Thursday, 16 April 2015

মনে পড়ে ঃ ফেরদৌসী মজুমদার






পড়লাম ফেরদৌসী মজুমদারের লেখা আত্মজীবনী ‘মনে পড়ে’। বনেদি, ধনী মুসলিম পরিবারে জন্ম হয়েছিলো তাঁর ১৯৪৩ সালে। চৌদ্দ ভাইবোনের সংসার ছিলো তাদের, তিনি ছিলেন এগারো নম্বর। বেশ কড়া শাসন আর আধুনিকতার মিশ্রণে ছিলো তার পারিবারিক জীবন। কবীর চৌধুরী, শহীদ মুনীর চৌধুরীর বোন তিনি, বাকি ভাই বোনেরাও সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত, রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান তারা। আত্মজীবনীতে তিনি তার পারিবারিক ঘটনা বেশ অকপটেই বলেছেন, সে-জিনিসটা আমার ভাল লেগেছে। আমার নিজের ছোটবেলাও কেটেছে মুসলিম রক্ষশীল পরিবারে। আমি তার পরিবার দিয়ে কিছুটা যেনো নিজের পরিবারটাই দেখতে পেলাম। মাথায় কাপড় দেয়ার জন্যে, পর্দায় থাকার জন্যে মেয়েদেরকে শাসন, সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরতে দেরি করা নিয়ে ছেলেদেরকে শাসন, পড়াশোনা নিয়ে মারধোর, অশান্তি, হয়তো তখন ঢাকার ঘরে ঘরে এরকমই গল্প ছিলো...


তখনো এতো লোক ঢাকায় বাস করতো না। গ্রামের দু একটি সচ্ছল পরিবারের দুএকজন ঢাকায় থাকে। প্রায়ই দেখা যেতো গ্রাম থেকে কেউ না কেউ, কোন না কোন প্রয়োজনে কিংবা কখনো স্রেফ শহর দেখার জন্যে ঢাকা চলে আসত এবং যারা ঢাকায় থাকে তাদের বাসায় উঠে যেতো। অনেকটাই “মান ইয়া না মান, ম্যায় তেরা মেহমান” টাইপ অবস্থা। ফেরদৌসীদের বাড়িও তার ব্যতিক্রম ছিলো না, তা নিয়ে ফেরদৌসী লিখেছেন, “বাবার দিকের লোকজন এলেই আম্মা সচেতনভাবে ওদের একটু সেবা-যত্ন করতেন। ওরা এলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের থাকা খাওয়ার একটু অসুবিধে হতো। বাড়িতে এলে বিছানায় উঠে যেত ওরা, মাটিতে নেমে যেতাম আমরা।............. কিন্তু এসব ঘটনা থেকে আমার মনে যেটা দাগ কেটেছে এবং যে উপসংহারে উপনীত হতে আমি বাধ্য হয়েছি-সেটা হচ্ছে দেশের বাড়ির প্রায় অশিক্ষিত লোকগুলো বড় সঙ্কীর্ণমনা হয়। এদেরকে সন্তুষ্ট করা বড় কঠিন। এদের ভিলেজ পলিটিক্সটা বড় মারাত্ক। বিচিত্র স্বভাব, বিচিত্র মনমানসিকতা। তাই গ্রামীণ সরলতার পাশাপাশি গ্রাম্য সঙ্কীর্ণতার কথাটিও ভুললে চলবে না।”


যতোটা আগ্রহ নিয়ে বইটি শুরু করেছিলাম বইটা ঠিক ততোটা আশা পূর করতে পারে নি। সত্তরের শুরুতে রামেন্দু-ফেরদৌসীর বিয়ে হয়। সেসময়ে দুজন ভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ পারিবারিক সম্মতি নিয়ে সংসার পাতছেন, সে খুব বিরল একটা ঘটনা। তাঁর ভাষাতেই, “মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে কদাচিৎ শোনা যেতো, কিন্তু মুসলমান মেয়ে হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে শোনা যেতো না”। কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু লিখেন নি তিনি। আমার দৃষ্টিতে, এটি খুব উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা যা বাংলাদেশের মানুষের জানার দরকার ছিলো। এই অন্ধ, বধির সমাজে, মৌলবাদী জনগোষ্ঠীর মত পরিবর্তন করতে এ ধরনের ঘটনার বিশদ প্রচারের প্রয়োজন আছে। প্রথমে পরিবার রাজি ছিলো না, পরে রাজি হয়েছে তার দৃঢ়তা দেখে শুধু এটুকুই লিখেছেন তিনি। সামাজিকভাবে কী ধরনের বাধাবিঘ্ন এসেছে বা আত্মীয় স্বজনদের কিভাবে মানালেন তা নিয়ে কিছুই লিখেন নি। তাঁর নিজের পরিবার ছাড়াও রামেন্দুর পরিবার ছিলো, রামেন্দুর সমাজ ছিলো, তাদের আচর তাঁর প্রতি কেমন ছিলো, তারা তাকে কিভাবে গ্রহ করেছিল সে-সম্পর্কেও একটি কথা নয়! তাঁর সুখ-শান্তির সংসারের কিছু বিবর সমাজকে জানানো তাঁর দায়িত্ব ছিলো বলে অন্তত আমি ভাবি।


রামেন্দু মজুমদারকে অনেকবার আমি পত্রিকায়, টিভিতে অনেক অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দেখেছি। ফেরদৌসীকেও আমি বিভিন্ন প্রগতিশীল, বক্তব্যধর্মী নাটকে মঞ্চে ও টিভিতে অভিনয় করতে দেখেছি। এই পরিবারটি সম্পর্কে আমার ধারনা খুব অন্যরকম ছিলো। কিন্তু ফেরদৌসীর বইটি আমাকে বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। আমি কিছুটা অংশ বই থেকে হুবহু তার ভাষাতেই তুলে দিলাম,

“ধর্ম নিয়ে জহুর ভাই অনেক পড়াশোনা করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইসলাম সব ধর্ম বিষয়ে মোটামুটি পড়েছেন। শুনেছি বৌদ্ধধর্ম তাঁর ভাল লেগেছিল। এমনকি গৌতম বুদ্ধের মতো গাছের নিচে ধ্যানে বসতে চেয়েছেন। প্যাগোডা না পেয়ে ২-১ দিন নাকি ধ্যানের উদ্দেশ্যে গাছের নিচেও বসেছিলেন। ১৩ – ১৪ বছর বয়সে বোধহয় বৌদ্ধধর্মের বিশ্বাসটা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। পরে গৌতম বুদ্ধের জীবনবিমুখতা তাঁর কাছে ভালো লাগলো না। জীবনের ঝঞ্ঝাট থেকে পালিয়ে বেড়ানো তিনি সমর্থন করেন না। কিন্তু এটা সত্য তিনিই বলেছেন, একসময় তাঁকে Buddist Qayyum ও বলা হতো। খ্রিষ্টান ধর্ম তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ১৪ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রোমান ক্যাথলিক হয়েছিলেন। তিনি ত্রিপিটকও পড়েছেন। কোনো ধর্মেই যখন শান্তি পাচ্ছিলেন না তখন তিনি কমিউনিস্ট হয়ে গেলেন। সেসময় তাকে Qayyum the Communist  বলা হতো। বেশ কয়েক বছর তিনি ও নামেই সুপিরিচিত ছিলেন, কিন্তু ওতেও শান্তি পেলেন না তিনি। অবশেষে নিজের সেই ধর্মে ইসলামের দিকে ঝুঁকলেন। সেটা হয়েছে আব্বা তাঁকে ইসলামের মর্ম বুঝিয়ে একটা চিঠি দিয়েছিলেন এবং সেটা পড়েই তিনি কোরান শরিফ পড়া শিখেছিলেন। আব্বা তাঁর জন্যে মৌলবী রেখে দিয়েছিলেন – নিজেও পড়াতেন; কিন্তু জহুর ভাই মৌলবীকে ফাঁকি দিয়ে প্রজাপতি ধরতেন। ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে মৌলবীর চাকরি নট। সম্পূর্ণভাবে আব্বা নিজে পড়াতে শুরু করলেন। সেই যে কোরানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা জন্মালো তা আর কোনদিন কমে নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে। জহুর ভাই ইসলাম ধর্মের আর কোরানের বাণীর এমন আধুনিক ব্যাখা দেন যা অনেকেরই অজানা। কোরানের গূঢ় তত্ত্ব এবং কোরানের বাণীর নির্যাসটা তিনি আহরণ করেছেন এবং জীবনে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন।

যখনই কোথাও কোনো ভাষণ দিয়েছেন ঠিক জায়গাতে কোরান থেকে ঠিক আয়াতটি বা শব্দটি বেছে নিয়েছেন। কোয়েটাতে একবার এক লেকচারের আগে তিনি কোরানের কিছু অংশ আবৃত্তি করেছিলেন। কোয়েটা কলেজের তৎকালীন Chief instructor এফএসকে লোদি এটার বিরুদ্ধে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারে জহুর ভাই ভ্রুক্ষেপ হয় নি, তিনি তাঁর চেতনায়, তাঁর বিশ্বাসে অনড় ছিলেন এবং অনেক পাঞ্জাবিও তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাঙালির বুদ্ধিমত্তা, বাঙালির মনমানসিকতারই জয় হয়েছিল সেদিন।“ 
  

এতোটা গোঁড়া চিন্তাভাবনা আর মানসিকতা যার তিনি সেই যুগে কী করে একজন ভিন্নধর্মীর গলায় মালা দিলেন! যার মনে নিজ ধর্ম নিয়ে এতোটা শ্রেষ্ঠত্ব আর গরিমা কাজ করে তিনি অন্য ধর্মের কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, ভাবতেও কষ্ট হয় আমার। যে সময়ে মেয়েদের স্কুলে থাকতেই বিয়ে হয়ে যেতো, সে সময়ে তিনি ডবল এম।এ করে টিভিতে নাটক করতেন, এ বইটি পড়ে আমার সেটা ভাবতেও কষ্ট হয়। ধর্মের কাছে কী সত্যি তাহলে শিল্প-সাহিত্য, প্রগতিশীলতা অসহায়? এতো আধুনিক জীবন যাপন করে এমন রক্ষনশীল চিন্তা ভাবনা মনে রাখা কতোটা পরস্পরবিরোধী।


তবে পুরো বইয়ের কোথাও ফেরদৌসী তার ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো খুব বিশদে লিখেন নি যেটা আত্মজীবনী লেখার অনেকটা মূলধারা বলে ভাবা হয়। তিনি তাদের পারিবারিক ঘটনাবলীই লিখে গেছেন। অনেকটা খাপছাড়া, ধারাবাহিকতা নেই। এক এক সময়, এক এক ঘটনা। পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশক, সত্তরের দশকের পর্যায়ক্রম অনুপস্থিত। সাংস্কৃতিমনা, শিক্ষিত পরিবারের ঘটনাবলী থেকে সমাজ পরিবর্তনের, রাজনৈতিক আন্দোলনের, মুক্তিযুদ্ধের যে-ধারাবাহিকতা আসার কথা ছিলো তাও নেই। যার কারণে ছোট থেকে বড় হয়ে-ওঠা ফেরদৌসীর বিশদ কিছু চিত্র এখানে পাওয়া যায় না। শেষের দিকে তাদের চৌদ্দ ভাইবোনের জীবনের সারমর্ম লিখেছেন, সবার প্রেম-বিয়ে-সংসার নিয়ে লিখেছেন। তারমধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত তার নিজের কাহিনি, যার মধ্যে প্রেম-বিয়ের কিছু নেই, শুধু আছে রান্না করতে জানতেন না, সেটা শিখেছেন আর তাঁর মেয়ের কথা! হয়তো এ-কারণে, বইটি ঠিক যতোটা আলোচনায় আসার কথা ছিলো, ঠিক ততোটা আলোচনায় হয়তো আসে নি। কিন্তু বইটিতে অনেক তথ্য আসার সুযোগ ছিলো। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনকে তুলে ধরার একটি দলিল হতে পারতো এই বইটি। সে-হিসেবে বইটা আশা জাগিয়েও ব্যর্থতার ছায়ামাখা একটা সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিয়ে গেলো।

গত গ্রীষ্মের ছুটিতে বইটি যথারীতি উপহার পেয়েছিলাম ছোটভাই আরাফাত শান্ত থেকে।

তানবীরা
১৫/০৪/২০১৫




Sunday, 12 April 2015

ভিন্ন চোখে দুনিয়া দর্শন – ১

এতোদিন পশ্চিমে থেকেও আবহাওয়াটা ঠিক পোষায় না সাজিয়াদের। শীতকে প্রচণ্ড ভয় তার ওপর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কাছের এই দেশগুলোতে শীতের দিনে আলোও নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক্রিসমাসের ছুটিতে প্রায়ই সূর্যালোকের খোঁজে এদিকে ওদিকে বেড়িয়ে পড়ে তারা। সারা জীবনের স্বপ্ন একবার ইজিপ্টে যাবে। সূর্যালোক খোঁজ করতে করতে ইজিপ্টে মন ঠিক করে আনন্দে আত্মহারা। যথাসময়ে বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে চললো ইজিপ্ট-দ্যা ল্যান্ড অফ হিসট্রি।
লুক্সর টেম্পল, কোর্নাক টেম্পল, ভ্যালি অফ দ্যা কিংস, হাবু টেম্পল, টেম্পল অফ হাসিবস্যুট, কোম ওমবো ইত্যাদি নানা জায়গায় ভ্রমণ করলো নীলের ওপর দিয়ে, ক্রুজ ট্যুর ছিলো। আট দিনের ভ্রমণ শেষে দিগ্বিবিজয়ের আনন্দ নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলো।





সাজিয়ার বারো বছর বয়সী মেয়েও বললো, মা, জীবনে যতো ছুটি কাটিয়েছি, ইজিপ্ট ইজ দ্যা বেস্ট।
আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে কোন ইভেন্টই গোপন থাকে না, আর এটা গোপন থাকার তো কোন কারণই নেই। মহাসমারোহে ফেসবুকে ফটো পোস্ট করে চলেছে সাজিয়া। এতো এতো ছবি উঠিয়েছে ডিএসএলার-এ, বাছাই করে পোস্ট করাও একটা বিরাট কাজ। একদিন স্থানীয় একজন বেড়াতে এলেন। গল্প হচ্ছে, চা খাচ্ছে।
বললো, আপনাদের মিশরের ছবি দেখে খুবই ভাল লাগছে। কোথায় কোথায় গেলেন? আমারও অনেকদিনের ইচ্ছা ওখানে যাওয়ার, কতো ইতিহাস।
সাজিয়ার তো আনন্দে টইটুম্বর অবস্থা, আনন্দে আটখানা হয়ে ফেটে পড়ে বলতে লাগলো কোথায় কোথায় গিয়েছে।
উনি একটু অপেক্ষা করে বললেন, মুসা নবী যেখানে নীল নদকে ওনার লাঠি দিয়ে দুই দিকে দুই ভাগ করলেন, সেখানে যান নাই!
সাজিয়া একটু থমকে গেলো। তারপর বললো, এসবতো আসলে মিথ, লোকের মুখে মুখে ছড়ায়, এ ধরনের কোন জায়গার অস্তিত্ব আসলে নেই।
ভদ্রমহিলা খুবই রেগে গেলেন, কী বললেন? কী বললেন আপনি? মুখে মুখে ছড়ায়? কুরআনে লেখা আছে জানেন, আল্লাহর কুরআনে!
সাজিয়া নিরুত্তর। যেভাবে উনি রেগে গেছেন তাতে সে এখন কী বলবে বুঝতে পারছিলো না।
সাজিয়াকে এমনিতেই ভদ্রমহিলার কম পছন্দ। আল্লাহর প্রতি সাজিয়ার ডর ভয় কম, এমনিতে সাজিয়া মানুষ খারাপ না হলেও কোন ইসলামি রেওয়াজ পালন করে চলে না। ছেলেরা অল্পবয়সে অনেকসময় এমন হয় উনি দেখেছেন, আবার বয়স হলে ঠিকও হয়ে যায় কিন্তু মেয়ে এরকম উনি শুধু এই একটা চিজই দেখলেন। সাজিয়াকে নিরুত্তর করাতে পেরে উনি বিজয়ীর দম্ভে আবার বললেন, আমার পরিচিত অনেকেই যারা গেছেন তারা দেখে এসেছেন। অনেক মুসলমান ট্যুরিস্ট হিসেবে শুধু এটা দেখতেই যায়, এটা আসলে ইমানের ব্যাপার।
নিরুপায় সাজিয়া বললো, চলেন গুগুলে দেখি এমন কোন জায়গা মিশরে সত্যিই আছে কিনা?
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে উনি বললেন, সব গুগলে থাকে না, সব গুগলের ব্যাপার না। অনেক কিছু কুরআনে আছে, ইমানের ব্যাপার।
রাগে লাল চেহারা করে বারবার যেই এমফেসিস তিনি ‘কুরআন’ শব্দের ওপর দিচ্ছিলেন সাজিয়া ভয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো যে উনি না রাগে তাকে মার দিয়ে ফেলেন। সাজিয়া মিশরের ইতিহাস জেনে ও তাকে বলবে, কী না বলবে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো।
সবদিক বিবেচনা করে সাজিয়া তার মুখ বন্ধ রাখাই সমীচীন মনে করলো। এখন সে জেনে গেছে ধর্মানুভূতি আহত হলে মারাত্মক ক্ষেপে যাওয়ার, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মেরে-ফেলারও অধিকার আছে।
_________________________
[৩২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রাজা মেনেস উত্তর মিশর আর দক্ষিণ মিশরকে এক রাজ্যে পরিণত করেন। তার পর ৩১টি রাজবংশের শতশত রাজা-যাদের উপাধি ছিল ‘ফেরৌন’-এই মিশর রাজ্যটি শাসন করেন। কাজেই ‘ফেরৌন’- যাকে ‘ফেরাউন’ বলা হয়-তা কারো নাম নয়, এটা তৎকালীন মিশর শাসনকর্তার উপাধি। এই শতশত ফেরাউনদের মাঝে অনেকেই যেমন অত্যাচারী ছিলেন, আবার অনেকে দয়ালু প্রজাবৎসলও ছিলেন। আর এই ৩১টি রাজবংশের শতশত ফেরাউনদের মাঝে একজনই ফেরাউন আছেন যাঁর নামের আগে ‘দি গ্রেট’ কথাটি উল্লেখ করা আছে। আর তিনি হলেন ‘দি গ্রেট দ্বিতীয় রামেসিস’ যিনি ৬৭ বছর মিশরকে শাসন করেছেন। শুধু তাই নয়-তাঁকে তাঁর মৃত্যুর পরেও হাজার বছর ধরে মিশরবাসী ‘দি গ্রেট’ নামে ডেকেছে।
বনি ইস্রায়েলেরা প্রথমে মিশরের উদ্বাস্তু ছিল। অনেক বনি ইস্রায়েল দাস হয়ে মিশরে এসেছে এবং শত শত বছর সময়ের প্রবাহে স্থায়ীভাবেই বসবাস করছিল, আর তারা সিনাই উপদ্বীপের রামিশেজ প্রদেশে বসবাস করত। তাদের আদিবাস কেনান বা প্যালেস্টাইন। সেখান থেকে প্যালেস্টাইন বা কেনান দেশ পূর্বদিকে। মুসা বনি ইসরায়েলদের সাথে নিয়ে পূর্ব দিকে প্যালেস্টাইন না-গিয়ে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে কয়েকশ মাইল পশ্চিমে নীল নদ পাড়ি দিতে যাবে কোন দুঃখে?
আর মুসা পালিয়েই বা যাবে কেন? মুসার নেতৃত্বে বনি ইস্রায়েলিদের যে-দলটি প্যালেস্টাইনে গিয়েছিল সে দলে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় লক্ষ লোক ছিল, সাথে আরও ছিল তাদের বিশাল পশু পাল। ছয় লাখ লোক এক রাতে রাষ্ট্রীয় কোন আলাপ আলোচনা ছাড়া পালিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া কি সম্ভব? মুসার নিজের কিতাব ‘তোরা’ বা ‘তাওরাত’ থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি- “তখন রাত্রিকালে ফেরাউন মোসি (মুসা) ও হ্যারোনকে ডাকাইয়া বলিলেন, তোমরা উঠো, ইসরায়েলদিগকে লইয়া আমার প্রজাদের মধ্য হইতে বাহির হও, তোমাদের কথানুসারে মেষপাল ও গো-পাল সঙ্গে লইয়া চলিয়া যাও এবং আমাকেও আশীর্বাদ করো……” তার মানে, বেরুনোর কথা ফেরাউন নিজেই বলেন, মুসা পালিয়ে গেছে, এটা সত্যি নয়। এবং তিনি ঠিক হুমকি দিয়েও তাড়িয়ে দেন নি, মুসা তো তাঁর ঘরেই পালকপুত্রের মতো ছিলো।
‘দি গ্রেট দ্বিতীয় রামেসিস’ নীল নদে ডুবে মরেছেন একথা সত্যি। একটা দুর্ঘটনায় তিনি পানিতে পড়ে মারা যান কিন্তু সেটা হজরত মুসাকে মারতে গিয়ে, একথার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি?]
__________________________________________________________________
এ সমস্ত খুব ভাল করে জানা থাকা সত্বেও সাজিয়া মুখ খুলে সামনের জনকে কিছুতেই বলতে পারলো না, যার অস্ত্বিত্ব নেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। গল্প গল্পই হয় আর বাস্তব বাস্তব। আসলে যখন কেউ কিছু মেনে নিয়ে তারপর কথা শুরু করেন তখন সেখানে আলোচনার আর কিছু থাকে না।

Tuesday, 7 April 2015

আমাদের প্রিয় ঢাকা

আমাদের প্রিয় ঢাকা চলে এঁকেবেঁকে
সারাবেলা গাড়ি সেথা গিট্টু লেগে থাকে।
পার হয়ে যায় ঠেলা পার হয় নারী,
দুই ধারে জমে থাকে লাইনভর গাড়ি।

কচ কচ ওড়ে বালি, সব লাগে ধাঁধা,
ধুলো পড়ে চারধার হয়ে থাকে সাদা।
গিজগিজ করে সেথা মানুষের ঝাঁক,
দূষণ বাড়িয়ে চলে শত হাঁকডাক।

তার সাথে পাল্লায় সিটি লাইফ চলে
শপিং মলের সারি, ফ্ল্যাট বহুতলে।
ফুটপাতে ফুটপাতে পশরার ঢাল
হরদম জনগণ ভুগিয়া বেহাল।

সকালে, বিকালে গাড়ি ইঞ্চি না নড়ে
গড়িয়ে গড়িয়ে লোকে নিজ গৃহে ফেরে।
গালি দেয় দেশেরে, মাথার চুল ছিঁড়ে
নেই কোনো চেঞ্জ তাতে, ভিড় শুধু বাড়ে।

দিন দিন পরিস্থিতি আরো ঘোরতর
হরতাল, অবরোধে প্রাণ থরথর
পেট্রোল বোমাতে জ্বলিয়া হয় কালা
শহরে পোহাতে হয় হায় শত জ্বালা।

http://www.samakal.net/2015/04/02/128460

Tuesday, 24 March 2015

বৈদেহীঃ নাসরীন জাহান

বৈদেহীঃ নাসরীন জাহান


নাসরীন জাহান-এর বৈদেহী পড়লাম। একটি চমৎকার বিষয় নিয়ে বইটি লেখা হয়েছে। মূল আখ্যায়িকায় বলা, সংবেদনশীলতা আর আমাদের শৈশবের শিক্ষা আমাদের পরবর্তী জীবন আর মানসিকতার ওপর কী প্রভাব ফেলে। কিন্তু লেখিকার লেখার মুন্সিয়ানার অভাবের কাছে মার খেয়ে গেছে অনেকটাই লেখাটি। উপন্যাসটি আরো ভাল হতেই পারতো। বানান ভুলগুলোও দেখা দরকার ছিলো।

আমাদের ঘরে ঘরে এমন নিরালা আছে। যারা জানেই না তারা নিজেরা জীবনে কী চায়। তাদের জীবনের ঘড়ি আবর্তিত হয় স্বামীর ইচ্ছে সাথে। স্বামী কী খেতে ভালবাসে কী বাসে না ভাবতে ভাবতে নিজের কিছু চাহিদা ছিলো কিনা তাই ভাবতে ভুলে যায়। শৈশবের শিক্ষার কারণেই জুজু তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় জীবনভর। ধর্মের জুজু, স্বামীর জুজু, পরকালের জুজু আর এই লোকভয় প্রোথিত করে গুরুজনেরা। ধর্ম হলো কাউকে শাসনে রাখার বড় হাতিয়ার। একবারও কোন মেয়ে প্রশ্ন করতে সাহস পায় না, ধর্ম শুধু মেয়েদের প্রতি এতো কঠিন কেন? মেয়ে হয়ে জন্মানো কেন তবে? ধর্ম  কী তাহলে ইচ্ছে করে সমস্যা তৈরী করতে ভালবাসে? মেয়েদের না তৈরী করলে কী হতো না? কিংবা শুধু নারী দেহ তৈরী করতে পারতো, ব্রেইন না দিলেও সমস্যা ছিলো না। কিংবা গৃহস্থালী কাজ করার জন্যে যতটুকু মগজের দরকার তার বেশী না দিলেই হতো। সর্বশক্তিমান কী এইটুকু শক্তি বা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন না?

আশা করছি, এই বিষয়টার ওপরে ভবিষ্যতে আরো অনেকেই কাজ করবেন। মেয়েরাই বোধ হয় সবচেয়ে ভাল কাজ উপহার দিতে পারবেন কারণ ভুক্তভোগী ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাদেরই বেশি এই স্থানটিতে।

জীবনের যাতনার বিষে নীল হতে হতে, নিজেকে নারী দূরে থাক এমনকি মানুষ হিসেবেও অগ্রাহ্য করতে করতে ভার্জিনিয়া উলফের সেই দীর্ঘশ্বাস মনে পড়ে, নিজের একটা ঘর!
উপন্যাস থেকে তুলে ধরি নিরালা কিছু তেতো নোনা অভিজ্ঞতা:

দাদীআম্মার জীবনে প্রাণের চেয়েও মূল্যবান শব্দ সতীত্ব। এই বিষয়ে তাঁর আবেগ এমনই প্রবল, তিনি হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে মূল্যবান এবং পবিত্র বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন একসময়ের সহমরণকে। সীতা দাদীআম্মার জীবনের প্রধান এক আদর্শ। তিনি চোখমুখে আলো জ্বেলে গল্প করতেন, কি করে রাবণ রাক্ষসের মতো লম্পটের কাছে গিয়ে সেই বৈদেহী নিজেকে সতী রেখেছিল-বলতেন, তুই হবি তা-ই। কেউ তোকে যদি  এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করে, ধরণীকে নির্দ্বিধায় বলবি, দু ফাঁক হতে। আগুনকে বলবি, তোকে আশ্রয় দিতে।

নিরালার মনে তার দাদীকে নিয়ে প্রশ্ন জাগে কিন্তু তা প্রশ্রয় পায় না নানামুখি চাপে ও তাপে:

শিক্ষা তাঁকে বিচিত্র করেছে। কিন্তু আলোকিত করতে পারে নি। যেহেতু পরকালই মানুষের জীবনের অনন্ত জীবন, সেহেতু এই স্বল্পকালীন জীবনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য অন্ধকার কবরে গিয়ে ফেরেশতাদের দেয়া কঠিন যন্ত্রণা যাতে ভোগ করতে না হয়, এই বিষয়ে ছিল তাঁর সচেতন দৃষ্টিত্যাগ আর তিতিক্ষাই তিনি করেছিলেন জীবনের প্রধান ধর্ম। এই বিষয়ে সুরে গান রচনা করতেন তিনি-“এই দুনিয়া ঘোরের বাজার, সুন্দরী পাপ হাজার হাজার, সেই ভুলে পা দিও না গো বেহেশতরেই পাখি, মোহের খেলা বন্ধ হবে, বন্ধ হলে আঁখি।” সৃষ্টিকর্তার পরই যেহেতু ইহদুনিয়ায় স্বামীর স্থান, স্বামীকে তিনি গুরুত্ব দিতেন পয়গম্বরেরও অধিক হিসেবে।

নিরালার স্বামী হাসানের হতাশ অভিজ্ঞতা:

নীরার সাথে এই একটি জায়গাতেই আমার প্রবল মিল, আমরা দুজনেই খুব কুণ্ঠিত, নির্জন, চাপা স্বভাবের। এক ঘন্টা এক সঙ্গে আছি, হয়ত দেখা যাচ্ছে দুজনের মধ্যে কোনো কথাই হচ্ছে না, কিন্তু উভয়েই এতে প্রাণের উত্তাপের কোন ঘাটতি অনুভব করছি না। তবে ওকে কেন্দ্র করে আমার একটাই শূন্য দিক, ও আমাকে বড় জ্ঞান করে, শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে, এক সমান্তরালে দাঁড়ানো বন্ধু মনে করতে পারে না। ও দুঃখে, প্রেমে, ক্রুদ্ধতায় সবকিছুতেই আমার কাছে নত। ওর এই স্বভাব যতটা না অনুভব থেকে উঠে আসে তার চেয়েও বেশি আসে তার আজন্ম শিক্ষা থেকে। এই বিষয়ে ও এমনভাবে নির্মিত, আমি এই একটি বিষয়কেই চেঁছে কোনো নতুন রূপ দিতে পারি নি।

মুসলিম পরিবারে জন্মেছি তাও বাংলাদেশে। নেহাত নিরালা হতে হতে হয়ে ওঠা হয়নি কারণটা হয়তো শহরে জন্মানো আর বড় হওয়ার কারণে। যৌথ পরিবারে বাবা কাকারা জীবিকার তাগিদে বাইরে বাইরে থাকতেন সারাদিন। মা, চাচীরা, দাদীর কাছ থেকে এই শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। মেয়েদের কী করতে আছে আর কী করতে নেই। জোরে হাঁটতে, লাফাতে নেই মাটি ব্যথা পাবে, ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করাটা ঠিক না সমান সমান কারণ ভাই ছেলে তার অধিকার বেশি, সেইতো বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা আমি বা আমরাতো অস্থায়ী। মেয়েদের জোরে কথা বলা নিষেধ, যখন তখন ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। দাদু বলতেন, এমন করে চলতে হবে যাতে অন্য পুরুষ টের না পায়, পৃথিবীতে যে একজন অন্য নারী আছে, এটা অবশ্য দাদুর নিজের কথা নয়, হাদীসের কথা।

গা ঢাকো, পা ঢাকো, মাথা ঢাকো শেখাতে শেখাতে ছোটবেলা থেকেই মেয়েগুলোকে এমন করে তুলে যে জীবন কেটে যায় ঢাকতে ঢাকতে। মন আর অন্যদিকে দেয়ার সময় পায় না। নিজেকে সবার সমকক্ষ ভাবার বীজ অঙ্কুর হওয়ার আগেই মিশে যায়। ধর্মের বলি থেকে তখন হয়ে ওঠে ধর্মের রক্ষক। নিজের জীবনে যা পেয়েছে তাই বংশ পরিক্রমায় বিলাতে থাকে। আজকাল চারপাশে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির এই মানসিকতা শিশুরা বাইরে কোথাও থেকে আহরন করেনি। দাদী, মা, নিরালাই নিয়ে এসেছে ধীরে ধীরে ......

সব মিলিয়ে বৈদেহী আমার কাছে কিছু রেখে গেলো।


তানবীরা

২২/০৩/২০১৫ 

Sunday, 22 March 2015

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আসসালাম ওয়ালাইকুম। আশাকরি আপনি সর্বাঙ্গীণ কুশলে ও মঙ্গলে আছেন। আমরা ভাল নেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের ষোল কোটি জনতা নিরাপদে নেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

অভিজিৎ রায়ের হত্যার আজ প্রায় পঁচিশ দিন পার হয়ে গেলো। খুনিরা ধরা পড়লো না, এমনকি কারা খুন করেছে তাদের নামও জানা গেলো না। আমাদের এতো দক্ষ পুলিশ, র‍্যাব, গোয়েন্দা বাহিনী থাকা সত্ত্বেও একের পর এক হত্যাগুলো এমনি সমাধান না-হয়ে রহস্যের জালে আটকা পড়ে এক সময় নিভৃতে চলে যায় আর রচনা করে নতুন আর একটি হত্যার ক্ষেত্র। সাগর-রুনী, আহমেদ রাজীব হায়দার, ত্বকী, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস, আশরাফুল আলম, আরিফ রায়হান দ্বীপ ...।


যে-দেশের জনতার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্যে তিরিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে সে-দেশের মানুষ বলে কি এটাই তাহলে নিয়তি বলে ধরে নিতে হবে আমাদের? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এসব কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আপনার কি মনে হয় না, বুদ্ধিজীবী হত্যার যে-পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল একাত্তরে, এগুলো তারই অংশ? সুপরিকল্পিতভাবে দেশ থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার, প্রতিবাদ করার কণ্ঠ বিলুপ্ত করে দেয়ার যে-চেষ্টা একাত্তরে শুরু হয়েছিল, সেই একই লোকজন একই কাজ আবার এই স্বাধীন বাংলায় চালিয়ে যাচ্ছে। আপনার কি মনে হয় না, একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা না-হলে হয়তো পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা এতো সহজ হতো না? বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন তাঁরা করতে পারতেন এবং তাঁর বিচার আরো ত্বরান্বিত হত? একাত্তরের পরাজিত শক্তি এতোদিন বাংলাদেশে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারতো না।

যাঁরা একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে তাদেরই নীল নকশায় পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। বেঁচে থাকে নি আপনার ছোট্ট ভাই রাসেলও। তাদেরই একাংশ আপনার ওপর একুশে আগস্ট গ্রেনেড ছুঁড়েছে এবং এখন আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে ক্ষতি করার পরিকল্পনা করছে। সব একই সূতোয় গাঁথা। বারে বারে তারা আঘাত করছে কারণ তারা হত্যায় বিশ্বাসী এবং মুক্তচিন্তা আর মুক্তবুদ্ধির মানুষকে তারা তাদের পথের কাঁটা মনে করে। তারা হুমায়ূন আজাদকে কুপিয়েছে, আহমেদ রাজীব হায়দারকে মেরেছে, তারা অভিজিৎ রায়কে খুন করেছে কারণ তারা প্রগতিশীল, মুক্তকণ্ঠ রোধ করে দিতে চায়। তারা এখানেই থেমে থাকবে না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তারা আস্তে আস্তে আরো সামনে অগ্রসর হবে। দেশের জনগণ যেমন নিরাপদ নয় তাদের হাত থেকে, তেমনি নিরাপদ নন আপনি কিংবা আপনার পরিবার।


আপনি উগ্র মৌলবাদীদের সাথে আপোষকামী বা ধীরে চলার যে-নীতি হয়তো গ্রহণ করেছেন, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনগণ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আপনি এবং হয়তো তাদের পরবর্তী টার্গেট আপনার পরিবারও। একটার পর একটা অন্যায়ের সাফল্য তাদের পরবর্তী অন্যায়ের পরিকল্পনা করতে দ্বিগুণ উৎসাহ যোগাবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তিতে অত্যন্ত ধীরে চলা নীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চুয়াল্লিশ বছর যারা অপেক্ষা করছে তারা আর কতো কাল অপেক্ষা করবে তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া অন্যায়ের শাস্তি পেতে! যে-সন্তান একাত্তরে ভূমিষ্ঠ হয় নি সে এখন চল্লিশ পার করা তরুণ, অপেক্ষায় আছে স্বাধীন দেশে তার বাবার হত্যাকারীর শাস্তি দেখার। চুয়াল্লিশ বছরের অপেক্ষা কী যথেষ্ট নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
তেমনি অপেক্ষায় আছে সাগর-রুনীর ছেলে মেঘ, অভিজিৎ রায়-এর পরিবার আর তার সাথীরা, রাজীবের পরিবার ও বন্ধুরা, অধ্যাপক এম তাহের, প্রভাষক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া, জগৎজ্যোতি তালুকদার সর্বোপরি দেশের ষোল কোটি জনতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, করজোরে প্রার্থনা আপনার দরবারে, আমাদের নিরাশ করবেন না। জনগণের পাশে দাঁড়ান। একবার অন্তত প্রমাণ করুন, জনগণের জন্যে রাজনীতি, রাজনীতির জন্যে জনগণ নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আদেশ দিন তাদের দায়িত্ব পালন করতে, জনগণের করের টাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। ভারতের দিল্লিতে ধর্ষিতা হওয়া জ্যোতির অপরাধীদের ধরতে দিল্লি পুলিশের সময় লেগেছিলো মাত্র দুদিন। অভিজিৎ রায়ের হত্যার আজ কুড়ি দিন অতিবাহিত হচ্ছে। এ-ব্যর্থতার লজ্জা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শুধু একার নয়, এ লজ্জা আমার, আপনার, পুরো বাংলার জনগণের।


আপনি নিরাপদে থাকুন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আপনিই আমাদের শেষ আশা। আপনার সর্বাত্মক সৌভাগ্য ও নির্বিঘ্ন নিরাপত্তা কামনা করছি।


তানবীরা তালুকদার
১৬/০৩/২০১৫



Sunday, 15 March 2015

রইলো তাঁহার বাণী, রইলো ভরা সুরে


সর্বনেশে ২০১৫ সালের ১২ই মার্চ স্যার টেরি প্র্যাচেট দি গ্রেট আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। সব বয়সের মানুষের মধ্যে কল্পনা ছড়িয়ে দিতে পারা এই যাদুকর মাত্র ছেষট্টি বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। তার লেখা বিখ্যাত সব বইয়ের মধ্যে আছে “দি কালার অফ ম্যাজিক” “রেইজিং স্টীম, “মোর্ট” “আ হ্যাট ফুল অফ স্কাই” এর মধ্যে “দি কালার অফ ম্যাজিক” “ট্রোল ব্রীজ” “জনি এন্ড দ্যা ডেথ” সিনেমাও হয়েছে। সাহিত্যে অবদানের জন্যে তিনি “নাইট” খেতাবে ভূষিত হন।

তার সম্মানে তার বিখ্যাত দশটি উক্তির ভাষান্তর:

১. লোকে বলে মৃত্যুর আগে মানুষ তার ফেলে-আসা জীবনের ঝলকানি দেখতে পায়। খুব সত্যি কেন জানো, এর নামই জীবন

২. মৃত্যু বললো, জীবন শেষ-হওয়াটা মর ভেবো না। ভেবে নাও, তুমি ভিড় এড়াতে আগে প্রস্থান করছো

৩. জানো না, যতক্ষণ একজন মানুষের নাম পৃথিবীতে উচ্চারিত হয়, সে তখনো মৃত নয়।

৪. আমি যে কাজটা করতে চাই, যদি তার জন্যে মূল্য দিতে হয় তবুও আমি প্রস্তত। সে যদি মৃত্যু হয় তাহলে মরব। এর যা পরিতি হবে আমি মেনে নেবো। এই আমার সিদ্ধান্ত, আমি জেনেশুনে এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

৫. যতদিন কারো কর্ম পৃথিবীতে বেঁচে থাকে ততদিন সে মারা যেতে পারে না।

৬. সবসময় একটি শেষ সুযোগ পাওয়া যায়।

৭. সময় একটি নেশা। অনেক বেশি অলস সময় মৃত্যুর কাছে নিয়ে যায়।

৮. একটি পড়ন্ত তারকা হওয়ার চাইতে উড়ন্ত উল্লুক হতে আমি বেশি ভালবাসি।
৯. পৃথিবী এতো সুন্দর, মায়াময় আর সময় এতো কম।

১০. মৃত্যু নিষ্ঠুর নয়, শুধুমাত্র ভয়ঙ্করভাবে, নির্দয়তার সাথে তার কাজটি করে যায়।

http://metro.co.uk/2015/03/12/rip-terry-pratchett-10-of-his-most-moving-quotes-about-life-and-death-5100810/

তানবীরা

১২/০৩/২০১৫