Friday, 27 February 2015

অভিজিত ভাইয়ের মৃত্যু আর চারপাশ

অভিজিত ভাইয়ের মৃত্যু আর একবার জানিয়ে দিলো, কতো প্রকারের সুশীল ফেসবুকে পদচারনা করে। তাদের মুক্তিযুদ্ধে আপত্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আপত্তি, শাহবাগে আপত্তি, জয় বাংলাতে আপত্তি, বঙ্গবন্ধুতে আপত্তি, মানুষের নামে আপত্তি, পোষাকে আপত্তি, মুক্তচিন্তা ভাবনায় আপত্তি ...... কিন্তু মুক্তচিন্তাকারদের আবিস্কৃত ফেসবুক, ইউটিউব, ভাইবার, বাংলা সফটওয়্যার ইত্যাদি কিছুর উপকারিতা নিতে তাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই

অসির চেয়ে মসি শক্তিশালী, এই ভুল কথাটি স্কুল বয়স থেকে শেখানো হয়। আসলে অসিই দুনিয়ায় প্রথম আর শেষ কথা। মাথায় চারখানা কোপ, কল্লা ফতে, মসি স্তব্ধ। পশুর জয় মানবতার পরাজয় ...... শুধু ইহকালে কুপিয়ে ক্ষান্ত হয় না পরকালে তাকে কীভাবে কীভাবে বারবিকিউ করা হবে তার কল্পনায় নিজে উজ্জীবিত হয়, স্ট্যাটাস লিখে অপরকেও উজ্জীবিত করে ......... তারচেয়ে দুঃখের কথা, এই ইসলামী রাষ্ট্রে অভিজিৎ রায়ের খুনী ধরা পড়বে কীনা সন্দেহ। কাফের এ্যামেরিকার নাগরিকত্ব যদি তিনি নিয়ে থাকেন তাহলে এ্যামেরিকা একটা চেষ্টা দিলেও দিতে পারে।

ধর্মের জন্মের ইতিহাসই কোপাকোপি, যুদ্ধ, রক্তারক্তি, নারীদের লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে সে ধর্ম নাকি শান্তির ধর্ম। কানা ছেলের নাম সর্বযুগে পদ্মলোচন। নিজের কানারে নিজে পদ্ম ডেকে শান্তি নেই, সবার কানপট্টিতে বন্দুক ধরে কানাকে পদ্ম বলাতে হবে। পৃথিবীর কোন ইতিহাসে এতো রক্তপাত আছে নাকি সন্দেহ। সেই রক্তের গঙ্গা আজো বহমান, ফ্রান্স থেকে টিএসসি। পৃথিবীর যে কোনায় রক্তারক্তি সে কোনাতেই এদের নাম এবং শুধু এদেরই নাম 


অসির কাছে মসী নতি স্বীকার করুক, বেঁচে থাকার তাগিদে করুক। কোন মুক্তমনার লেখালেখির দরকার নেই। বাজার ছেয়ে যাক, ধর্মের যুদ্ধ আর ধার্মিকদের জীবনীতে সাথে লাইলী মজনু আর শিরি ফরহাদের প্রেম কাহিনীতে। তবু মুক্তচিন্তাবিদরা বেঁচে থাকুক পৃথিবীর কোন কোনে। কুপিয়ে না মারলে কেউ অমর হয়ে যাবে না, বৃদ্ধ বয়স, জরা, বিভিন্ন অসুস্থতা মানুষের প্রাণ কেঁড়ে নিবেই তবুও এমন বীভৎস লজ্জা আর ঘৃনার হাত থেকে বাঙালি জাতি মুক্তি পাক।

বইমেলা এখন ঘাতকদের টার্গেট, এর বিকল্প খোঁজার বিকল্প নেই। হুমায়ূন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিত রায়, বন্যা আহমেদ ...... লিস্ট বড় হতেই থাকবে …… বাংলাদেশের ইতিহাস বুদ্ধিজীবি হত্যার ইতিহাস


27.02.2015

Monday, 16 February 2015

গ্রন্থালোচনাঃ আমি বীরাঙ্গনা বলছি ঃ নীলিমা ইব্রাহিম


বহুদিন ধরে পড়তে চাওয়া নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বইটি পড়ে শেষ করলাম। খুব সহজ ভাষায় সাতটি মেয়ের বীরত্বের কাহিনী এতে লেখা আছে। একশো ষাট পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু আমার অনেক সময় লেগেছে। আমি পাঁচ দিনে সাত জনের গল্প পড়লাম কারণ আমি হজম করতে পারতাম না। অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে হয়, থমকে থাকতে হয়। কীসের মধ্যে দিয়ে গেছেন তাঁরা। কিছু লিখবো না লিখবো না ভেবেও শেষ পর্যন্ত লিখছি। তাদের নাম-পরিচয়, পুর্নবাসন, তাদের সংগ্রাম নিয়ে, তথ্য উপাত্ত ভিত্তিক পূর্নাঙ্গ কোন বই আছে কীনা, তাও জানা নেই। আমি বাংলাদেশের অনেক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সিনেমা দেখেছি কিন্তু শুধু তাদের ওপর করা অত্যাচার এবং যুদ্ধ পরবর্তী তাদের মানসিক কষ্টের ওপর কারো কোন কাজ দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। তাদের পুর্নবাসনের কার্যক্রমের ওপরে চমৎকার সব ছবি তৈরী হতে পারতো। তাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাদের আত্মত্যাগ নিয়ে জানতো, তাতে করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের উপলব্ধি ও শ্রদ্ধা বাড়তো। আজকে যুদ্ধ বিরোধী পক্ষ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতো ধোঁয়াশা তৈরী করে নতুন ছাগু প্রজন্ম তৈরী করতে পারতো না। এই থেকে কিছুটাতো বুঝতে পারি আমাদের সমাজ বীরাঙ্গনাদের মূল্যায়ন কীভাবে করেছে। যুদ্ধের সময় শারীরিক অত্যাচার আর যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে মানসিক অত্যাচার নিয়ে বীরাঙ্গনারা ধরতে গেলে একাই লড়ে গেছেন এবং তাদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একাই লড়ে যাচ্ছেন

এই বইটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক আমার চোখে পড়েছে, জীবন যুদ্ধে যারা শত কষ্টের মাঝেও হেরে যায় নি শুধু তাদের গল্প দিয়েই বইটি সাজিয়েছেন লেখিকা। আমি সাধারণ বুদ্ধিতে বুঝতে পারি, সবাই এতো মানসিক, শারীরিক যন্ত্রনা পোহানোর মত শক্ত ছিলো না। সবাই সাঁতরে তীরে ভিড়তে পারেনি। অনেকেই হেরে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। লেখিকা হয়তো ইচ্ছে করেই তাদের কথা সযতনে এড়িয়ে গেছেনএই বইটি দিয়ে হয়তো লেখিকা আমাদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, আমরা যারা সহজে হতাশ হই, হাল ছেড়ে দেই, নৈরাশ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যেয়ে মুক্তি খুঁজি তারা যেনো যুদ্ধ করার, লড়ার মনোবল রাখি। আমাদের ইতিহাস অন্তত তাই বলে। বইটির সাত জন বীরাঙ্গনা ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক অবস্থা থেকে এসেছে। দর্জির মেয়ে আছে, গ্রামের বিত্তশালী কৃষকের মেয়ে আছে আবার শহরের উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিবিদের মেয়ে আছে। যাদের অনেকেই আজো ঘুমোতে পারে না, আজো সেই পদশব্দ শুনতে পায়, শরীরে বিভিন্ন রকমের কষ্ট, যন্ত্রনা, ব্যাধি যা মুখ খুলে কাউকে বলতে পারে না। তারা কী আজও অপেক্ষা করে নেই, তাদের পরিবার কী আজও অপেক্ষা করে নেই, এই হায়েনাদের বিচারের জন্যে? রাজনীতিবিদগন কবে তাদের আতর্নাদের দিকে কর্নপাত করবে? আর কত দিন বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদবে? এক মহাসাগর দীর্ঘশ্বাসে আজো বাংলা আকাশ ভিজে আছে মা। পয়তাল্লিশ বছর আশায় আছেন তাঁরা .........

মেহেরজান চরিত্রটি বলছে, “জীবনটা তো সরল সমান্তরালরেখায় সাজানো নয়। এর অধিকারী আমি সন্দেহ নেই, কিন্তু গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেন – কি বললেন আল্লাহ, পাগল হয়েছেন! বাঙালি মেয়ের জীবন পরিচালিত হবে আল্লাহর নির্দেশে! তাহলে এদেশের মৌলবী মওলানারা তো বেকার হয়ে থাকবেন, আর রাজনীতিবিদরাই বা চেঁচাবেন কি উপলক্ষ করে? না এসব আমার নিজস্ব মতামত, অভিযোগের বাঁধা আটি নয়।“

“যে কথা তাহের (ফাতেমার স্বামী) জানে না সেই কথাই চাঁপা ডাক্তারকে বললো। সে নির্মম কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে সে নিজেও কেঁদে উঠলো। ডাক্তার নিচু হয়ে চাঁপাকে প্রণাম করলো। দিদি, আপনারা প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আশ্চর্য এতো ত্যাগ স্বীকার করে দেশ স্বাধীন করলো বাঙালিরা, আর মা বোনদের দেয়া ত্যাগের মূল্য দিতে পারলো না। দূর্ভাগ্য সে দেশের!” 

আমি মাঝে মাঝে ওর ঘরে গিয়ে বসতাম। চোখ নিচু করে মিনা বেরিয়ে যেতো অথবা ঘরে ঢুকতো। কিছু জিজ্ঞেস করলে খুব কুন্ঠিতভাবে জবাব দিতো। বলতাম, জেরিনা এই মেয়েগুলোর বুকে আগুন জ্বেলে দিতে পারিস না, ওরা কেন মাথা নিচু করে চলে? নীলিমাদি তোমাদের এ সমাজ ওদের চারিদিকে যে আগুন জ্বেলে রেখেছে তার উত্তাপেই ওরা মুখ তুলতে পারে না। বেশি বেশি বক্তৃতা দিও না। ওদের সম্পর্কে জেরিনা খুব বেশি স্পর্শকাতর ছিল।“

কয়েকবার একটি লাইন ঘুরেফিরে এসেছে বইটিতে, “পাকিস্তানি সেনারা যখন আমাদের পেয়েছে তখন আমরা রাজাকারদের উচ্ছিষ্ট” --- পুরো বইটির মধ্যে এই একটি লাইন আমার কাছে যথেষ্ঠ পীড়াদায়ক মনে হয়েছে। লেখিকা কেন এই ধরনের শব্দ চয়ন করেছেন, তিনি জানেন। একজন জীবন্ত মানুষ কী করে উচ্ছিষ্ট হতে পারে? যতো শারীরিক লাঞ্ছনাই তিনি ভোগ করে থাকুন। একজন প্রগতিশীল ও মুক্তমনা লেখিকা যিনি হৃদয় দিয়ে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের জন্যে দিন রাত এক করে খেঁটে গেছেন তিনি কী অন্য কোন শব্দ চয়ন করে এই পারিপার্শ্বিকতার ছবিটা আঁকতে পারতেন না? কোন মানুষ সর্ম্পকে এ ধরনের কথা ভাবতে আমার হৃদয় মানে না। শারীরিক কারণে কেউ কী উচ্ছিষ্ট কেউ হতে পারে? পারে ক্ষতিকর স্বভাব চরিত্রের কারণে যেমন রাজাকাররা।

বইটিতে একটি ব্যাপার বার বার এসেছে, ধানমন্ডি নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনেক বীরাঙ্গনার স্বামী, ভাই, পিতা, নিকটাত্মীয় এসে দেখে করে গেছে, শাড়ি, খাবার উপহার এনেছে কিন্তু বাড়ি ফিরিয়ে নিতে পারবে না বলে দিয়েছে। অনেক পরিবার সরকার থেকে যুদ্ধক্ষতিগ্রস্তা এসব বীরাঙ্গনাদের জন্যে পাওয়া অনুদানের টাকা দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর মেরামত করিয়েছে, কিংবা ব্যবসায় নিজেদের স্বচ্ছলতা খুঁজেছে। তাদের মধ্যে কোন কোন মুসলমান ধর্মালম্বী পিতামাতা তাদের কন্যাকে গ্রহন করলেও মোটামুটি বলা যায় (বইয়ের তথ্যানুযায়ী) কোন হিন্দু ধর্মালম্বীরা মুসলমান পিশাচ দ্বারা লাঞ্ছিত তাদের মেয়েকে ফিরিয়ে নেয় নি। এমন কী যারা বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গেছে তারাও তাদের কন্যার সাথে কোন রকম সম্পর্ক রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কুমারী পূজা করা সনাতন ধর্মালম্বীরা কত সহজেই আত্মজাকে পাশ কাটিয়ে যায়। বার বার যুদ্ধের বলি আর ধর্মের বলি কেন মেয়েরাই? প্রসঙ্গতঃ কদিন আগে দেখা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি “ফিলেমোনা” মুভিটার নাম না উল্লেখ করে পারছি না। “ফিলেমোনা” ক্রিশ্চান ধর্মের বলি। অথচ ধর্মের আচার নিষ্ঠা পালনে মেয়েদেরকেই বেশি উদগ্রীব থাকতে দেখা যায়। কবে কোথায় এর শেষ কে জানে  ..................


এই বাংলায় একজন মুক্তিযোদ্ধা গর্ব ভরে পরিচয় দিতে পারেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু একজন বীরাঙ্গনাকে লুকিয়ে যেতে হয় তার চরম দুঃখের আর নির্যাতনের কাহিনী। আমরা নিজেরা গর্ব ভরে বলি আমার চাচা, মামা, খালু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু চাতুরতার সাথে লুকিয়ে যাই আমার যেই আত্মীয়া ধর্ষিতা হয়েছিলেন তার কথা। এই পতাকায় কী তাদের আত্মত্যাগের রক্ত লেগে নেই? অনেক মহীয়সী বীরাঙ্গনা অনেক মনোঃকষ্টে আছেন, তারা দাবী করতে পারেন না যুদ্ধে তাদের অবদানের কথা। পরিবার-পরিজনদের কথা ভেবে পিছিয়ে আসেন। কিন্তু এই লজ্জা কেন তাদের হবে? এই লজ্জাতো স্বাধীন বাংলাদেশের, বাঙালি জাতির। মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জা হওয়ার কথা। যে দেশ, জাতি তাদের মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারেনি দায় তাদের .....সে দায় তোমাদের নয় মা।

(লেখাটা হয়তো বেশী আবেগতাড়িত, ক্ষমাপ্রার্থী সেজন্যে, এরকম একটা বই পড়ে মেয়ে হিসেবে নিজেকে সামলে রাখা কঠিন)


তানবীরা
১৬/০২/২০১৫



Wednesday, 21 January 2015

রাত ভ’রে বৃষ্টি

অনেক দেরিতে হলেও পড়লাম বুদ্ধদেব বসুর বহুলালোচিত আর প্রকাশের আগে কিছুটা সময়ের জন্যে নিষিদ্ধ উপন্যাস ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’নিজের বাড়ির বুক শেলফের কোনায় কোনায় কতো না-পড়া বই পড়ে আছে দেখে নিজেই অবাক হই। খুব ছোট বই, খুব অল্প সময়ে পড়া হয়ে গেলো।

পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, সেই সময়ে তিনি বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা, অনুভূতি কী অন্য চোখেই না দেখতেন! নিঃসন্দেহে তিনি গতানুগতিকতার থেকে আলাদা ভাবনা ধারণ করতেনসে-সময়ের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই লেখাটি আলোচনায় আসার মতো ছিলো বই কিতখন নারীরা নিজেরাই তাঁদের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে কথা বলতে ভয় পেতেন, লজ্জা পেতেন, দ্বিধা করতেন। সে-জায়গায় তিনি পুরুষ হয়ে তাদের না-বলা কিংবা চেপে-যাওয়া অনুভূতিগুলো নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন। সেই অনুভূতিগুলো ন্যায় কী অন্যায় সেটার বিচার করবে সময়।

এই উপন্যাসের যথার্থতা বিচার করার মতো বোদ্ধা আমি হই নি হয়তো এখনো, তবু নারী হিসেবে উত্তম পুরুষে কথা বলে-যাওয়া এর মূল নারী চরিত্র মালতীর সাথে আমিও একাত্ম হয়েছি অবচেতনায়। ভালো-লাগা শব্দটা বেশ হালকা মনে হয়, আমি মনে-দাগকাটা কিছু কথা অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চাই।

উপন্যাসের নায়িকা মালতীর আত্মোপলব্ধি,

“আমার ছোট্ট শরীরটার তলায় অমন প্রকাণ্ড একটা কালো মেঘ কোথায় লুকিয়ে ছিলো এতদিন? তবে কি নয়নাংশুকে আমি কখনোই ভালবাসিনি? বাসিনি তা নয়, কিন্তু ওকে আমি পুরোপুরি কখনো দিইনি নিজেকে–এতোদিনে সেটা বুঝতে পারছি–একটা অংশ সরিয়ে রেখেছি না জেনে– সেই গোপন গভীর চরম অংশ তোমারই জন্যে আমি জমিয়ে রেখেছিলাম, জয়ন্ত। সে আমার স্বামী, রাতের পর রাত বছরের পর বছর আমি শুয়েছি তার পাশে, তার আর আমারই সন্তান বুন্নি–কিন্তু ও সবে কিছু এসে যায় না। কয়েক মিনিট সময়ের মধ্যে, বিনা চিন্তায়, বিনা ইচ্ছায় বিনা ভালোবাসায় কি স্ত্রীলোকের গর্ভে সন্তান আসে না? আমি এখন বুঝতে পারছি যে সাত সন্তানের মা হ’য়েও কোনো মহিলা কুমারী থেকে যেতে পারেন–হয়তো ঘরে ঘরে এমন গৃহিণী অনেক আছেন যাঁরা একটা বোবা শরীর নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবন। আর তা তাঁরা জানেন না পর্যন্ত। আমিও কি জানতাম আমার গোপন রহস্য, জয়ন্তর সঙ্গে দেখা না হ’লে? অংশু পারেনি–নতুন বিয়ের পরেও কখনো পারেনি আমাকে নিজের মধ্য থেকে এমনি ক’রে টেনে বের ক’রে আনতে, ভাসিয়ে নিয়ে ডুবিয়ে দিতে যেন অঝোর মেঘ ঝ’রে ঝ’রে পড়লো–নিঃশেষে নিঃশেষে।”

অভিমানী স্ত্রী মালতী বলেছে,

“নয়নাংশু আমাকে সভ্যভব্য মালতী ব’লেই ডাকে, আদরের সময় নিজে অনেক কিছু বানিয়ে নেয় কিন্তু লোটন বলে ডাকে না, তার মতে ওটা নাকি মানায় না আমাকে, ওটা ‘ন্যাকা’ নাম, অর্থাৎ আমার বিয়ের আগেকার কুড়ি বছরের জীবনটাকে সে উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু তুমি নিলে আমার জীবনের অংশ, আমার অতীতের আর বর্তমানের, আমার কথা শুনে-শুনে ক্লান্তি নেই তোমার; আমি বুঝতে পারলুম তোমার জীবন এখন আমাকে ঘিরে–ঘিরে ঘুরছে। সেটা তুমি খুব সরলভাবে সহজভাবে মেনে নিয়েছো, তা নিয়ে কোনো ভয় নেই তোমার, লজ্জা নেই- কত সহজে আমার হাত ধরেছিলে তুমি, কানে কানে ‘লোটন’ বলে ডেকেছিলে, আড়ালে যখন ‘তুমি’ বলো মনে হয় যেন চিরকাল আমি তা-ই শুনেছি, আর তাই তো যেদিন প্রথম আমাকে জাপটে ধরে চুমু খেলে আমি অবাক হলাম না, ভাবলাম না এটা ভালো হলো না মন্দ হলো, শুরু সারা শরীরে থরথর করে কেঁপে উঠলাম যেন আমি ষোলো বছরের কুমারী।”

আত্মগ্লানিতে ভোগা মালতী বলছে,

“কেউ যেন না ভাবে আমি নয়নাংশুর দুঃখ দেখতে পাইনি বা চেষ্টা করিনি তাকে সান্ত্বনা দিতে। তখন পর্যন্ত জয়ন্তর সঙ্গে কিছুই হয়নি আমার, কিন্তু আমি দেখছি নয়নাংশু কেমন অদ্ভুত বদলে যাচ্ছে, হাসি কমে গেছে মুখের–আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে ভালো করে জবাব দেয় না–অন্তত একজন মানুষের কাছে আমি যে তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি এইটেই ভালো লাগছে না তার। আমি কি তখন কম চেষ্টা করেছি নয়নাংশুকে খোশমেজাজে রাখতে? রাঁধতে আমি ভালোবাসি না, উনুনের আঁচে আমার মাথা ধরে, কিন্তু এই সময়ে আমি নিজের হাতে রান্না করেছি যা-যা তার বিশেষ পছন্দ, ঝি-চাকর থাকা সত্বেও তার শার্ট-প্যান্ট ইস্ত্রি ক’রে দিয়েছি নিজের হাতে, জুতো পালিশ ক’রে দিতেও পরোয়া করিনি। সে আরামপ্রিয় মানুষ, তার উপর একটু পরিচ্ছন্নতার বাতিক আছে–আমি অনেক খেটে অনেক যত্নে ঝকঝকে রেখেছি ফ্ল্যাটটিকে, আলোয় নতুন শেড আর সোফায় নতুন ঢাকনা পরিয়ে উজ্জল রেখেছি বসার ঘর–কিন্তু সে-সব যেন চোখেই পড়েনি তার। অথচ আমার হাতের কোনো একটি ছোটো কাজও জয়ন্তর চোখ এড়ায় না, যদি কোনদিন কানের দুল বদল করি তা পর্যন্ত লক্ষ করে সে, আমি যখন টিপট থেকে চা ঢালি তখন টের পাই তার দৃষ্টি আমার হাতের উপর।”

নিজের পক্ষে যুক্তি সাজাতে গিয়ে মালতী ভেবেছে,

“ও-সব ভালোবাসাবাসি অংশুর মতো লোকদের বানানো ব্যাপার-একটা ধারণা, কল্পনা, হয়তো একটা আদর্শ যার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে না কেউ, আর সেই আপসোসে তা নিয়ে শুধু কথা বলে। এমন মানুষ কে আছে যে অন্য একজনের সব ইচ্ছে মেটাতে পারে? অল্প বয়সে এক ধরনের মন থাকে, চনচনে চাঙ্গা থাকে অব্যবহৃত শরীর, হঠাৎ কোনো একজনের সব-কিছুই ভালো লেগে যায়। অন্য সব মানুষ থেকে আলাদা ক’রে নিই তাকে, মনে হয় তাকে পেলে আর-কিছু চাই না-কিন্তু তখন তাকে পাওয়া গেলো, ধরা যাক তারই সঙ্গে বিয়ে হ’লো যখন, তখন মোহাচ্ছন্ন ভাবটা এক গ্রীষ্মেই ঝ’রে পড়ে, এক বর্ষার জলেই ধুয়ে যায়। তারপর থাকে স্বার্থ, থাকে একত্র বসবাসের ফলে মমতা, থাকে অভ্যাস, পুরানো চটিজুতোর আরাম-আর থাকে শরীর। কিন্তু শরীরও কত সহজে ক্লান্ত হয় বিমুখ হয়, কত সহজে অন্য সুখের স্বপ্ন দ্যাখে-যদি না কারো বোকা হ’য়ে জন্মাবার মতো সৌভাগ্য হয়, কিংবা চোখে থাকে এমন ঠুলি যাতে সামনের মানুষটিকে ছাড়া আর-কিছুই সে দেখতে পায় না, জয়ন্ত আমাকে যত কথা বলেছে, তারমধ্যে ‘ভালোবাসা’ কথাটা একবারও উচ্চারণ করেনি-আমি সেজন্য কৃতজ্ঞ তার কাছে...”

স্বামী নয়নাংশুর অভিমানও কাচের বাসনের মতো ঝনঝন শব্দে ভেঙ্গেছে,

“হায় ভালোবাসাযেন তা মুখের কথার উপর নির্ভর করে-যেন তা চোখে ভেসে ওঠে না, ধরা পড়ে না গালের রঙে, হাতের নড়াচড়ায়, এমন কি পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকার ধরনে, নিচু হ’য়ে চা ঢেলে দেবার ভঙ্গিটুকুতে পর্যন্ত। তা আলোর মতো সহজ, রোদের মতো নির্ভুল-সেখানে কোনো তর্ক নেই, তা চিনে নিতে এক মুহূর্ত দেরি হয় না। এই কথাটাই আমি বলার চেষ্টা করেছিলাম মালতীকে অনেক কষ্টে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে–তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালবাসো আমি কেন তা অনুভব করি না? কেন করো না তা আমি কী ক’রে বলবো! ব্যস, এর উপর আর কথা নেই। একটা দেয়াল, বোবা দেয়াল, মাথা ঠুকলে শুধু মাথা ঠোকার প্রতিধ্বনি বেরোবে।”

প্রতি দিনের জীবন পরিক্রমায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কতো অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যায়। এই ক্লান্তিকর নাগরিক ব্যস্ততায় নর-নারীর একান্ত চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গব্যক্তিত্বের সংঘর্ষ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ব্যক্তিগত হতাশা কতকিছুই আসলে তার কারণ হতে পারে। কোনো জয়ন্ত এখানে একটি উপলক্ষ্য মাত্র তাই বারে বারে মালতী আর নয়নাংশুর অংশ আমরা জানতে পাই, জয়ন্তের অনুভূতি নিয়ে কিন্তু একটি কথাও লিখেন নি লেখক। আমার চোখে দাম্পত্য জীবন নিয়ে মালতীর হতাশা বের করে আনতে জয়ন্তকে সামনে এনেছেন মাত্র লেখক। পতি পত্মী অউর বোহ বা থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারেরা কারোর কাছে নিমিত্ত মাত্র, কারোর কাছে নিয়তিরাত্রি

প্রসঙ্গত, কদিন আগে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট’ পড়লাম। প্রথম অর্ধেকটা বেশ টেনে রেখেছিলো, শেষের দিকটা বিরক্তিকর ছিল। একই কথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এতো বার লেখা। অনেকটা জনপ্রিয় সিনেমা বানানোর জন্যে চিত্রনাট্যকাররা যেমন ‘স্পাইসি মশলা’ ঢোকান সেইরকম। আর এতো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যে নোট লিখবে সে কখনো আত্মহত্যা করতে পারবে না। আত্মহত্যা করে মানুষ ঝোঁকের মাথায়, চিন্তা ভাবনা করে আত্মহত্যা করা আমার দৃষ্টিতে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তারপরও একটা জিনিস আমার মনে হয়েছে, একজন স্বামীর কাছে উপেক্ষিত স্ত্রী, প্রেমিক বা বন্ধুর কাছে অবহেলিত হলে কী ধরনের অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যেতে পারে সেধরনের মানসিক অবস্থা চিত্রণে তিনি বেশ অনেকটাই সফল হয়েছেন। যেমন বুদ্ধদেব সফল হয়েছেন, উপেক্ষিত স্ত্রী মনের গুঞ্জরিত গোপন ভাবনাগুলো সামনে বের করে আনতে।

যাঁরা সবকিছু শুধু ন্যায়-অন্যায়ের পাল্লায় বিচার করেন না, যাঁরা জীবনের সাদা-কালোর বাইরের গ্রে পার্টটা অনুভব করেন তারা বইটা পড়তে পারেন। মানুষ যে শুধু আদর্শ বা শুধু অপরাধের রূপকথার চরিত্র নয়, রাক্ষসও হতে পারে শ্রেক আর রাজকুমারও হতে পারে ময়ূরবাহন, সেই বাস্তবতার ঘরোয়া স্বরূপ জানতে কিংবা হৃদয়ের পতনঅভ্যুদয়বন্ধুর পন্থার যুগযুগ সঞ্চিত যাত্রীদল যে-সামাজিক মানুষ, তার অন্তরের অন্দরমহলের ওঠাপড়ার কাহিনি জানতে চাইলেও এই বইটা একটা আবশ্যিক পাঠ্য হতে পারে। প্যাস্কেলের সেই কথাটাও বলে নিতে পারি, হৃদয়ের আছে যুক্তি, যা কেবল হৃদয়ই জানে।

তানবীরা

১৮/০১/২০১৫

Friday, 16 January 2015

শীত আসে বাবার গন্ধ নিয়ে


শীতকাল মানেই দেশে অন্যরকম একটা উৎসব উৎসব ভাব।

দেরি করে সকাল হয়, সূর্যের তাপ তখন আর খরখরে দজ্জাল রমণী নয় বরং মিষ্টি লাজুক কিশোরী। গায়ে এলিয়ে পড়লে কী ভালোটাই না লাগে! বিকেলে আকাশটা লাল হতে না-হতেই টুপ করে সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাবেসকালে ভাপ-ওঠা ভাপাপিঠে কিংবা চিতই, পুলি নইলে ছিটারুটি, মানে ঘুরেফিরে এমন কিছু যা সচরাচর হয় না। খেজুরের রস আর গুড়তো আছেই।

গ্রামে বেড়াতে গেলে দেখা যেতো প্রায় বাড়িতে মাচা আর তাতে উঁকি দিচ্ছে বেগুনি কিংবা সাদা সিমের ফুল, কোথাও কোথাও আবার ফুলের পাশে পাশে সিমও ঝুলে আছে। চারপাশের সবুজ মাঠে আগুন লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সর্ষে গাছগুলো, হলুদে আর সবুজে মিশে একাকার, ব্রাজিলের জার্সি হয়ে কিংবা কাঁচা আর পাকার প্রতিচ্ছবি হয়েপ্রকৃতিতেও নিত্যনতুন ফুল যেগুলো সারা বৎসর চোখে পড়ে না। নতুন আলু দিয়ে মুরগি, টমেটো ধনেপাতা মাখিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি, নতুন-ওঠা সিমের ভাজি, বরই-এর ডাল, শিকার করে-আনা পাখির মাংস, কী নয়!

স্যুটকেসে বা আলমারিতে আলাদা কিছু দিয়ে পেঁচিয়ে যে-কাপড়গুলো সযতনে মোড়া থাকতো সেগুলো তখন নামতো। সোয়েটার, জ্যাকেট, আলোয়ান, লেপ, কম্বল। অনেক বাড়িতেই বিয়ের উৎসব। স্কুলে পিকনিক, পাড়ায় পিকনিক, ছাদে পিকনিক, পাড়ার উঠোনে উঠোনে কোট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলা, রাতে লাইট ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে। শুক্রবার মানেই রাস্তা দিয়ে হইহই করে পিকনিকের বাস যাবে, নতুন রিলিজের আপাত হিট হওয়া কোন হিন্দি গান বাজিয়ে। স্কুলে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে দিলে নতুন ক্লাশে-ওঠা ছেলেমেয়েদের হাসি মুখ আর নতুন বই পুরনো ক্যালেন্ডারের সুন্দর ছবিটি দিয়ে মুড়িয়ে নেয়ার ধুম আর আনন্দ।

শীতের রাতে বাবা বাড়ি ফিরতেন সাধারণ সময়ের থেকে কিছুটা আগে। ঢাকায় শীতের রাতে দ্রুত রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। বাবা বাড়ি এলে আমাদের কী আনন্দ আর স্বস্তি! ঘরে ঢুকেই হাত মুখ ধুয়ে আমাদেরকে নিজের আলোয়ান দিয়ে মুড়ে দিতেন। আমরা তখন রাত নটার টিভিতে ব্যস্ত। একদিন ম্যাকগাইভার তো অন্যদিন সাপ্তাহিক নাটক নইলে সিরিজ নাটক। আমাদের নড়াচড়ার সময়তো নেইই আর সে সময় নড়া প্রায় অসম্ভব। কোন কিছু মিস করা যাবে না।

কোনদিন যদি বাবা সন্ধ্যে থেকে বাসায় থাকতেন, রাত নটার দিকে তাঁর আলোয়ান যখন আমাদের গায়ে, সেটা থেকে বাবার গায়ের বাবা বাবা গন্ধের সাথে মিষ্টি একটা বাবা বাবা ওম মিশে থাকতো। বাবার সেই চিকন বর্ডার দেয়া খয়েরি, বাদামি উলের আলোয়ানগুলো সাধারণ আলোয়ানের থেকে লম্বায় আর চওড়ায় অনেক বড় হতো। কত পুরনো ছিলো সেগুলো কে জানে। সেগুলোর কিছু বোধহয় তিনিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।

ছোটবেলায় একটা আলোয়ান দিয়ে দুজনকে পেঁচিয়ে ফেলতে পারতেন, বড় হওয়ার পর অবশ্য আলাদা আলাদা দিতে হতো। কিন্তু পেঁচিয়ে দিতেন সবাইকে, নিজের গুলোর সাথে দাদুর আলোয়ানও নিয়ে আসতেন। আলোয়ান পেঁচিয়ে প্যাকেট করে তারওপর কম্বল এনে দিতেন যেনো ঠান্ডা তার আগ্রাসী আঙুলে তাঁর সন্তানদের স্পর্শ করতে না পারে।  

কী অকিঞ্চিৎকর সেই সময়, সাধারণ মধ্যবিত্ত সংসার আমাদের। গিজার নেই, হিটার নেই, এয়ারকন্ডিশনার নেই। গরম কাপড়, সুন্দরবন থেকে বিশ্বাসী কাউকে দিয়ে আনানো মধু, গ্রামের বাড়ি থেকে বানিয়ে-আনা খাঁটি ঘি, বেসিনে, বাথরুমে গরম পানি বালতিতে করে এই আমাদের ভরসা।

খাবার সময় মানে আনন্দবাজার। বড় একটা বোলে বাবা ভাত, তরকারি, মাছ, মাংস, ডাল, গরম ঘি, সালাদ, লেবু, আচার সব একসাথে মেখে নিতেন। মেখে নিতেন বললে আসলে ভুল বলা হয়, ছোট বাচ্চাদের যেমন খিচুড়ি খাওয়ানো হয় সেরকম ক্বাথ বানিয়ে ফেলতেন। আমরা চারধারে কার্পেটের ওপর গোল হয়ে বসতাম, হাত আলোয়ানের ভিতর আর পা কম্বলের নিচে, চোখ টিভির ওপর আর সন্তানদের প্রতি একাগ্র আমার বাবা ঘুরে ঘুরে সবার মুখে লোকমা তুলে তুলে দিতেন।

অনেকসময় মুখে নিয়ে বসে থাকতাম ঠিক বাচ্চাদের মতো, তখন বাবা বকা দিতেন, চিবানোর তো কিছু নেই তাহলে মুখে নিয়ে চিন্তা করিস কী? মুখে যাবে গিলে ফেলবি, বাকি যা করার তো আমিই করে দিয়েছি।

রান্নাঘরে গরম পানি ফুটছে, আমাদের মুখ মুছিয়ে দেবেন বাবা নিজের হাতে আর একটু গরম পানি জগে মিশানো হবে, সবাই খাবে। ইউনিভার্সিটি পড়া অব্ধি কটা শীতের সন্ধ্যে নিজের হাতে খেয়েছি আঙ্গুলের কড়ে গুনে বলে দিতে পারবো। শীত বাদেও বহু সন্ধ্যে বাবা খাইয়ে দিতেন, তবে শীতের দিনে সেটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত ছিলো।
খাবার প্লেটে নিয়ে আমরা এতো দেরি করতাম যে খাবার প্লেটে ঠান্ডা হয়ে যেতো। অনেকসময় দেখা গেছে, গরুর মাংস প্লেটে ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে। মা চ্যাঁচামেচি করতেন ছেলে মেয়েগুলোকে নষ্ট করছেন আহ্লাদ দিয়ে দিয়ে এই বলেবাবা শুনতেন কিনা জানি না, মুখ টিপে হাসতেও পারেন

সকালে সোয়েটার, মোজা লেপের ভেতর দিয়ে যেতেন বাবা সোয়েটার গরম হবে তবে সেটা পরে বিছানা থেকে নিচে মেঝেয় পা দেবো। কিছুতেই ঠান্ডা লাগা যাবে না তাঁর সন্তানদের গায়ে। আহ্লাদী মেঘ আমার কাছে বায়না করে আমি যেমনটা করতাম, মা, আমি উঠতে পারবো না, আমার ঠান্ডা লাগে আমাকে পানি এনে দেবে, জুস এনে দেবে, মুড়ি মেখে দেবে আরো কত কীখুব মায়ায় মনটা ভরে যায়। নিজেকে দেখি মেঘের মাঝে, নিজের শৈশবকৈশোরবেলা

গ্রীষ্মের দুপুরে গল্পের বই নিয়ে শুয়ে পড়েছি, ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে। কিছুক্ষণ পরেই আবার একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। উঠে আবার চাদরখানা গায়ে টানতে কতো রাজ্যের যে আলস্য! অপেক্ষা করে থাকতাম কখন বাবা এইদিকে আসবেন। আমাকে কিংবা দাদুকে কাউকে না কাউকে দেখতে, কথা বলতে। দেখামাত্রই বলতাম, একটু চাদরটা দিয়ে দিবেন। কতো রাগতো বাবা, তুই এতো বড় হয়েছিস, তুই সবারটা দেখবি, না তোর চাদর আমাকে দিয়ে দিতে হয়!

আমি সেসব থোড়াই শুনেছি! গল্পের বইয়ে ডুবে নিদারুণ আরামে আলস্যে ঘুমিয়ে পড়েছি, কখন হাত থেকে বই পড়ে গেছে খসে, টেরই পাই নি।

শীতের দিনে কিংবা ঠান্ডার দিনে খিচুড়ি বাবার খুব পছন্দ তারমধ্যে সব্জি খিচুড়ি আরো বেশি পছন্দ। খিচুড়ি রান্না করার জন্যে সব্জি ধুতে ধুতে ভাবছিলাম বাবা কি কখনো ভেবেছিলেন তাঁর কন্যারা কোন সুদূরে সাত সমুদ্দুর সতের নদী পাড়ি দেবে? বরফ শীতল ঠান্ডা পানি ঘেঁটে ঘেঁটে সাংসারিক কাজ করবে?

ঠান্ডা আমার সহ্য হয় না, কিন্তু নিয়তির কারসাজিতে শীতের দেশে বসবাস। সারা শীত ধরতে গেলে সর্দি, কাশি, জ্বরে ভুগি। প্রায় দিন সূর্য দেখা যায় না, অন্ধকার চারদিক, টিপটিপ বৃষ্টি নয়তো বরফ আর সাথে উত্তরের হাওয়াতো আছেই। ঘুরেফিরে সংসারের কাজ করি আর পুরনো স্মৃতি কারণে অকারণে জাবর কাটি। বয়স হচ্ছে তারই লক্ষণ হয়তো।

ভেবেছিলেন কখনো বাবা আপনি, আমরা বরফের মধ্যে জুতো পরে অফিসে যাবো, বাজার করবো, মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাবো? মোটা জ্যাকেট আর মাফলার ভেদ করে কনকনে শীতের হাওয়া আমাদের হাড়ে ঢুকে যাবে আর চকিতে সেই ঠান্ডার আড়াল এড়িয়ে মনে পড়বে, আপনি কতো যত্নই যে করেছেন আমাদের প্রত্যেককে একটু ঠান্ডা যেনো আপনার বাচ্চাদের ছুঁতে না পারে, সেজন্যে আপনার নির্দেশে সকালে পানি গরম করে মগে দিয়ে যেতো, মুখ ধোওয়া থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ গরম পানিতে হবে।

ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলেই আপনাকে মনে পড়ে বাবা, আপনার ওম, আপনার গন্ধ, আপনার যত্ন আর ভাবি আপনি এখানে থাকলে আপনার আত্মজাদের রক্ষা করতে কী করতেন! আরো ভাবি আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকলে কী না করতেন! শঙ্করের একটা লাইন আছে, কোথায় জানি না। সেটা এরকম, পৃথিবীর সব ভালোবাসাতেই স্বার্থ থাকে। এমনকি ছেলের জন্যে মায়ের ভালোবাসাতেও কিছুটা স্বার্থ মিশে থাকতে পারে। একমাত্র যে ভালোবাসাটা নিঃস্বার্থ, সেটা হলো মেয়ের জন্যে বাবার ভালোবাসা।

এই লেখাটি তাঁদের জন্যে যারা বলে যাচ্ছেন অনেকদিন কিছু লিখছি না কেনো কোথায় ডুব মেরেছি। মনখারাপের পেন্সিল হাতে নিয়ে বোবা বরফ ভেঙে কিছু স্মৃতিকাচের টুকরো রেখে গেলাম এখানে, অনেকটুক ভালোবাসা আর অনেকটা অসহায়ত্ব সঙ্গী করে।


১৬/০১/২০১৫

Tuesday, 6 January 2015

গ্রন্থালোচনাঃ "নিন্দিত নন্দন”

প্রায় একটানে পড়ে শেষ করলাম ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর আত্মজৈবনিক উপন্যাস “নিন্দিত নন্দন”। শব্দশৈলী থেকে ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত ১৯১ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে পড়তে চোখের পানি আটকে রাখা মুশকিল। একটি “নারী” তার সামাজিক অবস্থান যে পর্যায়েরই হোক না কেন, ভুল-ভ্রান্তি, আবেগ-অনুভূতির কী মূল্যই না তাকে জীবনভর পরিশোধ করে যেতে হয়। তবুও তিনি কিছু জায়গায় সৌভাগ্যবতী, ছেলেমেয়েদের ভালবাসা পেয়েছেন, বিয়ার ভাইয়ের মতো স্বামীকে পাশে পেয়েছেন, নিজের যোগ্যতায় ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন, বহুজন কোন অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন তার মত পরিস্থিতিতে।

“আমাদের খন্ডকালীন সঙ্গীত শিক্ষক কিউ।এস।ইসলাম বেশ আন্তরিক ছিলেন। তাঁর শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি খুব ভালো গাইতেন। দেখতে ভালো ছিলেন না, তবে বয়সে তরুণ, বাচনে চৌকষ। এক পর্যায়ে খালাদের কারণে-অকারণে শাসন আমার শৈশবকে ঝালাপালা করে ছাড়ল – উপায়ন্তর না দেখে গানের শিক্ষক কিউ।এস।ইসলামকে বিয়ে করলাম মাত্র এক বছর প্রণয় শেষে। খুবই ভালোবাসলাম ওকে। প্রথম প্রেম একটি কিশোর জীবনে! সত্যি ভালোলাগার ব্যাপার। ভুল খুঁজে বের করার মন ছিল না। কিন্তু কুমারী জীবনের মুহূর্তগুলো যেন দ্রুতই সরে সরে যাচ্ছিল।“

“সন্ধ্যার পরে সিরাজ (আমার স্বামী) আমাকে ছাদে ডেকে নিলেন। সেদিন আকাশে পূর্ণ চাঁদ। জ্যোৎস্নার রুপোলি আলোতে সারা প্রকৃতি স্নাত। আমি যেন সেই আলোর সমুদ্রে স্নিগ্ধ সাগরিকা। প্রাণে গভীর স্পন্দন। মনে হলো এমন রুচিবান সংস্কৃতিমনা স্বামী, তিনি চাঁদের আলোয় গান গেয়ে আমাকে বরণ করে নেবেনযেন শকুন্তলার রাজা দুস্মন্ত আজ আমার এতদিনের শৈশব-কৈশোরের যত কষ্ট যত ক্ষোভ সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে আমার জীবন পূর্ণতা দেবেন।

উনি সতীনাথ মূখার্জির গান শোনালেন। ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না .........অপূর্ব দরদ দিয়ে গানটি গাইলেন। আমি মগ্ন হয়ে শুনতে শুনতে হঠাৎ দেখি ঝলমলে রুপোলি কাগজে মোড়ানো প্যাকেট থেকে একটি কাপড়ের তৈরী জিনিস বার করলেন মুহুর্তেই বুঝতে পারলাম এটি একটি বোরকা, যে বসন সমগ্র নারী সমাজকে অবনত করেছে। এ বসন জীবনকে কিছুই দেয় না শুধুমাত্র কুসংস্কার ছাড়া, ফতোয়ার সবক ব্যতীত অন্য কিছু নয়। বোরকা ফ্যাশনের পোষাক হতে পারে কিন্তু ধর্মের পোষাক নয়। ধর্ম অন্তরে।“

“সিরাজ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলেন, আমি স্কুলে চাকরী করতে শুরু করি। সামান্য বেতনে চাকরী করে, স্বামীকে পড়াশোনার সম্পূর্ন দায়ভার নিয়ে বিশাল সংগ্রামের পদক্ষেপ নিলাম। ৬০ টাকা বেতনে দুই শিফটে ১২০ টাকা এর ফাঁকে দুটি টিউশনি শেষ করতাম। জীবন ঘন্টা মাপের যন্ত্র, যে সংগ্রামে শুধু শ্রমই ছিল না কেবল কলঙ্ক, দুর্নাম, দারিদ্র্যের, স্বামীর অকারণ শাসন, সন্দেহ, দুর্ব্যবহার কোনকিছুরই কমতি ছিল না। সিরাজ যেহেতু আমার উপরে নির্ভরশীল সে কারণে তাঁর অন্যায়, হীনমন্য ব্যবহারগুলো আমি দাঁত চেপে সহ্য করে নিয়েছিলাম। কারণ মানবিক বিষয়টি বড় করে দেখতাম। তাঁর কাছে বিবাহিত জীবনের কোনো দাবিই যেন রাখতাম না।“

এরপর তার জীবনে “বিয়ার ভাই” এর আবির্ভাব। নানা ঘাত প্রতিঘাত। বিয়ার ভাইয়ের সাথে প্রেমের আমেজ পুরো বইটিকে তরতর করে পড়তে অনেক পাঠককে নিশ্চয় টেনে রেখেছে। সেই কিশোরী বয়স থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন শুধু সংসার টেনে রাখতে। পড়ছি আর ভাবছি, কতো যুদ্ধ করলে তবে এমন একজন মহীয়সী হওয়া যায়। যুদ্ধদিনের কথা আমি আর নাই লিখলাম, পড়ে নিবেন তার নিজের কথায়। স্যালুট ম্যাম, জীবন্ত কিংবদন্তী আপনি।


বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন, মহামান্যা অদিতি  

গ্রন্থালোচনাঃ বোবাকাহিনী

ক্রীসমাসের ছুটিতে কিছুটা কাউচ পটেটো হয়ে বাইরের তুষারপাত দেখেছি আর হাতে ছিলো গরমা গরম সবুজ চায়ের সাথে পড়া না পড়া কয়েকটি বই আর কিছু দুর্দান্ত সিনেমা। ছোটবেলা থেকে পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের কবিতা পড়েছি তবে সেগুলো বেশীরভাগই টেক্সট বইয়ে। সহজ সরল জীবন কথা, গ্রামীন রুপ এই তার লেখার প্রধান উপজীব্য বলে ধারনা ছিলো। নিজেদের শহুরে জীবনের সাথে অনেক সময় রিলেট করতে পারিনি বলে বেশীর ভাগ সময় আগের যুগে গ্রামে এমন হতো এই মনোভাব নিয়ে পড়ে গেছি।

আমার বাড়ি যাইও ভোমর, বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব, বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা গামছা বাঁধা দই।

কিংবা

আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।

নয়তো

এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!


আমাদের আটপৌরে শহুরে জীবনে আমরা কাকেইবা এমন উদাত্ত আহবান করি? কোথায় বা তাদের আপ্যয়নের জন্যে শালি ধানের চিঁড়ে। ভেন্না পাতার বাড়িই বা আমরা কোথায় দেখেছি? এসমস্ত মিলিয়ে পল্লীকবি সর্ম্পকে ধারনা ছিলো সহজ সাধারণ কাব্যকথা লিখে গেছেন তিনি। বইয়ের তাক এপার ওপার করতে যেয়ে হাতে পরলো তার “বোবাকাহিনী” উপন্যাসটি। অনেক আগে একবার পড়েছিলাম, হালকা হালকা মনে ছিলো। আবারো পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ধরতে গেলে প্রায় এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম বইটি। হাতে নিয়ে আর ছাড়তে পারিনি, এভাবে কাহিনী আর ভাষা দুইই আবার টেনে নিয়ে গেছে।

ছোটবেলায় শুধু মুগ্ধ পাঠিকা হয়ে পড়ে গেছি কিন্তু এবার পড়তে পড়তে পল্লীকবির দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে ভাবছিলাম। এতো এতো আগের দিনে বইটি লেখা যেটাতে তিনি বার বার ধর্মের নামে গরীবকে শোষণ করা, ধর্মের আফিম খাইয়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করিয়ে দেয়ার ব্যাপারগুলো তুলে এনেছেন। দেখিয়েছেন গ্রামে যেমন ছিলো শোষন তেমন ছিলো ভালবাসা, শহুরে হঠকারিতা। স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে, নিজের প্রয়োজনের জন্যে ধর্মকে ব্যবহার শিক্ষিত রাজনীতিবিদদের সূক্ষন চালকে তার দক্ষ লেখনীর মাধ্যমে তুলে এনেছেন। কতো চাতুরতার সাথে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে দিয়ে পাশাপাশি বাস করা প্রতিবেশীকে শত্রু করে তোলা যায় উঠে এসেছে তার লেখায়। এই জিনিসটি যে তিনি ততো আগে উপলব্ধি করেছেন এবং তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছেন সেটি তার এই বইটি না পড়লে আমার জানাই হতো না তার সম্পর্কে। পল্লীকবির জীবনকে দেখার দৃষ্টি আর তার তা নিয়ে তার চিন্তা – ভাবনা, বইটি পড়ে তার সম্পর্কে আমার ধারনা বদলে গেছে। তিনি এতোটা অসাম্প্রদায়িক আর মুক্তমনা ছিলেন, কোন ধারনাই ছিলো না।  

বইটির সবচেয়ে বেদনার্ত অংশ ছোটবোন বড়ুই আর ভাই বছিরের ভালবাসা।আমাকে বারবার পথের পাঁচালীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো, অপু-দুর্গা। দরিদ্র সংসারে নিদারুন অভাব কিন্তু আদাড়ে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় দুই ভাইবোন মনের সুখে, ফল কুঁড়িয়ে খায়, ফুল কুঁড়িয়ে মালা গাঁথে। আছে পথের পাঁচালীর সেই বিষন্নতা, প্রকৃতির অবাধ স্বাধীনতার কোলে কিশোর কিশোরীদের উদ্দাম বেড়ে ওঠা অনেক ক্ষেত্রেই অনায়সে শহুরে ছেলে মেয়েদের হিংসার কারণ হতে পারে। কিন্তু কলেরায় ভুগে ডাক্তার আর ওষুধের অভাবে বড়ুই এর মৃত্যু দুর্গার মতোই বড্ড করুণ। কাঁদিয়ে আকুল ভাসায়। আমি যেনো চোখের ওপর সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলাম, কি নিপুন ভাষায় না বর্ননা করে গেছেন সেই দুঃখ গাঁথা। ভাই বছির প্রতিজ্ঞা করলো, যেভাবেই হোক তাকে ডাক্তার হতেই হবে। বড়ুই এর মতো আর কাউকে যেনো অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে না হয়। গরীবের পাশে থাকবে সে, ডাক্তার যেনো আর শুধু শহর আর ধনী লোকদের জন্যে না হয়। ফুলির ভালবাসা অগ্রাহ্য করে চলে যায় বছির গ্রামের লোকদের তার পানে আশা করে থাকার কথা ভেবে, বোন বড়ুইয়ের কবরে করা তার প্রতিজ্ঞার কথা ভেবে ......... যদিও আজকেও বাংলার গ্রামে গ্রামে ডাক্তার আর ঔষধের দৈন্যতা ঘুচেনি। বহু বছিরের বলিদানও রক্ষা করতে পারছেনা বাংলাদেশকে।


সব মিলিয়ে অন্য এক জসীমউদ্দিন ......... অন্য এক জগত ......। এতোটাই বাস্তব সেই পৃথিবী যেনো আমি নিজের চোখে সব দেখতে পাচ্ছিলাম ......... অসীম মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা লেখকের জন্যে


লেখাটি উৎসর্গ করা হলো আমাদের শান্তকে 

Sunday, 7 September 2014

বইপড়া

মাঝে মাঝেই কিছু বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। প্রশ্নটা হয়তো যথার্থ কিন্তু বিব্রত হয়ে যাই আমি।
“আপনার প্রিয় শিল্পী কে?

প্রিয় লেখক কিংবা কবি কে?

প্রিয় গান বা সিনেমা কোনটি?”  ইত্যাদি ইত্যাদি যখন কেউ বেশ আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করেন।


এতো এতো গান, এক এক সময় এক একটাতে বুঁদ হয়ে থাকি, তাতে একজনকে প্রিয় শিল্পী কিংবা কয়েকজনকে প্রিয় শিল্পী বলাও কষ্টকর। একসময় ফরিদা পারভীন টানেন তো অন্যসময় ফাল্গুনী পাঠক, একবার সুবীর নন্দী ভাল লাগেতো কদিন পর আর ফিল কলিন্স। সময়ের সাথে, মানসিক অবস্থার সাথে, বয়সের সাথেও রুচি, পছন্দ, মন বদলাতে থাকে। দস্যু বনহুরে একসময় ডুবে থাকলেও পরে সেটা বড্ড পানসে হয়ে মাসুদ রানা আকর্ষণীয় হয়ে গেলো। কিরীটী রায়ের জায়গা নিয়ে নিলেন ফেলুদা। প্রিয় খাবার কিংবা নিজের শাড়ির সংগ্রহ থেকে প্রিয় দশটি শাড়ি বের করতে বললেও আমার জন্যে কষ্টকর হবে। প্রত্যেকটি শাড়িই কখনো না কখনো নিজেই পছন্দ করে কিনেছি। প্রিয় বই আর লেখকের কথাতো বাদই দিলাম কারণ যতোদিন যাচ্ছে ততোই না পড়া বইয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে, কতো কী জানি না, পড়া হয়নি কিংবা হবে না তার হতাশা জাপটে ধরছে ক্রমশ।


সম্প্রতি ফেসবুকের দশটি বইয়ের নাম উল্লেখের ট্যাগ হওয়ার ঘটনা থেকে উৎপত্তি এই লেখাটিরযদিও আমাকে রাসেল, জাহিদ ভাই আর অয়না বাদে কেউ ট্যাগ করে নি, তাতে অবশ্য মান সম্মান বেঁচে গেছে। কতো কিছু পড়িনি তার সবটা সবাই জানলো না (ইগনোরেন্স মালুম নেহি হুয়া)তবে আমি ভেবেছি প্রথম সুযোগে মনে আসা দশটি বইয়ের কথা নিজের জন্যেই লিখে রাখবো যেগুলো পড়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত হয়েছি। প্রিয় বইয়ের কথা বা পছন্দের বইয়ের লিস্ট দশে আঁটবে না।
প্রিয় অনেক কিছুইবরং দিনে দিনে প্রিয় থেকে প্রিয়তর হওয়ার তালিকা আরো দীর্ঘ হচ্ছে।


১. নির্বাচিত কলামঃ তসলিমা নাসরিন 

বইটি ঠিক এস.এস.সি. পরীক্ষার পরপরই হাতে পাই। তখন বইটি নিয়ে আশেপাশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বেশ আগ্রহ নিয়েই বইটি পড়তে শুরু করে প্রথমে বেশ একটা বড়সড় ধাক্কা খেলাম।
কিশোরী থেকে তখন তরুণীর দিকে যাত্রা করেছে শরীর, মন। সে-বয়েসে ঢাকায় বড় হতে-থাকা একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত মেয়ে যেসব যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে, আমি বা আমরাও তারমধ্যে দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের সে বয়সেই কঠোরভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়া হয়েছে, “এসব যন্ত্রণা মেয়েদের জন্যে খুব সাধারণ ব্যাপার, এগুলো নিয়ে আলোচনা বা প্রতিবাদ করার কিছু নেই। ভদ্র মেয়েরা সব সহ্য করে রাস্তায় মাথা নীচু করে হেঁটে চলে আসে। প্রতিবাদ করতে গেলে অন্যেরা যদি শুনে ফেলে তবে মেয়েদেরই অপমান, লজ্জা, দোষ। ছেলেদের জন্যে ব্যাপার না, আটকে যায় মেয়েরাই।” আর, আমরাও সেসব মুরুব্বিদের বাণী চিরন্তনী প্রাণ দিয়ে মেনে চলে স্কুল, কোচিং, স্যারের বাসা সেরে মাথা নীচু করে বাসায় ঢুকে পড়ি


এই বই পড়ার পর প্রথম জানতে পারি, যে অনুভূতির মধ্যে দিয়ে আমি যাচ্ছি বা আমরা যাচ্ছি সেই অনুভূতির মধ্যে দিয়ে আরো অনেকে যান। ঠিক আমাদের মতোই তাঁরাও অপমানিত অনুভব করেন। আমরা যেরকম যেরকম ভাবি, নিজের মধ্যে ফুঁসি, গুমরে মরি, সেরকম আরো অনেকেই আছেন। এগুলো প্রকাশ করা, কাউকে চ্যালেঞ্জ করা লজ্জার বা অপমানের বিষয় নয়, অধিকারের বিষয়। নিজের অধিকারের প্রতি সচেতনতা তৈরিতে, নিজেকে মানুষ ভেবে লড়তে এই বইটির অসামান্য অবদান আছে জীবনে। আমাদের সময় নিজের অধিকার কিংবা সচেতনতা নিয়ে কোন বিষয়ে প্রতিবাদী হলে, অনেকেই অপমান করার উদ্দেশ্যে যে বাক্যটি বলতেন সেটি হলো, “তসলিমা নাসরিন হইছো নাকি?” সহজ ভাষায়, উপমা-অলঙ্করণ বাদে নিজের কথা লিখে যাওয়ার প্রেরণাও ‘নির্বাচিত কলাম’ দিয়েছে। কল্পনাশক্তি বাদ দিয়ে, গল্প বলার চেষ্টা বাদ দিয়ে, নিখাদ নিভাঁজ সত্যি আমি প্রথমে ‘নির্বাচিত কলাম’-এই পড়েছি। আজকাল আমরা যারা ব্লগ লিখি ইন্টারনেট দিয়ে, তার সূচনা বোধ হয় অনেকটা নির্বাচিত কলাম শুরু করেছে, অন্তত নারীদের হৃদয়খোলা সাবলীলতার তো বটেই।  

২. শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচারঃ হুমায়ুন আজাদ 

 

টিএসসিতে আবৃত্তি-কণ্ঠশীলনের সাথে যুক্ত হয়ে পরিচয় হয় হুমায়ুন আজাদের দুর্দান্ত সব কবিতার সাথে। তারপর আস্তে আস্তে তাঁর উপন্যাস, প্রবন্ধজ্বলো চিতাবাঘ, নারী, রাজনীতিবিদগণ পড়ার পর হাতে আসে “শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার”। প্রতিটি বইয়েই তাঁর সুস্পষ্ট একটি বক্তব্য থাকতো তাঁর পাঠকদের জন্যে কিন্তু এই বইটির বক্তব্যের মতো এতো প্রাঞ্জল খুব কমই যেনো লেগেছে। হয়তো পিছনের গল্পটি পরিষ্কার ধরতে পেরেছি তাই কিংবা পটভূমিটা ভীষণ পরিচিত সেজন্যে। নিজের চিন্তাচেতনার পিছনের যে যুক্তিগুলো হাতড়ে বেড়াতাম, এই বইটি সেই যুক্তিগুলোর যোগান দিয়েছিলো, সমর্থন দিয়েছিলো।

                        
৩. সত্যের সন্ধানেঃ আরজ আলী মাতুব্বর

ধর্মীয় মৌলবাদ ও কুসংস্কারবিরোধিতার এবং সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে উঠার পেছনে এই বইটির অনেক অবদান ছিলো নিজের মনে সারাবেলা যে প্রশ্নগুলো খেলা করতো, যার উত্তর নিরন্তর সন্ধান করে বেড়াতাম, সেসব উত্তর না-জানা অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম এই বইটিতে। বইটির যুক্তিগুলো হৃদয়ে গেঁথেছিলো। অনেকের সাথেই আরজ আলীর যুক্তি নিয়ে কথা বলতে গেলে, তাঁরা আটকে গিয়ে বলতেন, “বেয়াদব, বয়স কম, বয়স হলে বুঝবি”আমিও তেড়ে বলতাম, “আমার না হয় বয়স হয় নি কিন্তু যিনি লিখেছেন, তিনিতো বয়স্ক মানুষ, বুঝেই লিখেছেন, তাঁর বেলা?” বরিশাল জেলায় জন্ম-নেয়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন একজন প্রায় গ্রাম্য দরিদ্র মানুষ এতো যৌক্তিক ভাবনা কী করে ধারণ করেন ভাবলে আজো আমার বিস্ময় কমে না! অথচ, চোখের সামনে দেখছি পাশ্চাত্যে কুড়ি বছর কাটিয়ে দেয়া অনেক মানুষই নানা ধরনের কল্প কাহিনীকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

৪. মৈত্রেয় জাতকঃ বাণী বসু

দুই পর্বের এই বইটি প্রথম আমাকে মুগ্ধ করে এর ভাষাশৈলীতে। বাংলা ভাষা এতো অলঙ্করণময়, এতো মিষ্টি সাথে এতোটাই যে দুর্বোধ্য হতে পারে তার প্রথম অনুভূতি আনে এই বইটি। এর আগে বঙ্কিম, শরৎ কিংবা তারাশঙ্করের বই পড়তে গিয়ে অনেক সময় সাধু ভাষার কারণে খানিকটা অত্যাচারিত অনুভব করেছিলাম কিন্তু মৈত্রেয় জাতক ছিলো সব ছাড়িয়ে। নিজের ভাষা কতো কম জানি তার অনুভূতিও সর্বপ্রথম এই বইটি পড়েই হয়েছে। সাথে এও ভেবেছি এরকম একটা ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস রচনা করতে লেখিকাকে কী পরিমাণ পড়াশুনো-গবেষণা করতে হয়েছে!
মনীষীদের নিয়ে সাধারণের কৌতূহল চিরদিনের। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে ইতিহাস আশ্রিত এই উপন্যাসটি রচিত হয়েছে গান্ধার-মদ্র-কুরু-পাঞ্চালের জায়গায় কৌশল-বৈশালী-মগধের পটভূমিতে। ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট বলে খ্যাত বিম্বিসার, কোশলপতি প্রসেনজিৎ, নানান ধুরন্ধর রাজপুরুষবর্গ, আরো আছেন তক্ষশিলার বিদগ্ধ যুবক চণক, গান্ধারের বিদুষী নটী জিতসোমা, তসাকেতের সন্ধিৎসু রাজকুমার তিষ্য যাঁদের নিয়ে টুকরোটাকরা গল্প কিংবা গল্পের ছোঁয়া পৌরাণিক কাহিনি নানা নাটকে দেখেছি বা বইয়ে পড়েছিলাম, তাঁদের সম্বন্ধে বিশদভাবে কৌতূহল মেটানোর সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছিলো এই বইটি।

৫. প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা, বকুলকথাঃ আশাপূর্ণা দেবী

খুব ঘরোয়া কিংবা আটপৌরে জীবনকে জীবন্ত করে তুলে ধরতে আশাপূর্ণা দেবীর জুড়ি নেই। তিনি সবসময়ের আমার খুব পছন্দের লেখিকা। তাহলে এই তিনটি বইয়ের সিরিজটির কথাই কেন?
খুব ছোটবেলায় পড়াশুনোর জন্যে যখন বাবা-মা বকতেন নিজেদের কথা বলে কিংবা দাদির কাছে গল্প শুনতাম, কতো কষ্ট করে কয়েক ক্রোশ হেঁটে তারা স্কুলে যেতেন। পালকিতে পর্দা জড়িয়ে স্কুলে নামানো ওঠানো হতো, সেসব গল্পের কিছু বিশ্বাস হতো, কিছুটা হতো না। দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলে রূপকথার মতো লাগতো অনেকটা। তাঁরা অনুযোগ করতেন, আমরা সব এতো সহজে পেয়ে সুযোগের অপব্যবহার করছি, উচ্ছন্নে যাচ্ছি। তাঁদের গল্প আর আমাদের জীবন অনেকটাই যেনো এই সিরিজটাতে বেশ মোহহীনভাবে আঁকা হয়েছে। সত্যবতীর সংগ্রাম থেকে জন্ম সুবর্ণলতা আর তার পরিনতি কি তবে বকুলকথা? কী চেয়েছিলেন তার আর বাস্তবে কী ঘটছে? ভেবেছি কি অনেক প্রপিতামহী মাতামহীদের সংগ্রামের ঋণ কিভাবে শোধ করে যাচ্ছি আমরা এই প্রিভিলেইজড জেনারেশান, কিংবা আদৌ যাচ্ছি কিনা?

৬. গর্ভধারিণী আর সাতকাহনঃ সমরেশ মজুমদার

অনির ছেলেবেলা, উত্তরাধিকার, কালপুরুষ, কালবেলা পড়ে উত্তরবঙ্গ তথা জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ির মুগ্ধ ভক্ত হয়ে যাই নি এমন খুব কম কিশোর-কিশোরীই তখন ছিলাম। তারপর হাতে এলো গর্ভধারিণী আর প্রায় কাছাকাছি সময়েই সাতকাহন। আমরাও তখন সদ্য স্কুল পাশ দিয়ে কলেজে আসছি, সমাজ পরিবর্তনের, সবকিছু বদলে দেয়ার অভিপ্রায় আমাদের নিজেদের মনে, রক্তে। একবার নিজেকে ‘গর্ভধারিণী’-এর জয়িতা মনে হয় তো আর একবার সাতকাহন-এর ‘দীপাবলী’-র সাথে একাত্মতা অনুভব করি। সেসব দিনে আমাদের মতো অনেকের মনকে চিন্তার খোরাক আর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এই দুটো উপন্যাস। বিপ্লবস্পন্দিত বুকে মনে হতো আমিই হবো সেই সকালবেলার পাখি যে ডেকে উঠবে সবার আগে কুসুমবাগে, শতবর্ষের নিস্তরঙ্গ সমাজের ভাঙাবো ঘুম।
হায়, সোনার শেকলে বাঁধা পড়ে আজ মাঝেমাঝে ছটফটাই। কিন্তু, জয়িতা আর দীপাবলীরা আমার কাছে থেকে চিরঅধরা দূরত্বেই থেকে গেলো। গেলো সেই অপ্রাপনীয় জীবনও।

৭. সূর্য দীঘল বাড়িঃ আবু ইসহাক

খুব ছোটবেলায় বিটিভি ছাড়া যখন বাংলাদেশে অন্য কোন চ্যানেল নেই তখন এই উপন্যাসটি অবলম্বন করে একটি সিনেমা দেখানো হয়েছিল। আমরা কচিকাঁচারা সেই সিনেমার কোন স্বাদ পাই নি বিধায় আমরা ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। খুব হেলাফেলায় এই বইটি হাতে নিয়েছিলাম স্কুলের শেষের দিকে। হয়তো হরতাল আন্দোলন কিংবা বন্যার কারণে স্কুল বন্ধ, হাতের কাছে যা পাচ্ছি তাই গোগ্রাসে গিলে সময় পার করছি টাইপ অবস্থা ছিলো। কিন্তু একবার বইটি হাতে নেয়ার পর, শেষ না করে ছাড়তে পারি নি। কখন ডুবে গিয়েছিলাম এর মধ্যে নিজেও টের পাই নি। উপন্যাসটি বিশেষ বড় নয়, এটি বাদে এই লেখকের আর কোন লেখা পড়েছি কিনা তাও মনে নেই। শুধু মনে আছে সহজ ভাষার বইটিতে জটিল কোন কাহিনি নেই, গ্রাম বাংলার চিরন্তন ঘটনাপ্রবাহ, অভাব অভিযোগ আছে, মানবিক সম্পর্কের জটিলতা আছে, কুসংস্কার আছে, ষড়যন্ত্র আছে, বেঁচে-থাকার লড়াই আছে। সূর্য দীঘল বাড়ি নামটিও চমৎকার লেগেছিলো, এর মানে কী, অনেককেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেউ বলতে পারে নি 

৮. চৌরঙ্গীঃ শংকর

মাটি ও মানুষকে কাছ থেকে দেখে লেখায় শংকরের জুড়ি নেই। নিছক কল্পনার আশ্রয় থেকে নয়, নিজের বারোয়ারি জীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি তার সাহিত্যে উপন্যাসে বারবার টেনে এনেছেন। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁকে জীবন সংগ্রামে নামতে হয়। নানা পেশায় নিযুক্ত হন টিকে-থাকার এই লড়াইয়ে। তারই একটা সময়ের উপাখ্যান চৌরঙ্গী। আত্মজীবনী আমার বরাবরই প্রিয়, সত্যকে আঁধার করে-লেখা আরো প্রিয়। সেদিক থেকে চৌরঙ্গী পড়তে যেয়ে, সমাজের পর্দার বাইরের ও আড়ালের মানুষের নানা কাহিনি আমায় ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছিল। লেখকের সহজ সাবলীল ভাষা নিয়ে খুব বেশী কিছু না বললেও চলে। কোথাও না আটকে তরতর করে লেখকের সাথে এই পাতা থেকে ঐ পাতায় পৌঁছে যেতে বেশি সময় লাগে না। তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ আরো অনেক উপন্যাস আছে কিন্তু সবগুলোর মধ্যেও চৌরঙ্গী অনেকটা উজ্জ্বল। এই বই নিয়ে তৈরি ছবিতে উত্তমকুমার - শুভেন্দু  আছেন বলে জানি, কিন্তু কেন যেন ছবিটা দেখার তেমন ইচ্ছে জাগে নি। তবে, এই ছবিতে মান্না দে-র গান “মেঘের ভেলায় আকাশ পারে” পছন্দের।

৯. নন্দিত নরকেঃ হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিংবা নাটকের জাদুতে মুগ্ধ হন নি এমন বাংলাদেশি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে, বিশেষ করে আশির দশকের শেষের দিকে, কিংবা নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে। স্কুলের লিটিস পিটিস বয়সেই আমরা তাঁর ‘এইসব দিনরাত্রি’-র মুগ্ধ দর্শক। আমার পড়া প্রথম উপন্যাস তাঁর ‘ফেরা’তাতে মুগ্ধতা ছিলো এরপর পড়েছিলাম পেপারব্যাক রহস্যপোন্যাস ‘দেবী’, সেটা পড়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারপর ‘নন্দিত নরকে’নন্দিত নরকে পড়ার সময় যেনো পাশের বাড়ির খোকা, মন্টু, রাবেয়া-কে চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছিলাম। রাবেয়ার মৃত্যুতে, মন্টুর ফাঁসিতে অঝোর ধারায় কেঁদেছি। একাত্মতা এসে গেছিলো সেই মধ্যবিত্ত পরিবারটির সাথে। আমাদের খুব চেনা পরিচিত গণ্ডি সেটা, যেখানে বইয়ের মানুষেরা আমাদের মতো ভাষায় কথা বলে, চাকরি পায় না, বেকার রাস্তায় ঘোরে, অবলীলায় বাজারের পয়সা চুরি করে, মিথ্যে বলে, চা খায় সেসব জীবনের জলছবির টুকরো তাঁর বইয়ে এতো সহজে উঠে এসেছে যে, মনেই হতো না বই পড়ছি। বইয়ের চরিত্র মানেই সুশীল বা ইউনিক কিছু যে নয়, সেটাও তাঁর উপন্যাস থেকেই প্রথমে জানতে পারি।
অনেক অনেকদিন সেই মুগ্ধতা ধরে রাখতে পেরেছিলেন সেই জাদুকর। শঙ্খনীল কারাগার, মিসির আলী সমগ্র, প্রিয়তমেষু, জনম জনম, অপালা যখন যেই উপন্যাস পড়েছি সেটার মধ্যেই মিশে গেছিলাম। বইগুলো পড়তে পড়তে বাজিতো বুকে সুখের মত ব্যথাআজো, এই বেলাঅবেলাকালবেলাতেও সেই অচিন রাগিণী যেন বুক কাঁপিয়ে দেয় জন্মান্তরের অসহ আনন্দ নামের বেদনায় বা বেদনা নামের আনন্দে।

১০. শ্বেত পাথরের থালাঃ বাণী বসু

কিশোরীকালে পড়া আর এক মুগ্ধতার মাস্টারপিস। সমাজের নিয়ম কেনো সব মেয়েদের বেলায়? একটি আধুনিকা শিক্ষিতা মেয়ের একটি বনেদি সনাতন চিন্তাধারার পরিবারে বিয়ে হয় বিয়ের পর এক রকম ভালই চলে যাচ্ছিলো স্বামীর সাথে, বাড়ির বাকিদের সাথে গোঁজামিল দিয়ে হঠাৎ স্বামী মারা গেলে তার বৈধব্য জীবন আর আত্মসম্মানের লড়াইয়ের মধ্যে শুরু হয় চিরদিনের সেই প্রভুদাস নামের সামন্তযুগের খেলা শ্বশুরবাড়ির সাথে শেষে নিজের অস্তিত্বের তাগিদে ছেলেকে নিয়ে বাধ্য হয়ে আলাদা হয়ে যান তিনি সমাজের অনেক বিরূপতা সহ্য করে একা ছেলে মানুষ করলেন, ছেলে নিজের বান্ধবী, নিজের জীবন খুঁজে পেয়ে পরে মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় অথচ মায়ের কাছে তার জীবনের দাবি অনেকবারই সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলো কিন্তু মা ছেলেকে বড় করতে, সমাজের ভ্রূকুটি থেকে বাঁচাতে এতোটাই বদ্ধপরিকর ছিলেন যে নিজের জীবনের দিকে তাকানোর কথা মনেই আনেন নি, ফিরিয়ে দিয়েছেন সেসব সুখের প্রলোভন

মাআসলে কী হন? ‘মাশুধু মা’-ই হন

একজন একলা নারীর আত্মসম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে নিরন্তর যুদ্ধ করে যাওয়ার এই উপন্যাস আমাকে অনেক টেনেছে


অর্পনা, দীপঙ্কর, সব্যসাচী অভিনীত প্রভাত রায়ের বানানো সিনেমাটা দেখেও আমি সমান মুগ্ধ হয়েছি যদিও আমি বরাবরই ভাবি একটি সমগ্র উপন্যাসকে তিন ঘন্টার সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসাধ্য একটি কাজ। 


১১. সোনার হরিণ নেইঃ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

একটা সময় আশুতোষের প্রতিটি উপন্যাসের সাথে মিশে থাকতাম। তাঁর উপন্যাসের নায়িকারা প্রথাগত সুন্দরী নয়, পড়াশোনায় স্ট্রাগল আছে, ঘাড় ত্যাড়া হতো অনেকদিকে। আপোষহীন, জেদি মেয়েদের দেখা যেতো প্রেমের জন্যে অনেক বড় ছাড় দিচ্ছে। স্কুল জীবনের শেষের দিকটা ছিলো আমার আশুতোষময়। খুব কম উপন্যাস আছে তাঁর যেটা আমার পড়া হয় নি। সবগুলো বইয়ের মধ্যে ‘সোনার হরিণ নেই’ সবচেয়ে বেশী মনে দাগ কেটেছে। সেই বয়সে ‘প্রেম’ জিনিসটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ধরা হতোকে কতো বেশী আত্মত্যাগ করেছ সেজন্য তাতে তাকে আরো মহান মনে হতোবানরজুলির জংগলে এই উপন্যাসের বিস্তৃতি, কাঠের ব্যবসার সাথে। কিন্তু শেষ অব্ধি সেই উপলব্ধি দেয়ার চেষ্টা করা হয়, অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি প্রেমের কাছে এসব কিছুই না। প্রেমই সবচেয়ে মহান বিষয় জীবনের। ছোটবেলায় মুগ্ধ হওয়ার মতো অনেক উপাদান এই বইয়ে ছিলো।


অবসরের সঙ্গী ছিলো বই, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বিনোদন ছিল সেই সময় বই পড়া কিংবা গান শোনা, মাঝে মাঝে আলো বাতাসের সাথে সম্পর্ক রাখতে ছাদে একটু বেরিয়ে-আসা। অবসরে বাংলায় বই পড়তেই বেশি ভাল লাগতো, তার মধ্যেও টুকরোটাকরা ইংরেজি বই যে একেবারে পড়া হয়নি তা নয়। প্রবাসিনী হওয়ার কারণে ঝুম্পা লাহিড়ীর নেমসেক খুব টেনেছে, খালেদ হোসাইনীর কাইট রানার-এর আমির আর হোসেইন-এর দ্বন্দ্ব আর ভালবাসা দুটোই মনে দাগ কেটেছে, হামিদা লাখোর ভেরবরখেন ট্রেইলস যেমন অনেক কাঁদিয়েছে আবার খুব ছোটবেলায় পড়া টমাস হার্ডির প্রেমের উপন্যাস আ পেয়ার অফ ব্লু আইজ ভাল লেগেছিলো। ড্যান ব্রাউনের উপন্যাসগুলোর অনুবাদ থেকে ‘দ্যা ভিঞ্চি কোড’ আর ‘দ্যা লস্ট সিম্বল’ পড়েছি কেনো যেনো খুব টানে নি, জোর করে পড়ে কষ্ট করে শেষ করতে হয়েছিলো। ‘এঞ্জেলস এন্ড ডেমন্স’ সিনেমাটা দেখে ফেলাতে আর বইটি পড়ি নি, যদিও কেউ কেউ বলেছেন বইটা অনেক বেশি থ্রিলিং

আবারো বলি সেই পুরনো কথা, বই তো পড়ে শেষ হয় নি, হয় না তবু্ও অনেক মুগ্ধতার সঙ্গী, অনেক ভালোলাগা প্রহরের উপহারদাতা, অনেক আবেগের ঈশ্বর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জানাই জানাই মনের মাধুরীতে অনেক কৃতজ্ঞতা আর অনেক প্রণতি সাথে যাঁরা বই লেখেন আর বই খুব ভালোবেসে পড়েন, তাঁদেরও আবার বই আমার দীর্ঘশ্বাসেরও নাম আমার ফেলে-আসা সময় আর পরিবেশের স্মৃতির ছাপ রয়ে যাওয়া বই আজো আমার মনে মনকেমন-করা হাওয়া বইয়ে দেয়, উদাস আকুল করে তোলে জীবনের হয়তো এইই পরিণতি

তানবীরা
০৪/০৯/২০১৪