুষের স্বভাব হলো, চিপায় পরলে চিপার মধ্যে নিজেকে এডজাস্ট করে ফেলা, কেন চিপা হলো, কোথা থেকে চিপা এলো, কিভাবে চিপাকে ফিক্স করা যায়, তা না ভেবে, শুধু নিজেকে কিভাবে চিপার মধ্যে ভাল রাখা যায়, এই আমাদের ভাবনা।  

ধানমন্ডি থেকে লেক সাকার্স, শুক্রাবাদ থেকে আগারগাও, মোহাম্মদপুর থেকে হাতিরপুল, উত্তরা থেকে টঙ্গী, গুলশান টু বাড্ডা যেদিকেই যাবেন, দেখা যাবে, ঠ্যালায় করে রাস্তায় রাস্তায় সব্জি, মাছ বিক্রি হচ্ছে। বাজার করতে বাজারে যাওয়ার দরকার নেই, রাস্তায় আপনি এই অতি প্রয়োজনীয় কাজটি সেরে ফেলতে পারছেন। স্কুলের সামনে ভীড়ের কারণে দাঁড়ানোর উপায় না থাকলেও, থ্রী পিস থেকে পর্দা, চুড়ি থেকে ভুনা খিচুড়ীর ঠ্যালা আছে এবং তাতে প্রচুর কাস্টমারও আছে। অনেক রাস্তায়, রাস্তার দুপাশেই ঠ্যালা আছে।

একেতো গাড়ি চলারই রাস্তা নেই, তারমধ্যেই ঠ্যালা আর গ্রাহকের ভীড়, প্রতিদিন, প্রতিবেলা। ঠ্যালা ঘিরে মানুষের ভীড়, দামাদামি, বাছাবাছি সব চলছে হরদম, ওদিকে রিকশা, গাড়ি সব আটকে আছে, কখনও কখনও ধাক্কা লাগছে, মোটর সাইকেলের সাথে রিকশার, কিংবা রিকশা-গাড়ির সাথে মানুষের তবুও সবাই কি আশ্চর্য নির্বিকার। ইঞ্চি ইঞ্চি প্রেম থুক্কু ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গার কি অপটিমাম ব্যবহার, ঢাকা শহরের ড্রাইভাররা ছাড়া আর কেউ এ ব্যাপারে এত দক্ষ কিনা আমার দারুন সন্দেহ আছে। একেতো এত মানুষের ভার বহনের জন্যে রিসোর্স/ইনফ্রাসট্রাকচার নিয়ে এই শহর তৈরী হয় নি তারপরও যা আছে তার কি অপরিনামদর্শী যথেচ্ছ ব্যবহার। জন্মের পর থেকেই ফুটপাত হকারদের দখলে দেখে আসছি তা নিয়ে আর বলার কিছু নেই, সেটা স্বতঃসিদ্ধ ধরেই নিলাম না হয়।    

রাস্তার পাশে যাদের দোকান আছে, তারা দোকানের সামনে রাস্তার মিনিমাম চার হাত জায়গা দখল করে রাখেন, কোকের কেইস সাজান, চিপসের প্যাকেট টানান, কলা ঝোলান, নইলে বেঞ্চ আছে বসে কিছু খান, মোদ্দা কথা, দোকানের বাইরের রাস্তার চার হাতও তারই দখলে থাকতে হবে। আমি দেখেছি, গাড়ি/মোটর সাইকেলের ধাক্কায় কিছু সরে টরে গেলে আবার এনে ঝেড়ে বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে, কিন্তু দমবে না, যতই ভয়ের হোক না কেন। একেই সব অপ্রশস্ত রাস্তা ঢাকায়, তার প্রায় অর্ধেক আবার ব্যবহার হয় অন্য কাজে। প্রত্যেকে যানজটের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ কিন্তু প্রতিকারের চেষ্টায় কেউ নেই।


প্রতিদিন এত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, মর্মান্তিক সব কান্ড ঘটছে, সাধারণ মানুষ লিস্ট বদারড। ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহারে শহর জুড়ে মানুষের কি প্রচন্ড অনীহা। “পথচারী”কে জরিমানা করার নিয়ম কেন আসে না, বুঝতে পারি না। এত ভীড়ের মাঝে মানুষ বাচ্চার হাত ধরে নির্দ্বিধায় রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে, সারাটা সময় চোখ মোবাইল স্ক্রীনে। পেছন থেকে গাড়ি হর্ণ দিয়েই যাচ্ছে, একবারও মোবাইল থেকে চোখ সরায় না, মধ্য রাস্তা ছেড়ে এক পাশে হাঁটে না। দুর্ঘটনা ঘটলে অবশ্যই ড্রাইভার দায়ী, দেখে চলার দায়িত্ব শুধুমাত্র ড্রাইভারদের ওপর।


এক সময় ঢাকাকে বলা হতো মসজিদের নগরী এখন অনায়াসে বলা যায়, “মার্কেটের নগরী”। জায়গায় জায়গায় অপরিকল্পিত ভাবে মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, ক্লিনিক, স্কুল অফিস যার যার ইচ্ছে মতো। না সিটি করপোরেশান থেকে অনুমতি নেয়ার তোয়াক্কা বা রেওয়াজ আছে, না আছে কোন আরবান প্ল্যানিং। না আছে নিয়ম নীতির কোন বালাই। একটা ক্লিনিক করতে হলে মিনিমাম কয়টা গাড়ির পার্কিং থাকা উচিত, এম্বুলেন্স কোন রাস্তা দিয়ে আসবে ইত্যাদির কোন বালাই দূর দূরতক নেই। এন্ডহোভেন শহরটি আটাশি দশমিক সাতাশি স্কোয়ার কিলোমিটার, জনবসতি দুই লক্ষ একত্রিশ হাজার চারশো ছয় জন, পুরো শহরটিতে দুটো বিরাট শপিং মল আর নেইবারহুডে ছোট ছোট কিছু শপিং এরিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্যে। ঢাকা হলো তিনশো ছয় দশমিক চার স্কোয়ার কিলোমিটার, জনসংখ্যা বাদ দেই, কতগুলো মার্কেট/শপিং সেন্টার/শপিং মল আছে ঢাকাতে কেউ বলতে পারবে? কোন হিসেব আছে কারো? 



শুধু রিকশাই যানজটের কারণ, এসবই কি যানজটের কারণ নয়? কয়দিন আগেই বাচ্চারা “নিরাপদ সড়ক চাই” নিয়ে এত হাঙ্গামা করার পর যদি এই পরিনতি থাকে তাহলে প্রভুই এই জাতির একমাত্র ভরসা।


বিঃদ্রঃ রাস্তা/ যানজট সংক্রান্ত কোন গান/কবিতা কেউ কি জানেন, তাহলে মন্তব্যের ঘরে একটু জানাবেন প্লিজ।  


তানবীরা
১১.০৯.২০১৯



Tuesday, 10 September 2019

ডিজিটালাইজেশান ও বাংলাদেশ

গত বেশ কয়েক বছর ধরেই “বাংলাদেশ ডিজিটালাইজড” হচ্ছে এই শ্লোগান শুনতে পাচ্ছি এবং নানা ক্ষেত্রে এর প্রচার ও প্রসার লক্ষ্য করার মত। “ডিজিটালাইজড বাংলাদেশ” নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত থাকতে পারে। আমি আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

প্রথমে শুরু করি পাসপোর্ট রিনিউ থেকে। মেশিন রিডেবাল পাসপোর্ট (এম-আর-পি) রিনিউ করতে হবে, সেটার আবেদন আপনি (প্রবাসী বাংলাদেশীরা) বাংলাদেশ সরকারের ওয়েবসাইটে যেয়ে করতে পারেন, ই-ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ব্যাঙ্কে টাকাও ট্রান্সফার করতে পারেন। সেটা করতে হবে আপনার ব্যক্তিগত উদেগ্যে, সরকারের কাছ থেকে কোন রিমাইন্ডার চিঠি বা ইমেইল আসবে না আপনার “পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ” হয়ে গেছে এই জানিয়ে। আপনার পাসপোর্ট আপনার ভাবনা। বাংলাদেশ সরকারের ওয়েবসাইটে যেয়ে আপনাকে পাঁচ পাতার ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, পিতার নাম, স্বামীর নাম ইত্যাদি প্রভৃতি সাথে স্মার্ট কার্ডের কপি নয়তো, ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কপি, নয়তো জন্মনিবন্ধন পত্র ইত্যাদি জমা দিতে হবে। বাকি কাজ এরপর দূতাবাসের অফিসে যেয়ে সারতে হবে, আঙুলের ছাপ, ছবি তোলা ইত্যাদি।

ওলন্দাজ পাসপোর্ট রিনিউ করতে হলে, পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে আপনি মিউনিসিপ্যালটি অফিস থেকে একটা রিমাইন্ডার মেইল পাবেন, তবে এপয়ন্টমেন্ট আপনাকে নিজেকেই করতে হবে মিউনিসিপালটির ওয়েবসাইটে গিয়ে। সেখানে লেখা আছে, ছবি নিয়ে আর এত টাকা নিয়ে যেতে হবে। তবে তারা টাকার পরিমান এখন বাড়িয়েছে কারণ বড়দের এম-আর-পি এখন দশ বছর মেয়াদী। বাচ্চাদের যেহেতু মুখ মন্ডল পরিবর্তনের ব্যাপারটা দ্রুত হয় তাই তাদের এম-আর-পি পাঁচ বছর মেয়াদী। আপনি এপয়ন্টমেন্ট পাবেন পনের মিনিটেরই যদিও কাজ শেষ করতে সময় লাগবে পাঁচ থেকে দশ মিনিট। আঙ্গুলের ছাপ দেবেন, ছবি দেবেন, সিগনেচার আর টাকা, সাথে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, পুরনো পাসপোর্টে যেসব তথ্য দেয়া আছে তাতে কোথাও কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা, হলে সেটা কি? পরিবর্তনটুকু কাউন্টারে যিনি বসা তিনি দ্রুত তারা ডাটাবেজে মিলিয়ে দেখবেন, আপডেটেড আছে কি না, নইলে তিনি আপডেট করে নেবেন। কোন ফর্ম ফিলাপের বালাই কোথাও নেই, না আমাদের না টেবলের ওপাশে যারা বসে আছে তাদের।

পুরো পরিবারের জন্যে বাংলাদেশের এম-আর-পি রিনিউ এপ্লাই করতে অন্তত মিনিমাম হাফ ওয়ার্কিং ডে, প্রতি সদস্যের জন্যে পাঁচ পাতা ফর্ম আলাদা করে ফিলাপ করতে হবে যদিও তারা পাঁচ বছরের জন্যে দেবে আর ওলন্দাজ এম-আর-পি ছবি জমা দেয়া থেকে শুরু করে আনঙুলের ছাপ কমপ্লিট হবে আধ ঘন্টা থেকে কম সময়ে। অমূল্য সময় আর জনশক্তির কি নিদারুণ অপচয়।

সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশে যেতে গেলেই আপনাকে প্লেনে একটা ট্যাক্স ডিক্লারেশান ফর্ম ফিলাপ করতে হয়। কেন করতে হয় সেটা আজও বোধগম্য নয়। কত টাকা নিয়ে যাচ্ছি সাথে সেটা কজন সত্যি বলে কে জানে। যেহেতু সাধারণত কারো পকেট সেখানে চেক করা হয় না তাই সন্দেহটা থেকেই যায়। আর বাকি কোন কোন দ্রব্যের ওপরে শুল্ক আছে আর সেটা কত, কতজন সঠিক সেটা জানে আর সঠিক পূরণ করে আমার কাছে আজও তা বিরাট প্রশ্ন। ইউরোপের কথা বাদ, নর্থ এমেরিকা, নর্থ আফ্রিকা, এশিয়ার কিছু দেশেও প্লেনে চড়ে ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এই প্যারায় একমাত্র বাংলাদেশ ইউনিক। যতদিন প্লেনে চড়ি ততদিন ধরেই এই ফর্ম ফিলাপ করছি। গত পঁচিশ বছরে ফর্মের একটা কমা-সেমিকোলনও এদিক সেদিক হয় নি, ক্যামনে পারে ম্যান!

এরপর দেশে যাবেন। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশান কাউন্টারের সামনে আপনাকে অন্ততকাল দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যারা এমেরিকা থেকে যায়, এত লম্বা যাত্রার পর, তারা কিভাবে ধৈর্য্য ধারণ করেন তারাই জানেন। নিতান্ত অদক্ষ জনগোষ্ঠী দিয়ে এই কাউন্টারটি দিনের পর দিন চালানো হয় আর কোন পদের সফটওয়্যার আর কোন মডেলের কম্পিউটার তারা ব্যবহার করেন সেটাও বিরাট প্রশ্নবোধক। যতবার দেশে যাবেন, বছরে তিন বারও যদি যান, একই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই আপনাকে যেতে হবে, প্রথমে সেখানে রাখা একটি ফর্ম ফিলাপ করবেন তারপর সেই ফর্ম সমেত পাসপোর্ট আপনি ইমিগ্রেশান অফিসারকে জমা দেবেন। পাসপোর্টের বিভিন্ন তথ্য সেখানে বসে থাকা অফিসার তার ডাটাবেজে টাইপ করবেন, আপনার আঙ্গুলের ছাপ নেবে, ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া ওয়েবক্যাম দিয়ে আপনার ছবি তোলা শেষ হলে জিজ্ঞেস করবে, ঢাকায় পরিচিত কারো ফোন নম্বর দিতে। এরমধ্যে তিনবার তার কম্পিউটার হ্যাং হবে কিংবা সফটওয়্যার কাজ করবে না, পাশের জনকে সাহায্যের জন্যে ডাকবে এবং লঞ্চের ইঞ্জিন গুতানোর মত, ঠুকঠাক করে কম্পিউটার ঠিক করা হবে।

ফিরে আসার সময় আবার ঠিক সেই একই পেখনা। ফর্ম ফিলাপ করো, আঙুলের ছাপ দাও, ছবি তোল এবং ফোন নম্বর দাও! যতবার এই বিমানবন্দর ব্যবহার করি ততোবার এই সেইম পেখনা একই দ্রুততায় তারা কাজ করেন! এই একই কাজের গতি, বছরের পর বছর ধরে রাখার আশ্চর্য কৌশল সত্যিই অভিনব।

আমার অভিজ্ঞতায়, আগে কাগজে-কলমে যেভাবে কাজ হতো, এখন সেটা কীবোর্ডে আর সফট কপিতে হয় কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া একই আছে, কোথাও কিছু পরিবর্তন হয় নি। হার্ড কপির বদলে সফট কপির নাম বাংলাদেশে, "ডিজিটালাইজেশান" এই যদি আউটকাম হয় তাহলে এম-আর-পি, স্মার্ট কার্ড, টিন-ইটিন, ন্যাশনাল আই-ডি, হ্যানাত্যানা করে কি লাভ? এখনও যদি কোন সেন্ট্রাল ডাটাবেইজ না থাকে তবে আর কবে? পাসপোর্ট নম্বর কিংবা ভিসা নম্বর কিছু টাইপ করলেই বাকি ইনফর্মেশান সামনে আসার কথা, বিশ বার যদি কারো সারনেম টাইপ করতে হয়, তাহলে কোথায় আর কিসের ডিজিটালাইজেশান!

তবে কোথাও কি কোন পরিবর্তন হয় নি? হ্যাঁ হয়েছে, ইমিগ্রেশান কাউন্টারে যিনি ছিলেন এবার, আমার আর আমার মেয়ের ইনফর্মেশান ইনপুট দিয়ে, দেরীর জন্যে নিতান্ত আন্তরিক মুখে "এপোলজি" দিয়েছেন। মোস্ট আনলাইকলি দো, দেরী করিয়ে দেয়াটা আগে সরকারী কর্মকর্তা - কর্মচারীরা তাদের স্বাভাবিক অধিকার বলে ধরে নিতেন। আরও অবাক হয়েছি, তিনি নিজে অনুধাবন করেছেন, তার আর একটু এফিসিয়েন্ট হওয়া দরকার।

সরকারী এক ব্যাঙ্কে অনেক আগের একটা হিসাব ছিলো, জায়গায় জায়গায় আর ঝামেলা রাখবো না বিধায় সেটা ক্লোজ করতে গেছি, আমাকে অবাক করে দিয়ে আধ ঘন্টার থেকেও কম সময়ে তারা সব কাজ সম্পন্ন করে দিয়েছে এবং আরও অবাক করে দিয়ে অনুনয়ের গলায় বারবার অনুরোধ করেছে, “হিসাবটা চালু রাখেন ম্যাম, আপনার যেকোন দরকারে আমাদের জাস্ট একটু ফোন করবেন ম্যাম, দশ মিনিটের বেশি সময় নেবো না, আপনার যা দরকার থাকে করে দেবো। 

বর্তমান গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রচুর ব্যাঙ্কের পারমিশান দেয়াতে জনগনের লাভ হয়েছে, গ্রাহক সেবার মান প্রচন্ড উন্নত হয়েছে, গ্রাহকের ভোগান্তি কমেছে, সরকারী এবং বেসরকারী দুটো সেক্টরেই। গ্রাহকের প্রতি ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। আগে যেমন ব্যাঙ্কে গেলে বিশেষ করে সরকারী ব্যাঙ্কে, ব্যাঙ্ক অফিসারদের বাংলা পাঁচ মুখ দেখতে হতো সেটা নেই, বরং বেশ হাসিখুশি আর বিনয়ী, যদিও সর্বসাকুল্যে আধ ঘন্টা দেখে এত মূল্যায়ন ঠিক নাও হতে পারে। তবে বেসরকারী ব্যাঙ্কিং বার্গেন পর্যায়ে সেবা দিচ্ছে। আগের মত বিশবার স্বাক্ষর আর ছবি মেলানোর কষ্ট দেয় না, নিজের টাকা ওনাদের কাছে রেখে নিজেকেই চোর চোর লাগতো সেই জিনিস উধাও। 

বেসরকারী ব্যাঙ্ক অনলাইন ব্যাঙ্কিং চালু করেছে বেশ অনেকদিন এবং সেটা ইউরোপ-এমেরিকা থেকেও নিজের একাউন্ট নিজে চেক, ট্রান্সফার ইত্যাদি করতে পারবেন। সরকারী ব্যাঙ্কের সাথে জীবনের লেনাদেনা সমুদ্র সফেন করে ফেলেছি, তাদের হালনাগাদ অবস্থা জানি না। বেসরকারী ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে হলে চেকের সাথে শুধু আইডির কপি দিলেই চলবে আর লাখের ওপরে হলে আইডির সাথে চেক স্বাক্ষরকারীর টেলিফোন নম্বর। ব্যাঙ্ক ফোন করে কনফার্ম করে নেবে, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি ইম্প্রেসড। 

এছাড়া আছে বিকাশ সিষ্টেম, মোবাইল ব্যাঙ্কিং এর মত খানিকটা। অনেক দোকান দেখলাম, ক্যাশ পেমেন্টের থেকে বিকাশ বেশি প্রেফার করে, “এপেক্স” বিকাশ পেমেন্টে পনের পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দেয়, বেক্সিমকোর ফ্যাশন হাউজ “ইয়লো”, “আড়ং” অনেকেই বিকাশে পে করলে ছাড়ের ব্যবস্থা রেখেছে। 

গতবার ন্যাশনাল আইডি করার জন্যে অনেক প্যারা নিতে হয়েছিলো। এবার যখন ভাইয়া বললো, আইডি বদলে স্মার্ট কার্ড নে, আমি ভয় খেয়েছিলাম রীতিমত, যাবে আমার ছুটির এক চতুর্থাংশ ফাউ। হুদা কামে আজকে আসেন, কালকে আসেন বলে লেফট রাইট করাবে। আমার বিস্ময়ের এফোর ওফোড় ব্যাপার হলো, এন আই ডি দিয়ে বললাম, স্মার্ট কার্ড চাই, সাথে সাথে খাতায় এন্ট্রি রেখে বসতে বললেন। এতে বোঝা যায়, এন আই ডিকে, স্মার্ট কার্ডে ট্রান্সফার করার জন্যে দুটো ডাটাবেইজের কোথাও ইন্টারফেস চালু আছে। করিডোরে সোফা রেখেছে, বসে দেখলাম, তিনি ফেসবুকিং এ ব্যস্ত আর এদিকে আমার হাজার কাজ পরে আছে। 

বিনীত গলায় বললাম, ভাইয়া, আমার তাড়া আছে এবং আমাকে বিস্ময়ের ওপারে ফেলে দিয়ে তিনি সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে আমার আঙ্গুলের ছাপ রেখে রিসিট ধরিয়ে দিলেন, বললেন, কাল বেলা দুটোর পর এসে নিয়ে যাবেন। বললাম, আমি না এসে কাউকে পাঠালে হবে, জানালেন, না, নিজে এসে নিতে হবে, “প্রাপ্তি স্বীকার” স্বাক্ষর দিতে হবে। এবং গেস হোয়াট, পরদিন যেয়ে রিসিট দেয়া মাত্র, স্বাক্ষর রেখে, স্মার্ট কার্ড দিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ থাকেন যারা প্রমাণ করে দেন, চাইলে তারাও পারেন শুধু তাদের চাওয়াটা ব্যাপার। 

মোবাইল টেকনোলজি আর গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে পুরো ঢাকা জুড়ে উবার চলছে, পাঠাও, রাইড আরও কত কি। অসহ্য যানজটের মাঝেও উবার এক পশলা শান্তির বৃষ্টি। অগনিত বার উবার ব্যবহার করেছি, প্রত্যেকবারই একই রকম সেবা পেয়েছি, ওয়ার্ল্ড ক্লাশ। তাছাড়া, কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস এত ভাল করেছে, যেকোন ধরনের অভিযোগ এবং কিউরির জন্যে বারবার কোম্পানী থেকে নিজেরাই যোগাযোগ করে। 

এই টেকনোলজি দিয়েই বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, সুপার মার্কেট ইত্যাদি হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করেছে, ঢাকাতে। ঢাকার বাইরে তেমন ভাবে যাওয়া হয় নি তাই ঢালাও ভাবে পুরো বাংলাদেশের কথা বলতে পারছি না।

05/09/2019

Friday, 30 August 2019

সেলুলয়েডে বন্দি কিছু অমূল্যগাথা

https://www.bhorerkagoj.com/2019/07/25/%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%A1%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A7%81-%E0%A6%85%E0%A6%AE%E0%A7%82/?fbclid=IwAR3lBVScI6uixR4vGjk3nJXHzDFWPRD5Z7Fkc5-F2z-KRoxIMxxVKemrNyQ

দস্যু বনহুর তারপর মাসুদ রানা অনেকদিন পড়েছি, তখন স্কুলের ওপর ক্লাসে পড়ি, আর একটুখানি ডিঙোলেই কলেজ, কড়াকড়ি বাঁধাবাঁধি নিয়মের জীবন থেকে মুক্তি, পাখা মেলে আকাশে উড়বো সেই স্বপ্নে দিন-রাত্রি বিভোর। তখন আমি খুব উপন্যাসে মজে আছি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, শংকর ছেড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব গুহ আর সমরেশ মজুমদার কাজ করেন ক্রেজের মতো। ঠিক সেই সময় হাতে এসে পড়ে ছোটগল্প সংকলন ‘শালগিরার ডাকে’, শুরু করার পর আর হাত থেকে নামিয়ে রাখতে পারছি না। একটানে পড়ে যাচ্ছি, আবার মনে হয় ঠিক করে হয়ত বুঝে উঠতে পারিনি, আবার পেছন থেকে পড়ছি। পড়ছিলাম নাকি আমিও সেই আদিবাসীদের সাথে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন আদিবাসীদের সাথে, ভৌগোলিক পরিবেশ-পরিস্থিতি, অবস্থান, পার্থিব জীবনযাপন প্রণালীসমূহ নিয়ে তাঁর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি স্থান পেয়েছে তাঁর কলমে। সেসকল কারণে তাঁর লেখা হয়েছে ঐতিহাসিক দলিল। ইতিহাসের সমান্তরাল তিনি রচনা করেছেন জনবৃত্ত অন্বেষণের বিকল্প ইতিহাস। উল্লেখযোগ্য কারণেই তাঁর লেখায় নারী চরিত্রগুলো গুরুত্ব পেয়েছে অনেক বেশি। আদিবাসী নারীদের মধ্যে প্রতিবাদের প্রবণতা অনেক বেশি। আদিবাসীদের বঞ্চনা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা স্থান পেয়েছে তাঁর গল্পগুলোতে। শুরু হলো তাঁর সাথে ভ্রমণ, ছোটগল্প দিয়ে শুরু করে উপন্যাসে-


উনিশ ছাব্বিশ সালের চৌদ্দই জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করে বিশিষ্ট সাহিত্যিক বাবা মনীষ ঘটক আর খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক কাকা ঋত্বিক ঘটকের সাথে সাংস্কৃতিক আবহমণ্ডলে বড় হয়েছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে তখন পুরুষদের দোর্দণ্ড প্রতাপ আর তাদের সাথে লড়াই করে যাচ্ছিলেন আশাপূর্ণা দেবী, বেগম সুফিয়া কামাল, নবনীতা দেব সেন আর তার সাথে যোগ হলো আরো একটি দৃঢ় নাম মহাশ্বেতা দেবী। চৌদ্দ জানুয়ারি উনিশ ছাব্বিশ সালে প্রতিভাময়ী এই লেখিকার জন্ম হয় বাংলাদেশের ঢাকায়। মহাশ্বেতা দেবী আজীবন সংগ্রামী চিন্তা চর্চা করেছেন এবং দেশ ও মানুষ সর্বপ্রকার শোষণমুক্ত হবে সেই লক্ষ্যে সাহিত্য রচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন সাহিত্যে শুধু হৃদয়-গ্রাহ্যতা নয়, মস্তিষ্ক-গ্রাহ্যতাও চাই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে দুটি কবিতা উপহার দিয়েছিল। লেখালেখির বিষয় নির্বাচন, বস্তুনিষ্ঠতা আর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তার সংবেদনশীলতা ছিল কিংবদন্তি পর্যায়ের। তাঁর প্রথম দিকে লেখা উপন্যাস ‘তিমির লগন’ ও ‘রূপরেখা’তে চরিত্রগুলো যেহেতু কোনো সামাজিক গুরুত্ব বহন করে না, উপন্যাসগুলো আর দশটা উপন্যাসের মতোই, পাঠককে যেহেতু আলাদা কোনো বার্তা দেয় না, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই উপন্যাস দুটো তিনি আর ছাপাবেন না। নিজের সাহিত্যকর্মের নিজেই ছিলেন কঠিন সমালোচক, সমাজ সচেতনতা, ইতিহাস নির্ভরতা, লেখনীর মাধ্যমে সমাজকে বিশেষ একটি বার্তা দেয়া, বস্তুনিষ্ঠতা তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।


তার লেখায় সমাজের প্রান্তজনের কথা এসেছে বারবার। গভীর সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য থাকার কারণে তাঁর লেখাগুলো পেয়েছে আলাদা স্থান। ‘হাজার চুরাশির মা’ তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস হলেও ‘কবি বন্দ্যঘটি গাঞির জীবন ও মৃত্যু’ উপন্যাসটি একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস এবং আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের শুরুও এ উপন্যাস থেকেই বলা যায়। মহাশ্বেতা দেবী দীর্ঘ জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন যে জনমানুষের সাথে, তাদের বড় একটি অংশ হলো প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠীর গোত্রভুক্ত। তিনি বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের ইতিহাস থেকে চরিত্র নির্মাণ করেছেন। আদিবাসী সংগ্রামের এবং ভারতীয় সংগ্রামের ইতিহাস থেকে বিপ্লবী এবং বীরের চরিত্র নিয়ে আসেন। যা বাংলা সাহিত্যের সংগ্রামী চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে। এহেন ক্ষুরধার লেখার জন্য সবার নজরে এসেছেন তিনি বারবার। তার লেখা গল্পকে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, হয়েছে দেশে-বিদেশে পুরস্কার জিতে নেয়া দুর্ধর্ষ কিছু কালজয়ী সিনেমা।


‘লায়লি আসমানের আয়না’ ছোটগল্পটি অবলম্বনে উনিশ আটষট্টি সালে পরিচালক হারনাম সিং রাওউয়ালি তৈরি করেন ‘সাংঘার্শ’। সাঞ্জীব কুমারের প্রথম ছবি, এছাড়াও ছবিটিতে আরো অভিনয় করেছেন, দীলিপ কুমার, বৈজয়ন্তীমালা। নওশাদের সংগীত পরিচালনায় এই ছবিটিকে আজো বলিউডের ক্লাসিক হিসেবে ধরা হয়। গ্রামে আসা ধনী পথচারীদের কালি মাতার চরণে খুন করে চলা পণ্ডিতের সাথে তার পুত্রের দ্বন্দ্ব নিয়ে শুরু হয় এই সিনেমা। ব্রিটিশ ভারতে ফকির এবং সাধুদের দাপট ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। কোম্পানির শাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়েই তারা তাদের লুটতরাজ এবং হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে গিয়েছে পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে। বিশেষ করে বেনারসে ফকির এবং সেখানকার সাধু-সন্তদের মধ্যবর্তী বিরোধ ছিল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। নানা পুরস্কার জিতে নেয়া এই সিনেমাটি দিলীপকুমার প্রেমীদের পছন্দের তালিকায় আজো প্রথমদিকে অবস্থান করে।


কল্পনা লাজমীর পরিচালনায় তার গল্প থেকে উনিশ তিরানব্বই সালে তৈরি হয় ‘রুদালি’। ভূপেন হাজারিকার সংগীত পরিচালনায়, গুলজারের লেখা আর আশা ভোসলের গাওয়া, ‘বিতেনা বিতেনা র?্যয়না’ আজো সংগীত প্রেমীদের কানে কানে গুঞ্জে। রাজস্থানের এক হতভাগী মেয়ের জীবন নিয়ে লেখা এই গল্পটি, পিতৃহীনা শনিচরীকে তার মাও ফেলে চলে যায় এক নাটকের লোকের সাথে। গ্রামে যত অঘটন ঘটে তার জন্য গ্রামসুদ্ধ সব লোক শনিচরীকে দায়ী করে। উঁচু শ্রেণির কেউ মারা গেলে, বাইরে বসে বিলাপ করে বাড়ির মেয়েরা কাঁদতে পারে না, সামাজিক কারণে তখন নীচু জাত থেকে কান্নাকাটি করার জন্য মেয়ে ভাড়া করে আনা হয়। ভিখনী সেরকম একজন, তার সাথে পরিচয়ের পরে, নানা ঘাতে প্রতিঘাতে, শনিচরীও একজন পেশাদার রুদালিতে পরিণত হয়, রুদালিকে তার পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। অসংখ্য পুরস্কার জেতা এই সিনেমাটির কথা মনে হয় কোনো সিনেমাপ্রেমীই আজো ভোলেননি।


উনিশ আটানব্বই সালে গোবিন্দ নিহলানি তাঁর উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ অবলম্বনে তৈরি করেন ‘হাজার চৌরাশি কি মা’। সত্তর দশকের কলকাতায় চারু মজুমদারের ইশতেহারের ডাকে নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল অন্যান্য অনেক তরুণের মতো কলেজপড়ুয়া ব্রতী। সুজাতা খুব ঠাণ্ডা স্বভাবের, ধর্মপ্রাণা, সংসারী, হিন্দু, বাঙালি রমণী, যিনি স্বামী আর ছেলে নিয়ে আরো অনেকের মতো খানিকটা নীরব অহংকারে ভোগেন। ব্রতীকে নিয়ে বাবা-মা দুজনেই খুশি, তার কলেজের পড়াশোনার খবর রাখেন। নিরিবিলি এই বাড়িটিতে একদিন টেলিফোন বাজে ঝনঝন শব্দ করে, লেখাপড়ায় ভালো, আদরের সন্তান ব্রতী নয় বরং হাজার চুরাশি নম্বর লাশের দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয় তার মা, সুজাতাকে। ব্রতী মারা যাওয়ার পর সুজাতা ছেলে কোথায় যেতো, কাদের সাথে মিশতো সেসব খুঁজতে শুরু করেন। ছেলের আদর্শ জানার পর সিদ্ধান্ত নেন এই সংগ্রামে তিনি নিজে যুক্ত হওয়ার। কলকাতায় ষাট থেকে আশির দশকের মধ্যে বামপন্থি নকশালদের আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচার এবং গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছিল এরকম অসংখ্য তরুণ। গুমোট এই পরিস্থিতির বেদনাবহুল প্রেক্ষাপট পরিষ্কারভাবেই ধরা পড়েছিল এই সিনেমাটিতে। প্রায় আঠারো বছর পর সেলুলয়েডের জগতে ফিরে শোকাহত সেই মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন। ‘হাজার চৌরাশি কা মা’ সেবার অগণিত পুরস্কারের সাথে আরো পেয়েছিল সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।


দীর্ঘ লেখনি জীবনে মহাশ্বেতা দেবী বর্ণ প্রথা নিয়ে লিখেছেন অনেক। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছিল তার লেখার প্রধান উপজীব্য। তেমনি আরেকটি গল্প ‘বায়েন’ অবলম্বনে মারাঠি নির্মাতা চিত্রা পালেকার নির্মাণ করেন ‘মাটি মায়’ সিনেমাটি। দুহাজার সাত সালে নন্দিতা দাসের অনবদ্য অভিনয়ে ফুটে ওঠে সমাজের চাকচিক্যের আড়ালের অন্ধকার দিকটি। বাবা মারা গেলে পরিবারে আর কোনো পুরুষ না থাকায় পরিবারের দীর্ঘ সময়ের প্রথা বজায় রাখতেই গোরখোদকের পেশা বেছে নিতে হয় নিম্ন বর্ণের মেয়ে চান্দিকে। কিন্তু সবকিছু বদলে যায়, যখন চান্দির কোলে আসে সন্তান। লাশের কবর খুঁড়তে হাত কাঁপে চান্দির, ছোট শিশুদের মৃতদেহগুলোকে দেখে গা শিউরে ওঠে তার। এদিকে নিজের কাজ ছেড়ে দেয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করায় চান্দির ওপর নেমে আসে গ্রামবাসীর অত্যাচার। মৃত শিশুদের সে দুধপান করাচ্ছে, এমন অপবাদ জুটে যায় তার নামে। ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে তার ওপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। এমনকি তার স্বামী নারসুও তাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, তার কষ্ট, নৈতিকতা কিছুই সে অনুধাবন করতে পারে না। নন্দিতা দাসের প্রথম মারাঠি সিনেমা এটি যাতে তিনি মহারাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার গ্রহণ করেন। আর সিনেমাটি দেশে ও বিদেশে নানা পুরস্কার অর্জন করে।


মহাশ্বেতা দেবীর ‘চোলি কে পিছে’ ছোট গল্প থেকে আর একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘গাঙ্গোর’। দুহাজার দশ সালে ইতালীয় পরিচালক ইতালো স্পিনেলি পরিচালনা করেন এই ছবিটি, ছবিটি বহু ভাষায় অনুবাদ করে দেখানো হয়েছে। ভারতের পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে এই চলচ্চিত্রটি বাংলা, সাঁওতালি ও ইংরেজি ভাষায় দৃশ্যায়ন করা হয়। পরে এটি ইতালীয় ভাষায় ভাষান্তর করা হয়। পঞ্চম রোম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হলে, দর্শকবৃন্দ দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্রটির কলাকুশলীদের অভ্যর্থনা জানান। উপেন একজন অভিজ্ঞ চিত্র সাংবাদিক, সে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার একটি অনুন্নত অঞ্চলে আসে, সেখানকার দরিদ্র নারীদের ওপর সহিংসতা সম্পর্কে প্রতিবেদন লিখতে। গাঙ্গোর তার সন্তানকে দুধপান করাচ্ছিল এমন সময় উপেন সেখানে এসে পড়ে। উপেন তার প্রতিবেদনে ব্যবহার করার জন্য গাঙ্গোরের সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে। ছবিটির কথা গ্রামবাসী জানতে পারলে তারা গাঙ্গোরকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। পুলিশ তাকে জোর করে থানায় নিয়ে যায় ও সেখানে তার গণধর্ষণ হয়। এদিকে, উপেন তার মূঢ়তা উপলব্ধি করে এবং তীব্র নিপীড়িত সহিংসতার মধ্য দিয়ে তার খোঁজে পুরুলিয়া ফিরে যায়। কিন্তু গাঙ্গোর সেখানে ছিল না। উপেন, আরো জোর দিয়ে গাঙ্গোরকে খুঁজতে থাকে, একদিন তাকে খুঁজে পায়; কিন্তু ততদিনে গাঙ্গোরের ঠাঁই হয়েছে পতিতালয়ে। গাঙ্গোর এবার নিজে তার ব্লাউজটি খুলে নিয়ে উপেনকে ছবি তুলতে অনুরোধ করে, জানায় যে, পুলিশ ধর্ষণের সময় তার শরীরকে কীভাবে জন্তুর মতো উপভোগ করেছিল। ঘটনাটি গণমাধ্যমের মনোযোগে আসে এবং গাঙ্গোরের মামলাটি আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়। এই মামলার শুনানির দিন, সমাজকর্মী মেধার নেতৃত্বাধীন আদিবাসী নারীদের একটি দল পুলিশের নির্মমতার বিরুদ্ধে আদালত প্রাঙ্গণে তারা তাদের ব্লাউজ খুলে প্রতিবাদ জানায়। নারীর প্রতি পুরুষ সমাজের নৃশংসতার এই গল্পটি, সেই দগদগে ঘায়ের কথা মনে করিয়ে পীড়া দেয় এই সিনেমাটিতে। অন্যান্য পুরস্কারের সাথে তেরতম সিনেম্যানিলা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, এটি ফিলিপিনো পরিচালক লিনো ব্রোকার পর সবচাইতে বেশি পুরস্কার জয় করে।


ভারতকে অগ্রসরবর্তী একটি দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলেও মহাশ্বেতা দেবী এই পরিচয়কে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। সারা ভারত জুড়ে নারীদের প্রতি অত্যাচার আর ধর্ষণের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাগুলো তাকে নাড়া দিত বারবারই। তার লেখা উপন্যাস, গল্প, তা থেকে বানানো সিনেমা প্রত্যেকটিই সারা পৃথিবী থেকে অসংখ্য সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছে। বাংলা ভাষা, ভারতের অন্যান্য ভাষা, জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক খুব কম পুরস্কার আছে যেটা তিনি পাননি এবং আনন্দের কথা হলো বেশির ভাগই তিনি পেয়েছেন তার জীবদ্দশায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (বাংলায়), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, র?্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ভারতের চতুর্থ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান যথাক্রমে পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ লাভ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান বঙ্গবিভূষণে ভূষিত করেছিল।

দুহাজার ষোল সালের তেইশে জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মহাশ্বেতা দেবী কলকাতার বেল ভিউ ক্লিনিকে ভর্তি হন, আটাশে জুলাই একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

তানবীরা তালুকদার
১০/০৭/২০১৯ 

Friday, 14 June 2019

সত্যজিৎ রায়ের জানা-অজানা


খুব ছোট বয়সে, হয়ত বারো কি তের, ভিসিআরে বাসায় সিনেমা দেখলাম ‘তিন ভুবনের পারে’। সারা বাসা, আত্মীয়, বান্ধবী মহল যখন উত্তম কুমারের ফ্যান আমি তখন ‘সৌমিত্র’ প্রেমে দিওয়ানা। দিনরাত আমার মাথায় নেচে যায় ছিপছিপে সেই তরুণের টুইস্ট ‘জীবনে কি পাবো না, ভুলেছি সেই ভাবো না’। সৌমিত্রের সিনেমা খুঁজে খুঁজে দেখা শুরু হলো। যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সেখানে সত্যজিৎ রায় অবধারিত। সৌমিত্রকে খুঁজতে যেয়ে হয়ে গেলাম সত্যজিৎ রায়ের আজীবনের ফ্যান। অপুর সংসার, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, অরণ্যের দিনরাত্রি, অশনি সংকেত কিংবা জয়বাবা ফেলুনাথ। অনেকেই বলে থাকেন সত্যজিৎ রায় নিজে লম্বা বলে, সৌমিত্রের প্রতি তার এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল কিন্তু অভিনয় দক্ষতা দেখার পর সেটাকে কি নিছক পক্ষপাতিত্ব বলার সুযোগ কি থাকে? সত্যজিৎ রায় নিজে গুণী আর মেধাবী ছিলেন, তাই তার কাজ ভাষায় কে ফুটিয়ে তুলতে পারবে তাকে খুঁজে নিতে পেরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের বেশির ভাগ সিনেমার প্রধান পুরুষ চরিত্রে ছিলেন সৌমিত্র। আর যার সিনেমার হাতেখড়ি হয়ে যায়, সৌমিত্র, সত্যজিৎ রায়ের সাথে তার সিনেমা দেখার মোড় সারা জীবনের জন্যে ঘুরে যায় অন্যরকম স্বাদের সব সিনেমাতে।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর একজনের মাঝে এরকম বহুমুখী প্রতিভা বাংলা ভাষায় বিরল। লেখা, শিশু সাহিত্য, চলচিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, আঁকা, প্রকাশক, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। প্রতিটি জায়গায় ছিল সমান দক্ষতা। উনিশো একুশ সালের দোসরা মে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে এই কিংবদন্তির জন্ম। কাছের মানুষদের কাছে সত্যজিতের ডাকনাম ছিল ‘মানিক’। ওই বাড়িটিকে এককালে বলা হতো ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’। বাংলা সাহিত্যের তীর্থভ‚মি হিসেবে স্বীকৃত এই বাড়িতে জন্মেছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, শিশু সাহিত্যের আরেক অমর নাম সুকুমার রায় চৌধুরীসহ অন্যান্য যোগ্য উত্তরসূরি। এই বাড়িতেই একদা কবি, সাহিত্যিক ও জ্ঞানী-গুণীদের মিলনমেলা বসত। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঐতিহাসিক এই বাড়িটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।


মাত্র ৫ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালে আবারো এসেছিলেন মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। সেদিন পল্টন ময়দানে প্রধান অতিথির প্রদত্ত ভাষণে বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি তার ভাষণে উল্লেখ করেন ‘আমার কুড়ি বছরের চলচ্চিত্র জীবনে বিশ্বের বহু স্থান থেকে এবং আমার নিজ দেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার, পদক এবং সম্মান লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে যে সম্মান, যে ভালোবাসা আমি পেলাম তা সবকিছুর কাছে ¤øান হয়ে গেছে। আমি কোনোদিন এই জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলব ভাবতে পারিনি। আমি বক্তা নই। আমি থাকি নেপথ্যে। ছবি আঁকি, পরিচালনা করি। আজ সকালে ঢাকায় এসে আমি যা দেখেছি তাতে আমি অভিভূত। আমি বহুদিন থেকে শহীদ দিবসের কথা শুনে আসছি। কিন্তু এখানে এসে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না আপনারা বাংলাভাষাকে কতখানি ভালোবাসেন।’


এই সতেরই মার্চ ‘থেস্পিয়ানস নেদারল্যান্ডসের’ আমন্ত্রণে এসেছিলেন সত্যজিৎ পুত্র প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক সন্দীপ রায়, তাঁর স্ত্রী ললিতা রায়, অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী আর প্রযোজক সামিয়া জামান। ঠাণ্ডা, বৃষ্টি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোববারের সন্ধ্যায় এত মানুষের সমাগম দেখে, সন্দীপ রায় ঘরোয়া আড্ডায় যাকে বাঙালির চিরাচরিত ডাক নামের ঐতিহ্য ধরে সবাই ‘বাবুদা’ নামে ডাকে, অভিভ‚ত হয়ে বলেই ফেললেন, ‘বাবাকে সবাই এত ভালোবাসে আমি কল্পনাই করতে পারিনি, এই আবহাওয়া দেখে আমি ভাবিনি যে গোটা পঞ্চাশেকের বেশি লোক হবে, অথচ হল কানায় কানায় পূর্ণ।’ সন্দীপ রায় সাথে নিয়ে এসেছিলেন, সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথের স্কেচ ও বুকলেট, আগ্রহীরা পরম যত্নে তা সংগ্রহ করেছেন। এমস্টেলভিনের এক থিয়েটারে সামিয়া জামানের প্রাণবন্ত পরিচালনায় এক ঘরোয়া আড্ডায় জানা গেলো অনেক অজানা তথ্য। সত্যজিৎ রায় যাকে বাংলার আগাথা ক্রিস্টি বলে অনেকে আর তার লেখা অনবদ্য চরিত্র ‘ফেলুদা’ যাকে স্কটিশ লেখক ও চিকিৎসক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের সমকক্ষ বাংলা চরিত্র বলে ধরে নেয়া হয়, সেই ‘ফেলুদা’কে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়ার জন্যে প্রযোজক পেতেন না। শিশুতোষ চলচিত্রের প্রতি প্রযোজকদের অপরিসীম অনীহা কাজ করতো। স্রেফ টাকার জন্যেই তাঁর অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও ‘ফেলুদা’ সিরিজের আরও সিনেমা বানানো বাদ থেকে গেলো। কালজয়ী এই চরিত্রের এ বছরে ৫০ বছর পূর্তি হলো। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে সন্দেশ পত্রিকায় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি প্রকাশিত হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ওই সিরিজের ৩৫টি সম্পূর্ণ ও ৪টি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়।


তবে অবস্থার এখন অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, এখন বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে ‘ফেলুদা’ এক জনপ্রিয় চরিত্রের নাম আর তিনি শুধু শিশু-কিশোরদের কাছেই আটকে নেই, বড়দের পৃথিবীতেও তার অনবদ্য বিচরণ। সন্দীপ রায় পিতার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে তৈরি করে যাচ্ছেন একের পর এক ‘ফেলুদা’। প্রযোজকরা নাকি এখন বলেন, ‘একটা অন্য সিনেমা বানিয়ে দিন আর দুটো ফেলুদা।’ সেই নিয়ে গল্প করতে যেয়ে সন্দীপ রায় বললেন, তাঁর বাবার সময় থেকেই অন্য সব সিনেমার শুটিং যেমন হোক হয়ে যায় কিন্তু ‘ফেলুদা’ করতে গেলে একটার পর একটা বাধা আসবেই। কখনো দ্বিগুণ কিংবা কখনো তিনগুণ খরচা হয়ে যায় ‘ফেলুদা’র শুটিংয়ে। দেখা যাবে লোকেশনে কিছু না কিছু সমস্যা হবে, নইলে অভিনেতা-অভিনেত্রী অসুস্থ, নইলে পুলিশের ঝামেলা ইত্যাদি। একবার ব্যাংকক থেকে শুটিং শেষে ফেরার পথে দমদমে কাস্টমস তাদের নেগেটিভ আটকে দেয়। সেই নেগেটিভ কাস্টমস থেকে বহু কষ্টে উদ্ধার করে পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পাঠানো হলেও পঁচাত্তর শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছিল বলে আবার শুটিং করতে হলো।

‘ফেলুদা’ এখন শুধু বাংলায় আটকে নেই। হিন্দি সিনেমার প্রযোজকরাও ‘ফেলুদা’ নিয়ে সমান আগ্রহী। একটি সিনেমা হিন্দিতে তৈরি হওয়ার পর বাবুদা দেখলেন, একটা সুন্দর সিনেমা হলো বটে কিন্তু ‘ফেলুদা’ হলো না। ‘ফেলুদা’ বলতে যে টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত বাঙালি আমেজ আছে সেটি হিন্দিতে কিংবা অন্য কোনো ভাষায় আনা প্রায় অসম্ভব। যেমন- লুচি, আলুর দম আর গুড়ের সন্দেশ কিংবা সুক্তো আর ইলিশ ভাজা’র যে সংস্কৃতি, বাঙালির প্রাণে যে আবহটা তৈরি করে সেটিকে অন্য ভাষায় আনতে গেলে, ‘ফেলুদা’ আর ‘ফেলুদা’ রইলো কোথায়! সে তো অন্য এক চরিত্র দাঁড়িয়ে গেলো। তাছাড়া কিছু কিছু কথা’র সে স্বাদ, রস যা বাঙালি’র কাছে এক ধরনের দ্যোতনা তৈরি করে সেগুলোকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করলে তার অর্থই হারিয়ে যায়, যেমন :

তবে রে
কিংবা বটে

এর হিন্দি বা ইংরেজি পাওয়া যায়? না আক্ষরিক অনুবাদ সেই স্বাদ এনে দিতে পারে? তাই বাঙালির ‘ফেলুদা’ বাঙালি হয়ে রয়ে গেছেন বাংলাতেই। সন্দীপ রায়ের সাথে বর্তমানে ফেলুদা হিসেবে আছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। অভিনেতা হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার কিন্তু আমার কাছে ফেলুদা সৌমিত্রই। ছোটবেলার পছন্দ বলে কথা। সত্যজিৎ রায় ছাড়া সে সময় তার মানের যে চলচ্চিত্র পরিচালকরা ছিলেন বিশ্বজুড়ে, কেউ শিশুদের নিয়ে কাজ করেননি। তিনিই এই ব্যাপারে এক মাত্র ব্যতিক্রম। অর্থনৈতিক ব্যাপারটা তিনি বরাবরই কম গুরুত্ব দিতেন, কাজটাই তার কাছে মুখ্য ছিল। সোসাইটি ফর দ্য প্রিজারভেশন অব সত্যজিৎ রায় আর্কাইভস প্রতি বছর ফেলুদা প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে দক্ষিণ কলকাতার লি রোডের নাম পাল্টে হয়েছে সত্যজিৎ রায় ধরণী। এই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁর জীবনের অনেকখানি সময় কাটিয়েছিলেন লি রোডের কাছের রাস্তা বিশপ লেফ্রয় রোডে। কাজেই, সেই সুবাদে লি রোডের নাম পাল্টে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।


তবে শুধু ফেলুদা নিয়েই নয়, সত্যজিৎ ঠিক করেন যে, বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী ‘পথের পাঁচালী’ই হবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। ১৯৫২ সালের শেষদিকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রাথমিক দৃশ্যগুলো দেখার পর হয়তো কেউ ছবিটিতে অর্থ লগ্নি করবেন। কিন্তু সেই আশার গুড়েবালি। সে ধরনের আর্থিক সহায়তা মিলছিল না তাঁর। ‘পথের পাঁচালী’র দৃশ্যগ্রহণ তাই থেমে থেমে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পন্ন হয়। কেবল তখনই দৃশ্যগ্রহণ করা সম্ভব হতো, যখন সত্যজিৎ বা নির্মাণ ব্যবস্থাপক অনিল চৌধুরী প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান করতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ওই বছরই সেটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ছবিটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে এবং সেই সঙ্গে বহু পুরস্কার জিতে নেয়। বহুদিন ধরে ভারতে ও ভারতের বাইরে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। ছবিটি নির্মাণের সময় অর্থের বিনিময়ে চিত্রনাট্য বদলের জন্য কোনো অনুরোধই সত্যজিৎ রাখেননি। এমনকি ছবিটির একটি সুখী সমাপ্তির (যেখানে ছবির কাহিনীর শেষে অপুর সংসার একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্পে’ যোগ দেয়) জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধও তিনি উপেক্ষা করেন।


অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, সত্যজিতের মতো বরেণ্য মানুষের নিজের কোনো বাড়ি ছিল না; মা, মামা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এক ভাড়া বাড়িতেই সারা জীবন কাটিয়ে দেন তিনি। তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় ও ছেলে সন্দীপ রায় দুজনেই সত্যজিতের কাজের সঙ্গে ছিলেন জড়িয়ে। বেশির ভাগ চিত্রনাট্য বিজয়াই প্রথমে পড়তেন এবং ছবির সঙ্গীতের সুর তৈরিতেও তিনি স্বামীকে সাহায্য করতেন। আয়ের পরিমাণ কম হলেও নিজেকে বিত্তশালীই মনে করতেন সত্যজিৎ। কেননা পছন্দের বই বা সঙ্গীতের অ্যালবাম কিনতে কখনোই কষ্ট হয়নি তাঁর।


চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তাঁর কাজের পরিমাণ ছিল বিপুল। তিনি নির্মাণ করেছেন ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তাঁর কাজের ‘ভার্সেটাইল’ রূপটি চির স্মরণীয়, অরণ্যের দিনরাত্রির পরিচালককে হীরক রাজার দেশেতে মিলিয়ে ফেলা শক্ত। অরণ্যের দিনরাত্রিতে চার শহুরে তরুণ ছুটিতে বনে ঘুরতে যায় এবং একজন বাদে সকলেই নারীদের সাথে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে যা তাদের মধ্যবিত্ত চরিত্রের নানা দিক প্রকাশ করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন যদিও এই নিয়ে আমার সামান্য অনুযোগ আছে রায় সাহেবের প্রতি, চলচ্চিত্রে রূপ দিতে যেয়ে প্রায়ই তিনি মূল লেখা থেকে সরে যেতেন। হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন, যেটিতে তাঁর রাজনৈতিক মতামতের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ছবিটির চরিত্র হীরক রাজা ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা ঘোষণাকালীন সরকারের প্রতিফলন। সত্যজিতের ছেলে স›দ্বীপের অনুযোগ ছিল তিনি সবসময় বড়দের জন্য গম্ভীর মেজাজের ছবি বানান। এর উত্তরে ও নতুনত্বের সন্ধানে সত্যজিৎ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন তাঁর সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন। এটি ছিল সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্র কিশোরের লেখা ছোটদের জন্য একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানানো সঙ্গীতধর্মী রূপকথা। গায়ক গুপী ও ঢোলবাদক বাঘা ভ‚তের রাজার তিন বর পেয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে ও দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আসন্ন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করে। ছবিটির নির্মাণকাজ ছিল ব্যয়বহুল, অর্থাভাবে সত্যজিৎ ছবিটি সাদা-কালোয় তৈরি করেন। অশনি সংকেত ছবিটির পটভ‚মি ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ফলে ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই দুর্ভিক্ষ কিভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল তা-ই এই ছবির মূল উপজীব্য। বর্তমানে এই ছবিটি ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গাইড টু দ্য বেস্ট ১,০০০ মুভিজ এভার মেড’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে একটি ছবি তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এই মন্তব্য করে যে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি শরণার্থীদের বেদনা ও জীবন-অভিযাত্রার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন, তাদের নিয়ে রাজনীতির প্রতি নয়।


যদিও বহুবিধ নান্দনিক শাখায় তাঁর পদচারণা ছিল কিন্তু তাঁর স্বীকৃতি আর পুরস্কার এসেছে চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমেই, সারা বিশ্বের মানুষ তাকে ধ্রুপদী চলচিত্র পরিচালক হিসেবেই জানে। চিত্রসজ্জা বা ভিজ্যুয়াল ডিজাইন সত্যজিতের পছন্দের একটি বিষয় ছিল এই দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। সত্যজিৎ তাঁর জীবদ্দশায় পেয়েছেন বহু সম্মাননা ও পুরস্কার। তিনিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার সত্যজিৎকে সে দেশের বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার ‘লেজিওঁ দ’নর’ ভ‚ষিত করে। ১৯৮৫ সালে তিনি পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস এন্ড সায়েন্সেস তাঁকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে। ওই সময়টায় ভারত সরকার তাঁকে দেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’। সেই বছরেই মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর ‘আকিরা কুরোসাওয়া’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রয়াত পরিচালকের পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর।