Thursday, 29 March 2018

প্রিয় ইশ্বর/খোদা/ভগবান

খুব ক্লান্ত বুঝি? ঘুমোচ্ছ? বিশ্রাম নিচ্ছো? অনেক অনেক কান্না’র শব্দে তুমি পর্যুদস্ত কি? তনু’কে ভাল্লুকে খেয়ে ফেললো এই কষ্টে তনু’র মা আজও বিলাপ করে কাঁদে, তনু’র বাবা শয্যাশয়ী। এরমধ্যে আর কত শত বিলাপের রোল, বিউটি, নুসরাত, এক বছড় দশ মাস বয়সী শিশুর কান্না ………। তারা জানে সব তোমার ইচ্ছেতেই হচ্ছে কিন্তু তারপরও অসহায় এই মায়ে’রা, এই পরিবার গুলো তোমার নাম নিয়েই বিলাপ করে চলছে, তোমার কাছেই লাগাতার তাদের ফরিয়াদ। এই পরিবার গুলো আর কখনও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না, কখনও ঈদ, পূজা, বৈশাখ তাদের বাড়িতে সেই আনন্দ নিয়ে আসবে না। এমনকি তাদের পরের বংশধর’রাও এই জেনেই বড় হবে, তাদের ফুপি, খালা এই দেশে বিনা দোষে নির্যাতিত হয়ে মারা গেছে যার বিচার পর্যন্ত হয় নি। তুমি সব কেড়ে নিয়েছো জেনেও, তোমাকেই বলছে, হে খোদা, তুমি এর বিচার করো। তোমার ইচ্ছেতে সব হারিয়েও তারা বিশ্বাস করে, তুমি ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। পুলিশ তো নেইই, আইন নেই, দেশ নেই, মন্ত্রী নেই, তাদের কিছু নেই শুধু তুমিই আছো।


অনেকদিন তো পশ্চিমে আরাম করলে এখন তুমি পূর্ব দিকে যাও, ওদের তোমাকে খুব প্রয়োজন। এখানে তো সব চলছে ঠিক মত, আজকাল এরা তোমাকে নিয়ে মাথা ও ঘামায় না, তেমন চাহিদা বা যত্ন আত্তিও নেই তোমার। ওদের বাজারে তোমার প্রয়োজন শেষ। যেদিকে তোমাকে সবাই অকাতরে ডেকে চলছে, সেদিকেই আছ তুমি মুখ ফিরিয়ে! কত চাহিদা তোমার ঐ বাজারে, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার নাম নিয়ে কত খেলায় না চলছে। তবুও “তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে?”


আচ্ছা, তুমি কি পূর্বের খবর কিছু রাখো? অত্যাচার-নির্যাতনের কারণ হিসেবে তারা মেয়েদের জামা কাপড়ের দোষ দেয়। তুমি তো অনেকদিন পশ্চিমে আছো, পশ্চিমের মেয়েদের জামা কাপড় কি তাহলে আকর্ষনীয় নয়? নাকি এখানকার পুরুষদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে? তারা কি যথাযথ পুরুষ নয়? তারা এসব স্বল্প বসনা মেয়ে দেখেও কেন তাদের আক্রমণ করার মত যথেষ্ঠ উত্তেজনা অনুভব করে না? মজার কথা কি জানো, পূর্বের এই বীর পুরুষেরা, যারা সেখানে ছয় গজ কাপড় পরা মেয়ে দেখেও নিজের উত্তেজনা সামলাতে পারে না সেই তারাই পশ্চিমে এসে কোন স্বলপ বসনা মেয়ের দিকে সোজাসুজি তাকানোর সাহস পর্যন্ত করে না, পুলিশ ডাকলে খবর হয়ে যাবে সেই ভয়ে। আমার অবাক লাগে, এই বীর পুরুষেরা নিজেদের পরিবার, বউ, বান্ধবী, প্রেমিকা, মেয়ে, বোন পাশে থাকার পরও সেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না কিন্তু প্রবাসে কেউ পাশে না থাকা সত্বেও নিজেকে সামলে রাখতে পারে, জানো? এখানে তারা “মানসিক” ভাবে ব্যালান্সড থাকে, অদ্ভূত লাগে না? উলটো হওয়ার কথা ছিলো না? সামথিং ইজ ভেরি রঙ, ইজ’ন্ট ইট?


অনেকেই বলে, তুমি নাকি ঈমানের পরীক্ষা নাও, ভগবান দুঃসময় দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। সত্যিই তাই? একটানা এই পরীক্ষা তুমি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র থুক্কু উন্নয়নশীল দেশের ওপরই নাও কেন গো? এদের তোমার চোখে পরে না, হ্যাঁ, এদের কথাই বলছি, এদের, যেখানে তুমি গ্যাঁট হয়ে বসে ফায়ার প্লেসে আগুন পোহাচ্ছ। আর যদিও তৃতীয় বিশ্বকেই গিনিপিগ ধরলে, তাহলেও অবিরাম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি মেয়ে গুলো, সংখ্যা লঘু মেয়ে গুলো, দরিদ্র শিশু-কিশোরী কিংবা মাদ্রাসা’র ছাত্ররা। এ কেমন অসম পরীক্ষা? তাদের তো এমনিই কিছু নেই তাদের কি পরীক্ষা নাও তুমি প্রত্যেকদিন? হ্যাঁ প্রত্যেকদিন? পরীক্ষা নিতে হয়, তাহলে নাও মন্ত্রী’র মেয়ের, বিত্তবান ব্যবসায়ী’র মেয়ের, কিংবা সামরিক বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা’দের মেয়েদের। তাদের তো অনেক আছে, তাদের ধরো তো দেখি। নাকি তাদের মেয়ে’রা যথেষ্ঠ আকর্ষনীয় পোষাক পরে না? তাদের বেলায় ঈমানী জোশ কাজ করে না? সব ক্ষমতা বুঝি দরিদ্রের মুখের হাসি কেঁড়ে নেয়ার বেলায়?


অভিনেতা মোশাররফ করিম একটি টক শো পরিচালনা করতেন, সেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, “সমস্যা পোষাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়”। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সমস্ত মৌলবাদি জনগন এই কারণে ক্ষেপে গিয়ে তাকে আক্রমণ করে। এর চেয়ে অত্যাশ্চার্য ঘটনা হলও, তার একজন সহকর্মী’ও তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি, তার পক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু গাজি রাকায়েতের লুচ্চামি ধরা পরার পর তাকে সহায়তা দিতে প্রায় পুরো নাটক পাড়া তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলো। তুমি বুঝতে পারো কোথায় নেমেছি আমরা? এই দেশে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও স্বাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছে। শিল্পী’রা তাদের গানে, কবিতায়, নাটকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করেছে, মুক্তিযোদ্ধা’রা তাদের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এই দেশেই গান হয়েছিলো, “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে মোরা যুদ্ধ করি, একটি ফুলের হাসি’র জন্যে মোরা অস্ত্র ধরি”, “ও, আমার সাত কোটি ফুল দেখো গো মালি, শক্ত হাতেই বাইন্ধো মালি, লোহারও ডালি”। এই বিপ্লব যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আজও সুস্থ সবল বেঁচে বর্তে আছে কিন্তু টুঁ শব্দটিও করে নি।


আগা থেকে গোঁড়া পর্যন্ত যখন কিছু পঁচে যায় তখন তার ধ্বংসই ভাল। “শেষ থেকে শুরু যে এবার” --- একটা প্রচন্ড সুনামি, ভূমিকম্প কিছু দিয়ে তুমি সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে আবার একটি ভোর আনো, বিশুদ্ধ ভোর। পঁচে যাওয়া এই ভূখন্ড তাকিয়ে আছে আজ একটি বিশুদ্ধ শুরু’র দিকে। “ভোর হয়নি, আজ হলো না, কাল হবে কি না, তাও জানা নেই।“ এক বছরের, তিন বছরের, পাঁচ বছরের শিশু গুলোকে তুমি নির্যাতন করে না মেরে, এমনিতেই ভূমিকম্পে মেরে ফেলো, তাদের পরিবার গুলো কোথাও তো স্বান্ত্বনাতো পাক। একটা তিন বছরের শিশু নির্যাতিতা হয়ে মারা গেলে তার বাবা-মা, ভাই-বোন কি কখনো আর স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে, শিশুটি শুধু মারা যায় না, পুরো পরিবারটা জীবন্মৃত হয়ে যায়। শুধু নিঃশ্বাস নেবার নামই কি বেঁচে থাকা? ঠোঁট বাঁকা’র নামই হাসি?


পাকিস্তানী’রা আর দেয় না হানা, নেই তো রাজাকার
তবু কেন এ দেশ জুড়ে, লাশের পাহাড়
জেনেছো দেশ তো স্বাধীন, আছে ওরা বেশ
দুঃখ কষ্টের আর নেই কোন রেশ
একদন্ড নিরাপত্তা নেই সেখানে, নেই সান্ত্বনা
শরৎবাবু এ চিঠি পাবে কি না জানি না আমি
এ চিঠি পাবে কি না জানি না

http://www.sylhettoday24.news/opinion/details/8/1126?utm_campaign=shareaholic&utm_medium=facebook&utm_source=socialnetwork

http://nari.news/post/prio-tanbira


ডাচ নির্বাচন

গতকাল মহাসমারোহে নেদ্যারল্যান্ডসে পৌরসভা নির্বাচন ও গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সেবা’র জন্যে উপদেষ্টা মন্ডলী’র প্রয়োজনীয়তা’র ওপর নির্বাচন হয়ে গেলো। যদিও এই সমারোহ টের পাওয়ার কোন উপায় নেই। কোলাহলবিহীন, প্রার্থীবিহীন, হাকডাকবিহীন, মিছিলবিহীন ম্যান্দামারা নির্বাচন। ভোট দিলে ফ্রিজ, কালার টিভি, এমনকি বিরিয়ানি খাওয়ানো’র ও কোন প্রতিশ্রুতি নেই। নিজের দরকার মনে হলে এসে ভুটিয়ে যাও, এমন নিদারুন অবস্থা। কি আর করা, তবুও যেয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন করে ভুটিয়ে এলুম। সামনের চার বছরের জন্যে প্রার্থী নির্বাচন করার দায়িত্ব এই নগরীর বাসিন্দাদের। এন্ডহোভেনের পৌরসভা’র সদস্য সংখ্যা পয়তাল্লিশ জন।


নির্বাচন হচ্ছে, আর যেয়ে মুখ বুজে একখানা ভোট ঠেকিয়ে আসবো, সেই ভাল বান্দা/বান্দী কি আমি? বসে বসে নেটানেটি করা হলো। কেন, কাকে, কি কারণে ভোটাবো সেটা জানতে তো হবে। নেট গুতাতে গুতাতে খুব ভাল একটা “প্রশ্নমালা” পেলাম। “প্রশ্নমালা”টি তৈরি করেছে, “দৈনিক এন্ডহোভেন”। আপনি আপনার শহরে কি কি চান, কি কি পেতে পারেন, কারা কি কি পরিবর্তন, পরিবর্ধন করবে বলে কি কি আশ্বাস দিয়েছে, সেরকম ত্রিশটি প্রশ্নের জবাবের ওপর ভিত্তি করে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন দলের প্রার্থীকে আপনি আপনার শহরের জন্যে চান।


প্রার্থীদের দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে এই জরিপ তৈরী করা হয়েছে। উত্তর দেয়ার সুযোগ আছে তিন রকম, ১. চাই, ২. কোন মতামত নেই ৩. চাই না।


উদাহরণস্বরুপ কিছু প্রশ্নঃ
পুরনো সুইমিং পুলটি মেরামত করে, আধুনিক সুবিধা দিয়ে নতুন করে চালু করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন নাকি ভেঙে ফেলে সেখানে অন্য একটা পার্ক তৈরী করা যেতে পারে?
শহরের ভেতরে গাড়ি চলাচল আরও কমিয়ে দেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
পুলিশের গায়ের ভেতরে ক্যামেরা কি অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে বলে আপনার ধারনা?
রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের জন্যে আলাদা বসবাসের জায়গা দেয়া উচিত?
নতুন চাকুরী ও কাজের জন্যে কি এ শহরের বেশি বেশি বিনিয়োগ দরকার?
ইত্যাদি ইত্যাদি ---- আগ্রহীদের জন্যে মন্তব্যের ঘরে লিঙ্কটি সংযুক্ত করে দেয়া হলো।


আমি নিবিষ্ট মনে চরম আন্তরিকতায় মনের মাধুরী মিশিয়ে এই “প্রশ্নমালা” শেষ পর্যন্ত পূরণ করলাম। দুই দলের সাথে পঞ্চাশ ভাগ মিল হলো, আর একদলের সাথে সাতচল্লিশ ভাগ তাই পঞ্চাশ ভাগ ওয়ালা একজনকেই ভোট দিলাম


এখানের নির্বাচনে আইভী – শামীম যত জন ইচ্ছে দাঁড়াতে পারে এক দলের হয়েই। “জো জিতা বোহী সিকান্দার” ---আমি একজন বিদেশী প্রার্থীকে (নন ডাচ) ভোট দিয়েছি। প্রার্থী লিস্ট থেকে বাছাই করলাম। আমার ধারনা, শুধু ইউরোপীয়ান পোশাক পরলে, ইউরোপীয়ান খাবার খেলেই “ইন্টিগ্রেশান” হয় না। যেহেতু দিনের পর দিন অন্যান্য নাগরিকের মত আমরাও সব ধরনের “কর” পরিশোধ করে যাই তাই নাগরিক ও জন জীবন গঠনে মতামত রাখতে অধিবাসী ডাচ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসা উচিত, সুযোগ পাওয়া উচিত। আমরা যে এখন এই সমাজেরই অংশ, বাইরের কেউ নই সেটা প্রতিষ্ঠিত করার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা তো এটাই।

প্রশ্নমালা পূরণ করতে করতে ভাবছি হায় ডিজিটাল বাংলাদেশ - তুমি এসব থেকে কত দূরে।


https://www.gemeentekieswijzer.nl/eindhoven/#intro

Monday, 12 March 2018

আহারে জীবন, আহারে জীবন, আহারে জীবন আহারে আহা..


এক একটা দিন এক একটা ঘোরের মধ্যে যায়। নিস্প্রাণ সোমবার সকালে অফিসের একঘেয়ে কাজের মাঝে নিউ ডট এনএল চাপতেই চক্ষু ছানাবড়া। বাংলাদেশ সবচেয়ে প্রথমে দাঁড়িয়ে আছে, দুর্ঘটনার খবর নিয়ে। হাত পা গুলো ঠান্ডা ঠান্ডা লাগতে লাগলো। আমাদের ছোটবেলা কেটেছে প্লেন হাইজ্যাক আর প্লেট দুর্ঘটনার খবরের মধ্যে দিয়ে কিন্তু তখন জানতাম এগুলো পেপারে থাকা লোকদের হয়, আমাদের মত সাধারণ মানুষদের হয় না। যতদিন না ঘরে ঘটলো উপলব্ধিই করতে পারলাম না, এরা কারো না কারো ঘরেরই মানুষ, ঠিক এই আমাদের মত।

কাজের কারণে ভাইকে অনেক ফ্লাই করতে হয়। একদিন দুপুরে বাসায় ফোন করে ভাইয়ের গলা পেয়ে খুব চমকালাম, অফিসে থাকার কথা। বেজার গলায় বললো, বাইরে যেতে হবে, ফ্লাইট রেডি হলে অফিস থেকে খবর দেবে, তখন যাবো। আমি হেসে ফেললাম কথা শুনে, ভাই আমার হাসি শুনে বললো, চার্ট এয়ারের অবস্থা তো জানো না, এসব প্লেনে উঠলে পেটের মধ্যে বাটার ফ্লাই দৌড়াদৌড়ি করে। এতটাই নাইফ আমি, ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ডে অভ্যস্ত যে, ভাইয়ের টেনশানটা অনুভবই করতে পারলাম না, উলটো বললাম, বাসার বড় কালো ছাতাটা নিয়ে যেও, এসব ফ্লাইট তো তত ওপরে ওঠে না, সময় মত প্যারাস্যুট না খুললে ছাতা খুললেও কাজ দেবে।

ফোন ছেড়ে যথারীতি আমি সেসব ভুলেও গেলাম। পরদিন সংবাদপত্রে সংবাদও দেখলাম, ইউনাইটেডের প্লেন দুর্ঘটনায় পরেছিল, প্লেনের জানালা ভেঙে যায়, ক্রু আহত হলেও, যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হন। আমার তাও একবারও মনে আসেনি, এখানে আমার ভাই থাকতে পারে। কারণ, আমি তো জানি সেসব যাদের হয় তারা শুধু পেপারে থাকে। যতক্ষণ বাসা থেকে আমাকে না জানালো হলো, আমি জানতামই না কি অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্যে।

কয়েকদিন ট্রমা’র মধ্যে ছিলাম, আস্তে আস্তে জীবনের নিয়মে ট্রমা কেটে বেড়িয়েছি। "ভাইয়া" আমার চেনা মাত্র একজন মানুষ যে বিমান দুর্ঘটনা সারভাইভ করেছে। তার অনেকদিন পর যখন কোন এক নির্জন সন্ধ্যায় ভাইয়ের মুখোমুখি হলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি সেই মূহুর্তে কি ভেবেছিলে ভাইয়া? ভাইয়া বললো, বেশি কিছু না, এই ভাবলাম, আব্বু কে হিসেব গুলো বুঝিয়ে দিয়ে যেতে পারলাম না, তুই এটা করে দিতে বলেছিলি, সেটা দেয়া হলো না, ও এটা বলেছিলো, সে ওটা বলেছিলো, জিনিস গুলো সব হাফ ডান পরে রইলো, শেষ করে যেতে পারলাম না, ক’দিন সবার একটু সমস্যা হবে। এর বেশি কিছু আর ভাবি নি।


আজ সারাদিন সেসব কথা মনে আনাগোনা করছে। ফেসবুকের হোমফীড জুড়ে কত মানুষের হাস্যোজ্জল মুখ ভেসে বেড়াচ্ছে, নানান ভাষায় চেক ইন দিয়েছে, হানিমুন, ফান, বেড়ানো কত কি? তারা শেষ মূহুর্তে বুক খামচে ধরে কি এরকম ভাবেই মৃত্যুর অপেক্ষা করেছে? টু ডু লিস্ট ভেবেছে? কি কি করা হলো না, কত কি করার ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল, কত ঘুরবে, ছবি তুলবে, বাড়ি ফিরে নেপাল থেকে কিনে আনা ওয়াল হ্যাঙ্গিং দিয়ে বসার ঘরটা সাজাবে কি করে মানা যায় তারা আর এখন নেই!


সব শোকের সান্ত্বনা হয় না।


আহারে জীবন, আহারে জীবন, আহারে জীবন আহারে আহা..


লেখার শিরোনামটি অনুপম রায়ের গানের ছায়া থেকে নেয়া

১২/০৩/২০১৮

Sunday, 4 March 2018

লাইফ আফটার ডেথ

অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবী দাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া
মুহূর্ত যায় জন্মের মতো অন্ধ জাতিস্মর
গত জন্মের ভুলে যাওয়া স্মৃতি বিস্মৃত অক্ষর
ছেঁড়া তাল পাতা পুঁথির পাতায় নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া.


গান গাই বটে, আসলে কি তাই? “প্রতিটি জীবিত মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে” জেনেই প্রতিটি জীবিত মানুষেরই মরনের পরেও বেঁচে থাকার এই আকুতি চিরন্তন। সেই থেকেই নানান সৃষ্টি। গল্প, কবিতা, গান, ব্যবসা, দান, অবদান, স্থাপনা, রাজ্য পাট কীসের মধ্যে দিয়ে নয়। নানান কীর্তি’র মধ্যে দিয়েই মানুষ মরনের পরেও বেঁচে থাকতে চায়। এই আকুতি থেকে প্রাচীন মিশরে “মমি”র চেষ্টা হয়েছে। মিশরের সমস্ত মন্দির গুলো’র গায়ে নানা রকম চিত্রে ইতিহাস গাঁথা বর্ননা করে সময়কে বেঁধে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে আজকের পরিমাপে তিন মানুষ সমান উঁচু উঁচু নিজেদের ভাস্কর্য। অটোমান, মুঘল সম্রাট’রা করিয়েছেন নিজেদের প্রতিকৃতি। নানা কবিতায়, গল্পে, গানে এই আকুতি বিভিন্ন ভাবে হাজার বছর ধরে নিবেদিত হয়েছে


সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার--
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক
আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।


“সৃষ্টিকর্তা”র ধারনাও কিন্তু এই আকুতির মধ্যে থেকেই এসেছে। মানুষ নিজের মত করে ভেবেছে বলেই, এই পূজা, এই আরাধনা, এই ইবাদতের অবতারনা। নইলে যিনি সর্বশক্তিমান তার কি দায় পরেছে কে তাঁকে নিয়ে ভাবছে কি না ভাবছে সেই কথা ভাবতে? মানুষের এই চাওয়ার সুযোগ নিয়েই যুগে যুগে এসেছে “ধর্ম” এর ধারনা। “লাইফ আফটার ডেথ” এই ধারনাটিই ধর্মের মূল পুঁজি, এটুকু সরিয়ে নিলে বাকী সমস্ত কিছুই অন্তসার শূন্য। মানুষ যেহেতু তার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি, তাই কাল্পনিক এই সৃষ্টিকর্তা’ও অমরত্ব চান তার সৃষ্টির মাঝে, স্তুতি চান, চান সবাই তার কাছে নতজানু হোক। প্রত্যেকটি ধর্মেই স্বর্গ, নরক, পুর্নজন্ম এই বিষয় গুলো এসেছে, কোন ধর্মই নেই যেখানে এই উপাদান গুলো নেই। ঘুরে ফিরে “লাইফ আফটার ডেথ” কিংবা অমরত্ব এর অসীম চাহিদাই ধর্মের আঁধার কিংবা আবশ্যিক উপাদান।


মরে গিয়েও অন্ততকাল বেঁচে থাকার এই আকুতি থেকেই মানুষের যাবতীয় সৃষ্টি, সন্তান, বংশ, পরিবার কি নয়। নিজের নাম যেনো রয় সদা বহমান। “কীর্তিমানের মৃত্যু নেই”। এই বিভ্রম থেকে পৃথিবীর খানিকটা অনুন্নত অংশ কখনও মুক্ত হতে পারবে না। প্রথম বিশ্বের জীবন এতটাই ব্যস্ততা আর জাগতিক চাপের মধ্যে দিয়ে যায় যে, কোন একটা “ধারনা”র পেছনে খরচ করার মত ঠিক এতটা সময় বাঁচে না সে দেশের মানুষের হাতে থাকে না। উন্নত জীবন ধারা যেমন দেয় অনেক ঠিক তেমনি নেয়ও অনেক। এখানে হাতের কাছে চিত্ত বিনোদনের এত খোরাক মজুদ যে, মানুষ বেঁচে থেকেই সব উপভোগ করতে চায়। অতৃপ্ত আত্মা’র অতৃপ্ত বাসনা, অন্য কোথাও অন্য কোন সময়ে বা জীবনে এখানে তত জনপ্রিয় নয়।


হয়ত এই একটা কারণেই “ধর্ম” ধারনাটি যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নির্দিষ্টি একটি জায়গাতেই প্রতিপালিত হয়ে আসছে। বিশেষ একটি ধর্ম লালনের যেই মূল খনি তারা এখন অর্থনীতিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ বলে তাদের জীবন রীতি পরিবর্তনের প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়েছেন, এত দিন চলছিল সবই কিন্তু অঘোষিত। এখন আর নেই কোন রাখ ঢাক গুঢ় গুঢ়। যত দিন দারিদ্রতা আর অতৃপ্ত আত্মার অতৃপ্ত বাসনা থেকে পৃথিবীর ঘন জনবসতিপূর্ণ এই এলাকা’র মুক্তি আসবে না, থাকবে না সুস্থ চিত্ত বিনোদনের সুযোগ, জীবন যাত্রার মান মানুষকে মানবিক জীবন ধারন করার সুযোগ করে দেবে না, ধনী আর দরিদ্রের এই অসম পার্থক্য বিরাজমান ততদিন এই কাল্পনিক সুখের আনন্দ থেকে কেউ তাদের বঞ্চিত করতে পারবে না, এই যে তাদের একমাত্র সুখ। সামগ্রিকভাবে অনুন্নত জীবন যাপন, চিত্ত বিনোদনের অপযার্প্ত সুযোগ, নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে এই ধারনাটিকে টিকিয়ে রাখবে।


আমি চলে গেলে ফেলে রেখে যাব পিছু.
চিরকাল মনে রাখিবে, এমন কিছু,.
মূঢ়তা করা তা নিয়ে মিথ্যে ভেবে।
ধুলোর খাজনা শোধ করে নেবে ধুলো,
চুকে গিয়ে তবু বাকি রবে যতগুলো.
গরজ যাদের তারাই তা খুঁজে নেবে।

Sunday, 25 February 2018

বায়োস্কোপঃ পদ্মাবত

বানশালি’র ফিকশন সিনেমা “পদ্মাবত” নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে নানা আঙ্গিকে নানা স্তরে। নানা মানুষ নানা মত দিচ্ছেন। নারীবাদী’রা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, সাধারণ মানুষ যারা সিনেমা আর বাস্তবতার তফাৎ বোঝে না তারা পদ্মাবতীর উদাহরণ দিয়ে দিয়ে মেয়েদের জীবন আরও দুর্বিসহ করে তুলবে। তাদের কথায় যুক্তি আছে বইকি, এমনিতেই যেকোন দুর্ঘটনার জন্যে উপমহাদেশে মেয়েদের চাল, চলন, পোশাকআশাককে দায়ী করা হয়, পরিবার থেকেই বলা হয়, মুখপুড়ি, তুই মরিস না কেন? আর এখন তো হাতের কাছে রয়ে গেলো জ্বলন্ত প্রমাণ। “পদ্মাবতী” মরলো তুই মরিস না কেন? এই বাক্যবান কত মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় কে জানে। দু’হাজার আঠারো সালে সিনেমার এই এন্ডিং মেনে নেয়া যায় না।

বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষজন ও বানশালি’র অবিচারে ব্যাপক ভাবে আহত হয়েছে। পুরো পৃথিবী দুহাজার আঠারোতে থাকলেও বাংলাদেশ এখনও পাঁচশো সত্তর খ্রীষ্টাব্দেই আটকে আছে, আরব বেদুইনদের মরুভূমিতে এলাস খিলজীকে মন্দ বলা বানশালি মোটেই উচিত হয় নি রতন সিং এর কীর্তি কিছুই চোখে দেখে নাই শালা, সাম্প্রদায়িক কোথাকার রতন সিং এর মত অত্যাচারী রাজা আর হয়? তিনি কয়দিন রানীদের সাথে থাকতেন? তার রাজবাড়ি ভর্তি ছিলো রক্ষিতা দিয়ে এসেছে খিলজী নিয়ে মুভি বানাতে

আচ্ছা, খিলজী আর রতন সিং এর তুলনা কোথা থেকে আসে! রতন সিং ভারতের সন্তান আর খিলজি তুর্কি থেকে আসা বহিরাগত যার উদ্দেশ্যই ছিল ভারতবর্ষ লুটেপুটে খাওয়া গতানুগতিক বক্তব্য, “মুঘল সম্রাটরা ভারতবর্ষকে হিন্দু রাজাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই সময়ে ভারতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়“  আচ্ছা!!!– সেই প্রভূত উন্নতি গুলো কি কি? বাসস্থান, জীবিকা, স্বাস্থ্য, খাদ্য কোন দিক থেকে সাধারণ জনগন উন্নতির মুখ দেখেছিলো? হ্যাঁ, বড় বড় ইমারত বা স্থাপনা তৈরী হয়েছিল কিন্তু সে তো তাদের নিজেদের প্রয়োজন ছিল ভারত তো মুঘলদের দেশও ছিল না, তারা এটাকে শক্তি বলে হস্তগত করে নিজেদের বিলাসের প্রয়োজনে, কি যুক্তিতেই বা তারা ভারতবর্ষের উন্নতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন? বরং মুঘলদের পুরো সময়টা কেটেছে নিজেদের মধ্যে বিশ্বাসঅবিশ্বাস, মসনদের ষড়যন্ত্র, দ্বন্দ্ব আর কাটাকাটি মারামারি মধ্যে দিয়ে, কে কার চেয়ে বেশি ভোগ করবে এই ছিলো তাদের লড়াই মানছি আমি, হিন্দু রাজারা খুব খারাপ ছিলেন, তাতে কিন্তু বাইরে থেকে এসে কারো ভারতবর্ষ অধিকার করে নেয়া জায়েজ হয়ে যায়?   

যে যুক্তিতে আলাউদ্দিন খিলজী কিংবা মুঘলদের ভারতবর্ষ দখল জায়েজ হয় সেই একই যুক্তিতে এমেরিকার ইরাক কিংবা আফগানিস্তান দখলও জায়েজ হয় তখন আবারএমেরিকা নিপাত যাকশ্লোগানে রাজপথ মুখরিত মুঘলদের থেকে শাসন ব্যবস্থা বা শাসকদের দিক থেকে ইংরেজরা অনেক উন্নত ছিলো। তাহলে কোন যুক্তিতে বৃটিশ তাড়ানো হলো? স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়! উপমহাদেশে কোন ন্যায়, যুক্তি, বিচারের ব্যাপার নেই, একটি শব্দ ধর্মদ্বারা সব বুদ্ধিবৃত্তি পরিচালিত হয়। আবার ট্রাম্প আর সৌদি যখন এক সাথে নাচ গান করে তখন কবি নীরব এদের সব কিছুতে আলাদা বিচার একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্যে চারটি মৌলিক উপদান লাগে, জাতীয়তা, ভাষা, নির্দিষ্ট ভূখন্ড এবং ধর্ম আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধর্ম এমন কিছু আবশ্যিক উপাদানও নয়, সেটা পৃথিবীর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে না, এমেরিকা-ইউরোপ দেখার দরকার নেই, ভারতই তার উজ্জল দৃষ্টান্ত ধর্ম যদি মূল ভূমিকা রাখতো তাহলে ভারতের আজ খান খান হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো

মুঘল সম্রাট’রা খুবই শিক্ষানুরাগী ছিলেন, নিজেরা ছবি আঁকতে ভালবাসতেন, কবিতা লিখতেন, সঙ্গীতের চর্চা করতেন এবং করাতেন। এমনকি কেউ কেউ গোপনে শাহজাদীদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করিয়েছিলেন। বহু মাদ্রাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠিত করেছেন, স্কুল – কলেজ এর সংস্কার করিয়ে বিভিন্ন বৃত্তির ব্যবস্থাও করেছিলেন কিন্তু কোন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় নি। যেমন হয়নি হাসাপাতাল প্রতিষ্ঠা। তবে প্রচুর রাস্তা ঘাট বানিয়েছিলেন, মসজিদ বানিয়েছিলেন তারা। সেই ঐতিহ্য বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা আজও ধরে রেখেছে। নির্বাচনী এলাকায় রাস্তা আর মসজিদ বানাতে কখনও ভুল হয় না তাদের। কিন্তু কিছু টাউট বাটপার ছাড়া আর কারও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না, সাধারণ জনগন যেই তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই থেকে যান ঠিক মুঘল শাসন ব্যবস্থা’র মত।

(বেশির ভাগ বাংলাদেশীদের মতে) হিন্দু নাপাক অত্যাচারী রাজাদের হাত থেকে মহান মুসলিম বীর আলাউদ্দিন খিলজী ভারতকে উদ্ধার কিংবা রক্ষা করেছিলেন, আসুন আমরা এই বীরের জীবনীটি দেখি এক নজরেঃ আলাউদ্দিন খিলজী নিজের আপন চাচা যিনি তার শ্বশুরও বটে তাকে খুন করে দিল্লীর গদি দখল করেন। তিনি নিজে বেশুমার মদ খেলেও মদ্যপান নিষিদ্ধ করেন সে সময়। জুয়াখেলা, পতিতা গমন সব নিষেধ করেন, পতিতাদের বলেন বিয়ে করতে নইলে তাদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে মর্মে ঘোষনা দেন। তার দুজন স্ত্রী ছিলো। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি পেডোফাইল এবং বাইসেক্সুয়ালও ছিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তার হেরেমে সত্তর হাজার মানুষ ছিলো, যার মধ্যে ত্রিশ হাজার স্ত্রী লোক ও বাকি পুরুষ আর বাচ্চা। তিনি এক সময় নিজেকে প্রফেট হিসেবে ঘোষনা দেন এবং মোল্লাদের বাধ্য করেন ইসলাম ধর্মকে ম্যানিপুলেট করে তাকে স্বীকৃতি দান করার জন্যে। ইসলামী সংস্কৃতি মেনে, তার খাস আদমি মালিক কাফুর সিংহাসনের আশায় তার শিরায় বিষাক্ত ইনজেকশান দেন এবং বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটে এবং মালিক কাফুর খিলজী’র দুই পুত্রকে অন্ধ করে। তাকে মেহরুলির কুতুব কমপ্লেক্স এ কবর দেয়া হয় খুব চুপচাপ ভাবে

 খিলজি শুধু চিতোরই লুটপাট করেন নি, রানথাম্ভোরে দুর্গ, মালোয়া থেকে মান্ডু হয়ে চান্দেরী আর ধার পর্যন্ত দখল করেছিলেন। বেশীর ভাগ যুদ্ধেই প্রথম বারে হেরেছিলেন। তেরশ আট সালে ওয়ারানগাল যুদ্ধে জয় লাভ করেন এবং কোহিনূর হীরা লুট করেন। বালগানা রাজ্যে জয় করে, রাজা রায় করনের কন্যা দেভালা দেবীকে বন্দী করে দিল্লী নিয়ে এসে তার বড় পুত্র খিজির খানের সাথে তার বিয়ে দেন। মংগলদের আক্রমণ থেকে চারবার এই তুর্কি বংশোভূত রাজা ভারতবর্ষকে রক্ষা করেন। বর্গা চাষীদের পঞ্চাশ ভাগ কর তিনি জমি’র মালিকদের ওপর অর্পণ করেন। তারপরও বর্গা চাষীদের হাতে তেমন কিছু বাঁচত না কারণ আলাউদ্দিনকে খুবই উচ্চহারে কর হারে পরিশোধ করতে হত। সমাজে আভিজাত্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্যে তিনি বিয়ের ব্যাপারে কিছু নিয়ম তৈরী করে দিয়েছিলেন। অভিজাত সমাজে বিয়ের সম্বন্ধ করতে তার অনুমতি লাগত। তিনি দিল্লীতে সৈন্য আর সাধারণদের জন্যে সুলভ মূল্যে খাবার, কাপড়, ওষুধ, ঘোড়া ইত্যাদি কেনার দোকানের ব্যবস্থা করেছিলেন। দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজের পরিচয় সম্বলিত বিভিন্ন ধাতব, তামা, রুপার মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন

মহারাষ্ট্রের টেক্সট বই থেকে মুঘলদের ইতিহাস বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য বলে খ্যাত “তাজমহল”কে উত্তর প্রদেশ তাদের ট্যুরিজম বুকলেট থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। যদিও তাজমহল বাদ দেয়া আমার দৃষ্টিতে একটু বাড়াবাড়ি। পূর্ব পুরুষরা তাদের মাতৃভূমি রক্ষা করতে পারে নি সেই রাগ এখন ঢেলে আর কি হবে? তার থেকে বরং ট্যুরিস্টদের এই দেখিয়ে দেখিয়ে টু পাইস যা আসছিলো তা দিয়ে দেশে’র যদি কোন কাজ হয়। নিজেদের বুকলেট থেকে বাদ দিলে কি হবে, বিশ্বজোড়া সবাই তো ভারত মানেই তাজমহল আর মুঘল স্থাপত্য ভাবে আর জানে। অন্তর্জালে অনেক আলোচনা খুঁজে পেলাম, ভারতে আলোচনা হয় “মুঘল শাসন না ইংরেজ শাসন ভাল ছিলো এই নিয়ে”কিন্তু বাংলাদেশ? ইয়েস বাংলাদেশ আটকে আছে বাংলাদেশে। আমাদের টেক্সট বই গুলো থেকে হিন্দুদের লেখা বাদ দেয়ার পায়তারা করা হবে কিন্তু যুক্তিশীল চিন্তা ভাবনা নিয়ে লেখা কিছুই পড়ানো হবে না। নির্মোহ ইতিহাস কবে আসবে বাংলাদেশের টেক্সটবুকে কে জানে। স্মৃতি থেকে লিখছি, ভুল হতেও পারে, আমাদের প্রাইমারি টেক্সট বইয়ে শিরোনাম ছিল, “বখতিয়ার খিলজী’র ভারত বিজয়”, আদতে সেটা হত “বখতিয়ার খিলজী’র ভারত দখল”। ট্রেনিং দিয়ে গবেটের পর গবেট জেনারেশান তৈরী হবে। বখতিয়ার খিলজী কিংবা বাবরকে ইতিহাসের পাতায় আঁকা হবে মহান বীর হিসেবে। বেকুব গুলো বীরদর্পে ফেবু ভেঙে লড়াই করবে, রতন সিং আর সব হিন্দু বাজে রাজাদের কাছ থেকে তাদের মাতৃভূমি কেড়ে নিয়ে খিলজী আর মুঘল’রা ভারতে সু’দিন নিয়ে এসেছিলো তুর্কি বংশোভূত এই বহিরাগতদের ভালবাসার বন্যায় ভারতবর্ষের দুকূল প্লাবিত হয়ে গেছিলো। আর হ্যাঁ করবে নাই বা কেন, সেই প্লাবনের কিছু ছিটেফোঁটা তো দিল্লী থেকে বাংলাদেশ অব্ধি এসে কিছু পৌঁছেছিলো বটে।    





তানবীরা
১৩/০২/১৮