Monday, 21 May 2018

সে যে বসে আছে একা একা

এক সওদাগরী আপিসে সে কেরানি ছিলো, জীবন মানে সপ্তাহে পাঁচ দিন, ভোর সাড়ে ছয় ঘটিকায় নিদ্রা হইতে জাগিয়া বৃষ্টি-বরফ ঠেলিয়া তাহাকে আপিসে যাইতে হইতো। সেইখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ঘরে’র আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত কুরসী’তে বসিয়া সারাদিন রাজ্যের মাইনষের প্যানপ্যান, ভ্যানভ্যান শোনাই ছিল তাহার কাজ। এইসব রসকষহীন কঠিন হিসাবের কথা শুনিতে শুনিতে বেলা গড়াইয়া দ্বিপ্রহর।


অথচ ইহার মধ্যেই ঐ দূর নীল আকাশে কত শত শাদা মেঘ ডানা মেলিয়া উড়িয়া যাইতো। সেই দৃশ্য অবলোকন করিয়া কিছু পাখি কলকাকলি করিয়া তাহাদের সুমিষ্ট সুরে গান গাহিয়া উঠিতো। হঠাৎ হঠাৎ আকাশ ভীষম রাগিয়া কাঁদিয়া উঠিতো। মাঝে মাঝে তাহাতে রাস্তায় জল জমিয়া যাইতো। দুষ্ট মিষ্টি ছেলের দল তাহাতে লাফাইয়া উঠিয়া ব্যস্ত পথিকের জামা কাপড় ভিজাইয়া দিতো। লাজুক কোন মায়াবতী কিশোরীর দুই চোখ আচমকা কোন বিপ্লবী তরুণের হৃদয় ছুঁইয়া তাহাকে আর্দ্র করিয়া তুলিতো। আরও কত শত কিছু ঘটিয়া যাইত এই বিশাল ধরাধামে যাহার কোন ছোঁয়া এই সওদাগরী আপিসে আসিয়া পৌঁছাইত না। সেইখানে সারাক্ষণ চলিত কঠিন লাভ আর লোকসানের বাণিজ্যিক খেলা।


মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘবের সাধ্য তাহার ছিল না। তাহাকে চলিতে হইত কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে দিয়া। তবুও তাহাদের খানিক সত্যি আর খানিক মিথ্যা সহমর্মিতা দেখাইয়া সান্ধ্য ছয় ঘটিকার দিকে সে বাটি ফিরিতো। ফিরিয়া তাহাকে বাধ্যতামূলক রান্নাবাটি খেলিতে হইত। সেই খেলা সাঙ্গ হইলে শুরু হইত পিতা-কন্যার যুগলবন্দী ঘ্যান প্যান। এই সমস্ত কিছুর মাঝেই সে তাহার মুঠোফোন খানি ব্যবহার করিয়া মুখবহিতে প্রবেশ করিত, সেইখানে রাজ্যের হাসিখুশী মানুষ তাহাদের সুখ আনন্দের ছবি বা বার্তা পোস্ট করিয়া রাখিয়াছে, দেখিয়া তাহারও ভাল লাগিত। সেই ভাল লাগা সে এইদিক সেইদিক কিছু “লাইক” কষাইয়া যথাসাধ্য প্রকাশ করিত আর তাহার পর ঘুমাইতে যাওয়ার আয়োজন করিত কারণ পরদিন তাহাকে আবার একই রুটিনে চলিতে হইবে।


,
রাঁধার পরে খাওয়া, আর খাওয়ার পরে রাঁধা
বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা।


রবি ঠাকুর তাহাকে ভাবিয়াই হয়ত এই পদ্যখানি রচিয়া ছিলেন। এই সংসার বেড়াজাল হইতে তাহার কোন মুক্তি ছিল না। অথচ কত কি করিবার ছিল, কত দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া দেখিবার ছিল, কত সহস্র বই তাহার না পড়াই রহিয়া গেলো, কত লক্ষ সঙ্গীত রহিল অশ্রুত, সিনেমার কথা না হয় নাই বা কহিলো, এ ছাড়াও আরও আরও আরও কত শত কত কি


সে যে বসে আছে একা একা, রঙ্গীন স্বপ্ন তার বুনতে,
সে যে চেয়ে আছে ভরা চোখে, জানালার ফাঁকে মেঘ ধরতে।
তার গুণগুণ মনে গান বাতাসে ওড়ে, কান পাতো মনে পাবে শুনতে,
তার রঙের তুলির নাচে মেঘেরা ছোটে, চোখ মেলো যদি পারো বুঝতে।
সে যে বসে আছে একা একা, তার স্বপ্নের কারখানা চলছে,
আর বুড়ো বুড়ো মেঘেদের দল, বৃষ্টি নামার তাল গুনছে।
তার গুণগুণ মনের গান বৃষ্টি নামায়, টপটপ ফোঁটা পড়ে অনেকক্ষণ,
সেই বৃষ্টিভেজা মনে দাগ দিয়েছে, ভেজা কাক হয়ে থাক আমার মন।

১১/০৪/২০১৮

সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ - ভারতবর্ষ

সাম্প্রতিক কালে আসানসোলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি নিয়ে অর্ক ভাদুড়ী’র হৃদয় নিংড়ানো লেখাটি বেশ কয়েকজন আমাকে ইনবক্সে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেককে আমি আবারও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, আমাকে আপনারা এর যোগ্য ভেবেছেন বলে। ইমাম সাহেবের আচরনে আপনারা আশাবাদী হলেও আমি নিতান্ত বিনয়ের সাথে সাদামাটা ভাষায় এখানে আমার হতাশা বলছি,


ইমাম সাহেব তার ছেলে হত্যার বিচার চান না, তিনি অসম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেন, যেমন কখনো ছিল। আচ্ছা, ইতিহাস আমরা সবাই কম বেশি পড়েছি, আমরা নিজেরাও কালের সাক্ষী, ইতিহাসের অংশ হয়ে আছি। “ভারতবর্ষ” ঠিক কোন সময়টাতে অসাম্প্রদায়িক ছিল, বলতে পারবেন কেউ? সেই সময়ের কোন ইতিহাস কি কেউ কখনো পড়েছেন? ইমাম সাহেব অলীক কোন স্বপ্ন দেখছেন না তো? ইতিহাস সাক্ষী, ভারতীয়দের মধ্যে একতা থাকলে শত শত বছর ধরে ভারতবর্ষ বিদেশীদের দ্বারা শাসন হত না।


বৃটিশ সামাজ্র্যে কখনও সূর্য অস্ত যেতো না, সে কি এমনি এমনি ছিল? সেটুকু দূরদর্শিতা ছিল বলেই তারা দু’শ বছর আমাদের শাসন করেছে। ভারতের সব বিচ্ছিন্ন টুকরো গুলোকে একসাথে জুড়ে যেমন গোটা ভারতের মানচিত্র এঁকেছিল আবার ছেড়ে যাওয়ার সময় টুকরো’ও করে গেছে এই সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। নইলে কোন যুক্তিতে একটি দেশ এখন তিনটি দেশ? তিনটি দেশ হয়েই কি থেমেছি আমরা কোথাও? এখনও সেই হানাহানি করেই যাচ্ছি। আড়াইশ বছর আগেও যা ছিল এখনও তো তাই আছে। ব্রিটিশদের এই রাজনীতি এখন খেলছে আমাদের স্বদেশী রাজনৈতিক নেতারা। বাংলাদশে যা অবস্থা ভারতেও অবস্থাও তথৈবৈচ। জনতা খায় রাজনীতিবিদরা খাওয়ায়, খেলা চলছে হরদম এবং চলবে “কায়ামত সে কায়ামত তাক”।


আড়াইশ বছরে ঈদ–পূজা ডিজিটালাইজড হয়েছে কিন্তু চলছে। বরং আরও বেড়েছে, থামেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমরা কি করে রক্ষা করি? ফেসবুকে অসাম্প্রদায়িক স্ট্যাটাস লেখা’র মাধ্যমে। সেই স্ট্যাটাসের ভাষা হয়ঃ “সব মুসলিম বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা” কিংবা “সব সনাতন ধর্মালম্বীদের শারদীয়া শুভেচ্ছা”। শুভেচ্ছা’র মত একটা সার্বজনীন ভদ্রতা’ও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই পায় না, হায় অভাগা ভারতবর্ষ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা যা করে গেছে আমরাও তা বিনা বাক্যে পালন করে যাচ্ছি। কখনও কি নিজের মনকে প্রশ্ন করি, কি করছি আর কেন করছি?


যেকোন একটি ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে বাংলাদেশ–পাকিস্তান–ভারতের মধ্যে যে পরিমান গালি’র বন্যা বয়ে যায় তাতে নিঃন্দেহে আমাদের অসাম্প্রদায়িকতাই ধরা পরে। বিচ্ছিন্ন হওয়া যে আমাদের কতটা অনিবার্য ছিল তা আজও প্রতীয়মান। ফেসবুকে’র বিভিন্ন লেখালেখি গ্রুপে আমার খুব সামান্য যাতায়াত। স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষাভাষী গ্রুপে আমি বেশি যুক্ত। এই খেলা নিয়ে দু দেশের সৃজনশীল ব্যক্তিরা যে ভাষায় একজন অন্য একজনকে আক্রমণ করে তারপর সেই ব্যক্তিই আবার প্রেমের কবিতা’ও লেখে। সেলুকাস।


সর্বশেষে, পুত্র হারা ইমাম সাহেব ছেলে হত্যার বিচার চান না। এই দুঃখী আত্মার প্রতি যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এটি কিন্তু খুব সুস্থ কোন ব্যাপার নয়। আপনারা যারা ইমাম সাহেবের মহানতা দেখছেন এরমধ্যে তার সাথে কি তার বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, প্রচলিত গনতন্ত্রের প্রতি অনাস্থাটা দেখতে পেয়েছেন? তিনি মহান, আমিও নিসঙ্কোচে স্বীকার করছি কিন্তু সাথের এই কারণ গুলো’ও বাস্তব। বিচার চান নি “দীপন” এর বাবা’ও। কারণ জানতেন, বিচার পাবেন না। বিচার চেয়ে চেয়ে আজও পথে পথে ঘুরছেন, অভিজিতের বাবা। বিচার পাননি। তারা সবাই কিন্তু ঠিক একই কারণে খুন হয়েছেন। এই ভারতবর্ষে কম ছেলের প্রাণ উৎসর্গ হয় নি। আজকে আসানসোল তো কালকে ব্রাক্ষনবাড়িয়া। ইমাম সাহেবের ছেলের আগেও অনেকের প্রাণ গেছে, এখনও যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও যাবে যাদের কখনও কোন বিচার হয় নি, হয় না আর হবে না।


আসলে গোটা পৃথিবী’র কোন জায়গাটাতে “ধর্ম” নিয়ে মারামারি হয়নি সে জায়গাটি আমি খুঁজছি। ইউরোপ এখন আটকে আছে কঠিন আইনের বেড়াজালে। আইন শিথিল হলেই অন্য চেহারা বের হয়ে আসতে পারে সে ব্যাপারে আমার দ্বিধা কম।


ইমাম সাহেবের শোকার্ত পরিবারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর অর্ক ভাদুড়ী’কে অসংখ্য ধন্যবাদ এই মর্মস্পর্শী লেখাটি আমাদের দ্বারে পৌঁছে দেয়ার জন্যে।

০৯/০৪/২০১৮

ডাচ এজুকেশান সিস্টেম – গাইডিং টু দ্যা ফিউচার – ২


ডাচ এজুকেশান সিস্টেমগাইডিং টু দ্যা ফিউচার

সারাদিন অফিস করে বাসায় আসতে আসতে মাথা ঘুরছিলো বাসায় ফিরতেই মেঘের জোরালো হুকুম, স্কুলের টেক্সট বইয়ে কিছু প্রশ্ন আছে সেগুলোর উত্তর লিখতে দিতে হবে ও বই গুছিয়ে ঘুমোতে যাবে বই খুলে আমি দিশেহারা ডাচ এজুকেশান সিস্টেম অনুযায়ী ডাচ হাই স্কুলে, আঁকা, গান, নাচ কিংবা অভিনয় এই চারটি বিষয়ের মধ্যে থেকে তিনটিকে প্রথম তিন বছর অনুশীলন করতে হবে তারপর যেকোন একটি নিতেই হবে একটির বেশি চাইলে বেশিও নেয়া যাবে সেই সিলেবাস অনুযায়ী, মেঘদের ভাগে এবার পরেছে, শেক্সপীয়ারের রোমিও জুলিয়েটনাটকটি এই নাটকটি তাদের পড়তে এবং অভিনয় করতে হবে বাবা মায়েদের আগেই দাওয়াত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে অভিনয় দেখতে যাওয়ার জন্যে

এখন বইতে দুটো আলাদা এঙ্কেটে দেয়া আছে, একটা বাবা মা পূরণ করবে আর একটা বাচ্চা পূরণ করবে কিন্তু কেউ কারওটা আগে থেকে দেখবে না তারপর একসাথে সবাই মিলে দেখবে উত্তরগুলো, আলোচনা করবে কিংবা দেখবে দুজনের উত্তর গুলোই মিলে গেলো কি না আমাকে প্রশ্ন করা হলো, সন্তানের ভবিষ্যত পার্টনারের মধ্যে আমি কি কি গুন দেখতে চাই আর কেন আমি সেসব গুন গুলো দেখতে চাই, তার পার্টনার নির্বাচনে আমার কোন শর্ত বা চাহিদা আছে কি না আমি আমার উত্তর লিখলাম তারপর পাতা উলটে মেঘও লিখলো মেঘের জন্যে আবার একটা প্রশ্ন বেশি, বাবা মায়ের পছন্দ তার কাছে যৌক্তিক মনে হয় কীনা আমি হাত মুখ ধুয়ে এসে মেঘকে বললাম, আয় উত্তর দেখি, মেঘ মোচড়ামুচড়ি তার উত্তর দেখাবে না আমি বারবার বললাম, স্কুল থেকে তো বলে দিয়েছে, দেখাতে তাহলে দেখাবি না কেন? তারপরও দেখায় না, সান্টিং দিলাম, এরপর স্কুল থেকে কিছু লিখতে বললে কিন্তু লিখে দেবো না মেঘও উলটো সান্টিং, দিও না, পাপা দেবে

এবার পাপা বকা লাগাতে, দিলো বইটা সে লজ্জায় লাল বেগুনী হয়ে মেঘের উত্তর দেখে বোঝা গেলো, স্কুলে এই নিয়ে অনেক আলোচনা আগেই হয়েছে, স্বাভাবিকভাবে সে প্রস্তূত ছিলো, তার পার্টনার এর কাছে সে কি আশা করে, কেমন পার্টনার চায় এ নিয়ে সে বিস্তারিত লিখেছে, মায়ের মত এক কথায় প্রকাশ করে নি যদিও সে শেষ প্রশ্নে মায়ের সাথে একমত হয়েছে, মায়ের পছন্দকে তার যৌক্তিক মনে হয়েছে এই নিয়ে একটু গল্প করার চেষ্টা করলাম মেঘের সাথে, মেঘ প্রথমে অনেক আড়ষ্ট থাকলেও পরে একটু স্বাভাবিক হলো রোমিও জুলিয়েটদেখতে যাবো, মেঘ মোচড়ায়, গাঁইগুই করে দেখতে যাওয়ার দরকার নেই, তুমি কত ব্যস্ত, শুধু শুধু তোমার সময় নষ্ট আমি বললাম, কত সময় নষ্ট করলাম তোমার পেছনে আর একটা ঘন্টাতে কি যাবে আসবে

বয়োসন্ধিতে ছেলে মেয়ের মন মানসিকতার পরিবর্তন আসে এ সময় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই ছেলে মেয়েরা কাছাকাছি আসে তাদের তখন স্বপ্ন দেখার বয়স। তাই নিয়ে পরিবারে দূরত্ব তৈরী হয়, মনোমালিন্য হয় বাচ্চাদের মন অশান্ত হতে পারে। তারা নানারকম ক্ষতিকারক পদক্ষেপ নিতে পারে। পড়াশোনা করিয়ে পরীক্ষা নেয়াই স্কুলের একমাত্র দায়িত্ব নয়, সমাজকে সুনাগরিক, সুখী নাগরিক উপহার দেয়াও স্কুলের সামাজিক দায়িত্ব এই নিয়ে পরিবারের মাঝে আলোচনা হলে বাবা মায়ের মানসিক প্রস্তূতি থাকলে, দু পক্ষের মধ্যে যেন আচমকা ধাক্কা না লাগে, সহনশীলতা থাকে তার মানসিক প্রস্তূতি দেয়াও স্কুল নিজের দায়িত্বের মধ্যেই ধরে মেঘ ঘুমোতে চলে গেলে পুরোটা সন্ধ্যে আমি নিশ্চুপ আর নিঃশব্দ বসে ভাবছিলাম, সেদিনই আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা যেখানে প্রধানমন্ত্রী বানী দিয়েছেন, প্রশ্ন সব সময়ই ফাঁস হত কম আর বেশি দায়িত্বহীন এই সমাজ নিয়ে কান্না করার মত কান্নাও আর আমার নেই মেঘের ছোটবেলা বলা কথাটাই আমি ভাবি, এই দুটো দেশ কি করে এক প্ল্যানেটে হবে মা, এরা কত অন্যরকম

তানবীরা তালুকদার
২১/০২/২০১৮

Thursday, 29 March 2018

প্রিয় ইশ্বর/খোদা/ভগবান

খুব ক্লান্ত বুঝি? ঘুমোচ্ছ? বিশ্রাম নিচ্ছো? অনেক অনেক কান্না’র শব্দে তুমি পর্যুদস্ত কি? তনু’কে ভাল্লুকে খেয়ে ফেললো এই কষ্টে তনু’র মা আজও বিলাপ করে কাঁদে, তনু’র বাবা শয্যাশয়ী। এরমধ্যে আর কত শত বিলাপের রোল, বিউটি, নুসরাত, এক বছড় দশ মাস বয়সী শিশুর কান্না ………। তারা জানে সব তোমার ইচ্ছেতেই হচ্ছে কিন্তু তারপরও অসহায় এই মায়ে’রা, এই পরিবার গুলো তোমার নাম নিয়েই বিলাপ করে চলছে, তোমার কাছেই লাগাতার তাদের ফরিয়াদ। এই পরিবার গুলো আর কখনও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না, কখনও ঈদ, পূজা, বৈশাখ তাদের বাড়িতে সেই আনন্দ নিয়ে আসবে না। এমনকি তাদের পরের বংশধর’রাও এই জেনেই বড় হবে, তাদের ফুপি, খালা এই দেশে বিনা দোষে নির্যাতিত হয়ে মারা গেছে যার বিচার পর্যন্ত হয় নি। তুমি সব কেড়ে নিয়েছো জেনেও, তোমাকেই বলছে, হে খোদা, তুমি এর বিচার করো। তোমার ইচ্ছেতে সব হারিয়েও তারা বিশ্বাস করে, তুমি ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। পুলিশ তো নেইই, আইন নেই, দেশ নেই, মন্ত্রী নেই, তাদের কিছু নেই শুধু তুমিই আছো।


অনেকদিন তো পশ্চিমে আরাম করলে এখন তুমি পূর্ব দিকে যাও, ওদের তোমাকে খুব প্রয়োজন। এখানে তো সব চলছে ঠিক মত, আজকাল এরা তোমাকে নিয়ে মাথা ও ঘামায় না, তেমন চাহিদা বা যত্ন আত্তিও নেই তোমার। ওদের বাজারে তোমার প্রয়োজন শেষ। যেদিকে তোমাকে সবাই অকাতরে ডেকে চলছে, সেদিকেই আছ তুমি মুখ ফিরিয়ে! কত চাহিদা তোমার ঐ বাজারে, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার নাম নিয়ে কত খেলায় না চলছে। তবুও “তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে?”


আচ্ছা, তুমি কি পূর্বের খবর কিছু রাখো? অত্যাচার-নির্যাতনের কারণ হিসেবে তারা মেয়েদের জামা কাপড়ের দোষ দেয়। তুমি তো অনেকদিন পশ্চিমে আছো, পশ্চিমের মেয়েদের জামা কাপড় কি তাহলে আকর্ষনীয় নয়? নাকি এখানকার পুরুষদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে? তারা কি যথাযথ পুরুষ নয়? তারা এসব স্বল্প বসনা মেয়ে দেখেও কেন তাদের আক্রমণ করার মত যথেষ্ঠ উত্তেজনা অনুভব করে না? মজার কথা কি জানো, পূর্বের এই বীর পুরুষেরা, যারা সেখানে ছয় গজ কাপড় পরা মেয়ে দেখেও নিজের উত্তেজনা সামলাতে পারে না সেই তারাই পশ্চিমে এসে কোন স্বলপ বসনা মেয়ের দিকে সোজাসুজি তাকানোর সাহস পর্যন্ত করে না, পুলিশ ডাকলে খবর হয়ে যাবে সেই ভয়ে। আমার অবাক লাগে, এই বীর পুরুষেরা নিজেদের পরিবার, বউ, বান্ধবী, প্রেমিকা, মেয়ে, বোন পাশে থাকার পরও সেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না কিন্তু প্রবাসে কেউ পাশে না থাকা সত্বেও নিজেকে সামলে রাখতে পারে, জানো? এখানে তারা “মানসিক” ভাবে ব্যালান্সড থাকে, অদ্ভূত লাগে না? উলটো হওয়ার কথা ছিলো না? সামথিং ইজ ভেরি রঙ, ইজ’ন্ট ইট?


অনেকেই বলে, তুমি নাকি ঈমানের পরীক্ষা নাও, ভগবান দুঃসময় দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। সত্যিই তাই? একটানা এই পরীক্ষা তুমি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র থুক্কু উন্নয়নশীল দেশের ওপরই নাও কেন গো? এদের তোমার চোখে পরে না, হ্যাঁ, এদের কথাই বলছি, এদের, যেখানে তুমি গ্যাঁট হয়ে বসে ফায়ার প্লেসে আগুন পোহাচ্ছ। আর যদিও তৃতীয় বিশ্বকেই গিনিপিগ ধরলে, তাহলেও অবিরাম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি মেয়ে গুলো, সংখ্যা লঘু মেয়ে গুলো, দরিদ্র শিশু-কিশোরী কিংবা মাদ্রাসা’র ছাত্ররা। এ কেমন অসম পরীক্ষা? তাদের তো এমনিই কিছু নেই তাদের কি পরীক্ষা নাও তুমি প্রত্যেকদিন? হ্যাঁ প্রত্যেকদিন? পরীক্ষা নিতে হয়, তাহলে নাও মন্ত্রী’র মেয়ের, বিত্তবান ব্যবসায়ী’র মেয়ের, কিংবা সামরিক বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা’দের মেয়েদের। তাদের তো অনেক আছে, তাদের ধরো তো দেখি। নাকি তাদের মেয়ে’রা যথেষ্ঠ আকর্ষনীয় পোষাক পরে না? তাদের বেলায় ঈমানী জোশ কাজ করে না? সব ক্ষমতা বুঝি দরিদ্রের মুখের হাসি কেঁড়ে নেয়ার বেলায়?


অভিনেতা মোশাররফ করিম একটি টক শো পরিচালনা করতেন, সেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, “সমস্যা পোষাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়”। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সমস্ত মৌলবাদি জনগন এই কারণে ক্ষেপে গিয়ে তাকে আক্রমণ করে। এর চেয়ে অত্যাশ্চার্য ঘটনা হলও, তার একজন সহকর্মী’ও তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি, তার পক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু গাজি রাকায়েতের লুচ্চামি ধরা পরার পর তাকে সহায়তা দিতে প্রায় পুরো নাটক পাড়া তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলো। তুমি বুঝতে পারো কোথায় নেমেছি আমরা? এই দেশে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও স্বাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছে। শিল্পী’রা তাদের গানে, কবিতায়, নাটকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করেছে, মুক্তিযোদ্ধা’রা তাদের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এই দেশেই গান হয়েছিলো, “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে মোরা যুদ্ধ করি, একটি ফুলের হাসি’র জন্যে মোরা অস্ত্র ধরি”, “ও, আমার সাত কোটি ফুল দেখো গো মালি, শক্ত হাতেই বাইন্ধো মালি, লোহারও ডালি”। এই বিপ্লব যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আজও সুস্থ সবল বেঁচে বর্তে আছে কিন্তু টুঁ শব্দটিও করে নি।


আগা থেকে গোঁড়া পর্যন্ত যখন কিছু পঁচে যায় তখন তার ধ্বংসই ভাল। “শেষ থেকে শুরু যে এবার” --- একটা প্রচন্ড সুনামি, ভূমিকম্প কিছু দিয়ে তুমি সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে আবার একটি ভোর আনো, বিশুদ্ধ ভোর। পঁচে যাওয়া এই ভূখন্ড তাকিয়ে আছে আজ একটি বিশুদ্ধ শুরু’র দিকে। “ভোর হয়নি, আজ হলো না, কাল হবে কি না, তাও জানা নেই।“ এক বছরের, তিন বছরের, পাঁচ বছরের শিশু গুলোকে তুমি নির্যাতন করে না মেরে, এমনিতেই ভূমিকম্পে মেরে ফেলো, তাদের পরিবার গুলো কোথাও তো স্বান্ত্বনাতো পাক। একটা তিন বছরের শিশু নির্যাতিতা হয়ে মারা গেলে তার বাবা-মা, ভাই-বোন কি কখনো আর স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে, শিশুটি শুধু মারা যায় না, পুরো পরিবারটা জীবন্মৃত হয়ে যায়। শুধু নিঃশ্বাস নেবার নামই কি বেঁচে থাকা? ঠোঁট বাঁকা’র নামই হাসি?


পাকিস্তানী’রা আর দেয় না হানা, নেই তো রাজাকার
তবু কেন এ দেশ জুড়ে, লাশের পাহাড়
জেনেছো দেশ তো স্বাধীন, আছে ওরা বেশ
দুঃখ কষ্টের আর নেই কোন রেশ
একদন্ড নিরাপত্তা নেই সেখানে, নেই সান্ত্বনা
শরৎবাবু এ চিঠি পাবে কি না জানি না আমি
এ চিঠি পাবে কি না জানি না

http://www.sylhettoday24.news/opinion/details/8/1126?utm_campaign=shareaholic&utm_medium=facebook&utm_source=socialnetwork

http://nari.news/post/prio-tanbira


ডাচ নির্বাচন

গতকাল মহাসমারোহে নেদ্যারল্যান্ডসে পৌরসভা নির্বাচন ও গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সেবা’র জন্যে উপদেষ্টা মন্ডলী’র প্রয়োজনীয়তা’র ওপর নির্বাচন হয়ে গেলো। যদিও এই সমারোহ টের পাওয়ার কোন উপায় নেই। কোলাহলবিহীন, প্রার্থীবিহীন, হাকডাকবিহীন, মিছিলবিহীন ম্যান্দামারা নির্বাচন। ভোট দিলে ফ্রিজ, কালার টিভি, এমনকি বিরিয়ানি খাওয়ানো’র ও কোন প্রতিশ্রুতি নেই। নিজের দরকার মনে হলে এসে ভুটিয়ে যাও, এমন নিদারুন অবস্থা। কি আর করা, তবুও যেয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন করে ভুটিয়ে এলুম। সামনের চার বছরের জন্যে প্রার্থী নির্বাচন করার দায়িত্ব এই নগরীর বাসিন্দাদের। এন্ডহোভেনের পৌরসভা’র সদস্য সংখ্যা পয়তাল্লিশ জন।


নির্বাচন হচ্ছে, আর যেয়ে মুখ বুজে একখানা ভোট ঠেকিয়ে আসবো, সেই ভাল বান্দা/বান্দী কি আমি? বসে বসে নেটানেটি করা হলো। কেন, কাকে, কি কারণে ভোটাবো সেটা জানতে তো হবে। নেট গুতাতে গুতাতে খুব ভাল একটা “প্রশ্নমালা” পেলাম। “প্রশ্নমালা”টি তৈরি করেছে, “দৈনিক এন্ডহোভেন”। আপনি আপনার শহরে কি কি চান, কি কি পেতে পারেন, কারা কি কি পরিবর্তন, পরিবর্ধন করবে বলে কি কি আশ্বাস দিয়েছে, সেরকম ত্রিশটি প্রশ্নের জবাবের ওপর ভিত্তি করে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন দলের প্রার্থীকে আপনি আপনার শহরের জন্যে চান।


প্রার্থীদের দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে এই জরিপ তৈরী করা হয়েছে। উত্তর দেয়ার সুযোগ আছে তিন রকম, ১. চাই, ২. কোন মতামত নেই ৩. চাই না।


উদাহরণস্বরুপ কিছু প্রশ্নঃ
পুরনো সুইমিং পুলটি মেরামত করে, আধুনিক সুবিধা দিয়ে নতুন করে চালু করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন নাকি ভেঙে ফেলে সেখানে অন্য একটা পার্ক তৈরী করা যেতে পারে?
শহরের ভেতরে গাড়ি চলাচল আরও কমিয়ে দেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
পুলিশের গায়ের ভেতরে ক্যামেরা কি অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে বলে আপনার ধারনা?
রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের জন্যে আলাদা বসবাসের জায়গা দেয়া উচিত?
নতুন চাকুরী ও কাজের জন্যে কি এ শহরের বেশি বেশি বিনিয়োগ দরকার?
ইত্যাদি ইত্যাদি ---- আগ্রহীদের জন্যে মন্তব্যের ঘরে লিঙ্কটি সংযুক্ত করে দেয়া হলো।


আমি নিবিষ্ট মনে চরম আন্তরিকতায় মনের মাধুরী মিশিয়ে এই “প্রশ্নমালা” শেষ পর্যন্ত পূরণ করলাম। দুই দলের সাথে পঞ্চাশ ভাগ মিল হলো, আর একদলের সাথে সাতচল্লিশ ভাগ তাই পঞ্চাশ ভাগ ওয়ালা একজনকেই ভোট দিলাম


এখানের নির্বাচনে আইভী – শামীম যত জন ইচ্ছে দাঁড়াতে পারে এক দলের হয়েই। “জো জিতা বোহী সিকান্দার” ---আমি একজন বিদেশী প্রার্থীকে (নন ডাচ) ভোট দিয়েছি। প্রার্থী লিস্ট থেকে বাছাই করলাম। আমার ধারনা, শুধু ইউরোপীয়ান পোশাক পরলে, ইউরোপীয়ান খাবার খেলেই “ইন্টিগ্রেশান” হয় না। যেহেতু দিনের পর দিন অন্যান্য নাগরিকের মত আমরাও সব ধরনের “কর” পরিশোধ করে যাই তাই নাগরিক ও জন জীবন গঠনে মতামত রাখতে অধিবাসী ডাচ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসা উচিত, সুযোগ পাওয়া উচিত। আমরা যে এখন এই সমাজেরই অংশ, বাইরের কেউ নই সেটা প্রতিষ্ঠিত করার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা তো এটাই।

প্রশ্নমালা পূরণ করতে করতে ভাবছি হায় ডিজিটাল বাংলাদেশ - তুমি এসব থেকে কত দূরে।


https://www.gemeentekieswijzer.nl/eindhoven/#intro

Monday, 12 March 2018

আহারে জীবন, আহারে জীবন, আহারে জীবন আহারে আহা..


এক একটা দিন এক একটা ঘোরের মধ্যে যায়। নিস্প্রাণ সোমবার সকালে অফিসের একঘেয়ে কাজের মাঝে নিউ ডট এনএল চাপতেই চক্ষু ছানাবড়া। বাংলাদেশ সবচেয়ে প্রথমে দাঁড়িয়ে আছে, দুর্ঘটনার খবর নিয়ে। হাত পা গুলো ঠান্ডা ঠান্ডা লাগতে লাগলো। আমাদের ছোটবেলা কেটেছে প্লেন হাইজ্যাক আর প্লেট দুর্ঘটনার খবরের মধ্যে দিয়ে কিন্তু তখন জানতাম এগুলো পেপারে থাকা লোকদের হয়, আমাদের মত সাধারণ মানুষদের হয় না। যতদিন না ঘরে ঘটলো উপলব্ধিই করতে পারলাম না, এরা কারো না কারো ঘরেরই মানুষ, ঠিক এই আমাদের মত।

কাজের কারণে ভাইকে অনেক ফ্লাই করতে হয়। একদিন দুপুরে বাসায় ফোন করে ভাইয়ের গলা পেয়ে খুব চমকালাম, অফিসে থাকার কথা। বেজার গলায় বললো, বাইরে যেতে হবে, ফ্লাইট রেডি হলে অফিস থেকে খবর দেবে, তখন যাবো। আমি হেসে ফেললাম কথা শুনে, ভাই আমার হাসি শুনে বললো, চার্ট এয়ারের অবস্থা তো জানো না, এসব প্লেনে উঠলে পেটের মধ্যে বাটার ফ্লাই দৌড়াদৌড়ি করে। এতটাই নাইফ আমি, ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ডে অভ্যস্ত যে, ভাইয়ের টেনশানটা অনুভবই করতে পারলাম না, উলটো বললাম, বাসার বড় কালো ছাতাটা নিয়ে যেও, এসব ফ্লাইট তো তত ওপরে ওঠে না, সময় মত প্যারাস্যুট না খুললে ছাতা খুললেও কাজ দেবে।

ফোন ছেড়ে যথারীতি আমি সেসব ভুলেও গেলাম। পরদিন সংবাদপত্রে সংবাদও দেখলাম, ইউনাইটেডের প্লেন দুর্ঘটনায় পরেছিল, প্লেনের জানালা ভেঙে যায়, ক্রু আহত হলেও, যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হন। আমার তাও একবারও মনে আসেনি, এখানে আমার ভাই থাকতে পারে। কারণ, আমি তো জানি সেসব যাদের হয় তারা শুধু পেপারে থাকে। যতক্ষণ বাসা থেকে আমাকে না জানালো হলো, আমি জানতামই না কি অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্যে।

কয়েকদিন ট্রমা’র মধ্যে ছিলাম, আস্তে আস্তে জীবনের নিয়মে ট্রমা কেটে বেড়িয়েছি। "ভাইয়া" আমার চেনা মাত্র একজন মানুষ যে বিমান দুর্ঘটনা সারভাইভ করেছে। তার অনেকদিন পর যখন কোন এক নির্জন সন্ধ্যায় ভাইয়ের মুখোমুখি হলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি সেই মূহুর্তে কি ভেবেছিলে ভাইয়া? ভাইয়া বললো, বেশি কিছু না, এই ভাবলাম, আব্বু কে হিসেব গুলো বুঝিয়ে দিয়ে যেতে পারলাম না, তুই এটা করে দিতে বলেছিলি, সেটা দেয়া হলো না, ও এটা বলেছিলো, সে ওটা বলেছিলো, জিনিস গুলো সব হাফ ডান পরে রইলো, শেষ করে যেতে পারলাম না, ক’দিন সবার একটু সমস্যা হবে। এর বেশি কিছু আর ভাবি নি।


আজ সারাদিন সেসব কথা মনে আনাগোনা করছে। ফেসবুকের হোমফীড জুড়ে কত মানুষের হাস্যোজ্জল মুখ ভেসে বেড়াচ্ছে, নানান ভাষায় চেক ইন দিয়েছে, হানিমুন, ফান, বেড়ানো কত কি? তারা শেষ মূহুর্তে বুক খামচে ধরে কি এরকম ভাবেই মৃত্যুর অপেক্ষা করেছে? টু ডু লিস্ট ভেবেছে? কি কি করা হলো না, কত কি করার ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল, কত ঘুরবে, ছবি তুলবে, বাড়ি ফিরে নেপাল থেকে কিনে আনা ওয়াল হ্যাঙ্গিং দিয়ে বসার ঘরটা সাজাবে কি করে মানা যায় তারা আর এখন নেই!


সব শোকের সান্ত্বনা হয় না।


আহারে জীবন, আহারে জীবন, আহারে জীবন আহারে আহা..


লেখার শিরোনামটি অনুপম রায়ের গানের ছায়া থেকে নেয়া

১২/০৩/২০১৮

Sunday, 4 March 2018

লাইফ আফটার ডেথ

অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবী দাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া
মুহূর্ত যায় জন্মের মতো অন্ধ জাতিস্মর
গত জন্মের ভুলে যাওয়া স্মৃতি বিস্মৃত অক্ষর
ছেঁড়া তাল পাতা পুঁথির পাতায় নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া.


গান গাই বটে, আসলে কি তাই? “প্রতিটি জীবিত মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে” জেনেই প্রতিটি জীবিত মানুষেরই মরনের পরেও বেঁচে থাকার এই আকুতি চিরন্তন। সেই থেকেই নানান সৃষ্টি। গল্প, কবিতা, গান, ব্যবসা, দান, অবদান, স্থাপনা, রাজ্য পাট কীসের মধ্যে দিয়ে নয়। নানান কীর্তি’র মধ্যে দিয়েই মানুষ মরনের পরেও বেঁচে থাকতে চায়। এই আকুতি থেকে প্রাচীন মিশরে “মমি”র চেষ্টা হয়েছে। মিশরের সমস্ত মন্দির গুলো’র গায়ে নানা রকম চিত্রে ইতিহাস গাঁথা বর্ননা করে সময়কে বেঁধে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে আজকের পরিমাপে তিন মানুষ সমান উঁচু উঁচু নিজেদের ভাস্কর্য। অটোমান, মুঘল সম্রাট’রা করিয়েছেন নিজেদের প্রতিকৃতি। নানা কবিতায়, গল্পে, গানে এই আকুতি বিভিন্ন ভাবে হাজার বছর ধরে নিবেদিত হয়েছে


সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার--
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক
আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।


“সৃষ্টিকর্তা”র ধারনাও কিন্তু এই আকুতির মধ্যে থেকেই এসেছে। মানুষ নিজের মত করে ভেবেছে বলেই, এই পূজা, এই আরাধনা, এই ইবাদতের অবতারনা। নইলে যিনি সর্বশক্তিমান তার কি দায় পরেছে কে তাঁকে নিয়ে ভাবছে কি না ভাবছে সেই কথা ভাবতে? মানুষের এই চাওয়ার সুযোগ নিয়েই যুগে যুগে এসেছে “ধর্ম” এর ধারনা। “লাইফ আফটার ডেথ” এই ধারনাটিই ধর্মের মূল পুঁজি, এটুকু সরিয়ে নিলে বাকী সমস্ত কিছুই অন্তসার শূন্য। মানুষ যেহেতু তার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি, তাই কাল্পনিক এই সৃষ্টিকর্তা’ও অমরত্ব চান তার সৃষ্টির মাঝে, স্তুতি চান, চান সবাই তার কাছে নতজানু হোক। প্রত্যেকটি ধর্মেই স্বর্গ, নরক, পুর্নজন্ম এই বিষয় গুলো এসেছে, কোন ধর্মই নেই যেখানে এই উপাদান গুলো নেই। ঘুরে ফিরে “লাইফ আফটার ডেথ” কিংবা অমরত্ব এর অসীম চাহিদাই ধর্মের আঁধার কিংবা আবশ্যিক উপাদান।


মরে গিয়েও অন্ততকাল বেঁচে থাকার এই আকুতি থেকেই মানুষের যাবতীয় সৃষ্টি, সন্তান, বংশ, পরিবার কি নয়। নিজের নাম যেনো রয় সদা বহমান। “কীর্তিমানের মৃত্যু নেই”। এই বিভ্রম থেকে পৃথিবীর খানিকটা অনুন্নত অংশ কখনও মুক্ত হতে পারবে না। প্রথম বিশ্বের জীবন এতটাই ব্যস্ততা আর জাগতিক চাপের মধ্যে দিয়ে যায় যে, কোন একটা “ধারনা”র পেছনে খরচ করার মত ঠিক এতটা সময় বাঁচে না সে দেশের মানুষের হাতে থাকে না। উন্নত জীবন ধারা যেমন দেয় অনেক ঠিক তেমনি নেয়ও অনেক। এখানে হাতের কাছে চিত্ত বিনোদনের এত খোরাক মজুদ যে, মানুষ বেঁচে থেকেই সব উপভোগ করতে চায়। অতৃপ্ত আত্মা’র অতৃপ্ত বাসনা, অন্য কোথাও অন্য কোন সময়ে বা জীবনে এখানে তত জনপ্রিয় নয়।


হয়ত এই একটা কারণেই “ধর্ম” ধারনাটি যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নির্দিষ্টি একটি জায়গাতেই প্রতিপালিত হয়ে আসছে। বিশেষ একটি ধর্ম লালনের যেই মূল খনি তারা এখন অর্থনীতিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ বলে তাদের জীবন রীতি পরিবর্তনের প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়েছেন, এত দিন চলছিল সবই কিন্তু অঘোষিত। এখন আর নেই কোন রাখ ঢাক গুঢ় গুঢ়। যত দিন দারিদ্রতা আর অতৃপ্ত আত্মার অতৃপ্ত বাসনা থেকে পৃথিবীর ঘন জনবসতিপূর্ণ এই এলাকা’র মুক্তি আসবে না, থাকবে না সুস্থ চিত্ত বিনোদনের সুযোগ, জীবন যাত্রার মান মানুষকে মানবিক জীবন ধারন করার সুযোগ করে দেবে না, ধনী আর দরিদ্রের এই অসম পার্থক্য বিরাজমান ততদিন এই কাল্পনিক সুখের আনন্দ থেকে কেউ তাদের বঞ্চিত করতে পারবে না, এই যে তাদের একমাত্র সুখ। সামগ্রিকভাবে অনুন্নত জীবন যাপন, চিত্ত বিনোদনের অপযার্প্ত সুযোগ, নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে এই ধারনাটিকে টিকিয়ে রাখবে।


আমি চলে গেলে ফেলে রেখে যাব পিছু.
চিরকাল মনে রাখিবে, এমন কিছু,.
মূঢ়তা করা তা নিয়ে মিথ্যে ভেবে।
ধুলোর খাজনা শোধ করে নেবে ধুলো,
চুকে গিয়ে তবু বাকি রবে যতগুলো.
গরজ যাদের তারাই তা খুঁজে নেবে।