Monday, 17 May 2010
অহনার অজানা যাত্রা (তিন)
তারা তাদের কথাবার্তা বলার ফাঁকে ফাঁকে কফি খাচ্ছিলো আর মাঝে মাঝে এসে সেখানে থাকা ভিনদেশীদের ধরে ধরে বেশ জোরে হাত মুচরে দিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জোরে মারছিলো। মাথা দেয়ালে ঠুকে দিয়ে, নাকে চোখে মুখে এলোপাতাড়ি ঘুষি। মারার সাথে সাথে সেসব ভিনদেশীদেরকে কিছু প্রশ্ন করা হচ্ছিলো যেমন তাদের পাসপোর্ট কোথায়, তারা কি যুগোশ্লাভিয়া থেকে এসেছে কিনা, কি জন্যে এসেছে? ভিসা কোথা থেকে যোগাড় করলো ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলেগুলো কিছুক্ষন চুপ থাকে আবার কিছুক্ষন কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলেগুলো যাইই বলছে তা তারা শুনছে কি শুনছে না বোঝা যাচ্ছে না, কারন তারা ছেলেগুলোকে মেরেই যাচ্ছিলো। এমনভাব করে মারছিলো যে ও কিছু নয়। কিন্তু ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো অহনা কারণ অহনার চোখের সামনে এ ধরনের কঠিন পদ্ধতির মারধোর এই প্রথম। তার সহযাত্রী ভদ্রলোকের পাসপোর্ট নিয়ে ইউনিফর্ম পরা লোকগুলো তাকে সমানে জিজ্ঞেস করে চলেছে কেনো সে নেদারল্যান্ডসে এসেছে, কে তাকে ভিসা যোগাড় করে দিয়েছে, কি চায় সে ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি যাই বলছিলেন তাতেই অফিসারদের গলা আরো চড়ছিলো, অফিসাররা তার জবাব মেনে নিতে পারছিলেন মনে হচ্ছে। অফিসাররা তার সহযাত্রীকে তখনও না মারলেও প্রায় মারার পর্যায়েই চলে এসেছে এখন ঘটনাটি। অন্যএকজন অহনাকে একটু দূরে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সে এই ভদ্রলোককে চেনে কি না? ভয়ে আধমরা অহনার মুখ দিয়ে প্রায় আর্তনাদের মতো সত্যি কথাটা বেরিয়ে গেলো, “না”। হয়তো দুদেশের পাসপোর্ট ভিন্ন হওয়ায় তারা অহনার কথা বিশ্বাস করে নিলেন আর তাকে তারা ঘাটালেন না।
তার চেয়েও বিস্মিত সে, তার প্রতি তাদের সৌজন্যের কোন ঘাটতি নেই। অহনাকে দিব্যি জিজ্ঞেস করল কফি খাবে কিনা, ঠান্ডা লাগছে কিনা ইত্যাদি। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া অহনাকে এই ফাঁকে একজন বলল তার চোখ খুবই সুন্দর কালো, এটাকি সত্যিকারের চোখের রঙ্গ না লেন্স লাগিয়েছে সে !! হকচকানো অহনা তার সামান্য জ্ঞান দিয়ে এইলোকগুলোকে কি ভালোর দলে ফেলবে না খারাপের তাও বুঝতে পারছে না। তখন ভিতর থেকে সেই অফিসার ফিরে এসে অহনাকে তার পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বললেন, ‘It’s alright, you may go”. অহনা উঠলো বসা থেকে বটে কিন্তু এখন তার কী করনীয়, কোনদিকে যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার মুখচোখ দেখে হয়তো সেটা বোঝা যাচ্ছিলো। একজন ইউনিফর্মধারী এগিয়ে এসে তাকে বলল তুমি জানো তোমার লাগেজ কোন বেল্টে আসবে? মাথা নেড়ে সে বলল, ‘না’। তখন লোকটি বলল, ‘চলো আমার সাথে’। সেই লোকটি যেয়ে অহনার লাগেজ খুজে বের করল, দেরী দেখে বেল্ট থেকে সুটকেস তুলে কেউ একপাশে রেখে দিয়েছে। তিনি অহনার ভারী সুটকেস ট্রলিতে তুলে কাষ্টমস পার করে একেবারে দরজার সামনে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অর্ণকে কোথাও দেখা যাচ্ছে কী না। অন্য পরিবেশ প্রথমে অর্নকে চিনতেই পারছিলো না সে। অনেকক্ষন তাকিয়ে অহনা দেখলো অর্ণ দাঁড়িয়ে আছে অস্থির এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। সে মাথা নেড়ে অফিসারকে জানাতে, তিনি তাকে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিলেন।
যাত্রার ধকল আর স্বামীর কাছে আসার আনন্দ নিয়ে অহনা সামনে আগালো। মনে মনে ভাবছে তাকে দেখে অর্ন না জানি কতো খুশী হবে। কিন্তু অহনাকে দেখে বেশ একটু যেনো রেগেই বলল, ‘তুমি এতোক্ষন কোথায় ছিলে? সব্বাই চলে গেলো আর তোমার কোন পাত্তা নেই। আমি বারবার লষ্ট পারসানে যাচ্ছি তারা বলছে একঘন্টা না হলে লষ্ট পারসন ঘোষনা করার নিয়ম নেই’। অহনাতো আকাশ থেকে পড়ল, ‘তারমানে? আমি আবার কি করলাম’? সে তার জীবনের সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা শুরু করতেই অর্ন থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘তুমি কেনো পুলিশকে বললেনা তোমার বর বাইরে দাঁড়ানো, তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তাহলেইতো তারা তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসতো’। অহনাতো আরো অবাক, এরমধ্যে পুলিশ আসলো কোথা থেকে? কোনটা পুলিশ? তারচেয়েও বড় ‘আমি কেনো শুধু শুধু তোমার কথা বলতে যাবো? তারাতো জানতে চায়নি তোমার কথা’? তুমি আসলে কোথা থেকে এরমধ্যে? এরকম অনেক কথার পর অহনা জানতে পারলো যে আসলে অহনাকে ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে নিয়ে গিয়েছিলো এবং এতোক্ষন তাদের হেফাজতে ছিলো সে। অহনা কি ছাই তা জানে? সেতো ভেবেছে ইমিগ্রেশনের বুঝি এই নিয়ম এভাবেই সকলকে আন্তর্জাতিক ভ্রমন করতে হয়। পুলিশ যদি অহনাকে ধরে নিয়েই যাবে তবে কেনো সৌন্দর্যের প্রশংসা করবে আর কফি খেতে সাধবে? সিনেমায় যে দেখি পুলিশ ধরে নিয়ে যায় তার সাথে কোন মিল থাকলে তবেই না বুঝবো যে কি হয়েছিলো???!!!
একথা সেকথা বলতে বলতে, বিশাল ঝকঝকে সুসজ্জিত এয়ারপোর্টের চারিধার দেখতে দেখতে হেটে অহনা অর্নের সাথে এয়ারপোর্টের পার্কিং এ এলো। অর্ন যে গাড়ির লক খুলছে তা দেখে অহনার চক্ষু যাকে বলে চড়ক গাছ, সুজুকি গাড়ি, তাও আলটো!! বি, এম, ডব্লিও, মার্সিডিজ দূরে থাক ওপেলও না। মোহ ভঙ্গের এই ছিল শুরু। বিদেশ এসেছে অহনা সুজুকি চড়তে! অনেক কষ্টে সৃষ্টে আলটোতে মালপত্র ঢোকানো হলো। তারপর শুরু হলো যাত্রা বাড়ির পথে। পার্কিং এর বাইরে বেরিয়ে দেখল চারদিক ধূসর হয়ে আছে, হাইওয়ের পাশে সারি সারি গাছ লাগানো আছে যেগুলোকে গাছ কম আর শুকনো খড়ি মনে হয় বেশী। কোন গাছেই কোন পাতা নেই শুধু ডাল গুলো নিয়ে দাড়িয়ে আছে। পুরো রাস্তা ছাই রঙ্গা, স্থবির একই রকম ঘোলা ঘোলা ছবি দেখতে দেখতে অহনা বাড়ি এলো। যদিও এ ধরনের ছবি অহনা এর আগে ভিউকার্ডে বা ক্যালেন্ডারের পাতায় অনেকবার দেখেছে, তখন দেখলে বুকের ভিতরে একটা শিরশিরানি অনুভব হতো, মনটা বেশ রোমান্টিক রোমান্টিক লাগতো, মনে হতো আহা না জানি কি শান্তি, কি সুন্দর। কিন্তু এখন এর মাঝে এসে পরে একে বড় বেশী প্রাণহীন মনে হচ্ছিল। আকাশ দেখে অহনার মনে হচ্ছিলো ভোরবেলা যদিও হাতের ঘড়ি জানান দিচ্ছিল দুপুর বেলা। গাড়ি এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাকিং লটে এসে পৌঁছলো, চারিদিক ফাঁকা কোথাও কেউ নেই।
(চলবে)
তানবীরা
পরিশোধিত ১৮.০৫.১০
Sunday, 9 May 2010
অহনার অজানা যাত্রা (দুই)
সারারাত বৃষ্টি হয়ে সকালে খুব মিষ্টি রোদ উঠেছে। চারপাশটা তাই অনেক স্নিগ্ধ। দুরু দুরু বুকে দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে অহনা এ্যম্বেসীর ভিতরে গেলো হাতের ফাইল শুদ্ধ, সে টেবিলের একপাশে বসল আর অন্যপাশে বসলেন একজন শ্বেতাঙ্গ আর একজন দেশী ভাই। শ্বেতাঙ্গ ভাই অবশ্য বেশ হেসে তার খোঁজ খবর নিলেন, সে কি করতো, কবে বিয়ে হলো, অর্ন অহনার পূর্ব পরিচিত কিনা, বাবা মাকে ছেড়ে যেতে মন খারাপ লাগবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি, দেশী ভাই অবশ্য তেমন কোন কথা বললেন না শুধু শ্যেন দৃষ্টি দিয়ে তার ভিতরটা এফোড় ওফোর করে এক্সরে করে দেখার চেষ্টা করলেন। দৃষ্টি দিয়ে উনি বুঝার চেষ্টা করছিলেন সে কি টেররিষ্ট কিংবা কোন ভয়াবহ অপরাধী কী না, যে নেদারল্যান্ডসে চলে যেতে চায় তাকে ফাঁকি দিয়ে। শ্বেতাঙ্গ ভাইয়া অবশ্য খুব আরামদায়ক ভঙ্গীতে ছিলেন, অহনা কফি খাবে কিনা তাও এক ফাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন এমনকি চলে আসার সময় তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন। এরি মধ্যে ফাইলে থাকা কাগজগুলো দু আঙ্গুলে সামান্য একটু উলটে পালটে দেখলেন, সমস্ত কাগজের মধ্যে থেকে তার পাসপোর্টটাই শুধু রেখে দিলেন আর একটা রিসিট দিয়ে বলে দিলেন দু দিন পর এসে এতো টাকা ভিসা ফি দিয়ে যেনো সে পাসপোর্টটা নিয়ে যায় সাথে সেফ জার্নি টু হল্যান্ডও উইস করলেন। শ্বেতাঙ্গ ভাইয়ের ভদ্রতায় বিমুগ্ধ অহনা ভেবেই পেলো না কেনো লোকে এ্যাম্বেসী নিয়ে এতো খারাপ খারাপ গল্প ছড়ায়। আসলে লোকের খেয়ে দেয়ে কাজতো নেই, কাজ একটাই ভালো ভালো জিনিসের বদনাম দিয়ে বেড়ানো। এরপর থেকে তার যার সাথেই দেখা হলো তাকেই তার এই ‘জার্নি টু এম্বেসী’ গল্প করে শোনাতে লাগল। যথাদিনে ভিসা কাম পাসপোর্ট আনতে গেলো সে, রিসিপশনে বসা সুন্দরী ঘটি (কোলকাতাইয়া) আন্টি মিষ্টি হাসি দিয়ে পাসপোর্ট দিতে দিতে একটু গল্পও করল তার সাথে, কবে যাচ্ছে, শপিং করেছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
পাসপোর্ট হাতে নিয়ে, খুলে অহনাতো অবাক, একটা ঝিকমিক দেয়া ষ্টিকার আছেতো বটে লাগানো কিন্তু সেখানে কোথাও নেদারল্যান্ডস লেখা নেই, আছে ‘বেনেলুকক্স’ লিখা। এই বেনেলুকক্স মানে কি? অহনা অবশ্য অর্নের কাছে শুনে ছিলো বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডসের ভিসা এই এক এ্যম্বেসী থেকেই ইস্যু হয়। কি দিতে কি দিয়ে দিলো চিন্তায় পড়ে গেলো সে। শ্বেতাঙ্গ ভাইয়ার মিষ্টি মিষ্টি হাসি ভদ্রতার পিছনে কি তাহলে এই শয়তানীই লুকিয়ে ছিল? তাহলে কি এ্যাম্বেসী নিয়ে লোকজনের ভয়াবহ সব গল্প সত্যি!? যাই হোক উপায় না দেখে রিসিপশনে বসা আন্টিকেই জিজ্ঞেস করল সে এই ‘বেনেলুক্স’ চীজটি কি? আন্টি দেখতে বেশ কনফিডেন্ট, বেশ সবজান্তা সবজান্তা ভাব আর সাজগোজের বাহারি কারণে তখন তার মনে হয়ছিল পৃথিবীর চলমান সমস্ত ঘটনাবলী আন্টির নখদর্পনে। কথাবলার ভঙ্গীতে আরো মনে হয় আন্টি সব প্রশ্নের উত্তর জানে। কিন্তু তার বিধি বাম। আন্টি আবার চিরকালের চরম সেই সত্যটি প্রমান করলেন, ‘মুখ দেখে ভুল করো না, মুখটাতো নয় মনের আয়না’ । আন্টি দেখা গেলো নিজেও বিশেষ কিছু জানেন না এ ব্যাপারে, তো তো করে যা বললেন তার মানে দাড়ায় এই, যা দিয়েছেন তারা বিচার বিবেচনা করে ঠিকই দিয়েছেন, অহনার এতো কথা বুঝে কাজ নেই, সে যেনো বিসমিল্লাহ বলে প্লেনে ঝুলে পড়ে। এদিকে অহনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, যাবার আর মাত্র দু সপ্তাহ আছে, প্লেনের কনফার্ম টিকিট, শপিং, আত্মীয় স্বজনের বাসায় দাওয়াত খাওয়া প্লাস বিদায় নেয়া প্রায় সব সারা, এখন যাওয়া না হলে কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ফেরৎ আসলেতো প্রেস্টিজের ফালুদা হয়ে যাবে। উপায়ন্তর না দেখে অর্নের ফোনের অপেক্ষায় রইলো সে।
অর্ন ফোন করতেই কাঁদো কাঁদো গলায় অহনা বললো সর্বনাশ হয়ে গেছে। নেদারল্যান্ডসের ভিসার বদলে কোথাকার কোন ‘বেনেলুক্সের’ ভিসা দিয়েছে তাকে। অর্ন ৫,৮৫ গিলডার উইথ আউট ১৭,৫ পার্সেন্ট ট্যাক্স পার মিনিট এর ফোন কলে মোটেই তার নব পরিনীতা বউ এর সাথে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন কিংবা বেনেলুক্স নিয়ে সেই মূর্হুতে আলোচনায় যেতে কোন আগ্রহ দেখাল না বরং শান্ত গলায় বলল সর্বনাশের কিছু হয়নি, এতো কথা এখন না বুঝলেও চলবে, চুপচাপ প্লেনে চড়ে যেনো সে চলে আসে, অর্ন তার অপেক্ষায় আছে। যদিও অহনা একটু বেকুব হয়ে গেলো সে মুহূর্তে কিন্তু তখনও বেকুব অহনা বুঝতে পারেনি তার জীবনের বেকুব হওয়ার এইতো কেবল শুরু, এখন জীবনই যাবে বেকুব হয়ে হয়ে। সে যাই হোক, এক নিকষ কালো রাত্রিতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেনে মা, ভাই-বোন, বন্ধু - বান্ধব, চির পরিচিত দেশ আর পরিবেশ পিছনে ফেলে অহনা যাত্রা করলো অজানার উদ্দেশ্য। মায়ামায় বাবা সাথে এলেন তাকে এগিয়ে দিতে, দিল্লীতে এসে প্লেন চেঞ্জ করতে হবে। দিল্লী বিরাট এয়ারপোর্ট, নেমেই মনে হলো তার বাবা সাথে না এলে হারিয়ে সেতো যেতোই এখানে। কিন্তু সাথে বাবা, এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি, অথরিটি আর সিডিউল মনিটরিং বোর্ডের কারণে অহনা হারাতে পারলো না। সেখান থেকে কে।এল।মে চেপে অহনা নেদারল্যান্ডসের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলো। প্লেনে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তারায় তারায় ভর্তি নীল কোজাগরী আকাশ দেখছিলো সে চুপ করে। মাঝে মাঝে নাম না জানা কষ্টে হঠাৎ ভীষন চুপচাপ হয়ে গিয়ে কাঁদছিলো। কেনো চোখ ভিজে আসছিলো তা সে জানে না। তখনও সবাইকে ছেড়ে আসার কষ্ট সে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি আবার অর্নের কাছের যাওয়ার আনন্দও ছিল। একটা নাম না জানা ভীতি মিশ্রিত অনুভূতি সে সময়টায় তাকে ব্যকুল করে ফেলেছিল।
সে সময় খাবার দিতে আসা কে।এল।এম এর একজন বেঙ্গলী স্টুয়ার্ডেস পরিস্কার বাংলায় অহনাকে প্রায় ধমক দিয়েই দিলেন, ‘এই মেয়ে তুমি কোথায় যাচ্ছো একা একা, আবার কাঁদছ’? ষ্টুয়াডের্সের ধমক খেয়ে অহনা একটু ভয় পেলো মনে মনে, আবার প্লেন থামিয়ে নামিয়ে দিবে নাতো? তাহলে হয়েই যাবে, সারা গোষ্ঠীর ধমক খেতে হবে তখন, বলবে, কাঁদতে গিয়েছিলি কেনো তুই? কোন ঝামেলা না হয় সেভেবে কোন উত্তর না দিয়ে সে চুপ করে রইলো। পাশের সীটে এক গুজরাটি কিংবা পাঞ্জাবী ভদ্রলোক ছিলেন অহনার সহযাত্রী, মোটামুটি তরুন বয়সী। তিনি তার কান্নাকাটি দেখে আর হয়ত নিজের কৌতুহল থেকেও খুটিনাটি জিজ্ঞেস করছিলেন। অহনার নিজের বন্ধু - বান্ধব আর তার বাড়ির বাইরের বর্হিবিশ্ব সমন্ধে কোন ধারণা ছিল না বিধায় যা যা তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন সে সবকিছুর উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো, সাধারণ সৌজন্যতা ভেবে।
প্লেন একটানা দশ ঘন্টা উড়ে ক্রিসমাস ইভের এক ঠান্ডা ভোরে নেদারল্যান্ডসে এসে পৌঁছলো। অহনা বোর্ড পড়ে পড়ে হেটে হেটে ইমিগ্রেশন অবধি পৌঁছলো সাথে সেই সহযাত্রী ভদ্রলোক, তিনি তখন তার পিছন ছাড় ছিলেন না, সে অবশ্য ভেবেছিলো পাছে সে যদি কোথায় হারিয়ে যায় সেই জন্য। ইমিগ্রেশনের জন্য কয়েকটা গেট আছে, তার মধ্যে পরিস্কার ইংরেজী ও অন্যান্য আরো কয়েকটি ভাষায় লেখা আছে যারা প্রথমবার নেদারল্যান্ডসে ঢুকছেন তারা যেনো এই পথে আসেন। অহনা সেই বিশেষ কাউন্টারের পাশে যেয়ে তার পাসপোর্ট সেখানে বসা একজন অফিসারকে দিলে, তিনি খুবই হাসি হাসি মুখে সেটি নিলেন, সাথে সাথে অহনার সহযাত্রী ভদ্রলোকও তার পাসপোর্ট দিলেন সেই অফিসারকে। সহযাত্রী ভদ্রলোক এমন ভাব ভঙ্গি করার চেষ্টা করছিলেন বার বার যে তিনি তার সাথেই ভ্রমন করছেন। পাশের যাত্রীর পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পরই সেখানে বসা অফিসার ভদ্রলোক তাদেরকে ওয়েট বলে দাড় করিয়ে দিয়ে পাসপোর্টগুলো নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন। একটু পরেই তিনি তার এক সহকর্মীকে নিয়ে সেখানে ফেরত এলেন এবং তাদের বললেন তার সেই সহকর্মীর সাথে যেতে। বেচারী অহনার কোন ধারণাই নেই কেনো কার সাথে কোথায় যাচ্ছে, যেতে বলা মাত্র কোন প্রশ্ন করা ছাড়াই সে সেই ইমিগ্রেশন অফিসারের সাথে হেটে যাচ্ছিল। সবকিছু এতো দ্রুত আর অদ্ভূতভাবে ঘটছিলো যে তার সব তালগোল পাকানো লাগছিল, কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিল না।
(চলবে)
তানবীরা
পরিশোধিত ০৯.০৫.১০
অহনার অজানা যাত্রা
বেশ হুড়মুড় করেই ধরতে গেলে অহনার বিয়েটা হয়ে গেলো অর্নর সাথে। পাত্র অর্ন বিদেশ থাকে, তার ছুটি ফুরিয়ে এসেছিলো প্রায় এই মেয়ে বাছাবাছি করতে করতেই, অবস্থা অনেকটা সে পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে বিয়ে না করেই অর্নকে আবার কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে, যদিও পাত্রপক্ষীয় প্রথানুযায়ী অর্ন ছুটিতে আসার আগে থেকেই অর্নের পরিবার মেয়ে বাছার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক যেনো মিলাতে পারছিলেন না। এই মেয়ের বাবা পছন্দ হয়তো ভাই না, সে মেয়ের ভাই পছন্দ হয়তো মেয়ে না। সেই অন্তিম মূহুর্তে একজন কমন বন্ধুর মারফত পাত্রপক্ষের পাত্রীপক্ষের যোগাযোগ হলো। তারপর মেয়ে দেখার সেই চিরন্তন পালা। তবে অহনাকে স্বীকার করতেই হবে সে ভাগ্যবতী বর্তমান সময়ে জন্মানোর কারণে। আজকের আধুনিক সমাজে পড়াশোনা জানা সোকলড আধুনিক শিক্ষিত লোকজনের ভিতরে যাইই থাকুক, সবার সামনে আর সেরকমভাবে মেয়ের হাতের আঙ্গুল, পায়ের গোড়ালির পরীক্ষা তারা নিতে পারেন না, সাজানো মুখোশ খুলে যাওয়ার ভয়ে। সাধারণ মামুলী দু-চারটা কথাবার্তার মধ্যে দিয়েই তাদের ‘মেয়ে দেখা’ পর্বটি শেষ করতে হয়। তো সে ধরনের সহজিয়া পরীক্ষার মধ্য দিয়েই উতরে গেলো মোটামুটি মিষ্টি চেহারার, মাঝাড়ি গড়নের সদ্য কুড়িতে পা দেয়া অহনা। বিয়ের পিড়িতে বসার সৌভাগ্য ঘটলো তার।
বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় মেহেদী রাঙ্গানো হাত নিয়ে ঝলমল করা আলোয় সাজানো বাড়িতে বউ সাজলো অহনা। তাড়াহুড়োর মধ্যে যতটা সম্ভব সেই আন্দাজের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়েই ঘটে গেলো অহনার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। যদিও ছোট ভাই বোনেরা প্রায়ই তার বিয়ে নিয়ে নানারকম প্ল্যানিং করতো। বোনদের মধ্যে বড় হওয়ায় কারণে অকারনেই বাড়িতে অহনার বিয়ের পরিকল্পনা চলতে থাকতো দিনমান বছর ধরে। নূতন কোন হিন্দী ফিল্মের গান হিট হলে তখনই সেটা অহনার গায়ে হলুদের নাচের জন্য ঠিক হয়ে যেতো, কদিন পর সেই গানের তোড় যেয়ে অন্য গান এলে দেখা যেতো আগেরটা বাদ হয়ে নতুনটা সিলেক্ট হয়ে যেতো। নতুন কোন শাড়ি বের হলোতো সব কাজিনরা মিলে ঠিক করে ফেলল অহনা বাজির গায়ে হলুদে তারা এটাই পড়বে। মাঝে মাঝে ছোট ভাইবোনদের সাথে অহনা নিজেও তার বিয়ের পরিকল্পনা করতে বসে যেতো, কোন গানের ব্যান্ড আনলে সস্তা হবে, কোন কমিউনিটি সেন্টার ভালো, কোন বান্ধবীর বিয়েতে নতুন কি দেখে এসেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বিয়ে নিয়ে পরিকল্পনাকারীদের লেভেলে অহনার বর বাদ দিয়ে আর সবই ঠিক করা ছিল বহুদিন ধরে। কিন্তু কাজের সময় দেখা গেলো মাত্র দশ দিনের নোটিসের বিয়েতে অনেক ঠিক করা জিনিসই বাদ পড়ে গেলো সময়ের অভাবে। ছোটরা তাদের পরিকল্পনায় বাধা পাওয়ায় প্রথমে বেশ বিমর্ষ হলেও সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর কিন্তু তারাও সবাই খুশী।
অন্য সবার সাথে অহনা নিজেও খুশী তার বিয়েতে, তবে তার খুশীর উৎস অন্য জায়গায়। আর পড়াশোনা করতে হবে না এইভেবে সে আনন্দিত। রোজ রোজের টিউটোরিয়াল, ভাইভা, লাইব্রেরী, পরীক্ষা, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নোট মুখস্থ করার হাত থেকে অবশেষে পরিত্রান পাওয়া গেলো। যদিও বিদেশে বিয়ে করা নিয়ে অহনার প্রথমে খুবই আপত্তি ছিল কারণ পড়াশোনা করতে ভালো না লাগলেও টি।এস। সির ক্যাফেটেরিয়ায় কিংবা মাঠে, পাবলিক লাইব্রেরীর সিড়িতে, কলাভবনের মাঠে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে অহনার কোনই আপত্তি ছিল না। ভাবত শুধু আড্ডা দিয়ে আর হৈ- হুল্লোড় করেই যদি জীবনটা কাটিয়ে দেয়া যেতো। এখন বিয়ে হয়ে হঠাৎ করে সব ত্যাগ দিতে অহনার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। সকালে ডাসের কলিজা সিঙ্গারা কিংবা দুপুরে টি।এস।সির এক পিস মাংস দিয়ে দেয়া তেহারী মিস হয়ে যাবে, কেমন করে তা সম্ভব? কিন্তু পরে আত্মীয় স্বজনের অনেক বোঝানো সোঝানো আর বন্ধু বান্ধবের বিদেশ নামক বস্তুটা নিয়ে লোভনীয় অনেক গল্প শোনানোর পর অহনা অগত্যা রাজি হলো বিদেশী বিয়েতে।
এছাড়া অহনার সিক্স সেন্স এমনিতেও জানতো যে বেশী ট্যা - ফো করে কোন লাভ হবে না, বিয়ে তাকে বিদেশেই করতে হবে, পরিবারের মুরুব্বীরা কিছু অলিখিত কায়দা তৈরী করে ফেলেছেন। পরিবারের ছেলেরা বাপ - দাদার ব্যবসা বানিজ্য সামলাবে আর মেয়েদের বিদেশ পাঠিয়ে দিয়ে তাদের ভবিষ্যত নিশ্চিত রাখা হবে। এতে ডবল লাভ মেয়ে বিদেশে থাকে শুনতেও সামাজিকভাবে ভালো শোনায় সাথে মেয়েরা ভালো থাকলে বাবার সম্পত্তির পাওনাও আর দাবী করতে আসবে না। ঘরের মালকড়ি ঘরেই থেকে যাবে। যদি না জামাই ব্যাটা অনেক ছোটলোক হয়, তবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এম - এস, পি - এইচ - ডি করা ছেলেদের মনে যাইই থাকুক, বিদেশ ফেরতা হয়ে শ্বশুর বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে দলাদলি করতে যাওয়াওতো তাদের পক্ষে আর সম্ভব না। সুতরাং বিদেশী পাত্রে, পাত্রী পক্ষের ডবল গ্যারান্টি, মেয়েও ভালো থাকবে সাথে বাবা - চাচারাও।
অহনার মাথা ভর্তি অনেক আইডিয়া কাজ করতো, পাকা আইডিয়া আর দুষ্টু বুদ্ধির জন্য অহনা অনেকটা পরিচিত মহলে বিখ্যাত ছিল। বিয়ে করার জন্য সেজে গুজে বসে তারপর শুরু করা কান্নাকাটি। কেনো বাবা আগে জানতে না বিয়ে করতে যাচ্ছো? এখনতো আর কেউ বালিকা বধূ না কিংবা ছ মাস ন মাসে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসার হাঙ্গামাও নেই নৌকো করে। ইচ্ছে হলেই বাপের বাড়ি। তাহলে এতো আলহাদের কান্নাকাটিটা কীসের শুনি? এজন্য অন্যরা অহনাকে আগেই শাসিয়ে রেখেছিল, দেখবো তোর বিয়ের সময় কি করিস। আজ সেই মহা দিন। সাধারনতঃ বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন এর সাইন দেখার জন্য এতো পিচকি পাচকী ঘরে আসে না। মুরুব্বীরাই থাকেন ঘরে কিন্তু অহনা যে সবার লেজে পা রেখে আছে। তাই যখন কাজী সাহেব তার খাতাপত্র মেলে ধরে বসলেন অহনার সামনে, মাথা নীচু করে রেখেও অহনা বুঝতে পারছিল জোড়া জোড়া চোখ তাকে পাহারা দিচ্ছে আর হাসছে, বাছাধন এখন কেমন, দেখি? অহনাও শক্ত হয়েছিল, এতো জনের কাছেতো আর সে হেরে যেতে পারে না, না কিছুতেই না। কাজী সাহেব তার গৎবাঁধা কবিতা শেষ করা মাত্রই অহনা ভাবলো বলে ফেলবো নাকি এখুনি? আবার ভাবলো আম্মি যদি বকা দেয়, ভাবতে ভাবতেই কাজী সাহেব বললেন আবার, বলেন মা বলেন। অহনা ভাবার আগেই কখন যেনো মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো কবুল। বেশ স্পষ্ট আর জোরে। সবাই পরিস্কার শুনতে পেলো বলে কেউ হাসার সুযোগ পেলো না। শুধু অহনা তখনো অনুধাবন করেনি এখানে শুধু প্রতিপক্ষের লোকেরাই ছিল না, বর পক্ষও ছিল!
বিয়ের মাধ্যমে কতটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অহনার জীবনে ঘটল সেটা অবশ্য তখনও সে আন্দাজ করতে পারেনি, তখনও সে নতুন শাড়ি, গয়না, বিয়ে বাড়ির হৈ-হুল্লোড় আর নাচ-গানের আমেজের মধ্যেই মশগুল ছিল। অর্নের ছুটি তখন প্রায় ছিল না বললেই হয়। বিয়ের পরে সপ্তাহেই নতুন বিয়ে আর তরতাজা নতুন বউকে রেখে, বিয়ের কাগজপত্র সব বগল দাবা করে ভারাক্রানত মন নিয়ে অর্নকে বেরসিক চাকরীস্থলে ফিরে আসতে হলো। আর তার প্রায় মাসখানেকের মধ্যেই অহনার ডাক পড়ল এ্যাম্বেসীতে। বিভিন্নজনের কাছ থেকে এ্যাম্বেসী নামক পদার্থটা নিয়ে অনেক রকম ভয়াবহ গল্প শোনার কারণে এই শব্দটাতে অহনার বিশেষ ভীতি ছিল, নাম না জানা ভীতি যাকে বলে। ইঞ্জেকশন শুনলেই যেমন অকারনে ভয় লাগতে থাকে অনেকটা সেই টাইপ। জীবনে অহনা বিদেশ নামক জিনিসটাই ভালো করে চোখে দেখেনি তায় এ্যাম্বেসী। যাওয়ার মধ্যে যাওয়া ঘরের কাছের ইন্ডিয়া তাও তার জন্য এ্যাম্বেসী চোখে দেখেনি অহনা। ঘটনাটা হলো এমন, একদিন সব ভাইবোনরা ভালো জামা কাপড় পড়ে বাবার সাথে বাড়ির পাশের স্টুডিওতে গেলো, আর স্টুডিওর লোক গম্ভীর মুখে অহনাদের সব ভাইবোনদের আলাদা আলাদা করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলে দিলেন। স্টুডিওর লোকের গম্ভীর মুখ দেখে অহনারা কেউ কিছু বলার সাহস পেলো না শুধু অহনার বড় ভাই সাহস করে বলল, ‘ভাই একটু সুন্দর করে তুলে দিয়েন’, ভদ্রলোক ততোধিক গম্ভীর গলায় বললেন, ‘যেমন চেহারা তেমনই ছবি উঠবে, সুন্দর অসুন্দর নেই’। বড় ভাই এ কথা শুনে দমে গেলেন আর অহনাদেরতো ভয়ে মুখ দিয়ে রা’ই নেই। তো সেই ছবি বাবা নিয়ে গেলেন, কাকে যেনো দিলেন, সেই ভদ্রলোক পাসপোর্ট ভিসা সব করে বাড়ি এনে দিয়ে গেলেন, অহনাদের আর এ্যাম্বেসী যেতে হলো না, সোজা বাংলায় যাকে সবাই বলে ঝামেলা হলো না। তার কদিন পরে একদিন সবাই মিলে অহনারা তাজমহল দেখতে রওয়ানা দিল।
জীবনের প্রথম সেই বিদেশে গিয়ে অহনার মানসিক অবস্থা ভয়াবহ হয়ে গেলো। বিদেশ মানে অহনার কল্পনায় টিভিতে দেখা চার্লিস এ্যাঞ্জেলস এর মতো ঝকঝকে চারিধার, দামী দামী সাই সাই গাড়ি আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু দিল্লী, আগ্রা, আজমীর, জয়পুর গিয়েতো অহনা হতভম্ব, তাজমহলে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়া লোক ঘুরছে, রাস্তায় বোচা বোচা এ্যাম্বেসেডর গাড়ি চলছে, পুরনো দিনের সাদা - কালো ফিল্মের মতো তার পেছন দিকে দরজা খুলছে, বরং ঢাকায় এর চেয়ে ঢেড় ভালো। এই কাতর অবস্থা থেকে পাথর হলো অহনা যখন স্কুলে গেলো, স্কুলে গিয়েছিলো বড় খোশ মেজাজে বিদেশ ভ্রমনের এ্যালবাম বগলদাবা করে, হ্যা হ্যা এবার আমিও বিদেশ ফেরতা এই ভাব নিয়ে কিন্তু - - - অহনাকে দেখে বান্ধবীরা প্রায় আর্তনাদের সুরে বলে উঠল, ‘তুই বিদেশ ঘুরে এলি!!! দেখে মনে হচ্ছে তুই গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলি’। অহনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘কেনো’? বান্ধবীরা বলল,‘ গ্রামের থেকে বেরিয়ে এলে যেমন রোদে পোড়া কালসিটে চেহারা হয় তোর তো দেখি সেই অবস্থা’।
সেই থেকে বিদেশ নামক ব্যাপারটা নিয়ে অহনা নানা টেনশানেই থাকে। কদিন আগেও অহনা অবশ্য বাড়ির কাছের আর একটা ছোট বিদেশ থেকে ঘুরে এসেছে, তখন অহনা এ্যম্বেসীর গেট পর্যন্ত গিয়েছিল ভিতরে ঢুকতে হয়নি, অর্নই সব ম্যানেজ করেছে । এবার এ্যম্বেসীর চিঠি পাওয়ার পর অহনা অর্নকে ফোনে তার এ্যাম্বেসী ভীতির কথা জানিয়েছিলো, কিন্তু অর্ন বিরাট এক ধমক দিয়ে বলল,‘ এর মধ্যে ভয়ের কিছু নেই তোমার জন্য। কাগজ পত্র সমস্ত আছে, তুমি শুধু যেয়ে দেখা করবে আর যা জিজ্ঞেস করবে তার ঠিক ঠিক জবাব দেবে।’ তো এবার যখন আর কোন উপায় নেই, বাড়ির মুরুব্বীদের সালাম করে, সবার দোয়া মাথায় আর ভীরু ভীরু হূদয় নিয়ে আল্লাহর নাম জপতে জপতে অহনা এ্যাম্বেসীতে গেলো বাবার সাথে কিন্তু সেখানকার সিকিউরিটি বাবাকে গেটেই আটকে দিলো, আর অহনা বেচারিকে একাই ভিতরে ঢুকিয়ে এস এস সি পরীক্ষার হলের মতো উচু গেট আটকে দিলো দারোয়ান। নিরুপায় বাবা ওধার থেকে অভয় দিলেন, ‘তুই যা আমি তো আছি।’
(চলবে)
তানবীরা
১০- ০৪ - ২০০৭
Sunday, 11 April 2010
শুভ নববর্ষ ১৪১৭
বাংলা নতুন বছর উদযাপনের প্রতি আমার আগ্রহ অসীম। কেনো এই টান আমি নিজেও জানি না। এমনিতেই আমি পার্টি এ্যনিম্যাল কিন্তু বাংলা নতুন বছর নিয়ে আমার যেটা হয়, সেটা হলো উন্মাদনা। এ উন্মাদনা নিয়ে অনেক মজার এবং বেমজার ঘটনাও ঘটে।
একবার ঠিক করলাম রমনা বটমূলে সকাল ছয়টায় বর্ষবরন করতে যাবো। ঘুম থেকে উঠতে যদি না পারি তাই ভাবলাম রাতে ঘুমাবোই না। এমনিতেই পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে মাত্র কদিন আগে এখানে থেকে দেশে গিয়েছি, তাই না বলা গল্পের ঝুড়ি দুই প্রান্তেই অফুরন্ত। আমরা সারারাত ধরে সকালের শাড়ি চুড়ি সাজগোজ ঠিক করলাম, তারপর বসলাম হাতে মেহেদী দিতে। সাথে গান বাজনাতো আছেই। এ সময়টায় ঢাকায় বড্ড ঘন ঘন লোডশেডিং হয়। যত সম্ভব রাত তিনটার দিকে আবার কারেন্ট চলে গেলো। অনেক গরম তাই আমি ভাবলাম ঘরের লাগোয়া বারান্দায় একটু বসি, বাতাস আসবে। আমার ছোট দুবোন চার্জার নিয়ে রান্নাঘরে গেলো চা বানাতে।
আমি বারান্দায় বসে আছি, আমাদের রুমটা বাড়ির পেছনের দিকে। আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির লোকরা তাদেরও সেই পেছনদিকের ঘরগুলোতে মেস করে ব্যচেলরদের ভাড়া দিয়েছেন। আমি অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছি, জোনাকির মতো কিছু ওঠানামা করছে। অন্ধকার চোখে সয়ে গেলে বুঝলাম, সিগ্রেট। কারেন্ট নেই, ভ্যাপসা গরম, ঘুমানোর মতো কোন অবস্থা কারোই নেই। তারা স্যান্ডো গেঞ্জী গায়ে দিয়ে বাইরের খোলা হাওয়ায় ঘুরছেন। আমাকে অন্ধকারে তাদের দেখতে পাওয়ার কোন কারন নেই। যদিও আমি বারান্দার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে নীচু হয়ে তাদের দেখতে পাচ্ছি। রাত নিঝুম তাই চারপাশের শব্দ পরিস্কার শোনা যায়।
তারা নিজেদের মধ্যে আমাদের নিয়ে আলোচোনা করছেনঃ
প্রথমজনঃ দ্যাশটার কি হইলো? রাইতের বাজে তিনটা মাইয়াগুলা এখনো গান বাজনা করতাছে?
দ্বিতীয়জনঃ অপসংস্কৃতি অপসংস্কৃতি, অশ্লীল
আরেকজনঃ (খুবই অভিজ্ঞতার সুরে) এইজন্যই মুরুব্বীরা আগেরদিনে কইতো বয়সকালে মাইয়াপুলার বিয়া দিতে হয়, বয়সকালে মাইয়াপুলার বিয়া না হইলে, এইগুলার মাতা নষ্ট হইয়া যায়, রাইতে বিরাইতে এইগুলা গান বাজনা করে।
অন্যরা সবাই তাদের মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তার বেদবাক্য সায় দিচ্ছেন।
আমি কোন রকমে হাসি চেপে মাথা নীচু করে ঘরে এসে (যাতে তারা আমাকে দেখতে না পায়) আমার ভাই আর স্বামীকে আমাদের বয়সকালে বিয়ে না হওয়ার গপ্পোটা দিলাম। যতোবার নতুন বছর ঘুরে আসে, সবচেয়ে প্রথমে আমার এ নাম না জানা কজন লোকের বেদবাক্যি গুলো মনে পড়ে।
তারচেয়ে বড় আইরোনি হলো, সেদিন কি আমরা সূর্যোদয়ের সময়ে বটমূলে পৌঁছতে পেরেছিলাম? না ভাই না। সারারাত গুলতানি করে ভোরের দিকে সবাই এদিক সেদিক কাত। আমাদের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আব্বু আমরা কি চলে গেছি না দেখতে এসে আমাদেরকে বেলা আটটায় ঘুম থেকে টেনে তুলেছিল
যাক আবার নতুন বছর আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। নতুন বছরের শুরু হবে কিছু নতুন চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্খা আর বেদনা নিয়ে। সুস্বাগতম হে নতুন তোমায়।
http://www.youtube.com/watch?v=-Uw2fhBiULc
তানবীরা
২৯শে চৈত্র ১৪১৬।
Friday, 9 April 2010
প্রজাপতি মন আমার
কিন্তু আমি নিজে কি এতো বড়ো হয়ে গিয়েছি? আমার মেয়ে ক্যাম্পে যাবে? এতো বড় মেয়ের মা কি আমি? আমারতো সারাক্ষন মনে হয়, এইতো সেদিন আমি স্কুলে যেতাম, দুষ্টুমী করতাম! সেদিন মাত্র নয়? কিছু কিছু জিনিসতো এখনো স্পষ্ট মাত্র কিছুদিনের আগের কথা মনে হয়। দু হাজার দুইয়ে রাইফেল স্কোয়ারে এগোরা খুললো সুপার মার্কেট। আমি আর ভাইয়া রোজ যাই দেখতে। তখন ধানমন্ডির আশে পাশে বাস করা সব সেলিব্রেটিরা বান্ডেল ভর্তি টাকা নিয়ে ওখানে বাজার করতে আসেন। আমরা ক্যাশের পাশের খাবারের দোকানে খাই আর কে কখন কতো ঘুষ খেয়ে এসে এখানে বাজার করছে তার কাল্পনিক হিসাব মিলাই। একদিন এগোরাতে ঘুরছি, আমাদের সামনে গায়ক সাদী মোহাম্মদ তার পরিপাটী নিভাজ চুল আর একজন কর্মচারী গোছের কাউকে নিয়ে ঘুরছেন আর বাজার করছেন। তারা সেলিব্রেটি সুতরাং বাজারে যেয়ে নিজের হাতে জিনিস তোলা তাদের সাজে না কাজ়েই সাথে কেউ। একটু পর পরই আমরা সাদী মোহাম্মদের মুখোমুখি হচ্ছি দোকানে, তখন আমরা তার পিছে পিছেই ঘুরতে লাগলাম। নামী দামী লোকদের দেখতেওতো অনেক সুখ। খেয়াল করলাম মাথার চুলগুলো যেনো কেমন একদম নিভাঁজ। ভাইয়াকে বলতেই ভাইয়া বললো, আরে এটাতো উইগ। হঠাৎ ভাইয়া বললো, চল এক কাজ করি, ওর উইগটা টান দিয়ে খুলে নিয়ে আমরা উঠে একটা দৌড় দেই। প্রথমে আমার একটু কেমন মনে হলেও পরে ভাবলাম কি আছে জীবনে, চল করি। আমি আর ভাইয়া পরের এক ঘন্টা ওর পিছে পিছে হাটলাম উইগ নিয়ে দৌড় দেয়ার জন্য কিন্তু কিছুতেই দৌড়ের সুযোগ করতে পারলাম না, এগোরা ভর্তি কর্মচারী গিজগিজ করে, ধরে ফেলবে সহজেই সেজন্য শেষ পর্যন্ত করা হলো না কিন্তু সেই এক ঘন্টার রোমাঞ্চ আজো আমি আমার রক্তে অনুভব করি। এটাকি অনেকদিন আগের কথা?
এইতো গতো বছরের জানুয়ারীতে আমরা সেন্ট মার্টিন বেড়াতে গেলাম। সন্ধ্যেবেলা আমরা বোনেরা আমাদের আন্ডা বাচ্চা নিয়ে বীচে হাঁটছি, টুকটাক গল্প করছি এমন সময় দুটো দশ বারো বছরের স্থানীয় ছেলে এলো আমাদের কাছে। এসে জিজ্ঞেস করলো, আফু গান শুনবেন, গান? আমি বল্লাম, শোনাও। সে শুরু করলো, “সোনার ময়না পাখি………।“। আমার অন্যবোনেরা আমাকে চিমটি দিয়ে ধরলো তিনদিক থেকে। আমি বোনদের চিমটি অগ্রাহ্য করে মাথা নেড়ে নড়ে ওদের গান শুনতে লাগলাম। অসহ্য হয়ে স্বনার্লী বললো, ওরা কিন্তু গান শেষ করে টাকা চাইবে তোমার কাছে। আমি ফিঁচলা হাসি দিয়ে বল্লাম তাই নাকি? মুখ ভেংচে স্বর্নালী বললো, তাই না, আবার কি? এমনি এমনি নাকি? ওদের গান শেষ হওয়া মাত্র আমি বল্লাম, এবার আমাদের গান শোন। শুরু করলাম আমরা চারবোন মিলে গান। আমাদের গান শেষ হলে এবার আবার ওদের গান। কিশোর দুটো অবাক বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। বেশ কিছুক্ষন গান গান হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে কীসব আলোচনা করে পিঠটান ওরা দিল। খুব জব্বর বোঁকা বানিয়ে ওদেরকে আমি বিমলানন্দ অনুভব করতে লাগলাম।নপরদিন সকালে ওরা আমাদেরকে “চীজ” স্বরুপ মুখ নিয়ে আবার দেখতে আসলো।
আমাদের কিশোর বয়সে একটা খেলা ছিল টাকাতে ফোন নম্বর লেখা। বেশীর ভাগ গ্রাম্য কিসিমের লোকেরাই এধরনের কাজ করতো। সেধরনের টাকা পেলে আমাদের কাজ ছিল নম্বরে ফোন করা। অনেক সময়ই দেখা যেতো নম্বর আর নাম মিলছে না। কিন্তু যদি মিলে যেতো আর মক্কেল টাইপ কাউকে পেতাম তাহলেতো সোনায় সোঁহাগা। ফোনেই শাঁসিয়ে শেষ করতাম, টাকার ওপর নম্বর লিখলেন যে, জানেন কতো বড়ো অপরাধ? পুলিশে ধরতে পারে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের কতো বড়ো ক্ষতি করেছেন? ফোনের ওপাশে প্রথম দিকে গাই গুঁই করে পরে যখন নিশ্চুপ হয়ে পড়তো তখন আমরা ক্ষান্ত দিতাম। কিন্তু নম্বরগুলো রেখে দিতাম।বান্ধবীদের মধ্যে আদান প্রদান করতাম। মেজাজ খারাপ হলেই কিংবা পড়তে পড়তে বোর লাগলেই ওঠে যেয়ে ফোন করে সেসব নম্বরের হাঁদাগুলোকে বঁকে দিয়ে আসতাম। কিন্তু আমিতো এখনো তাই আছি। আমারতো এখনো তাই ইচ্ছে করে যেগুলো আগে ইচ্ছে করতো। দু হাজার আটের ষোলই ডিসেম্বরে আমরা টি।এস।টিতে হাটছি খুব ভাব নিয়ে। মেয়েকে বিজয় দিবস উদযাপন দেখাচ্ছি। কিছু আমাদের থেকে ছোট কিন্তু নাঁকের নীচে মোঁছ গজানো ছেলেপেলে আমাদের পিছনে পিছনে ঘুরতে শুরু করে দিল। একী মহা জ্বালা। বাসায় আসার জন্য রিকশা নিলাম, দেখি পোলাপানও রিকশা নিয়ে আসে। যখন আগের দিনের মতো ঠিক এতোবড় করে মুখ ভেংচি দিলাম তখন দেখি রিকশা নিউমার্কেটের ঐদিকে ঘুরে গেলো। আমিতো এখনো ভেংচা ভেংচি, মারামারি, ঝাড়াঝাড়ির ফর্মে আছি, আমার মেয়ে যদি বড় হয়ে যায় তাহলে ক্যামনে কী?
তানবীরা
০৯.০৪.১০
Friday, 26 March 2010
স্মৃতি হয়ে শুধু আছি ছবি হয়ে রয়ে গেছি
এক সময় প্রতি বছর আমি বাড়ি ফিরে ছয় সপ্তাহের জন্য। এই ছয় সপ্তাহ আমাদের বাড়িটা অচল থাকতো। সেবা স্বনার্লী স্কুল ছাড়া বাড়ি থেকে বেড়োতো না কোথাও। ছাঁদে কিংবা বাসার সামনের ছোট পোর্চটাতে বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটের বাচ্চাদের সাথে ওরা সারা বছর বিকেলে খেলা করতো শুধু ঐ ছয় সপ্তাহ বাদে। একদিন অন্য ফ্ল্যাটের খালাম্মা আম্মির কাছে নালিশ নিয়ে এলেন, ওনার মেয়েরা কাঁদছে, কেনো সেবা স্বনার্লী বোন এলে একদিনও খেলতে যায় না। ওরা একা একা আর কতোদিন খেলবে? আমাদের জন্য যে ছয় সপ্তাহ চোখের নিমেষে কেঁটে যেতো, সে সময়টুকু ওদের জন্য হয়তো পাহাড়সম ছিল। সুমি ইউনিতে ক্লাশ শেষ হওয়া মাত্র বাড়িতে দৌঁড়। কোন আড্ডা বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতো না, অনেক সময় ক্লাশও মিস করতো। আব্বু ভাইয়া যারা সন্ধ্যে পার না করে বাড়ি ফিরেন না তারাও রোজ দুপুরে বাড়িতে খেতে আসতেন। সবাই তাদের দৈনন্দিন কাজ কমিয়ে দিতেন, পরিবর্তন করে নিতেন শুধু আমি আছি বলে।
একটা সময় জীবনে যা অপরিহার্য ছিল আজ তার কথা মনেও পড়ে না। আমাদের পশ্চিমের টানা বারান্দায় ঝোলানো আমার দোলনাটার কথাটাই ধরি না কেনো? সকালে ঘুম থেকে ওঠে ওটাতে দুলে দুলেই আমাকে পড়তে হবে। গরমের ক্লান্ত দুপুরে কারেন্ট নেই, আমি বারান্দার দোলনায় দুলে দুলে সুনীল, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব কিংবা আশুতোষে মজ়ে আছি। পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে দোলনাতেই ঘুমিয়ে থাকতাম। দোলানায় বসে পা দিয়ে জোরে ধাক্কা মেরে একবার শুরু করতাম, তারপর সামনে এগিয়ে গেলে, ধাম ধাম পিলারে লাথি মেরে চলত আমার দোলনা দোলা সারা বেলা। নিজের পা ক্লান্ত হলে পাশ দিয়ে যেই যাবে আব্বু আম্মি কিংবা ভাইয়া, আমার দোলনাটা দুলিয়ে দিয়ে যাও চিৎকারের আব্দার। আমার দোলনা আমার দোলনা করে বাড়ি মাথায় রাখতাম কেউ যেনো দোলনা নিয়ে পালিয়ে যাবে, এমন ভাব থাকতো আমার। অথচ দোলনা থাকলে বাড়িতে বাচ্চারা এসে প্রথমেই সেই দোলনায় চড়তে চায়। আমার চোখ মুখ বাঁচিয়ে সবাই সেদিকেই দৌড়াত। যখন আমি ছিলাম তখন আব্বু বকত, দোলনা কি ওড়ে যাবে, তুই এমন করিস কেনো? আর যখন আমি নেই, আম্মি আমায় গল্প করলেন, বাচ্চারা অবাধে এসে দোলনায় লুটোপুটি খায়। আব্বু হাটে দেখে কিন্তু সহ্য করতে পারে না। আম্মিকে একদিন বললেন, তুমি আমার মেয়ের দোলনাটা প্যকেট করে তুলে রাখো। আমার মেয়েকে পাঠিয় দিবো আমি এটা। আমার মেয়েটা তার লম্বা লম্বা পা তুলে সারা বেলা দোল খেতো, এখন অন্যেরা এসে এতে হুটোপুটি করে আমার ভালো লাগে না।
সেই ঘুম না আসা গরমের দুপুরগুলোতে হেটে হেটে আমি অমিয় চক্রবর্তীর অন্ত্রনীলা ঘুমাওনি জানি, কিংবা সুনীলের কেউ কথা রাখেনি, হুমায়ূন আজাদের আমি হয়তো খুব ছোট কিছুর জন্য মারা যাব, শামীম আজাদের সর্বসাধ্য মনে হলেও সকল কথা কইতে নেই আবৃত্তি করতাম। এক সময় একবিতাগুলো আমি মুখস্থ আবৃত্তি করতাম। এখন স্মৃতিতে ধূলো জমেছে, না বলতে বলতে আজ় আর কিছুই মনে নেই। অথচ আমার ছোট বোনেরা যারা আমার পাশে বসে পুতুল খেলতো তাদের এখনো মনে আছে। আমি গেলে তারা আবৃত্তি করে শোনায় আমায়। কি বিচিত্র মানুষের ভালোবাসা।
সেই সব দিনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমি প্রচন্ডভাবে এখন মিস করি। একসময় যা কিছু সহজলভ্য ছিল, যার দিকে ফিরেও তাকাতাম না সেসমস্ত জিনিসের জন্য এখন আমার অন্তর আত্মা সারাবেলা কেঁদে ফিরে। প্রচন্ড ব্যস্ত এখন আমার দিনগুলো। এই দামি কর্পোরেট মূহুর্তে সবাই যখন ব্যবসা আর লাভ লোকসান নিয়ে ব্যস্ত, তখন দামি ইন্টেরিয়র দিয়ে সাজানো ডিজাইনার টেবল চেয়ারের ঘরে বসে হঠাৎ আমার বুকে চিন চিন ব্যথা শুরু হয়। কর্মব্যস্ত ঘরে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি কিছু সময়ের জন্য। আমার অতি সাধারন মধ্যবিত্ত শোবার ঘরটার জন্য মন আঁকুপাঁকু করতে থাকে। আমার সেই বিশ্রী পড়ার টেবলটা, যেটা বাংলাদেশের অতি সাধারন কাঠুরে কিংবা ছুতার তৈরী করেছেন, সেই চেয়ারটা যেটা কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার স্বাস্থ্যকর সার্টিফিকেট দেননি, কিন্তু আমি তাতে বসে গালে হাত দিয়ে আমার সমস্ত শরীর মনের ভার তাতে ছেড়ে দিতে পারতাম। বই সামনে নিয়ে পড়ার টেবলের সামনের জানালার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কতোরকম বাস্তব অবাস্তব স্বপ্ন বুনতাম। তখনো ঢাকা শহর ভর্তি এতো আকাশ ছোঁয়া ইমারত হয়নি। জানালার ফাঁক গলিয়ে নীল আকাশটাকে ছুঁয়ে ফেলা যেতো অতি সহজেই।
কি পাগলের মতো একসময় সবকিছুতে আমি আমি আমি’র ছাপ দেয়ার জন্য উন্মত্ত হতাম। বিছানার এপাশটাতে আমি শোব, ডাইনীং এর এই চেয়ারটায় আমি বসবো, টিভি দেখার সময় এই সোফাটা আমার। দুবোনে একটা বাথরুম শেয়ার করতাম। সেটা নিয়েও কি ঝগড়া। ঠিক দুজনের দিনের একই সময় গোসলে যেতে হবে। সারাদিন বাথরুম ফাঁকা পরে থাকে কিন্তু সে সময় বাসায় কুরুক্ষেত্র। আম্মি কতো বকতো, কেনো আমার বাথরুমে যা, ঘাড় ত্যড়িয়ে জবাব দিতাম, কেনো আমি অন্যের বাথরুমে যাবো, এটা আমার বাথরুম। সবকিছু আমার, মোহর দেয়া। এখন এতো দূরে পরে আছি আমি, ঢাকায় থেকেও সুমি সপ্তাহে একদিনও বাসায় যাবার সময় পায় না নিজের সংসার সামলে। ফার্নিচারের মডেলের বিবর্তনে সেই খাট আর টেবলও বাড়িতে আর নেই। শুধু সেই মূহুর্তগুলো এই ব্রক্ষান্ডের কোথাও আটকে আছে। টাইম মেশিন চালু হলেই আবার ছুটে আসবে যেনো।
যদিও বাড়ি ছেড়ে আসার সময় আমার লাগানো মানি প্ল্যান্টের লতাগুলোর ওপর থেকে, ওয়ারড্রোবে যে অংশে আমার কাপড় থাকতো সে জায়গা থেকে, আমার বইয়ের তাক থেকে, দোলনা থেকে আমার স্বত্ব ত্যাগ করেই এসেছিলাম কিন্তু এখনো কেনো যেনো পুরোপুরি মন থেকে সবকিছু ত্যাগ করতে পারিনি বলে মনে হয়। বাড়িতে যেয়ে এটা ওটা ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ যখন কোন কিছু হাতে পরে যাতে বাংলায় আমার নাম লেখা, কিংবা কোন বৈশাখী মেলাতে আমার কেনা কোন শৌখীন জিনিস যার প্রয়োজন আজকে ফুরিয়েছে বলে স্টোরে ঠাসা আছে দেখতে পাই বুকের ভেতরটা শিরশির করে ওঠে। কোথাও আমি নেই কিন্তু তবুও যেনো কোথাও আছি। মা দেয়াল ভর্তি করে তাঁর মেয়েদের নাতি নাতনীদের ছবি সাজিয়ে রেখেছেন, সারাদিন হাটেন ঘুরেন আর দেখেন, যখন সাজানো সে ছবিগুলোর বাইরেও নিজের অস্তিত্ব টের পাই তখন কেনো এমন লাগে?
তানবীরা
২৬।০৩।২০১০
Friday, 5 March 2010
কাদের কূলের মেয়েগো তুমি???
আমাদের বাড়ি নতুন কেউ এলে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু অনেকে আবার ধর্ম নিয়ে খুব স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের জানলে প্রথমে ধরেই নেয় মুসলমান হতে পারি। কিন্তু বাড়ি এসে যখন বাড়ি ভর্তি মূর্তি দেখে তখন সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস কর, আপনারা কি হিন্দু ? আমরা মাথা নাড়ি, না
মূর্তির দিকে ফিরে তাকিয়ে অবাক চোখে বলে, মুসলমান? আবারো মাথা নাড়ি না।
তারা আরো পাজলড হয়, বিস্ফোরিত চোখে জিজ্ঞেস করে তাহলে কি?
উত্তর দেই, আমরা মানুষ, শুধু মানুষ।
তারা অসন্তুষ্ট মনে চুপ করে যান।
আবার অনেকে এক ধাপ এগিয়ে যান।
মরলে কি করবেন?
আমরা অম্লান বদনে উত্তর দেই, আমাদের শক্তি যখন অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হবে তখন আমাদের পুরনো জামা কাপড় কে কোথায় ফেলে দিলো সে নিয়ে আমরা ভাবি না।
কখনো কখনো তারা আরো আগ্রাসী হয়। খেতে বসে জিজ্ঞেস করেন, খাবার হালালতো?
তখন বলি খাবার স্বাস্থ্যসম্মত, পঁচা গলা নয়। এর বাইরে আর কিছু বলতে অপারগ।
এই হিন্দু মুসলমান প্রশ্নটা শুনতে শুনতে, আজকাল আমার ছোট মেয়েটা, যাকে এসব বিভেদ থেকে অনেক দূরে রাখার চেষ্টা করেছি সেও অপেক্ষা করে থাকে অনেক সময়, লোকজন এলে কখন এ প্রশ্নটা আসবে।
জীবনে সবচেয়ে বেশি কোন প্রশ্নটির সম্মুখীন হয়েছি, কেউ যদি এ প্রশ্নটি করেন তাহলে নির্দ্বিধায় উত্তর দিতে পারবো। সেটি হলো এটি। এটি কি জানা একান্তই জরূরী না বন্ধুত্ব করার জন্য প্রয়োজনীয়?
তানবীরা
০০৬.০৩.১০