Sunday, 24 May 2015

ভিন্ন চোখে দুনিয়া দর্শন – ৩

দেশে তখন গজাগর মঞ্চের উত্তাল জোয়ার। এর মধ্যে সাঈদী সাহেব চাঁদে গেলেন। চারধারে টালমাটাল অবস্থা। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গজাগর শুরু হয়েছেদিকে ইমানদার ব্যক্তিরা আছেন ফাপড়ে, মোল্লা হুজুরের মতো পরহেজগার মানুষের প্রতি আঙুল-তোলা! এর মধ্যে আবার সাঈদী গেলেন চাঁদে। মান নিয়ে পুরাই ধ্বস্তাধ্বস্তি যাকে বলে।

সাজিয়ার মা হুজুরদের প্রচণ্ডই ভক্তিশ্রদ্ধা করেন কিন্তু বাসায় তার ছেলেমেয়েরা রোজ গজাগর মঞ্চে যায়, লেডিস ক্লাবেও গজাগরণের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। তিনি দোদুল্যমান অবস্থায় আছেন। বাড়িতে বাসন মাজতে যে-মেয়েটি আসে সে পরদিন বেশ দেরিতে এসেও খুব উত্তেজিত। উত্তেজনার কারণ আগের রাতে হুজুরকে চাঁদে দেখা গেছে।

সকালে নাস্তার টেবিলে এই নিয়ে ছেলেমেয়েদের এক প্রস্থ হাসাহাসি উনি অলরেডি গিলেছেন। তাই আর আগের মতো মান তার পোক্ত নেই। মেয়েটির উচ্ছ্বসিত গলার বর্ণনা শুনে দ্বিধা নিয়ে গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুই নিজে দেখেছিস?

সাথে সাথে উত্তেজিত গলার উত্তর, এতো সোজা নাকি গো খালাম্মা? এতোই সোজা? মানের জোর থাকতে হয় গো খালাম্মা, শক্ত মান লাগে। সবাই কি দেখতে পায়? সব পাক জিনিস কি সবাই ভাগে পায়?

সাজিয়ার মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে?

আমি দেখি নাই, তয় আমাদের বস্তির রাশেদের বাপ চাচা আর রহিমা খালায় দেখছে। তারা সক্কলরে কইছে, চাচায় রুজ মসজিদে যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, পাক সাফ মানুষ। বস্তির কারো কিছু হইলে চাচায় পানি পড়ায় দিলে, রুগ বালাই এক্কেরে খতম। রহিমা খালা তাহাজ্জুদের নামাজ পইড়া, জায়নামাজে বইসা তসবিহ টিপতে ছিলো আর জানালা ছিলো খুলা।

ৎকা খালার চোখ গেলো উপরে, খালাম্মাগো খালাম্মা, কী কইতাম। এই দেহেন আমার শইলের লুম গুলা কেমন খাড়া খাড়া হইয়া গ্যাছে। খালায় দেহে, চান্দের মইধ্যে জানি কী দেহা যায়! জায়নামাজ ছাইড়া, জানালার কাছে যাইয়া দেহে, নূরানি চেহারা চান্দের ভিতরেগো খালাম্মা। ইয়া চাপ দাড়ি, মাথায় টুপি, হুজুরে হাসতছে। একটুক্ষণ না অনেকক্ষণ আছিলো গো হুজুর চান্দের ভিত্রে।

রহিমা খালারতো পুরা বেহুঁশ হইয়া যাওনের অবস্থা। সকালে উইঠ্যা না আমরা হুনি এই কিচ্ছা। এমন পাকসাফ দাড়িওয়ালা মানুষটার পিছে শ্যাখের বেটি লাইগগা রইছে। হ্যার নাকি বিচার হইবো। দ্যাশ আর দ্যাশ থাকবো না গো খালাম্মা, আল্লাহর গজবে সব শেষ হইয়া যাইবো গো সব শ্যাষ।

তো হুজুর যদি অন্যায় করে তো বিচার হবে না?

কন কী খালাম্মা, তওবা তওবা, আল্লায়ও গুসসা করবো শুনলে। এমন নূরানি চেহারা, এমন নেক বান্দা, আল্লাহর ওলি হ্যায় কী কুনু দুষ করতে পারে?

দোষ না করলে কি এমনি এমনি ধরছে?

সেটাই তো কই খালাম্মা, সেটাইতো কই। সব তো আমি আপনে বুঝুম না জানুম না। ইন্ডিয়ার পইসা খাইয়া শেখের বেডি এখন এসব করতেছে। হিন্দুগো পইসা খাইয়া, আল্লাহ খোদার পিছে লাগছে। গজব হইয়া যাইবো গো খালাম্মা, দেইখেন আবার আইবো ঝড়, তুফান, বইন্যা...

সাজিয়ার মা বিরক্ত হয়ে বললেন, আসলে আসবে, তুই এখন কাজ শেষ কর। বাসন মাজা ঝি আরো কিসব যেন বকতে বকতে কাজ করছিলো, সাজিয়ার মা আর সেখানে দাঁড়ান নি তার সেসব শুনতে।

এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর সাজিয়া বাড়িতে ফোন করলো। রুটিন মাফিক খোঁজ খবর কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর দেশের কথা আর অন্যান্য খবর নিয়ে আলোচনা শুরু হতে সাজিয়ার মা বেশ রসিয়ে রসিয়ে সাজিয়াকে ঝি এর সাঈদীকে চাঁদে দেখার গল্প বলতে লাগলো। ঘটনা শুনতে শুনতে সাজিয়া বিরক্ত হয়ে মা’কে বলেই ফেললো, মা তুমি হেসে যাচ্ছো মজার ঘটনা ভেবে? তোমার কোন ধারনা আছে এই নিয়ে দেশে কী তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে?

সাজিয়ার বিরক্ত গলা শুনে মা একটু থতমত খেয়ে গেলো, তিনি এতোকিছু ভাবেননি তখনো। সাজিয়া ক্লান্ত গলায় বললো, মা টিভি খোল, দেখো এই মূর্খের দেশে একটি গুজব ছড়িয়ে কী তান্ডব বাঁধিয়ে দিয়েছে। মানুষ পর্যন্ত খুন হয়েছে মা, হাসির পর্যায়ে আর নেই।

সাজিয়ার মা অবাক হয়ে গেলেন। ক্লান্ত কন্ঠে সাজিয়া বললো, সবকিছু এতো হালকাভাবে নিয়ে হাসাহাসি করার পরিস্থিতি আর বাংলাদেশে নেই মা। সবকিছুই উদ্দেশ্যে নিয়ে করা হয় আর তাতে কিছু মানুষের বাড়িঘর পোড়ে আর কিছু মানুষ প্রাণ হারায়। সহজ সরল এই মানুষগুলোকে যা বোঝানো হয় তাতেই তারা উত্তেজিত হয়।

এরপর আবার এক কথায় সে কথায় কথার মোড় ঘুরে গেলে সাঈদী প্রসংগ চাপা পরে যায়। ফোন ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে যখন একা একা সাজিয়া সংসারের কাজ করছিলো তখন আবার এ ভাবনা মাথায় ফিরে আসতেই তিক্ততায় মন ভরে উঠলো তার।


তেতো মন আর জ্বালাধরা বুক নিয়ে সে ভাবতে লাগলো, যুদ্ধাপরাধের বিচারে দু’চারজন চিহ্নিত অপরাধীর গ্রেপ্তার ও বিচার হলো না-হয়, যদিও সেটাও পুরো নিশ্চিত হওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে আজকাল, কিন্তু তারপর সারাদেশ জুড়ে এই যে অপরাধীদের ছানাপোনারা তাদের বিষদাঁত নিয়ে নীরবেনিভৃতে ছড়িয়ে আছে, তার খবর কে রাখছে? কাল যদি সুযোগ আসে, তাদের সব হলাহল নিয়ে তারা একাত্তরের মতোই আবারো ঝাঁপিয়ে পড়বে বিরোধীপক্ষের ওপর। মুক্তচিন্তার মানুষ তো বটেই, সাধারণ জনতাও তো তাদের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচবে না। বিরোধীদলে থাকার পরও যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা, থানা আক্রমণ, পুলিশ হত্যা করে যাচ্ছে শুধু চিহ্নিত, জঘন্য, খুনি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে, ক্ষমতায় তারা যদি যায়, তাহলে যে কী রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে তারা ভাবতেই শিউরে উঠলো সে। ঘনকৃষ্ণ হতাশ অন্ধকারে সে বড্ড অসহায় বোধ করতে লাগলো, প্রচণ্ড হীনবল। কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো?


যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর চেহারা চাঁদে দেখা গেছে বলে ২ মার্চ শনিবার দিবাগত রাতে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামের কিছু কিছু এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অনেক স্থানে মসজিদের মাইকযোগে চাঁদে সাঈদীকে দেখতে পাওয়ার ঘোষণা দেয়া হলে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে  আসেন।

 
গত শনিবার রাত আনুমানিক ১০ টার পর সাতকানিয়া উপজেলার অনেক মসজিদ থেকে মাইকে হঠাত্ ঘোষণা দেয়া হয় আকাশে চাঁদের মাঝে সাঈদীকে দেখা যাচ্ছে। আপনারা সবাই ঘুম থেকে উঠুন। এভাবে কয়েকবার ঘোষণা দেয়ার পর সংশ্লিষ্ট মসজিদের আশেপাশে শত শত নারী-পুরুষ জড়ো হয়ে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এ গুজবকে কেন্দ্র করে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত সাঈদীর মুক্তির দাবিতে পাড়ায় পাড়ায় মিছিল করা হয়। হাতিয়ারপুল জামে মসজিদ, ভোয়ালিয়া পাড়া মসজিদ, দক্ষিণ ভোয়ালিয়া পাড়ার ভাঙ্গা মসজিদ, খলিফা পাড়া মসজিদ, সামিয়ার পাড়া মসজিদ, ছিটুয়া পাড়া মসজিদ, দক্ষিণ সামিয়ার পাড়া লামবইত্তাবো মসজিদ, ছগিরা পাড়া মসজিদ, মিয়াজান পাড়া মসজিদ, সাইল্ল্যা বো মসজিদ, চাঁদগাজী মসজিদ, কেওচিয়া মসজিদ, সোনাকানিয়া মসজিদ, পূর্ব-পশ্চিম গাটিয়াডাঙ্গা মসজিদ, রামপুর মসজিদ, মন্তার বো মসজিদ, উত্তর ছমদর খন্দকার পাড়া মসজিদসহ উপজেলার বিভিন্ন মসজিদে মাইকে এগুজব প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, চাঁদে সাঈদীকে দেখতে পাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন। http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMDRfMTNfMV8yXzFfMjM1NjI=

হঠাত্ জামায়াত-শিবির কর্মীরা হরতাল সমর্থনে ও সাঈদীর মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাংচুর করে ও আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের মেরাজ কম্পিউটারের দোকান লুট করে। এরপর বেলকুচি থানা ঘেরাও করার চেষ্টা করলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ২০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল ছোঁড়ে। পরে সেখান থেকে ফিরে বিক্ষোভকারীরা শ্রমিক লীগের অফিস ভাংচুর করে। দুপুরে বিক্ষোভকারীরা উপজেলার কান্দাপাড়া বাজার ১১টি দোকান ও ৩টি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়ি ভাংচুর ও লুট করে চলে যায়। পরে বেলকুচি উপজেলায় আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাংচুরের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা উপজেলা জামায়াত অফিস, জামায়াত নেতা আব্দুল মান্নানের বাড়ি ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগ করে। এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিন ভূইয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদীয়া স্টিল করপোরেশন, বিএনপি নেতা নুর হোসেন মণ্ডলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মণ্ডল ট্রেডার্স, বিএনপি সর্মথকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আল্লার দেয়া ভাণ্ডার, রিতা ফার্মেসি, শামিম ফার্মেসি, মিম ডেন্টাল, কমফোড প্যাথোলজি, খান অটো হাউজ ভাংচুর, অগ্নি সংযোগ করে বিক্ষুব্ধরা। দুপুরে উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বেলকুচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে তার অবস্থা খারাপ হলে তাকে এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এলাকায় বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন রয়েছে। http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2013-03-03/news/333589
পরবর্তী পর্যাবেক্ষনে দেখলাম নিশিরাতে বিভিন্ন মসজিদ হতে মাইকের এই কান্ডজ্ঞানহীন আহ্বান কি প্রমাণ করে না , সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মহিলা পুরুষ জামাত-শিবিরের ধর্মীয় মিথ্যাচার বা ধর্মীয় ভন্ডামির আরেকবার প্রকাশ্য এবং হাস্যকরের খোরাক হয়ে পড়লেন। যখনি ধর্মান্ধ মানুষরা রাস্তায় নেমে আসল কিছুক্ষনের মধ্যেই নারায়ে তাকবির শ্লোগান আছড়ে পড়তে শুরু করল। চাপাবাজ কুলঙ্গাররা বজ্রকন্ঠে মাইকে সমানতালে মিথ্যাচার করতে লাগল এই সরকার নাস্তিক, এই সরকারের জন্যে দেশের আলেমরা আজ কারাগারে, এই সরকার ইসলাম ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করবে, অচীরেই এই দেশে গজব নামবে আল্লাহ পাক এই জন্যে সাঈদী সাহেব কে চাঁদে হেফাজত করে রেখেছেন। মূর্হুমূহ শ্লোগানের মধ্যে দিয়ে তারা ফজরের নামাজের সাথে সাথে পাখি জাগার আহে-ভাগেই লাঠিসোটা, দেশি অস্ত্র নিয়ে পুলিশের উপর হামলে পড়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়িতে ভাংচুর শুরু করে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রেলওয়ে ষ্টেশনে আগুন, উপজেলা প্রশাসনে আগুনে দিয়ে শত শত কক্টেল বিস্ফরন করে , প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ইতিমধ্যে ৭ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ভোর ৬টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত পৌরা এলাকা জুড়ে বিভিষিকাময় তান্ডবের সৃষ্টি হলে, সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে উত্তপ্ত পরিবেশকে এখন পুরোপুরি শান্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
http://www.shobdoneer.com/kazladidi/41585

তানবীরা
০৪/০৫/২০১৫

Thursday, 14 May 2015

স্বপ্নহীন জীবনে যখন

আমি ঢাকার যে এলাকায় বড় হয়েছি সেখানে আমরা চার পুরুষ ধরে আছি হয়তো এখন পাঁচ পুরুষে পৌঁছে গেছি, কে জানে। আমাদের এলাকাতে আরো অনেকেই আছেন যারা কয়েক জেনারেশান ধরে এখানে আছেন।বাবাদের কাছে গল্প শুনেছি ছোট বেলায় বাতিওয়ালা এসে রাস্তায় বাতি জ্বেলে দিয়ে যেতো। গ্রাম থেকে লঞ্চে সদরঘাট এসে অনেকেই মাথায় বোঝা নিয়ে ধানমন্ডি, গ্রীনরোড পর্যন্ত হেঁটে আসতো। অনেক এলাকাতেই দিনের বেলায় শেয়াল ডাকতো, ঘন জঙ্গল ছিলো। আমি নিজেও ছোট বেলায় অনেক ফাঁকা ঢাকা দেখেছি। এখন ঢাকা অনেক ব্যস্ত, আমরা যে এলাকার বাসিন্দা সেতো মহাব্যস্ত।

জীবন নিয়ে আমরা নিজেরাও ব্যস্ত। পাড়ার, স্কুলের বান্ধবীরা, বন্ধুরা সবাই ছড়িয়ে পড়েছি পৃথিবীর নানা কোণে জীবিকা কিংবা ভাগ্যের টানে। প্রযুক্তির কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকলেও যোগাযোগটা রয়ে গেছে, হারিয়ে যায়নি। এক জায়গায় বাড়ি বলে ঘুরে ফিরে ছুটি ছাঁটায় দেখা হয়ে যায়, আড্ডা চলে প্রাণবন্ত, ছোটবেলার ভালবাসার অনেকটাই এখনো রয়ে গেছে বরং দিন যাওয়ার সাথে সাথে সেটা আরো গাঢ়ো হয়েছে।জীবনের বিরাট একটা পর্ব শেষ করে ফেলেছি প্রায় সবাই। এখন সাহিত্যিক ভাষায় মধ্যবয়স পার করছি। সময় দ্রুত যাচ্ছে। ছেলে মেয়েরা চোখের পলকে বড় হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই কথা হয়, ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেলে, আমরা কী করবো? পুরোই কী একা হয়ে যাবো না এই বিদেশে?

বান্ধবী বললো, সে আনন্দজনক একটি পন্থা বের করে ফেলেছে। ফুপুরা যে ভুল করেছে, আমরা সে ভুল করবো না। বাপের বাড়ি থেকে যা উত্তরাধিকার পাবো তা কেউ ছেড়ে দিবো না। সবাই রিটায়ার করে আবার দেশে ফিরে যাবো। ছোট বেলার মতো পাড়া দাপিয়ে বেড়াবো। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়ে আমাদের দেখতে বাংলাদেশ বেড়াতে আসবে তাতে তাদেরও দেশের সাথে যোগাযোগ থাকবে আবার আমরাও মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েদের দেখতে বিদেশে বেড়াতে আসবো। বুড়ো হয়ে সবাই একসাথে ছেলে বেলার মত আনন্দ করে দিন পার করবো।

বিদেশে সব পেয়েও দেশকে মিস করে গেছি প্রতি নিয়ত। আবার আসিব ফিরে এই ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায় এই ভেবে ভেবে এতোটি বছর প্রবাসে কাটিয়ে দিয়েছি। রোজ ভেবেছি এইতো আর একটি দিন পার হলো, এইতো বুড়ো হচ্ছি, দেশের দিকে আর এক পা বাড়লো। দুই হাজার পনর সাল প্রথম এই দরজায় এনে দাঁড় করালো, না কিছুতেই নয়। এই দেশ আমার নয় এই মানুষেরা আমার নয়। এতো বছর খোলা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে নিতে মন, ভাবনা, বিবেক সব নির্মলতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যদি প্রাণে বেঁচেও থাকি দেশে রোজ রোজ এতো শত অনাচারের মাঝে নিজেকে আর খাপ খাওয়াতে পারবো না।


পন করলাম নিজের সাথে নিজে, আজ থেকে আর বুড়ো হওয়ার কথা ভাববো না আজ থেকে শুধু বেঁচে থাকার গান। আর পেছনে তাকানো নয় সমুখে বাজুক আমার প্রাণ।

১৪/০৫/২০১৫



অনন্ত অম্বরে একা

আমাকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর পর আমার বন্ধুরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হয়তো ফেসবুকে কিছু দুঃখী স্ট্যাটাস লিখবে। তাদের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন হবে, হয়তো শোক আর প্রতিবাদ জানাতে কালো করা হবে কিছুদিন কিংবা আমার কোন ছবি ঝুলবে সেখানে। তাদের মৃত বন্ধুদের তালিকায় আরও একটি নাম আর তারিখ যোগ হবে, ইতিহাস ঠিক রাখার খাতিরে। কেউ কেউ ইভেন্ট খুলবে, হত্যার প্রতিবাদে কর্মসূচী, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ইত্যাদি প্রভৃতি। হয়তো আমার ছবি ঘুরবে ফেসবুকের হোমফিডে, যারা আমাকে জানতো না বা চিনতো না তারাও আমাকে তখন জানবে চিনবে। তবে কতদিন হোমফিডে ছবি থাকবে তা নির্ভর করবে ক্রিকেট কিংবা সালাহউদ্দিন-এর ফিরে আসার খবরের গুরুত্বের ওপর। 

পত্রিকার উদ্দেশ্য ব্যবসা, কে খুন হলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কী খাবে জনতা সেটাই তাদের লক্ষ্য। সুশীলজনেরা স্ট্যাটাস লিখবে, কারো অনুভূতিতে আঘাত পায় এমন কিছু কারো লেখা ঠিক নয়। টিভিতে টকশো হবে। খাঁটি পেয়ারা বান্দারা লিখবে, সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যারা লেখবে তাদের সৃষ্টিকর্তার দুনিয়ায় জায়গা নাই। প্রাকৃতিক নিয়মে আস্তে আস্তে শোকতাপ স্তিমিত হয়ে আসবে। সবাই ভুলে গিয়ে নিত্যদিনের কাজে মন দেবে, জীবনের ডাক বড় ডাক। একে উপেক্ষা করার শক্তি কারো নেই। মনে মনে অপেক্ষায় থাকবে সবাই, এবার কার নাম ......... হু ইজ নেক্সট?

আমার শূন্যতা নিয়ে ভগ্ন হৃদয়ে পথ চেয়ে বসে থাকবে আমার মা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরিয়ে আকাশ যখন ধরণী পবিত্র করতে ব্যস্ত থাকবে, অসীম নীলের সাথে শুভ্র জলধারা দিয়ে চেষ্টা করবে এই পৃথিবীর পাপ ধুয়ে দিতে, তখন হয়তো কোন টগবগে তরুণ তার শোবার ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে পাশের বাসার ছাদে খোলা চুলে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা লাজুক তরুণীটির দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকতে বিভোর। অন্য পাশের ফ্ল্যাট থেকে হাঁক শোনা যাবে বৃষ্টির আওয়াজ ভেদ করে,
কী, বৃষ্টি দেখেছো আজ? -অফিস যাবো না ভাবছি। একটু খিচুড়ি করো না আজ, সাথে গরম গরম গাওয়া ঘি, বেগুন ভাজা, ডিম ভাজা আর সর্ষের তেলে ইলিশ ভাজা।

এই শুনে আমার মা ডাক ছেড়ে বিলাপ করে কাঁদবেন, অনন্ত আমার অনন্ত! আমার অনন্ত বড্ড বৃষ্টি আর খিচুড়ি ভালবাসতো। দিনের শেষে শুধু সেই মনে রাখে যার ঘর শূন্য হয়, বুক শূন্য হয়, কোল শূন্য হয়।

http://www.banglanews24.com/fullnews/bn/393295.html



তানবীরা তালুকদার
 ১৩/০৫/২০১৫

Thursday, 30 April 2015

সৃষ্টিকর্তার শাস্তি আর ভূমিকম্প

নেপালের ভূমিকম্প নিয়ে তুখোড় সব মানুষদের তুখোড় সব স্ট্যাটাস পড়লাম ফেসবুকে। পড়ি আর অবাক হই, মানুষের এতো জ্ঞান আর আমরা কতো মূর্খ।

“স্রষ্টা শাস্তি দিলেন, স্রষ্টা গজব দিলেন”
স্রষ্টা ছোট ছোট বাচ্চাদেরও শাস্তি দিলেন, কেন তারা কী করেছিলো? শাস্তিতো ধর্ম মতে পরকালে হওয়ার কথা তাহলে আগে শাস্তি দেয়ার মানে কী? মানুষ পাপ করাতে কী তাহলে স্রষ্টা রাগ করে মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন! নৌকা ডুবে যাওয়া কিংবা ভূমিকম্প হওয়া কী তাহলে মানুষের ওপর স্রষ্টার প্রতিশোধ! স্রষ্টা ক্ষমাশীল আর দয়ালু, তিনি এতো কঠোর তার সৃষ্টির প্রতি কী করে হতে পারেন! ফেসবুকে নাস্তিকদের গালি দেয়ার জন্যে আগডুম বাগডুম লিখে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে এতো ব্যস্ত থাকে যে নিজেও জানে না আসলে কী লিখছে।

১৯১২ সনে জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রের্ড ওয়েগনার পৃথিবীর মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এক সময় পৃথিবীর মহাদেশগুলো একত্রে ছিল যা কালক্রমে ধীরেধীরে একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছে ওয়েগনারের এই তত্ত্বকে বলা হয় কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্ট তত্ত্ব বলে পৃথিবীর উপরিতল কতগুলো অনমনীয় প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত এই প্লেটগুলোকে বলা হয় টেকটনিক প্লেট একেকটি টেকটনিক প্লেট মূলতঃ পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গলিত পদার্থের বাহিরের আবরণ যা একটি পাথরের স্তর ভূ-স্তরে যা কিছু রয়েছে তা এই প্লেটগুলোর উপরে অবস্থিত টেকটনিক প্লেটগুলো একে অপরের সাথে পাশাপাশি লেগে রয়েছে এগুলো প্রায়ই নিজেদের মাঝে ধাক্কায় জড়িয়ে পড়ে কখনও মৃদু, কখনও সজোরে যেহেতু প্লেটগুলো শিলা দ্বারা গঠিত, তাই ধাক্কার ফলে তাদের মাঝে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয় এই ঘর্ষণের মাত্রা অধিক হলে এক ধরনের শক্তি নির্গত হয় যা ভূ-স্তরকে প্রকম্পিত করে যদিও ভূমিকম্পের আরও কারণ রয়েছে (যেমন আগ্নেয়গিরি), তবে এই কারণটিই অধিকাংশ ভূমিকম্পের জন্যে দায়ী

যারা এই জ্ঞান গর্ভ স্ট্যাটাসগুলো লিখেছে এবং ভেবেছে তাদের কাছে মিনতি, পাঁচ  হাজার মানুষ মারা গেছে নেপালে আর এটা কোন জোক নয়। এ বিপদ যেকোন দিন যেকোন জায়গায় হতে পারে। টেকটনিক প্লেট কোথায় ধসে যাচ্ছে ঠিক কোন মুহূর্তে সেটা সবসময় আগে থেকে কেউ জানে না যদিও একদল বিজ্ঞানী কিছুদিন ধরেই বলেছিল নেপালের এই জায়গাটা ঝুঁকিপূর্ন, সেখানে এ ধরনের বিপদ হতে পারেঠিক কোন মুহূর্তে এ ঘটনা ঘটবে সেটি এখনো বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করে উঠতে পারেননি। ভবিষ্যতের কথা এখনো বলা যায় না হয়তো ... হয়তো কোন একদিন বিজ্ঞান ভূমিকম্পকেও জয় করে নেবে।

আর আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না, সৃষ্টিকর্তা যিনি এতো ভালবেসে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি এতোটা নিষ্ঠুর তার সৃষ্টির প্রতি হতে পারেন। ভূমিকম্পের সাথে আস্তিক বা নাস্তিকের কোন সম্পর্ক নেই। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আস্তিক হওয়ার জন্যে একটা বই পড়লেই চলে আর নাস্তিক হওয়ার জন্যে প্রচুর পড়াশোনার প্রয়োজন হয়। তাই বলছি, সমালোচনা আর গালাগালি একটু সামালকে।

নীচের লিঙ্কটা খুলে পড়লে কিছুটা সময় নষ্ট হলেও অনেক কথা জানা যাবে,