Monday, 27 July 2015

লিখেছি কাজল চোখে

কাল শেষ রাতের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করলাম, কিন্তু ঘুম আর এলো না কিছুতেই। উঠে এক কাপ চা বানালাম খুব নিঃশব্দে, বাড়ির আর কারো যাতে ঘুম ভেঙে না যায় চায়ের মগ হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাড়ালাম, ওমা!!! দেখি কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে! কিন্তু কী জানো? এতো সুন্দর চাঁদকে ঠিক আমার মতোই নিঃসঙ্গ লাগলো এতো তারার ভিড়ে।

মাথায় হঠাৎ ভাবনা কিলবিল করে ওঠা আমার পুরনো রোগ, তুমিতো জানো। সবাই চাঁদকে নিয়ে কী কাড়াকাড়ি করে, প্রেমিকাকে চাঁদের সাথে তুলনা করে, কবিতা লিখে, গান করে কিন্তু কেউ কি কখনো চাঁদের নিঃসঙ্গতা নিয়ে ভাবে? ভাবে সে কতোটা একলা? কতোটা কষ্ট হয় তার একা একা এভাবে বছরের পর বছর মিথ্যে হাসি মুখে নিয়ে প্রহরগুলো কাটাতে? ভাবতে ভাবতে আবার চাঁদের দিকে তাকাতে চাঁদটাকে ভীষ বিষণ্ন লাগলো। মনে হলো চাঁদ কী ভীষ মন খারাপিয়া দৃষ্টি নিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে

চাঁদের দৃষ্টি অনুসর করে নিচে তাকিয়ে আরো অবাক হবার পালা আমার। পুরো শহরটা অদ্ভত মায়াময় একটা বিষণ্নতার চাদর গায়ে পরে আছে যেনো। চাঁদের বিষণ্নতা পুরো শহরকে গ্রাস করে নিয়ে সমস্ত আবহকেই গাঢ় নীল করে তুলেছে।

আচ্ছা, বিষণ্নতার রঙ কি গাঢ় নীল? নইলে পুরো শহরটাকে এতো নীল দেখাচ্ছে কেনো বলতো? কোন কারণ ছাড়াই আমার চোখ ভিজতে আরম্ভ করে দিলো। আচ্ছা এমন নয়তো, নিজে বিষণ্ন বলেই এরকম মনে হচ্ছে? যাহ, তা কী করে হবে!

আজকাল এই নিঃসঙ্গতা খুব উপভোগ করতে শিখে গেছি আমি, বড় হয়েছিতো। ভিড়ই বরং আমার অসহ্য লাগে। কেনো যেনো চাঁদের বিষণ্নতাটা কাউকে জানানো জরুরি মনে হয়েছিলো, লিখতে গিয়েই মনে পড়লো, কোথাও কেউ নেই।

টানা তিনদিনের হরতাল পড়লো আবার। এটা শেষ হতে না হতে আবার কয়দিনের জন্যে দেয় কে জানে? পুরো সপ্তাহটাই ধরতে গেলে মাটি, এভাবে বন্দি হয়ে দিনের পর দিন বাঁচা যায়? কী করবো ভেবে ভেবে ঠিক করলাম গ্রামে চলে যাই, যেখানে নেই হরতাল, নেই যানজট। আমি জানি তুমি বলবে, বিদ্যুৎ কিংবা এয়ারকুলারও হয়তো নেই, ওভাবে থাকা যায়? তাও আবার এই প্যাচপ্যাচে গরমে। কিন্তু গ্রামে আমি চলেলাম শেষ পর্যন্ত। আমারতো উঠলো বাই তো কটক যাই স্বভাব চিরকালের।

বিশ্বাস করো, এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, এসে অব্ধি তোমার জন্যে এতো খারাপ লাগছে আমার। এতো শান্ত কোলাহলহীন পরিবেশ যে আসা মাত্র তুমি মুগ্ধ হয়ে যেতে। সন্ধ্যেয় বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি আর আকাশের দিকে তাকিয়ে এলোমেলো ভেবে যাচ্ছি। যথারীতি বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু আমার কী মনে হচ্ছে জানো, ভাগ্যিস বিদ্যুৎ নেই। নইলে আকাশের এই রপ, সন্ধ্যের এই চেহারা আমার চোখে ধরা পড়তো কী করে বলো? সন্ধ্যা এতো সুন্দর হয় নাকি, কই শহরে বসেতো বুঝতে পারি না?

চারদিক থেকে ঝিরঝির হাওয়া আসছে, এয়ারকুলারের মতো এতো ঠান্ডা নয়, কিন্তু পিঠ ছুঁয়ে, গলা ছুঁয়ে, ঘাড় ছুঁয়ে, চুল ছুঁয়ে, চিবুক ছুঁয়ে আমার ঠোঁট অব্ধি ছুঁয়ে যাচ্ছে। জানি জানি, আমার ঠোঁট কেউ ছুঁয়ে দিলে তোমার ভাল লাগে না। কিন্তু এই বাতাস আমার সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে আমাকে শীতল করে দিচ্ছে। কেউ এভাবে নিঃশব্দে ভালবেসে ছুঁয়ে গেলে আমি কিভাবে ঠেকাই বলো?  বারান্দা ভর্তি জোনাকি পোকার আনাগোনা। হাজার হাজার তারাবাতি যেনো জ্বলছে আর নিভছে। তুমি পাশে থাকলে তোমার হাত মুঠো করে ধরে রাখতাম। জানি মুঠো ঘেমে উঠতো কিন্তু তবুও। তোমার গায়ের গন্ধ নিতাম। আর তুমি যেমন গুন গুন করো, তেমন গাইতে...। কোন গানটা গাইতে তুমি?

সকালে উঠে চটি ফেলে দিয়ে, খালি পায়ে কাদায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরলাম। তাজা মাছ কী অদ্ভু রুপালি হয়গো তুমি জানো? রুপার চেয়েও রুপালি আর কী এক সোঁদা গন্ধ মাছের গায়ে। আমার ইচ্ছে ছিলো সব মাছ আবার পানিতে ছেড়ে দেবো। মাছেদেরও নিশ্চয় পরিবার পরিজন আছে, মা মাছটি হয়তো তার মেয়ে মাছটিকে খুঁজতে থাকবেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে খেলতে গিয়ে কোথায় হারালো তার আদরের বুকের ধন? মেয়েকে ফিরে না পেলে কাঁদবেন। কিন্তু সবতো আর আমার একার ইচ্ছেয় হবে না, সাথে যে অন্যেরাও আছেন। তাই বড় বড় কটা মাছ রেখে দিয়ে ছোট মাছগুলোকে আরো কিছুদিন জলে সাঁতার কাটার সুযোগ দেয়া হলো।

খালের ধারটা এতো সুন্দর জানো আমার ফিরতে ইচ্ছে করছিলো না। ধান কেটে একটা নৌকায় একজন ফিরছিলেন হয়তো জিরোবেন বলে, তাকে বলে কয়ে রাজি করিয়ে আমি তার ছোট নৌকাতে চড়ে চলে গেলাম বিলের দিকে আরো ভিতরে। গহিন বিল আর তার চারদিকে এতো শাপলা না দেখলে তুমি কল্পনাই করতে পারবে না, ঠিক সুনীল যেমন বলেছিলেন, যেখানে সাপ আর ভ্রমর খেলা করে। আমি নৌকা বাইতে পারছিলাম না, এদিকে বৈঠা মারিতো ঐদিকে যায়। মাঝিদের কতো অবজ্ঞা করি আমরা কিন্তু আজ প্রথম উপলব্ধি করলাম ছোট সোনার তরীকে পারে নিতেও কতো কী জানতে হয়। অপক্ক হাতে বৈঠা মেরে মেরে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ছেড়ে দিলাম তারপর, এ যেনো যেখানে যাক যাক না কেনো, ডুবুক সবি ডুবুক তরী, তুমি হাসছো না, এই লাইনটা পড়ে?

বৈঠা রেখে আমি পাগলের মতো শাপলা তুলে তুলে ছোট নৌকাটাকে ভরিয়ে ফেলছিলাম। মাঝি অবাক হয়ে আমার কাণ্ড দেখে বলেই ফেললেন, এতো শাপলা দিয়ে কী করবেন আম্মা? মাঝির কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে নিজের ছেলেমানুষি দেখে আমি হেসে ফেললাম, লাজুক গলায় বললাম, কিছু না। আপনি নিবেন? নিয়ে নেন না। মাঝি কোন জবাব দিলেন না শুধু আমার দিকে তাকিয়ে কি যেনো বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

এরপর কথা নেই বার্তা নেই ঝুম ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। মাঝি ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি নৌকা বাড়ির দিকে বাইতে লাগলেন। নদীর ওপর কখনো বৃষ্টিতে ভিজেছো তুমি? কী অসাধারণ কী অসাধারণ অনুভূতি তুমি জানতেই পারলে না। মনে হচ্ছিলো মরণ হলে এই মুহূর্তেই হোক, আর কিছুই চাওয়ার নেই জীবনে। বৃষ্টির প্রতি ফোঁটা যখন আমার ছুঁয়ে যাচ্ছিলো, আমি কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম। তোমার প্রথম স্পর্শ মনে পড়ে যাচ্ছিলো। আর সাথে সাথে হাসছিলামও আবারো তোমার বিনা অনুমতিতে কেউ আমায় ছুঁয়ে দিলো। বাড়ি এসে নেয়ে খেয়ে বিছানায় গড়াতে গিয়ে মনে হলো, আজকের এই অসাধারণ মুহূর্তগুলো লিখি...আর লিখতে গিয়েই মনে পড়লো, কোথাও কেউ নেই...

আজকাল খুব ছোট ছোট কারণে মন খারাপ হয় জানো? সাধারণ মন খারাপ না, তীব্র হৃদয় ভেঙ্গে-যাওয়া কষ্ট হতে থাকে। শ্বাস নিতে পারি না চোখ ভিজে ওঠে শুধু। তুমি বলবে এ আর আমার নতুন কী? সামান্যতেই ভেঙে-পড়া চিরদিনের ছেলেমানুষ আমি। হয়তো তাই, কিন্তু কষ্টটাতো সত্যি। ভীরুদের কি কষ্ট কম হয় বলো?

আজ দুপুরে গোসল সেরে অনেকদিন পর একটা শাড়ি পড়লাম, হালকা আকাশি রঙের, হ্যাঁ স্যার তাই, কী করবো বলো? আমার যে শুধু হালকা রঙই ভাল লাগে। গাঢ় রঙে আমায় কি মানায়? আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো করি না একটু সাজ, কি আর হবে তাতে? ছোট একটা টিপ পড়লাম আর চোখে কাজল আঁকলাম, সেই আমার চিরচেনা সাজ। কিন্তু মন ভরলো না।

হঠাৎ মনে হলো মুক্তোর দুলটা পরলে কেমন হয়? দুল দুটো কিছুতেই খুঁজে পেলাম না, গয়নার বাক্স, ড্রয়ার, আলমিরা, কাবার্ড কোথাও না। কোন দুলগুলো বুঝতে পেরেছো? সেইযে কক্সবাজার থেকে আনা, পিঙ্ক পার্ল? আমার খুব পছন্দের দুলগুলো। অনেক খুঁজলাম এঘর ওঘর কিছুতেই পেলাম না। এতো কষ্ট হতে থাকলো, টিপ খুলে ফেললাম, কাজল মুছে দিলাম। অসহায়ের মতো কান্না পাচ্ছিলো।

একবার ছোটবেলায় আমি দাদুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম বাবা মায়ের সাথে। সেখান থেকে নিজের বাড়িতে যখন ফিরছিলাম অনেক রাত হয়ে গেলো, ট্যাক্সিতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার হাতে ছিলো আমার ময়না পুতুলটা যেটা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলো। খেতে ঘুমাতে এমনকি গোসলেও আমি আমার ময়নাকে হাত ছাড়া করতাম না। বাবা আমাকে ট্যাক্সি থেকে কোলে করে বিছানায় এনে শুইয়ে দিলেন। ময়নাটা হয়তো ট্যাক্সিতে আমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিলো, অন্ধকারে বাবা আর সেটা খেয়াল করেন নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে কী কান্না আমার! আমি সারা বাড়ি হেঁটে হেঁটে ‘আমার ময়না, আমার ময়না’ করে কেঁদেছি। এখন বড় হয়ে গেছিতো তাই চাইলেও আগের মতো হাপুস নয়নে কেঁদে বুক হালকা করতে পারি না। বুকে জমে থাকে চাপ চাপ ব্যথা।

সেই বয়সে একটা ময়নার জন্যে কাঁদলেও লোকে সেটা স্বাভাবিকভাবে নেয় আর আজ মুক্তোর দুলের জন্যে কাঁদলেও লোকের প্রশ্নবিদ্ধ চোখের কারণে ঝাঁজরা হয়ে যাবো। অদ্ভুত না এই বড় হয়ে-যাওয়া! জীবনের এই মৌলিক আবেগগুলোকেও কম্প্রোমাইজ করে দিতে হয়। ইচ্ছেমতো হাসি কান্নার অধিকারও হারিয়ে ফেলি।

এই বিষণ্নতা, এই মন খারাপ বাগে আনতে ভাবি গান শুনি। প্রথমে চন্দ্রবিন্দুর “মনরে হাওয়ায় পেয়েছি তোর নাম” গানটা আশ্রয় করলাম তারপর ফাহমিদার “মন খারাপের একেকটা দিন নিকষ কালো মেঘলা লাগে”। কিন্তু মন খারাপতো কমলোই না বরং গানের সাথে সাথে আমি আরো বিষণ্নতায় তলিয়ে যেতে থাকলাম। আমার খাবার মুখে রুচে না, রাতে বার বার ঘুম ভেঙে যায় আর ঘুম আসে না। মাঝরাত থেকে সকাল পর্যন্ত জেগে থাকি, চোখের কোণায় কালি, কোন কাজে উৎসাহ নেই, লেথার্জিক লাগে সব কাজে।

কেনো এমন হয় আমার?

কী এমন আমি খুঁজে ফিরি তবে!

সবইতো আছে আমার, এই মন খারাপের মুহূর্তগুলোয় ভাবি কাউকে লিখি আর লিখতে গিয়েই মনে পড়ে সেই ধ্রুবপদ, সমে ফিরে আসি বারবার, বারবার...কোথাও কেউ নেই...

তানবীরা

১৩/৮/২০১৩

http://issuu.com/banglatribunenews/docs/emag/17?e=13804967%2F14312683



Sunday, 19 July 2015

তসলিমা নাসরিনের মেয়েলীপনা

আমাদের দেশের সংস্কারপন্থী মানুষেরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা অন্য মেয়েদের বিশেষ করে তাদের তুলনায় আপাত আধুনিক বা অগ্রসর মেয়েদের সমালোচনায় ব্যস্ত থাকে। কেমন করে কাপড় পরে, ওড়না কেন গলায় দেয় বুকে না, চুল কেন রঙ করে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিংবা কারো ডিভোর্স হয়ে গেলে কেন মেয়েটি তারপরও হাসিখুশী থাকে, সাজগোঁজ করে অফিসে যায় সবই তাদের আলোচনার কিংবা সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কোন মেয়ে যখন একটা আনওয়ান্টেড রিলেশানশীপ থেকে মুক্তি পায় তখন তার কী আনন্দ হওয়া অস্বাভাবিক? কোন মেয়েদের স্বামী মারা গেলেতো আরো দুর্বিসহ করে দেয় তার জীবন। তার পোশাক হতে হবে ম্লান, তার মুখে কেন হতাশার চিহ্ন নেই, কোন কারণে হাসাতো যাবেই না কিন্তু ছেলেটির বউ মারা গেলে তার সাজ পোষাক কিংবা ব্যবহার নিয়ে কোন আলোচনা হয় না। বউ মারা গেছে তারপরও সারাবেলা ফেসবুকে থেকে এত কীসের হি হি কিংবা এতো হাসি আনন্দ কীসের কোন পুরুষ সম্বন্ধে শুনেছি কীনা মনে করতে পারছি না।
লন্ডনের ভলতেয়ার লেকচারে বন্যা আপা কেন হেসে ছিলেন, কেন রাগে ফুঁসে উঠেননি তসলিমা নাসরিনের লেখা সেই স্ট্যাটাসটাকি অনেকটা সেই প্রাচীনপন্থী মানুষদের চিন্তা চেতনাই প্রকাশ করছে না? কে কোথায় কত টুকু হাসবে কিংবা হাসবে না সেটা কী তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা সিদ্ধান্ত নয়? অন্য কেউ ঠিক করে দেবে? স্বামী বলবো না, স্বামী কথাটি সম্পর্কে অনেক সীমাবদ্ধতা আনে, বলবো সাথী হারিয়ে বন্যা আপাকে কী রকম আচরন করলে মানাবে সেটা কী তসলিমা নাসরিন বা হিলারী ক্লিনটনের বলে দেয়ার কথা। নারী স্বাধীনতার পক্ষে এতো লেখালেখি করে, প্রায় অর্ধেক জীবন নির্বাসিত থেকে তসলিমা এই চিন্তা চেতনা ধারন করছেন? লজ্জাজনক। তার স্ট্যাটাসটি খুবই লঘু চালে কিছু ভারিক্কী কথা ছিলো যেগুলোকে ছাঁচে ফেললে অনেকটা মেয়েলীপনা কিংবা কিছুটা ইর্ষার গন্ধ পাওয়া যায়।
আজকে অভিজিৎ ভাই নেই তাই বন্যা আপাকে তাঁর জন্যে, তাঁর লড়াই আর আদর্শের জন্যে এই শারীরিক - মানসিক অবস্থার মধ্যেও এদিক ওদিকের ডাকে সাড়া দিতে হচ্ছে। তিনি চেষ্টা করছেন অভিজিৎ ভাইয়ের কথা সবাইকে জানাতে, তিনি যেনো হারিয়ে না যান। ঘটনাটা কিন্তু উলটো ঘটার সম্ভাবনাও ছিলো পুরোই ফিফটি ফিফটি। অভিজিৎ ভাই সারভাইভ করে যেতে পারতেন আর বন্যা আপা নাও সারভাইভ করতে পারতেন, আক্রান্ত তিনিও হয়েছিলেন। অভিজিৎ ভাই বেঁচে থাকলে এতো বড় ঘটনার পর তারও বহু জায়গায় স্পীচ দেয়ার জন্যে, ডিসকাশনের জন্যে ডাক আসতে পারতো। অভিজিৎ ভাই বন্যা আপার স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে যদি বলতেন, “বন্যা খুবই গোছানো ছিলো, ঘর অগোছালো থাকলে খুব বিরক্ত হত, নোংরা নিতে পারতো না” তাহলে কী ঠিক একই কায়দায় তসলিমা বিরক্ত হয়ে এরকম স্ট্যাটাস লিখতেন? আপনাদের কী মনে হয় লিখতেন? এই দুজন দুজনকে সবচেয়ে কাছে থেকে জানে, দুজন দুজনের সম্বন্ধে কী বলবে, কতোটুকু বলবে, কোনটা বলবে আর বলবে না সে কী তৃতীয় ব্যক্তির হস্তক্ষেপের আওতায় আসতে পারে?
তসলিমা আপনার কী মনে হয় না আপনি দুজন মানুষের খুব বেশী ব্যক্তিগত সীমানায় নাক ডুবাচ্ছেন। আপনি এতোদিন যে সমস্ত স্বভাব, সংস্কার বা রীতির সমালোচনা করেছেন, দু চারটে শব্ধ আগু-পিছু করে নিলে আপনিও ঠিক একই কাজ করছেন, একই কায়দায়। অনেক তর্ক বিতর্ক আপনাকে নিয়ে থাকলেও আমরা অনেকেই আপনার পিছনে খুব শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আপনি অযথা বিতর্ক জন্ম দিয়ে আমাদেরকে হারিয়ে ফেলবেন না যেন। অভিজিৎ ভাইয়ের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশী ভেবেছি আপনার কথা। দেশে ফিরতে পারেননি সেই কষ্ট আছে আপনার বুকে কিন্ত প্রাণে বেঁচে আছেন, নির্মল আকাশের নীচে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন। দেশে ফিরে গেলে এই দিনগুলো নাও পেতে পারতেন। তাই বন্যা আপাকে বন্যা আপার মত থাকতে দিন, তাকে তার মত গুছিয়ে নিতে দিন। উলটোপালটা বকে নিজেকে হালকা করা আর পরশ্রীকাতরতা বের হওয়া ছাড়া আর কিছু লাভ হবে না। বরং দিন দিন নিজের স্ট্যান্ড থেকে কত দূরে সরে যাচ্ছেন তাই প্রমানিত হতে থাকবে।
তানবীরা
১৭/০৭/২০১৫

Tuesday, 14 July 2015

জন্মদিনের ধন্যবাদ ----- আমার তরফ থেকে

জন্মদিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো দিনটাকে যদি প্রিয়জনরা মনে রাখে। অতি ব্যস্ত মাইক্রো ব্লগিং, টুইটারের যুগে কেউ যদি এইচ-বি-ডি এর বদলে, শুভ জন্মদিন টুকু লিখে শুভেচ্ছা জানায় তাতেই আনন্দে চোখ ভিজে যায়। আমি বোকা সোকা, সহজ মানুষ। এতো বড় পোস্ট মানে উপহারের ভার কী করে সইবো ............
এরে পড়তে গেলে চোখ ভিজে
সারাবেলা মনের ভেতর বাজে 
এতো ভালবাসা কী আমায় সাজে এ এ এ এ

http://www.amrabondhu.com/aliarafat/7911


জন্মদিন নিয়ে আমি ব্যাপক হৈ চৈ করি নিজের চেনা গন্ডির মধ্যে। অফিসে দু’মাস আগে থেকে রিমাইন্ডার দিতে থাকি, জুলাই হলো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। কারণ আমি না জন্মালে এই কাজগুলো কে করতো? এটা কী করে হতো কিংবা ঐটা কী করে হতো? আমার পাকনামির চোটে আমার কলিগ একবার বলেই বসলো, আমি দেখেছি মেয়েদের যত বয়স হয়, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি কমে। তুমি একটা মানুষ, এখনো জন্মদিন জন্মদিন করে মাথায় তুলে রাখো।

আমি বললাম মানে? এই যে বেঁচে আছি প্রতিদিন এটা কী কম? কতো ইমেইল পাই, এ মারা গেছে ক্যান্সারে, সে মারা গেছে সেরিব্রেলে সেই তুলনায় বেঁচে থাকাটাতো জাস্ট একটা “দ্যা ভেরি প্রেসাস” গিফট। রোজদিন ভোর দেখি, পাখির ডাক শুনি, রাস্তায় হাঁটতে গেলে যত্নে লাগানো কেয়ারীর পাশে নিতান্ত অবহেলায় পরে থাকা নাম জানা ফুলটির দিকেও মনের অজান্তেই চোখ পরে। এসব কী বেঁচে থাকা উদযাপন করার জন্যে যথেষ্ঠ কারণ নয়? এই নীল আকাশের নীচে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারা কি কম সৌভাগ্যের? আকশের রঙধনুর দিকে তাকালে সমস্ত পাওয়া না পাওয়া ভুলে যেয়ে আরো আরো বহুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে


এও সত্যি প্রকৃতির নিয়মে সবকিছু একদিন ঝরে যায়, কেউ তার ব্যতিক্রম নয়। মিশরের রাজারা নিজেদের মমি বানিয়ে কত কী করে নিজেকে অমর করার চেষ্টা করে গেছেন। আমি সাধারণ মানুষ। করজোড়ে প্রকৃতির কাছে মিনতি রাখি, যখন সময় আসবে খুব নীরবে নাম না জানা ঘাস ফুলটির মত টুপ করে যেনো ঝরে যাই, কেউ উহ শব্দটি শোনার আগেই ঐ আকাশের তারা হয়ে ফুটে উঠতে চাই ............ আর তার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত জন্মদিনের আনন্দে কাটাতে চাই 

Monday, 13 July 2015

জন্মদিন

http://www.amrabondhu.com/aliarafat/7911


জন্মদিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো দিনটাকে যদি প্রিয়জনরা মনে রাখে। অতি ব্যস্ত মাইক্রো ব্লগিং, টুইটারের যুগে কেউ যদি এইচ-বি-ডি এর বদলে, শুভ জন্মদিন টুকু লিখে জানায় তাতেই আনন্দে চোখ ভিজে যায়। আমি বোকা সোকা, সহজ মানুষ। এতো বড় পোস্ট মানে উপহারের ভার কী করে সইবো ............

এরে পড়তে গেলে চোখ ভিজে
সারাবেলা মনের ভেতর বাজে 
এতো ভালবাসা কী আমায় সাজে এ এ এ এ


জন্মদিন নিয়ে আমি ব্যাপক হৈ চৈ করি নিজের চেনা গন্ডির মধ্যে। অফিসে দু’মাস আগে থেকে রিমাইন্ডার দিতে থাকি, জুলাই হলো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। কারণ আমি না জন্মালে এই কাজগুলো কে করতো? এটা কী করে হতো কিংবা ঐটা কী করে হতো? আমার পাকনামির চোটে আমার কলিগ একবার বলেই বসলো, আমি দেখেছি মেয়েদের যত বয়স হয়, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি কমে। তুমি একটা মানুষ, জন্মদিন জন্মদিন করে মাথায় তুলে রাখো।


আমি বললাম মানে? এই যে বেঁচে আছি প্রতিদিন এটা কী কম? কতো ইমেইল পাই, এ মারা গেছে ক্যান্সারে, সে মারা গেছে সেরিব্রেলে সেই তুলনায় বেঁচে থাকাটাতো জাস্ট একটা “দ্যা ভেরি প্রেসাস” গিফট। রোজদিন ভোর দেখি, পাখির ডাক শুনি, রাস্তায় হাঁটতে গেলে যত্নে লাগানো কেয়ারীর পাশে নিতান্ত অবহেলায় পরে থাকা নাম জানা ফুলটির দিকেও মনের অজান্তেই চোখ পরে। এসব কী বেঁচে থাকা উদযাপন করার জন্যে যথেষ্ঠ কারণ নয়?



এও সত্যি প্রকৃতির নিয়মে সবকিছু একদিন ঝরে যায়, কেউ তার ব্যতিক্রম নয়। মিশরের রাজারা নিজেদের মমি বানিয়ে কত কী করে নিজেকে অমর করার চেষ্টা করে গেছেন। আমি সাধারণ মানুষ। করজোড়ে প্রকৃতির কাছে মিনতি রাখি, যখন সময় আসবে খুব নীরবে টুপ করে যেনো ঝরে যাই, কেউ উহ শব্দটি শোনার আগেই ঐ আকাশের তারা হয়ে ফুটে উঠতে চাই ............ তার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত জন্মদিনের আনন্দে কাটাতে চাই ১৪-০৭-২০১৫

Monday, 6 July 2015

জার্নাল ২৮

১. মেয়েদেরকে “গাই” (গাভী)বলে সম্বোধনটি যারা বেশী করে তাদের বেশীর ভাগ নিজেরাও মেয়ে। তাদের বেশীর ভাগই পড়াশোনা জানা, সমাজ সচেতন এবং সমাজের উঁচু তলায় তারা প্রতিষ্ঠিত।

২. একটি উপমহাদেশীয় মেয়ে স্বামীর সমান সমান কিংবা স্বামীর থেকে বেশি উপার্জন করেও কেমন করে যেনো অন্য মেয়েদের চোখে “স্বামীর ঘর” করে কিংবা “স্বামীর সংসার” করে। তার নিজের বলতে কিংবা ঘর-সংসার বলতে কিছুই থাকে না, অথচ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হয়তো দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে পুরো দায়িত্ব পালনের পরেও সংসারের সিংহ ভাগ দায়িত্বও মেয়েটির মাথায়ই থাকে। স্ত্রী সম্পর্কে অন্য মেয়েদের এই মূল্যায়নটি সহজেই পড়ে ফেলতে পেরে স্বামীও গর্ব বোধ করে, তার মত উদার কারো সাথে আছে বলেই তো মেয়েটি এতো দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছে।


৩. দুজন ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই সাথে বেড়িয়ে একই সাথে কর্মক্ষেত্রে ঢুকলো, ঘর বাঁধলো। প্রাকৃতিক কিছু কারণে কিংবা পারিবারিক কারণে মেয়েটি ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়লে, অন্য মেয়েদের মুখে যে কথাটি শোনা যায় সেটি হলো, “বড়লোক ছেলে/স্বামী বাগিয়ে নিয়েছে” নিজের কিছু করার দরকার কী। সংসার পাতার সময় হয়তো জানতোই না মেয়েটি তার প্রেমিক দশ বছর পর কোন পজিশনে থাকবে কিংবা সে নিজে কোন পজিশনে থাকবে। যদি এর উলটোটা হয়, কোন মেয়ের মুখে শোনা যায় না, “বড়লোক দেখে স্ত্রী বাগিয়ে নিয়েছে।“ তখন ভাব থাকে, “সোনার আংটি তাও আবার বেঁকা”। অন্যদের মেয়েদের নিয়ে যারা এই আলোচনাগুলো অবলীলায় করেন তারা তাদের নিজেদের মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে কিংবা মেয়ের ভাবী বর নিয়ে টনটন সজাগ। 

০৫-০৭-২০১৫

Thursday, 2 July 2015

ইগনোরেন্স–দ্যাই নেম ইজ বাংলাদেশ


বাংলাদেশিদের ফেসবু্কিং করতে সবসময় একটা হুজুগের দরকার হয়। কখনো ক্রিকেট, কখনো ব্লগার নাস্তিক, কখনো ভারত কিংবা কখনো পাকিস্তান নইলে রমজান উপলক্ষ্যে ইমানদার প্রোফাইল ফটো। কিছু না কিছু চাই মাঠ গরম রাখতে। এখন হিট যাচ্ছে, ‘সমকামিতা’এ্যামেরিকায় সমলিঙ্গের মানুষদের একসাথে বসবাসের অধিকার আইনত বৈধ বলে আদালত রায় দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অনুভূতিপ্রবণ মানুষদের কোমল মনে আবার হেঁচকি উঠে গেছে। ফেসবুকে প্রায় স্ট্যাটাস আর পোস্ট দেখছি, “সমকামিতা, মানি না, মানবো না”। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, ভাই আপনারে জিঙ্গাইসে কে? আপনার মতামত চাইছে কে? আপনে মানার কে? আপনে এ্যামেরিকার আদালতের থেইক্ক্যা বেশি বুঝেন? আপনাকে মানতে হবেই তাই কে বলছে?

প্রকৃতি বৈচিত্র্য ভালবাসে। কেউ বাঁহাতি হয়, কারো কারো ছটা আঙুল থাকে, কারো চোখ ট্যারা, কেউ কথা বলতে আটকায়, কারো চোখের রঙ কটা, গায়ের রঙ, উচ্চতা ভিন্ন হয় মানুষের, তৃতীয় লিঙ্গ কিংবা লিঙ্গহীন হয় তার বেলায়? সেখানে মানি না, মানবো না কেন আসে না? মানুষের অবস্থা দেখলে মনে হয়, ‘সমকামিতা’ একটি ফ্যাশনের বস্তু, দামি ব্র্যান্ডেড সানগ্লাস কিংবা পারফিউমের মতো, যা ইচ্ছে করলেই কেনা বা বদলানো যায়। যার যার স্বাভাবিক জীবন অবস্থা, কেউ বিষমকামী, কেউ সমকামী। কতো মানুষ আগে ‘সমকামি’ হওয়ার লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে, পরিবার-পরিজনের নিগ্রহের কারণে। বহু পথ পেরিয়ে আজকে তাদের জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ্যামেরিকার আদালতকে ধন্যবাদ এদের বহু দিনের কষ্টের প্রতি সম্মান জানানোর জন্যে। মুসলমান বা হিন্দু হয়ে জন্মানোর ওপর যেমন মানুষের নিজের কোন হাত থাকে না তেমনি বিষমকামী হবে না সমকামী, লম্বা হবে না বেঁটে তার ওপরও একজন মানুষের হাত থাকে না। যারা আজকে রায়ের বিরুদ্ধে নেচে বেড়াচ্ছে তাদের কী আদৌ ধারণা আছে, এই রায়ের পিছনে কতো চোখের জল, কতো অপমান, কতো মৃত্যু লুকিয়ে আছে যার ওপরে মানুষের কোন হাত ছিলো না?
 প্রাকৃতিক তো নিঃসন্দেহেই সমকামিতা, অন্তত ১৫০০টা প্রজাতিতে এর অস্তিত্ব আছে, যাতে মেরুদণ্ডীই ৩০০+। কিন্তু , প্রকৃতিতে আছে বলেই ভালো, এটা এক ধরনের ভ্রান্ত যুক্তি। এর নাম ন্যাচারালিস্টিক ফ্যালাসি বা এ্যাপিল টু নেচার। অজাচারও প্রাকৃতিক, বেগ চাপলে খোলাখুলি ত্যাগ করাও তাই, নগ্ন থাকাও প্রাকৃতিক। আবার, আইনকানুন তেমন প্রাকৃতিক না, রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ইত্যাদি বিশেষ প্রাকৃতিক না, তাই বলে এসব কে বা কারা ফেলে দিচ্ছে? প্রকৃতির দোহাই দিয়ে মানা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি বাধা দেওয়াও।


অনেকে বলছেন, এতে মানুষের অভ্যাস নষ্ট হবে, বিকৃত রুচির চর্চা হবে। সমাজ নষ্টামির দিকে ধাবিত হবে, সমাজ পচে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এজ ইফ যারা এগুলো করে যাচ্ছে তারা আদালতের এই রায়ের অপেক্ষায় ছিলো আর কী! নষ্টামির জন্যে মোটামুটি বিখ্যাত জায়গাগুলো হলো চার্চ, মাদ্রাসা, জেলখানা, হোস্টেল, ইত্যাদি। আজকাল এর মধ্যে স্কুল আর কোচিংও যোগ হয়েছে। যান ভাই, যারা মানুষের অধিকার মিসইউজ করে, তাদের পারলে ঠেকান। কথা দিচ্ছি, সমকামিতা কেন, কোন কিছু নিয়েই শব্দ করবো না, মুখ একদম বন্ধ। ধর্ষনের নৃশংসতা বন্ধ করুন। সমকামীদের নয় বরং বিষমকামীদের সামলান।



অনেকেই আবার দুজন মানুষের পাশাপাশি থাকার সার্থকতা নিয়ে পড়েছেন। বিয়ে বা লীভ টুগেদার লোকে কেন করে, কী তার উদ্দেশ্য আর কী তার বিধেয়। সন্তান উৎপাদন বিয়ের বা প্রেমের শেষ কথা না। বন্ধ্যা দম্পতিও যেমন পরম করুণাময়ের অশেষ ইচ্ছেয় আছে, তেমনি আছে স্বেচ্ছায় সন্তানহীন থাকাও। এমনকি বিয়ে না করে থাকার মতোও অনেকে আছেন। কাজেই বিয়ে=সন্তানোৎপাদন, এটা মোটেও কোনো উদাহরণ বা যুক্তি না। পৃথিবীর সব প্রেমই যেমন সন্তানপ্রসবে পৌঁছায় না বিষমকামীদের বেলায়, তেমনি সমকামীদেরও হবে না। মজার ব্যাপার হলো, সমকামীদের নিজেদের সন্তানও হয়। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রায় সত্তর শতাংশের ওপরেই সমকামীদের নিজস্ব জিনবাহী সন্তান থাকে, বাকিটা দত্তক। কাজেই বংশবৃদ্ধি থেমে যাওয়ার কল্পনাটা রূপকথা, কুযুক্তি। তাছাড়া, পৃথিবীর সব মানুষকে অবারিত সুযোগ দিলেও তারা কখনোই সমকামী হবে না, যেমন সমকামীরা বিষমকামী বা উভকামীতে রূপ নেবে না।


ধর্মপ্রাণ মানুষেরা যেকোন রহস্যময় ব্যাপারের মধ্যেই ওপরওয়ালার লীলাখেলা খুঁজে পান। কুরানে গেলমানের কথা উল্লেখ আছে, সেখানে সমকামিতার প্রশ্ন আসে না? সব ব্যাপারে যারা সৃষ্টিকর্তার রহস্যের ওপরে আস্থাবান, সমকামী মানুষের ব্যাপারে কেন তাদের আস্থা হোঁচট খাবে! সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ছাড়া তো এই সৃষ্টি আসে নি? তারা ন্যায় অন্যায় যাই করুক, তিনি দেখবেন, আমাদের মানা না-মানা নিয়ে বেহুঁশ হওয়ার কী আছে? কুরানে বলা আছে, “আশরাফুল মাখলুকাত” মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ। ক্যাটাগরি করা হয় নাই, কারা কারা তার মধ্যে আছে আর কারা নেই। আশাকরি কোরান সার্বজনীন হিসেবে, আস্তিক, নাস্তিক, হিন্দু, জৈন, সমকামী, বিষকামী, বাঙালি, পাহাড়ি সবার কথাই বলেছে। তাই ব্যাপারটা তাঁর হাতেই ছেড়ে দেন, তিনি দ্বীন দুনিয়ার মালিক, তিনিই দেখবেন।

আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে বলতে চাই, যে দেশে দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ভালবেসে একসাথে থাকার অধিকার নিয়ে টানাটানি চলে সে-দেশের মানুষের সমকামিতার মতো মানবিক ব্যাপার নিয়ে মানা না-মানার দিকটা না-ভাবলেও চলবে। আপনাদের মানার দরকার নেই, নিজ নিজ কাজেই বরং মন দিন

অনেকেই এটাকে একটা রোগ ভাবেন, তাদের জ্ঞানের পরিধি আর বোঝার মন বিচার করে, বলার কিছু নেই।

একজন মানুষকে সম্মান করতে, ভালবাসতে শিখুন। তার স্বাভাবিক জীবনটা স্বাভাবিক ভাবে দেখুন, তারও আপনার আমার মতো নিজের পছন্দে বেঁচে-থাকার পূর্ণ অধিকার আছে, সেটুকু মেনে নিন।

সর্বোপরি, কোন ব্যাপার নিয়ে জ্বালাময়ী, বিদগ্ধ স্ট্যাটাস দিয়ে লাইকের বন্যায় ডুবে যাওয়ার আগে, বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করুন, জানুন তারপর লিখেন। অন্যের জন্যে নয়, জানতে চেষ্টা করুন নিজের জন্যে। যে-ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে কোন কিছুর উপসংহার টানছেন সে-ধারণাটি কতোটুকু সঠিক, সেটি জানার প্রয়োজন আছে বই কি। হুজুগের বন্যায়, ভেসে যাচ্ছে ন্যায় আর অন্যায়...

তানবীরা
০৭/০২/২০১৫

Thursday, 18 June 2015

অভিমান নাকি নিস্পৃহতা

দিনের পর দিন কারো সাথে কথা না বললে কী হয়
মনের মধ্যে আর কোন গল্প জমে না
কারো জন্যে কোন অপেক্ষা থাকে না।
সবকিছুতেই কী একটা অদ্ভূত নিস্পৃহতা
আকাশে বড় একটা চাঁদ উঠলে মনে হয়, কী যায় আসে
ভরা পূর্ণিমায় পৃথিবীর গাছপালা হেসে লুটিয়ে পড়লে মনে হয়, বয়েই গেলো তাতে।
রঙিন ফুলে প্রজাপতির ওড়াওড়ি খানিকক্ষণ চুপটি করে দেখার পর
হয়তো অজান্তেই মৃদু নিঃশ্বাস বেড়িয়ে যায়
কিন্তু কী অদ্ভূত জানো
এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে অন্য একটি মাদকতা আছে।
কাউকে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে থাকার অন্যরকম ভাললাগা
যার নাম জানা যায় না, যার আসলে কোন নাম নেই।


কল্পনা করতে ভাল লাগে, আচ্ছা কেউ থাকলে কী হতো?
মনের মধ্যে নিশ্চয় কথার ঢেউ বুদবুদ ফুটাতো
সারাদিনের সারাবেলার অর্থহীন টুকিটাকি তাকে হয়তো জানাতে ইচ্ছে করতো
তার গলা জড়িয়ে ধরে কী লুটিয়ে পড়তাম?
সে কি এই আকুলতা অনুভব করতে পারতো?
নাকি বিরক্ত হয়ে বলতো, থামাওতো বকবক, সারাক্ষণ শুধু বকবক।
গোটা দিনের জাগতিক যুদ্ধ আর সারা পৃথিবীর কাঠিন্য যাকে ছুঁতে পারেনি
হয়তো তার এই সামান্য কথায় কী সে ভেঙে যেতো চুরচুর হয়ে?
দুচোখে কি অভিমানের কুয়াশা মেঘ করে নামতো? 


তার চেয়ে কথারা হারিয়ে যাক নয়তো কথারা বরং দূরে থাক
কথারা কেঁদে ঝরে পড়ুক অক্ষরমালা হয়ে আকণ্ঠ খাতা জড়িয়ে
না বলা কথারা না হয় মনেই গেঁথে থাকুক খেই হারিয়ে  
দ্রুত বহু দ্রুত কাটে জীবনের প্রহর কী লাভ বলো আর কথা বাড়িয়ে

তানবীরা
১৭/০৬/২০১৫