Sunday, 24 July 2022

"বিয়ের প্রলোভন”

আপাদেরকে বলছি, “প্রেম” যেমন মানব জীবনের একটি শ্বাশত ব্যাপার, “ব্রেকাপ”ও তাই। প্রেম হয়, প্রেম ভাঙে। মানুষের মন বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, পেশা বদলায় কত কি। “পাশে থাকার শুধু একটি কারণ থাকে ভালবাসা আর ছেড়ে যাওয়ার হাজার কারণ থাকে কিন্তু কারণ আসলে একটাই অ-ভালবাসা। এই ব্যাপারটি শুধু বাঙালি সমাজে ঘটে না। পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেখানে নর-নারী এই প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যায় না। প্রেম আসলে যেমন উত্তাল জোয়ারে ভাসে, ব্রেকাপে তেমন ডিপ্রেশানে ভোগে, নিদ্রাহীন রাত, অশ্রু জলে ভাসা, অদম্য রাগ আর ঘৃণা। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র বা আদালত প্রেমে প্রতারণার দায়ে একজন মানুষকে একজন মানুষের সাথে থাকতে বাধ্য করতে পারেনি, শাস্তিও দিতে পারেনি। লিভ টুগেদার কিংবা বিয়েও ভেঙে যায়, কাউকে কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে থাকার পারমিশান আদালত দেয় না। আদালত শুধু অর্থনৈতিক দিকটার সুরাহা করে দেয়। বাচ্চা থাকলে সাধারণতঃ দায় এড়ানো পুরুষদের, বাচ্চার দায়িত্ব নিতে আদালত নির্দেশ দেয়, কেউ যেনো কারো ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় ব্যস এটুকুই। “বিয়ের প্রলোভন” দেখিয়ে কথাটা চরম আপত্তিকর। “প্রলোভন” দেখানো যদি অপরাধ হয় তাহলে “প্রলোভিত” হওয়াও অপরাধ নয় কেন। আর চরম ডিসরেসপেক্টফুল শব্দতো বটেই। একজন কেউ আপনার থেকে বেশি বুদ্ধিমান, আপনার বেক্কলামির সুযোগ নিয়ে আপনাকে ধোঁকা দিছে, এটা জনে জনে বলে বেড়ানো কতটা মানের? প্রেম থাকলে ব্রেকাপ থাকবেই, এটা মাথায় রেখেই সম্পর্কে জড়ান। শুধু ফেসবুকে সেলিব্রেটি হলেই তো আধুনিক হওয়া যায় না, চিন্তা-চৈতন্যতেও যুক্তি আনেন, সামনের দিকে তাকান, পেছনে না।

কাপিল শার্মা শো

“কাপিল শর্মা কমেডি শো” এই মুহূর্তে আমার প্রিয় একটা অনুষ্ঠান। সময় পেলেই দেখি। অনেক সময় ব্যাক গ্রাউন্ডে লাগিয়ে কাজ করি। একটা মানুষের উইথ স্ক্রিপ্ট কিংবা উইদাউট স্ক্রিপ্ট এত উইটিনেস আর প্রত্যুৎপন্নমতিতা “কাপিল”কে না দেখলে বিশ্বাসই করা যেতো না। “আপ কি আদালত” অনুষ্ঠানে রাজাত শার্মা যখন প্রশ্ন করছে, কাপিল কাঠগড়ায় তখনও ঠিক সেরকম মুডেই কথা বলছে। অডিয়েন্সের সাথে কানেক্ট করার কৌশল তার অস্থি মজ্জায়। এসব হাসি কৌতুকের একটা বিশাল ভাগ থাকে বডি শেমিং। অডিয়েন্স থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বের একটা বড় অংশ থাকে প্রশ্নকর্তাকে বডি শেমিং দিয়ে নাস্তানাবুদ করা। এই শরীর নিয়ে এই কাজ কিভাবে করেন। বাড়ি যেয়ে ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করেন। এত মোটা আপনি তারপরও আপনার পার্টনার আপনার সাথে থাকে সেটার শুকরিয়ে করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। ন্যাশনাল টিভি থেকে বিশ্বজুড়ে এই জিনিস সম্প্রচার হচ্ছে, ভাবা যায়!!!! কিকু সারদা বলছে, ভারতী সিং বিছানায় বসেছে তাতে গদীর তুলো বেরিয়ে গেছে। ভিদ্যা বালানকে দেখে একজন পাকা চুলের ভদ্রলোক কবিতা পড়াতে, কাপিল অনেকক্ষণ তাকে বুড়ো বলে পঁচালো। বয়স বাড়ার অপরাধে অন্যদের সাথে ঐ ভদ্রলোকের নিজে্কেও ঐ পঁচানোতে হাসতে হলো। ঠিক কতটা বয়স হলে একজন নর একজন নারীকে দেখে কিংবা একজন নারী একজন নরকে দেখে মুগ্ধ হতে পারবে না? কবিতা পড়তে বা লিখতে কিংবা গান গাইতে পারবে না? অজয় দেবঘন, সালমান খান, শাহরুখ খান, ইমরান হাশমী, ভিদ্যা বালান সবাই এসব জোকে হেসে গড়িয়ে পড়ে। সিদ্ধু সিং আর অর্চনা ম্যাডামের কথাতো বাদই দিলাম। আর আমরা সেন্সেবিলিটি, কমন সেন্স, কনসাশনেস, রেসপেক্ট এগুলো আশাকরি ম্যাঙ্গো পিপল থেকে!!!!!! পারস্পারিক শ্রদ্ধা, অন্যের ব্যাপারে নাক না গলানো, মানুষের আকার আকৃতি, গায়ের রঙ এগুলো মজার উপকরণ নয় বেসিক এই সভ্যতাগুলো এই উপমহাদেশের মানুষগুলো কবে শিখবে।

বিলাই - শেয়াল কথন

নন ম্যাট্রিক সকল ননদ আর জা’দের সংসারে এক বউ এম এ পাশ। একান্নবর্তী সংসারের যত রকম মনোমালিন্য আছে তাতে তার বাড়তি পাওনা হলো, “বিএ-এমএ পাশতো”। সংসারের যত রকম কুৎসিত রুপ আছে তার মধ্যে দিয়ে চান কিংবা না চান আপনাকে অনেক সময় যেতেই হয়। অসহ্য হয়ে যদি “উফ” উচ্চারণ করেন, আপনার বাড়তি পাওনা হলো, “দু’খানা বই নিকেচেতো”। "মেয়ে মানুষ" বাজার আনা থেকে শুরু করে রান্না করা, পরিবেশন করা, কাপড় কাঁচা থেকে বিল দেয়া সবই করবেন। সবার সুখ-দুঃখ,ভাল-মন্দ বিবেচনা করে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে সাংসারিক ব্যাপারে নিজের মতামত দিতে যাবেন, তখন শুনবেন, “দুই পয়সার একটা চাকরি করে তো”। আপনার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিংবা না হলো, সেটা ব্যাপার না, দিনের শেষে, সকল শেয়ালের মাঝে কোন বিলাই থাকতে পারবে না, বিলাই হওয়াই দোষের।

Thursday, 7 July 2022

কিসমাত আপনা আপনা

পকেটে টাকা নাই? গড়ের মাঠ? ফি মাসেই ম্যালা এদিক ওদিকের খরচা থাকে? ঐদিকে আবার বউ বাইরে খেতে যেতে বায়না করে? ঘুরতে যেতে চায়? জাস্ট বলবেন, ভাল মেয়েরা এত ঘুরতে বেড়াতে যায় না। বাইরের খাবার খায় না। এরকম মেয়েদের মানুষ মন্দ বলে। ভাল বংশের মেয়েরা, নিজেরা রেঁধে বেড়ে স্বামী- সন্তানকে খাওয়ায়। ব্যস, জোঁকের মাথায় নুন পরে যাবে। বউ নিজেকে ভাল মেয়ে প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে যাবে। কড়কড়া গরমে যতই তার ঠান্ডা ব্যানানা স্প্লিট কিংবা ডামে ব্ল্যাঙ্কের ওপরের আঠালো চকলেট সসের জন্যে জিহবা তড়ে যাক, সে নিজের চোখে দেবে ধূলো আর জিভে দেবে তুলো। বুক ফেটে গেলেও মুখ খুলবে না। ঘর সাজানোর জন্য মুরানো শোপিস, কিংবা শৌখিন বারবেরি কানের দুল, ক্রিস্টালের গ্লাস এসবের বায়না করে? ভদ্র বাড়ির বউরা কি মার্কেটে মার্কেটে ঘোরে? বাউন্ডুলে মেয়েরা এসব নাটক সিনেমা দেখে বেড়ায়, মার্কেটে ঘোরে, বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেয়। সংসারি মেয়েরা না। আজন্মের শখ ছিলো একটা মিষ্টি, আদুরে, সংসারি মেয়ে আমার বউ হবে। বাড়িতে টুকটুক ঘুরবে, কারণে অকারণে চা-নাস্তা বানিয়ে আনবে। দেখবেন, বউ নিজেকে সংসারি প্রমাণ করার জন্যে, স্বামীর পরীক্ষার খাতায় মেধা তালিকায় থাকার জন্যে, মার্কেট, বান্ধবী, নাটক, গল্পের বই পড়া সব বাদ দিয়ে দেবে। শুধু জানবে না, সীতারা পরীক্ষা দিয়েই যায় আজীবন কিন্তু পাশ আর হয় না, কিছু না কিছু খুঁত থেকেই যায়। গৃহকর্মে সাহায্য করার জন্যে পাখি আপা ছিলো আমাদের বাসায় অনেক অনেক বছর। একদিন পাখি আপা বড় হলে সবাই ঠিক করে পাখি আপাকে বিয়ে দেয়া দরকার। পাখি আপার পুরো পরিবার আমাদের কারো না কারো বাড়িতে সাহায্য করে, এদের পুরো পরিবারের দাবী আছে আমাদের পুরো পরিবারের প্রতি। বেশ আয়োজন করেই পাখি আপার বিয়ে দিয়ে দেয়া হলো। পাখি আপার বরকে জাহাজে চাকুরি দিয়ে দেয়া হলো। এটা বেশ সুবিধাজনক সমাধান ছিলো। পাখি আপার বর জাহাজে চলে গেলে পাখি আপা বাসার কাজ করে, জাহাজ থেকে মাসে-দেড় মাসে বর পাঁচ-সাত দিনের জন্যে এসে ঘুরে যায়। তখন পাখি আপা বরের সাথে একটু সিনেমা টিনেমা দেখতে যায়। নতুন বিয়ের আনন্দে পাখি আপা তার বর চলে গেলেই বরের গল্প করতে চায়। বাসার সবাই এটা নিয়ে বেশ বিরক্ত, কেউ তার বরের গল্প শুনতে আগ্রহী নয়। একদিন আম্মি আমার সামনে বললো, স্বামীর নাম নিয়ে কথা বলতে হয় না তাহলে স্বামীর হায়াত কমে যায়। পাখি আপা নিদারুণ দুঃখের মুখ করে ফেললো, এই কয় মাসে কয়েক লক্ষ বার স্বামীর নাম তিনি মুখে উচ্চারণ করে ফেলেছে। বারবার জিজ্ঞেস করে, কে কইছে খালাম্মা, কে কইছে? আম্মি বললো, হুজুরের কাছে শুনেছে। আর আমার খটকা লাগলো, এই যে কাজিনদের বিয়ে হয়েছে, তারাও স্বামীর নাম হাজার বার মুখে আনে, আম্মি তাদেরকে সর্তক না করে, পাখি আপাকে কেন করতে গেলো!!! আমি আম্মির ঘরে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোন হুজুর কোনদিন এটা বললো? আম্মি বিরক্তির গলায় বললো, কে জানে, কিসের! সারাদিন দেখোস না, পটর পটর জামাইর গল্প, বিরক্ত লাগে, এখন মুখটা একটু বন্ধ থাকবে। তারপর আবার আমাকে শাসানি দিলো, তুই কাউকে এটা নিয়ে কিছু বলতে যাবি না, চুপ থাকবি। আম্মির পছন্দের তালিকায় আসার নিদারুণ চেষ্টা থেকে আমি চুপই ছিলাম। শুধু জীবনের এই প্রান্তে এসে অনুভব করেছি, ধর্ম আর প্রথা তৈরিই হয়েছে শাসন আর শোষণ করার জন্যে। কাউকে "চুপ রাখার" জন্যে এর চেয়ে ভাল হাতিয়ার আর হয়ই না। যেখানে পাখি আপাকে পাকড়াও করা যায় সেখানে পাখি আপা আর যেখানে স্বাতী আপাকে পাকড়াও করা যাবে সেখানে স্বাতী আপা। কিসমাত আপনা আপনা।

Friday, 1 July 2022

সোনার হরিণ

সাধারণতঃ বছরে দু’বার গ্রামে বেড়াতে যেতাম। সকালে গিয়ে বিকেলে আসা হলো নানুর বাড়ি। আর দাদুর বাড়ি মানে দু/তিন দিন থাকা। দাদুর বাড়ি বেড়ানোর মধ্যে একটা পার্ট থাকতো, দাদুর হাত ধরে আশে পাশের দাদুদের সাথে দেখা করতে যাওয়া। তখন সব গ্রাম জুড়ে এত পাকা বাড়ি ছিলো না। বেশির ভাগই টিনের বড় বড় ঘর। ঘরের সামনের অংশে থাকতো মেহমানদের বসার জায়গা। ঘরের ওয়াল জুড়ে নানারকম সূচিকর্ম। অনেক বাড়িতেই সোনালি জড়ির সূতা দিয়ে দুটো হরিণ আঁকা থাকতো, সাথে লেখা, “সোনার হরিণ, কোন বনেতে থাকো”? গ্রাম্য জিনিস ভেবে হয়ত অনেকে তাচ্ছিল্য করি। সূচি কর্মের নিপুনতার বাইরে এই বাক্যটির আর কোন উদ্দেশ্য বা গভীরতা আছে কিনা খোঁজার চেষ্টাও হয়ত করিনি বা করি না। আজকাল খুব মনে হয়, সেই লাজুক, নিরুপায় মেয়েগুলো হয়ত তাদের গোপন বেদনা, অশ্রু এই সুঁই -সূতার মাধ্যমে নিবেদন করে গেছে। কে কবে কার সোনার হরিণের খোঁজ পেয়েছে? তখনতো ব্লগ, ফেসবুক ছিলো না, যার যার মাধ্যমে সে তার নিজের বেদনা আকুলতা রেখে গেছে। হয়ত, এই দু’লাইনের মাঝেই লেখা আছে, খুব চেয়ে না পাওয়া সেই পাথর বসানো ঝুমকার দুঃখ, ঈদে বা পূজায় বাপের বাড়ি নাইওর যেতে না পারার কষ্ট কিংবা অকাল প্রয়াত সন্তানের প্রতি মমতা। ঘুরেফিরে তো একই উপসংহার, যা পাই তা চাই না, আর যা আজীবন চেয়ে বেড়াই তা কোথাও নেই। যারা পেয়েছি বলে ভড়ং দেখায়, তারা হয় নিজের কাছেই মিথ্যেবাদী নয় প্রবঞ্চক।

প্রিয়তমেষু

https://arts.bdnews24.com/archives/37553?fbclid=IwAR0UNZKrir-Xupit6sxRarBeLaRh7c1J9YaiFBoLZuwXyJM49X58BxDcPr8 প্রিয়তমেষু, তোমাকে চুমু খেতে বলিনি। ভুল করলে ক্ষমা চাইতেও বলি না। খুব মন খারাপ করলেও, ডাকবো না, বলবো না, এসো, জড়িয়ে ধরো আমায়, মিথ্যে করেও বলতে বলিনি, বলো, আমায় কত ভাল দেখাচ্ছে। আমায় একটা সুন্দর চিঠি লিখবে? বলিনি কখনো। ফোন করে আমায় বলো, সারাদিন কি করলে, কেমন কাটলো সব, না, তাও বলি না। সারাদিনে কি একবারও আমার কথা ভেবেছিলে, তাও জিজ্ঞেস করিনি এই যে দিনভর তোমার জন্য আমি এত কিছু করি তার জন্যে ধন্যবাদও চাইনি। মন খারাপ করেছে, পাশে থাকো আমার এ আব্দারও করিনি। যখন কোন কঠিন সিদ্ধান্ত নেই তুমি সমর্থন দেবে, সে প্রত্যাশাও রাখি না। জেগে থাকা রাতে, অর্থহীন হাজার গল্প করতে ইচ্ছে করে তোমাকে সেসব শুনতে হবে, সে দিব্যি দেইনি। কিছুই চাইনি আমি তোমার কাছে প্রিয় এমনকি সারাজীবন আমার পাশে থাকো এটিও না। চেয়ে নেয়ার মধ্যে কি আর আনন্দ থাকে সোনা। স্বামী ডিয়েগো’র সাথে ফ্রিদা কাহলো’র আলাপচারিতা অবলম্বনে

Thursday, 26 May 2022

দূরের দোলাচল

https://samakal.com/kaler-kheya/article/2205113391/%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%AA%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%AE-%E0%A6%A6%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87 প্রায় দু’যুগের ওপরে হতে চললো প্রিয় বাংলাদেশ থেকে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার দূরে সংসার পেতেছে নিশি। কিংবা হুমায়ূন আজাদের ভাষায় বলতে গেলে “এই তাৎপর্যহীন জীবন”কে খানিকটা অর্থবহ করতে কিংবা “চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে আরো কিছু দূর যেতে" নিদারুণ ব্যস্ততায় কাটছে তার মূর্হুত, ঘন্টা, দিন। একসময় উত্তর সমুদ্রের পারের এই ভিনদেশি আবহাওয়ায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে কি কষ্টটাই না হয়েছে। আজও কি পুরোপুরি পেরেছে? এখনও আনমনে দ্রুত হাঁটতে গিয়ে কি পা পিছলে বরফের ওপরে পড়ে না? নিজের সম্পূর্নটা ঢেলে যতখানি সম্ভব শুদ্ধ ওলন্দাজ উচ্চারণে ও ব্যাকরণে যখন কথা বলে, প্রায়শই টেবলের ওপারের উনি হেসে বলেন, ভাষাটা তুমি খুব সুন্দর শিখেছো। মূহুর্তেই জেনে যায় সে তাদের কেউ নয়, সে অন্য দেশের অন্য কেউ যে নিজেকে তাদের দেশের আচার আচরণে অভ্যস্ত করতে ব্যস্ত। অথচ এই অব্ধি পৌঁছতে তাকে কত পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। কলেজ-ইউনিতে সালোয়ার কামিজ, চটিতে অভ্যস্ত জীবন এখন জীন্স, সোয়েটার আর বুটসে মোড়া। অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে গরম স্যুপের সাথে লুমপিয়া কিংবা ক্রোকেট খেতে খেতে ভাবে আহা সেই আমার টিএসসির তেহারি কিংবা ডাসের কলিজা সিঙ্গারা। তারপরও কর্মময় জীবন একসময় এসব ভাবালুতা পেছনে ফেলে স্যুপ, স্যান্ডউইচে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয় | আয় মরণ ভুলে গিয়ে ছুটে ছুটে আয় হাসি নিয়ে আয় আর বাঁশি নিয়ে আয় আজ যুগের নতুন দিগন্তে সব ছুটে ছুটে আয় || আজ ফাগুন ফুলের আনন্দে সব ছুটে ছুটে আয় | প্রয়াত ভূপেন হাজারিকার গাওয়া এই গানটা নিশির খুব বেশি প্রিয়। আগে ভাল লাগতো শুধু কথা আর সুরের জন্য আর এখন ভাল লাগে নিজের যাপিত জীবনে অনুভব করার জন্য। এখানে কেউ পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করে না, অযাচিত স্পর্শ নেই, নারী বলে কর্মক্ষেত্রে অবমাননা নেই, রাতবিরেতে সাইকেল চালাতে কিংবা জিমে যেতে বা হাঁটাহাঁটি করতেও কোন ভয় নেই। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর টিশার্ট পরে নিশ্চিন্তে বীচে হাঁটে, গলা ছেড়ে গান করে, ফুটবলে নেদারল্যান্ডস জিতলে সবার সাথে রাস্তায় নাচে, রাজার জন্মদিনে ওপেন এয়ার কনসার্টে নাচে কোনটাতেই এ বয়সের আদেখেলপনা নিয়ে চোখ বাঁকা করে জাজ করার কেউ নেই। এখানে জীবন হলো যাপন করার জন্যে, কোন বয়সে কি মানায় তার গন্ডীতে ফেলে নিজেকে শাস্তি দেয়ার জন্য নয়। সেই সাথে মনের গহীনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত বেদনাও পোড়ায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট জয়ের আনন্দে কখনও চুল খুলে রাস্তায় নামতে পারেনি, লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে নিজ দেশে জীবন খুঁজে নিতে পারেনি, উৎসবে আনন্দে ছুটে ছুটে আসতে পারেনি। খুব সোজা সাপটা কথা বলা, শাদামাটা জীবন যাপনের জন্য ওলন্দাজ সংস্কৃতি বিখ্যাত। প্রধানমন্ত্রীসহ প্রায় সব মন্ত্রীই রোজ সাইকেল চালিয়ে অফিসে আসে। অন্য সবার মতই তাদেরও যানজট এড়িয়ে সময়মত অফিসে আসার তাড়া থাকে। অফিসের সামনের ক্যাফেটারিয়াতে বসে কফি খায়। ফর্মাল কোন অনুষ্ঠান না থাকলে মোটামুটি সবাই সাধারণ জীন্স, কেডসে অফিস করে। মানুষের একাকীত্ব আর ডিভাইস আসক্তি কমানোর জন্য গার্ডেন অফিসের প্রচলন হয়েছে পৃথিবী জুড়ে, নেদারল্যান্ডসও এর ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং কারো কোন ফিক্সড ডেস্ক নেই, যে যখন আসবে, যেই ডেস্ক ফ্রী থাকবে সেখানে বসেই কাজ করতে হবে। এতে পদমর্যাদা নিয়ে লড়াই কিংবা বড়াই করার সুযোগ কম। বাংলাদেশের মত এরকম স্যার, বড় স্যার, ম্যাডামের দেশ থেকে এসে এসবে অভ্যস্ত হতে রীতিমত ধাক্কাই খেয়েছো প্রথম দিনগুলোতে সে। এখনও কি অভ্যস্ত হতে পেরেছে? আজও যখন লাঞ্চ ব্রেকে সিএফও অবলীলায় পাশের চেয়ারে বসে পড়ে তার অস্বস্তি কাজ করে। অহেতুক বাজে খরচা না করার জন্যে বিশ্ব জুড়ে “কিপ্টে” খ্যাতিও ওলন্দাজদের দখলে, এই নিয়ে কে কি বললো তা নিয়ে তাদের থোড়াই পরোয়া আছে? নিশির এখন সমস্যা হলো, দেশে বেড়াতে এলে অনেক কিছুই তার বাজে খরচা মনে হয়। কেউ তার সাথে দেখা করতে এলে তিন কেজি মিষ্টি নিয়ে আসে আবার নিশিকে বেড়াতে গেলেও একই কাজ করতে হয় যেখানে মানুষ হয়ত পাঁচ-থেকে দশ জন। এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে, বোঝাতে গেলে, মিতব্যায়ী হওয়ার ভাল দিকটা ব্যাখা করতে গেলে উলটো শুনতে হয়, অনেক বেশি ইউরোপীয়ান হয়ে গেছো, একদম দেখি ওদের মত। বুকের ব্যথা কাউকে বলা যায় না, কিন্তু ইচ্ছে করে বলতে জীবনের বেশি সময়টা ওখানে কাটলো, কি করে আশা করো আমি তোমাদের মত থাকবো? এধরনের কথবার্তা কি দেশের মানুষই বলে? না, এখানে বাস করা নিজ দেশী ভাইবোনরাও বলে। একবেলা ভাত খাও? সন্ধ্যা ছটায় খেয়ে নাও? পুরাই দেখি ডাচ। এই কথাগুলো যারা বলে তারা হয়ত একবারই বলে। যে শোনে সে হাজারবার শুনে ক্লান্ত। বাঙালির মেয়ে হয়ে সিগারেট খায়, মদ খায়, ডিস্কো যায় কিংবা ছেলে বন্ধু আছে? ভাবা যায়? বিদেশে এসে বাঙালিদের এই অধঃপতন? বাবামা ঠিক করে শিক্ষা দেয় নাই, পয়সার পেছনে ভাগছে আর কি? যে মেয়েটি শুধুমাত্র চামড়ায় বাদামী, কারণ তার বাবামা বাংলাদেশী বাকি তার জন্ম, পড়ালেখা, সমাজ, বন্ধু, খেলাধূলা সব নেদারল্যান্ডসেই। তার জীবন কেটেছে অন্যান্য বিদেশীদের সাথে, তিন কিংবা পাঁচ বছরে একবার কয়েক সপ্তাহের জন্যে ছুটি কাটানো ছাড়া বাংলাদেশের কোন অস্তিত্ব তার জীবনে নেই কিন্তু তাকেও অহরহ এসব নিন্দার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় শুধুমাত্র বাংলাদেশি কারো ঘরে জন্মেছে বলে। পূর্ব পশ্চিমের এই ব্যবধান দিন দিন বড় হয়ে দেখা দেয়। পূর্বে যেটাকে স্বাভাবিক লাগতো বহুদিন পশ্চিমে থাকার পর সেগুলোকে অযৌক্তিক লাগতে থাকে। এখানে সাধারণত খাওয়া মানে, ভাত নয় রুটি, মাছ বা মাংস, সব্জি কিংবা সালাদ। দেশে প্রায় প্রতিবেলায় পঞ্চ ব্যাঞ্জন রান্না করতে যে পরিমান শক্তি ব্যয় হয় তা যদি কোন উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হতো তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা আরো জোরেও হয়ত ঘুরতে পারতো। তাছাড়া পশ্চিমে বেশীরভাগ মানুষই নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত, ছোটবেলা থেকেই সবাইকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়। পূর্বে স্বনির্ভতার সংজ্ঞাটাই ভিন্ন আর তাই হয়ত প্রত্যেক বাড়িতেই সাহায্যকারী কর্মীর দরকার হয়। সব কিছু এই সব কিছুর পরেও হেমন্তে যখন এখানে পাতা ঝড়া শুরু হয়, পাতায় পাতায় রঙের খেলা, বিদায় নেয়ার পালা, চারধার শান্ত হয়ে আসতে থাকে, শীতের আমেজ মনে করিয়ে দেয় আরও একটি বছর কালের গর্ভে হারাতে যাচ্ছে তখন হারিয়ে ফেলা সেই ছোটবেলার কাঁচা খেজুরের রসের গন্ধ, ঠান্ডা খেজুরের রস খেতে খেতে সোয়েটার পরা গায়েও কেঁপে কেঁপে ওঠা, স্কুলের ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার সুবাদে গ্রামে বেড়াতে যাওয়া, সেই বেড়ানোকে উপলক্ষ্য করে গ্রামে সদ্য বন্ধুত্ব হওয়া নাম না জানা তুতো ভাইবোনদের সাথে ফসল ভরা জমিতে বেড়াতে যাওয়া। জমি থেকে টেনে তোলা শিশির ধোয়া ধনেপাতা দিয়ে তাজা কূল আর তেঁতুল মাখা ভর্তার গন্ধ, চারদিকে হলুদ সর্ষের চাদর বিছানো, কাঁচা সর্ষে শাকের গন্ধ, মাটি তোলা নতুন আলু আর মটরশুটি। জমি থেকে তুলে আনা টমেটো – ধনেপাতা দিয়ে ছোট মাছের চর্চরি। ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা আর পাখি শিকারীদের ভীড়। কিংবা তেল ভরা বালিহাঁস আর ভুনা খিচুড়ির জন্যে মনটা কেমন কেমন করে উঠে না? সবই কি হারিয়ে যায়? উচ্চ প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল বলে খ্যাত এই শহরে থেকেও, নিশি চোখ বন্ধ করলেই পরিস্কার দেখতে পায়, শ্যাওলা পড়া পুকুর ঘাট, গাছে গাছে জড়াজড়ি করে থাকা গ্রাম্য জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া এবড়ো থেবড়ো পায়ে চলা মেঠো পথ, এ বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনা ডিঙিয়ে কোন মাঠে গিয়ে মিশেছে। সেই মাঠ আবার মিশেছে আকাশের সাথে। প্রত্যেক বাড়ির সামনে বিরাট বিরাট উঠোন, সীমের মাচা, লাউয়ের মাচা, পাশেই গরুর ঘর। কি শান্ত অলস যেনো পটে আঁকা ছবি। প্রায় শুকিয়ে আসা খালের পাড়ে বাঁধা নৌকা, মসজিদের পেছন দিকে জঙ্গল, এসব কিছুর জন্যে আজও অন্তরে গভীর হাহাকার অনুভব করে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা চটপটি খাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের অনুভূতি দেয়, বেলী কিংবা কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ দেহ মনে সেই সময়ে যে শিরশিরানি আনতো আজো তেমনই আকুল করে। চওড়া পাড় দেয়া ভাজ ভাঙ্গা বাসন্তী রঙের নতুন তাতের শাড়ি, হাতে রঙ বেরঙের লাল হলুদ সবুজ রেশমী চুড়ি, কপাল জুড়ে বড় চাঁদের মতো কালচে লাল টিপ আর ঘাড় গলা খোঁপা জুড়ে জড়িয়ে থাকবে অজগরসম কাঁঠালিচাঁপার মালা, ফাল্গুনের এই সাজে নিজেকে সাজিয়ে বন্ধুদের সাথে বাংলা একাডেমীর প্রাংগনে বইমেলায় কলরবমুখর পদচারণা। সেই জ্বলে ওঠা নিভে যাওয়া জোনাকী পোকা, আমসত্ত্ব, চালতার আঁচার, সারা গায়ে সুর মেখে হুড খুলে বৃষ্টিতে ভেজা এর কোনটা সে ভুলতে পেরেছে? সবইতো মনে হয় এই সেদিনের কথা যখন সে ওখানকার একজন ছিলো। এখন কথা হতে পারে শ্যাওলা পড়া পুকুর নদী কি নেদারল্যান্ডসে নেই? এখানে কি ঘুঘু ডাকে না? রঙিন প্রজাপতি ওড়ে না? হ্যাঁ কথা সত্যি, এসকল সব এখানেও আছে, হয়তো খানিকটা অন্য ফর্মে অন্য ঢঙে। প্রবাসীরা যেমন সব কিছু ইউরো থেকে টাকায় কনভার্ট করে দেখতে ভালবাসে। তেমনি প্রকৃতির মধ্যেও নিজ দেশের তুলনা খুঁজতে ভালবাসে, স্মৃতিতে হারিয়ে নস্টালজিকতায় ভোগা প্রবাস জীবনের সতত ধর্ম বলা চলে। দেশে গেলে প্রায় প্রত্যেকেরই জিজ্ঞাসা, কবে এসেছিস, ক’দিন থাকবি? বক্তব্য খুব পরিস্কার, তুই আর আমাদের কেউ নোস, ক্ষণিকের অতিথি। তাকে ঘিরে চারপাশ জুড়ে এত আনন্দ কোলাহল থাকা সত্বেও নিশির শুধু মনে হতে থাকে, ছবি হয়ে রয়ে গেছি সবার স্মৃতিতে, বাস্তবে আর আমার কোন অস্তিত্ব নেই। সত্যিই কি নেই? তাহলে অনুষ্ঠানে আপনজনরা যখন ডাকে, তুই না এলে হবে না, তাড়াতাড়ি আয়। কোন সমস্যায় পড়লে বলে, তুই না বোঝালে কারো কথা শুনবে না সেগুলো কি তবে ভুল? তার অন্তর জানে, এগুলোও ভুল না। প্রতিবার বাড়ি ছেড়ে আসার কষ্টটা যেমন সত্যি তেমনি চলে আসার পর দিন দিন আবার এখানে অভ্যস্ত আরামে ফিরে আসাটাও ঠিক ততটাই সত্যি। তারচেয়ে বড় সত্যি হলো, তিন চার সপ্তাহ পরিবারের সবার সাথে থাকলে, বন্ধুদের সাথে র‍্যান্ডম আড্ডা দিলে, দেশের এই অসহ্য যানজট, খাবারে প্রাণনাশী ভেজাল, চারপাশেরর অকারণ উচ্চ শব্দদূষণ সব কেমন যেনো স্বাভাবিক লাগতে থাকে, সহ্যও হয়ে যায়। তসলিমা নাসরিনের মত বলতে পারে না, "আমার জন্য অপেক্ষা করো মধুপুর নেত্রকোনা অপেক্ষা করো জয়দেবপুরের চৌরাস্তা আমি ফিরব। ফিরব ভিড়ে হট্টগোল, খরায় বন্যায় অপেক্ষা করো চৌচালা ঘর, উঠোন, লেবুতলা, গোল্লাছুটের মাঠ আমি ফিরব। পূর্ণিমায় গান গাইতে, দোলনায় দুলতে, ছিপ ফেলতে বাঁশবনের পুকুরে-“ জীবনের এই প্রান্তে পৌঁছে আজ জানে নিশি নিষ্ঠুর এসময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ছেড়ে আসা যত সহজ ফিরে যাওয়া ততই কঠিন। যে জায়গা একবার ছেড়ে আসা হয় সে জায়গায় আর ফেরা হয় না। বারবার ফিরে গেলেও ফেরা হয় না। মানুষ বদলে যায়, মন বদলে যায়, চিন্তা-ভাবনা পরিবেশ, অভ্যস্ততা, অভ্যাস সব বদলে যায়। এত ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন হয় যে সহসা মন তা অনুভবই করে উঠতে পারে না। প্রবাসের পথে যারা পা বাড়ায় তাদের হয়ত দেশ বলতে আর কিছুই থাকে না। তারা প্রবাসেও খানিকটা বেমানান আবার দেশেও অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাত। লোপামুদ্রা মিত্রর এই গানটা নিশির তাই বড্ড প্রিয় ঠিক যেখানে দিনের শুরু, অন্ধ কালো রাত্রী শেষ মন যতদূর চায়ছে যেতে, ঠিক ততদূর আমার দেশ এই কাটাতার জঙ্গীবিমান, এই পতাকা রাষ্ট্র নয় দেশ মানে বুক আকাশ জোড়া, ইচ্ছে হাজার সূর্যদোয় এই মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক, এই দাবানল পোড়াক চোখ আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক তানবীরা হোসেন ২২/০৫/২০২২