Monday, 4 March 2019

ঈশ্বর ও বালিকা

http://www.bhorerkagoj.com/print-edition/2019/01/18/232218.php?fbclid=IwAR0bylHUCuN8_d30HBsvVsKE1va39FSVhAWSopvMCPeKwz8U1D2HvP4nOkc

প্রতিদিনের মতো প্রাতঃ ভ্রমণে বেড়িয়েছে ঈশ্বর

স্ক্যান্ডেনেভিয়ান বিষাদ চোখে নিয়ে ছিপছিপে তরুণীটি আজও তীর ঘেঁষে বসা

আনমনা হয়ে কখনো ফিরে না আসা ঢেউয়ের চলে যাওয়া দেখছে

হরিণ ডাগর চোখ আর্দ্র কিন্তু দৃষ্টি নক্ষত্র স্থির।

চলে যেতে গিয়েও কি ভেবে যেন ঈশ্বর এগিয়ে এলো

স্পঞ্জ নরম রসগোল্লা গলায় ডাকলো, “বালিকা”

ঈশ্বরের গলার তুষার কোমলতায় সমুদ্র উত্থলিত হলো হৃদয়ে

ভীত কাকাতুয়া বালিকা তবুও এক পা এগোয় দু’পা পেছোয়

হিমালয় অটল ঈশ্বর নিজেই আরও দু’পা সামনে এগুলো

মাথায় হাত রেখে বললো, পরিপূর্ণতা তো দিয়েছি তোকে

তবে কোন সে ছোবলে তুই সারাবেলা নীল!

নিজেকে বাঁধলো না বালিকা কাঁটাতারে

ঈশ্বরের দিগন্ত উদাত্ত বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললো, কাকে বলে পরিপূর্ণতা?

আবেগি বালিকার ক্যাটারিনার টাল সামলাতে ঈশ্বর এখন টালমাটাল

“পাগলী তোমার জন্যে” মতো কাব্য করবে সেই জয় কই আমার

ময়ূর বর্ষা রাতে পিঠে পিঠ ঠেকাবো, আঙুলে আঙুল ঢুকিয়ে সুরে হারাবো, কোথায় পাবো আমার অনুপমকে

গলায় দু’পা জড়িয়ে চাঁদের আলোয় সমুদ্রের বালুকায় বুনো আদিম খেলায় মাতবো,

সেই বুনো সাঁওতালি প্রেমিক কি দিয়েছো আমায় ঈশ্বর!

লোভী ঈশ্বর পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ক্ষীণ ক’টি বালিকাকে তুলে ধরে

ঈশ্বরের কামুক স্পর্শে জ্বলে গেলো বালিকার তুন্দ্রা শরীর

ঈশ্বরের এক চুমুতে সে ভেজে

দ্বিতীয় চুমুতে অঝোর বৃষ্টি

আর তৃতীয় চুমুতে সর্বনাশা বন্যা

আজানু সমর্পিত বালিকা ঈশ্বরের মুখে মুখে ঢুকিয়ে জিহ্বা দিয়ে গলা হৃদয় স্পর্শ করতে চাইলো

প্রকৃতি কম্পিত হলো বীণার ঝংকারে, “খোদার কসম জান, ভালবেসেছি তোমায়”

নীলকণ্ঠ পান করে আকাশ স্থির হয়ে গেলো বালিকা

অতোটুকু ভাবেনি ঈশ্বর, স্থানু দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র আল্পস হয়ে, ভেনিস বালিকা কোলে।

রফিক আজাদ নবরূপের প্রবর্তক

http://www.bhorerkagoj.com/print-edition/2019/02/08/235645.php?fbclid=IwAR0Nv41yBEpFGMb8d91CQVOSg9Jp-3pn9hfmkI2Jd0ciedzXLPbpS_XwaVg

তুমি সেই লোকশ্রæত পুরাতন অবাস্তব পাখি,

সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে যার

চতুর্দিকে আনন্দ, টাকার থলি, ভীষণ সৌরভ!

রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে

অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে

কেবল তোমার জন্য বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে

সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে ‘যাই’। (মাধবী এসে বলে : অসম্ভবের পায়ে)
বহুল জনপ্রিয় কবিতাগুলোর কাতারে হয়তো এই কবিতাটা আসে না কিন্তু কবি রফিক আজাদের নাম এলেই আমার এই কবিতাটির কথাই প্রথম মনে হয়। কালজয়ী সৃষ্টির জন্য নিঃসঙ্গতা, বিষণœতা, অপূর্ণতা যেন অবশ্যম্ভাবী। অনেক পেয়েও অসম্পূর্ণ অনুভব হতে পারে, বাড়ি ভর্তি মানুষের মাঝেও নিজেকে খুঁজে না পেয়ে একাকিত্ব ঘিরে থাকতে পারে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র কবি রফিক আজাদ যাকে অনেকে জীবন নামেই জানতেন চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি উনিশ একচল্লিশে জন্মেছিলেন টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে। তিনি কবিতা লিখে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামিয়ে দেখার স্বপ্ন দেখতেন।
ষাটের দশকে বাংলা কবিতা যখন নিজের ধারা পরিবর্তন করতে ব্যস্ত ছিল, রফিক আজাদ ছিলেন তার দিক নির্দেশনাকারী, পথ প্রদর্শক। নতুন আঙ্গিকে লেখা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা নিয়ে রীতিমতো তিনি নিরীক্ষা করে গেছেন। শুধু ক?বিতায় তি?নি নতুন দ্যোতনা আনেননি, ভে?ঙে ফে?লে?ছি?লেন ক?বি?দের স্টি?রিও?টি?পিক্যাল রূপ। প্রকৃতির সৌন্দর্য, নারী পুরুষের চিরন্তন চাওয়া, প্রেম, বিষণœতা, একাকিত্ব, হাহাকার, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের ভঙ্গুর পরিস্থিতি, স্বৈরাচার, দেশের বিরূপ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সবই তার কবিতায় উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কবি উনিশ একাত্তরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাতৃভূমির দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দেশের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা তার মনোবল নষ্ট করে দেয়। বিপন্ন ও বিদ্রোহ এই মনোভাব তার লেখায় উঠে এসেছে বারবার। দেশপ্রেমিক এই লড়াকু যোদ্ধা মানুষের লোভ, হিংসা ও ক্ষমতার দম্ভের প্রতিবাদে ক্ষোভে-বিক্ষোভে জ্বলে উঠেন। সেই আগুনের লাভা ছড়িয়ে আছে তার লেখার ছত্রে ছত্রে। তার বিক্ষুব্ধ সেই মনোভাবেরই জ্বলন্ত প্রকাশ।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবি,

তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘটে যাবে;

ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুন-

সমুখে যা পাবো খেয়ে নেবো অবলীলাক্রমে;

যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে, ধর, পেয়ে যাই-

রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।

সর্বপরিবেশগ্রাসী হলে সামান্য ভাতের ক্ষুধা

ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে! (‘ভাত দে হারামজাদা’)
স্বাধীনতা-উত্তরকালে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর ওপর অভিমান থেকে যেমন তিনি ওপরের কবিতাটা লিখেছিলেন ঠিক তেমনি সেই সাহসী উচ্চারণে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, সামরিক জান্তাদের দখলের নিচে যখন ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি প্রকাশ্যে বলা বাংলাদেশে এক রকম ‘অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ’ ছিল, তখন রফিক আজাদ ১৫ আগস্টের অন্যায় ঘটনা নিয়ে নির্ভীক চিত্তে প্রতিবাদ করতে গিয়ে লেখেন :
এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,

সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে-

বত্রিশ নম্বর থেকে

সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে

অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। (‘সিঁড়ি’)
অকুতোভয় দেশপ্রেমিক এই কবির কবিতায় দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, পট পরিবর্তন, মানুষের ক্ষুদ্র মানসিকতার নির্ভেজাল প্রকাশ বারবার উঠে এসেছে। বাস্তবতাকে এড়িয়ে সাহিত্য চর্চার চেষ্টা তিনি করেননি। তার কবিতায় স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের কথা এসে পড়ে, জাগতিক সব অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আছে তার তীব্র ক্ষোভ। যুদ্ধ, মহামারী, নৈরাশ্য, নগর সভ্যতা দ্বারা ক্ষয়ে যাওয়ার মানুষের শিকড়ের রূপ দেখে একজন সংবেদনশীল সচেতেন মানুষ হিসেবে কবিও হয়ে পড়েন বেদনাসিক্ত। আমেরিকার ‘বীট জেনারেশন’ ও ইংল্যান্ডের ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ মুভমেন্ট দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন কবি। নগর সভ্যতার বিরুদ্ধে তার রোমান্টিক কবিমন যেমন প্রতিবাদ মুখর হয়েছে ঠিক তেমনি আবার স্বপ্ন ভেঙে বাস্তবে ফিরে আসার চেষ্টাও আসছে তার লেখায়।
বালক জানে না সে বানানে ভুল করে

উল্টাসিধা বোঝে : সঠিক পথজুড়ে

পথের সবখানে কাঁটার ব্যাপকতা!

বালক ভুল করে পড়েছে ভুল বই,

পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূল বই!

বালক জানে না তো সময় প্রতিক‚ল,

সাঁতার না শিখে সে সাগরে ঝাঁপ দ্যায়,

জলের চোরাস্রোত গোপনে বয়ে যায়,

বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে! (‘বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে’)
রফিক আজাদকে তার লেখা প্রিয় কবিতার কথা জিজ্ঞেস করলে, তিনি বারবার এই কবিতার কথাটিই বলতেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ’ বইয়ের কবিতা এটি। তার দৃষ্টিতে তিনি যেই বোধটি এক কবিতায় ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই বোধটি পরিপূর্ণভাবে মূর্ত হয়ে এসেছে এই কবিতায়।
তিনি যে শুধু কবিতার রূপ আর ধারা কিংবা গতানুগতিক কায়দার রোমান্টিক ধাঁচের শব্দ পরিবর্তনে মনোযোগী ছিলেন তাই নয়। মানুষ হিসেবে খুবই বেপরোয়া ও লাগামহীন ধরনের ছিলেন। কবিতা জুড়ে বিষাদ ভর করলেও জীবনের প্রতি ছিল তার সীমাহীন লিপ্সা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অত্যন্ত আধুনিক ও উদারমনা রফিক আজাদ কবিতার সাথে কবিদের রূপ পরিবর্তনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। হাতকাটা গেঞ্জি পরতেন, গলায় চেন, হাতে বালা। নাকের তলায় ইয়া গোঁফ, হাতে সারাক্ষণই সিগ্রেট। ড্রাগ খেয়ে মোটরসাইকেল চালাতেন ঢাকার রাস্তায়। তরুণদের ওপর তার ইমেজ এতটাই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল যে, সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের সাথে তাল মিলিয়ে ‘বিচিত্রা’ তাকে নিয়ে কভার স্টোরি করেছিল।
রফিক আজাদ মানে স্বাভাবিক চিরন্তন কবি চিন্তাভাবনার বাইরে কিছু একটা। নিজের সময়ের কথা বলতে গিয়ে কবি রফিক আজাদ সাহসের সঙ্গে সেই সময়ের কথা বলেছেন অকপটে। শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনকে নিয়ে ‘মিলনকে নিয়ে দুচার কথা’ এক লেখায় তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আমাদের পাঠকদের মধ্যে ঐ সময়ে শিল্পী সাহিত্যিকদের সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল তাদের পরনে থাকবে পাঞ্জাবি, ঢিলেঢালা পাজামা, পাজামাটা ঝাড়ুর কাজও করবে, পাঞ্জাবির নিচের দিকে অনেক ময়লা থাকবে, তারপর একটু রোগাটে-লম্বাটে, একটু উসকো খুসকো, একটু উদাসীন, কাঁধে আবার ঝোলা, হাতে বেলি ফুলের মালা-টালা হলে আরো ভালো- এই রকম আর কি। ষাটের দিকে আমি অধিকাংশ বাংলা ছাত্রছাত্রীকে দেখতাম ঐরকম। আমরাই প্রথম স্কিন টাইট জিন্স পরা শুরু করি। বাংলা পড়লেই যে পোশাকে-আশাকে, আচার-আচরণে ওরকম হতে হবে, ‘সখি আমায় ধরো গো, ধরো গো’ বলে শান্তিনিকেতনী হতে হবে, মেয়েলি স্বভাবের হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শিল্পী তার লেখার সময় শিল্পী। অন্য সময় সে মানুষ। জীবনবাদী মানুষ। জীবনের সব কিছু সে উপভোগ করবে। তো সেই প্রচলিত ধারাকে আমরা একটু পাল্টে দিতে পেরেছিলাম। পরে এর সঙ্গে এসে যোগ দিল মিলন। তাতে করে বেশ জমেছিল। একবার যশোর প্রেসক্লাবে ঢাকা থেকে আমরা কয়েকজন শিল্পী-সাহিত্যিক গিয়েছি। যখন আলাপ হচ্ছিল সবার সঙ্গে, পেছন থেকে বুড়ো ধরনের কে একজন মুখ ফসকে বলে ফেললো, শালারা লেখক, একজন কবিও আবার, দেখে মনে হয় জলদস্যু।

শুনে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, আমরা জলদস্যুবেশী বটে কিন্তু আমরা লেখক। এখন থেকে এ ধরনের লেখকই দেখবেন। কোণাপাঞ্জাবি আর দেখবেন না এই দেশে।’
অন্য সব কবিদের মতোই প্রেম, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, বিরহ, পাওয়া না পাওয়া, অপ্রাপ্তি, অপূর্ণতা তার কলমে উঠে এসেছে বারবার। গতানুগতিক সব শব্দ হয়তো তিনি তুলে আনেননি, লেখেননি চিরন্তন প্রথা অনুসরণ করে কিন্তু যা লিখেছেন তা আজো কবিতাপ্রেমী কিংবা অপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে। ‘যদি ভালোবাসা পাই’ কবিতাটি তার অনবদ্য সৃষ্টি। আজো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তরুণ-তরুণীরা পরস্পরকে কাছে টানার জন্য অনেক সময়ই এই কবিতাটির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ কবিতাটি যদিও তার স্বভাবমতো নতুন ধারার আঙ্গিকে লেখা নয় কিন্তু এর আবেদন চিরন্তন। বুকের গভীর গহনে বিশ বছর ধরে লালন করা গোপন অনুভূতির এক দুর্দান্ত প্রকাশ। ওপরে উল্লেখিত দুটো কবিতাই তরুণদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অজস্র আবৃত্তিতে অনুরণিত। ‘চুনিয়া আমার অর্কেডিয়া’ কবিতায় ভালোবাসার সংজ্ঞা দিয়েছেন তিনি। তার কথানুসারে, কবিতাটি ১৯৭৬ সালের মে মাসে লেখা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর অভিঘাতের ফলে দীর্ঘদিন মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাওয়া টুকরো টুকরো কথা ও চিত্রের লিখিত রূপ। কবিতাটি বর্তমান দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত চুনিয়া নামক একটি গ্রামের বর্ণনা। ‘চুনিয়া’ গ্রামটিকে কবি গ্রিক আদর্শিক ও রোমান্টিক উপত্যকা আর্কেডিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং কাব্যিকভাবে দাবি করেছেন যে, এই আদর্শিক গ্রামটি দাঁড়াবে বর্তমান সভ্যতার সব হানাহানি আর রাহাজানির বিরুদ্ধে। কবিতার ব্যাকরণে ‘চুনিয়া আমার অর্কেডিয়া’ ঠিক কতখানি কবিতা হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে সুধীজনদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা, মতপার্থক্য আছে কিন্তু কবিতার বক্তব্যের প্রতি প্রায় প্রত্যেকেরই আছে নিরঙ্কুশ সমর্থন।
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্ট কিন্তু ভেতরে-ভেতরে

খুব শক্তিশালী

মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব।

চুনিয়া তো ভালোবাসে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ,

চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধ-স্বভাবের নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতি;

চুনিয়া যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি।

চুনিয়া কখনো কোনো হিংস্রতা দ্যাখেনি।

চুনিয়া গুলির শব্দে আঁতকে উঠে কি?

প্রতিটি গাছের পাতা মনুষ্যপশুর হিংস্রতা দেখে না-না করে ওঠে?

চুনিয়া মানুষ ভালোবাসে। (‘চুনিয়া আমার অর্কেডিয়া’)
নারী-পুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা খাপছাড়া তলোয়ার লেখাও ছিল তার প্রথা ভাঙা লেখালেখির আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক। সেই সময় কোনো ধরনের ভণিতা না করে সরাসরি এরকম সুস্পষ্ট উচ্চারণ বিরল ছিল। আড়াল রেখে কিংবা উপমা বা রূপকের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করার যে প্রচলিত ধরন ছিল সেগুলো সমূলে উৎপাটন করে দিয়েছিলেন তিনি। নারীর শরীর, পুরুষের কামনা, প্রকৃতির স্বাভাবিক এই খেলা, কাছাকাছি আসার এই অমোঘ আকুলতা, নর-নারীর চিরন্তন মিলন বা ভালোবাসার রূপের শাশ্বত চিত্রটি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে। বাস্তবকে কিংবা সত্যকে পাশ কাটিয়ে কবি হতে চাননি তিনি। জীবনের দাবি তাই বারবার ধরা দিয়েছে তার লেখায়।
‘আমার তারুণ্যময় সুঠাম শরীর তোমাকে পাপের পথে নামাতে পারে না?-

সামান্য পাপের ভয়ে আকণ্ঠ তৃষ্ণার্ত তুমি সুপেয় জলের জন্য,

প্রিয়তমা, এইটুকু পথ পেরুবে না? (সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে)

কিংবা

বেলাভূমি দীর্ঘ হলে শুধু ধূধূ বালি

বালি ছাড়া আর কিছু নাই, তাই বলে

কে কবে করেছে বন্ধ নোনাজলে স্নান?

ঘুরেফিরে সেই পুরনো জোয়ারে তুমি

সমর্পিত হলে? যে জলে দুর্নাম প্রায়

প্রান্তবাসী নারীর সমান?’ (পয়ারেই করো ধারাস্নান)
কবি হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি রয়েছে অনেক সম্মাননায় ও পুরস্কারে। বেসরকারি ‘আলাওল পুরস্কার’, লেখক শিবির প্রবর্তিত ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার’, কবি ‘আহসান হাবীব পুরস্কার’। তিনি সেই একজন বিরল সৌভাগ্যকারীদের একজন যিনি জীবিত থাকতেই জাতীয় সম্মাননার দুই বিশেষ নাম বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক দুই-ই তিনি লাভ করেছেন। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি আর ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তাকে একুশে পদক দেয়া হয়। সামরিক শাসকদের রোষানলে ছিলেন বরাবর আর তাই একবার তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ তখন বাজেয়াপ্তও করা হয়েছিল।
তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর করে কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতায়। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর কাজ করেন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে। বিভিন্ন ধরনের পেশা, বিভিন্ন জায়গায় বসবাস, বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা তার লেখার ভাণ্ডারকে দিনের পর দিন পরিপূর্ণ আর সমৃদ্ধ করেছে। কথিত আছে, অবসর গ্রহণের কয়েক মাস আগে এক আমলার বিরূপ আচরণে প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন এই কবি বাংলা একাডেমির চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা মৌলবাদিতা, ধর্মের আড়াল নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসনের সাথে আপসহীন এক কবির বিরাগের প্রবল ছাপ তার লেখায়ও পড়েছিল। সেসবের প্রতিবাদ হয়ে তার কবিতায় উঠে এসেছে, শুয়োরের বাচ্চা, হারামজাদা, বেশ্যার বিড়ালের মতো শব্দ। মানুষের আদর্শচ্যুত হওয়া, নৈতিকতা বিমুখতা তাকে বারবার ব্যথিত করেছে।
মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে সুচতুর ধর্মব্যবসায়ী

প্রতিদিন ফুলে-ফেঁপে ওঠে পীরের আস্তানা

শ্যামল বাংলায় চলে পাকিস্তানি উটের বহর

মধ্যপ্রাচ্যে নারী পাচারের কেচ্ছা প্রতিদিন

পেট্রোডলারের কাছে পরাজিত চার মূলনীতি

এই তো আমার প্রিয় স্বাধীন স্বভূমি। [যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ]
সদ্য স্বাধীন দেশে কবি রফিক আজাদ তাঁর কবিতা দিয়ে, তারুণ্য দিয়ে, উন্মাদনা দিয়ে, টগবগে ক্রেজ দিয়ে সত্যি সত্যি জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়, কবিকে খেয়েই কবিতার জন্ম হয়’- এই প্রবাদতুল্য কথাটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, কবিতা লেখা খুব কঠিন ব্যাপার। খেলোয়াড়দের মতো দুই দিন প্র্যাকটিস করলাম আর লিখে ফেললাম সেটা কবির ক্ষেত্রে হয় না। জীবন বিসর্জন দিয়েই কবিতা লিখতে হয়। নিজেও তো একটা জীবন বিসর্জন দিয়ে দিলাম। সারা জীবনের জন্য পণ করেই কবিতা লিখতে আসতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। লেগে থাকতে হবে আজীবন। নিজের সুখময় জীবনের মায়া ত্যাগ করেই কবিতা লিখতে আসতে হবে। কারণ যারা কবিতা লেখেন তাদের বেশিরভাগই কিন্তু কষ্ট করে গেছেন। আমি ব্যক্তিগত জীবনেও প্রচুর কষ্ট পেয়েছি শুধু কবিতা লেখার জন্য। সেসব বলে শেষ করা যাবে না।
অন্যায়, অবিচার, বিষণœতা, বিদ্রোহ, ক্ষোভ, বিক্ষোভ নিয়ে নৈরাশ্য আর হতাশাই কি কবির জীবন ছিল? না, একদমই না, যারা তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তারা বলেছেন, জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তার। প্রতিটি মুহূর্তকে ভালোবাসতেন তিনি, উপভোগ করতে চাইতেন। জীবন নিয়ে তার নিরীক্ষা ছিল, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপভোগের আকাক্সক্ষা ছিল তার মধ্যে। সত্য আর সুন্দরের একনিষ্ঠ পূজারী ছিলেন তিনি। সৌন্দর্যের প্রতি তার পিপাসা আকণ্ঠ। কবিতার অমরাবতীকে তা বারবার ছুঁয়ে গেছে। পরিপূর্ণ রোমান্টিক এক সত্তার অধিকারী ছিলেন তিনি। আকণ্ঠ প্রেমে নিমজ্জিত এক কবি। জীবনে আর যে কোনো হাতছানিই ছিল তাঁর কাছে তুচ্ছ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কোনো সৃষ্টিরই প্রেরণা হচ্ছে প্রেম।
‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে সত্যের সামান্য অংশ

খুঁজে পেতে অনেকেই লাঙলের ফলা আঁকড়ে ধরে-

সত্যের বদলে কিছু উঠে আসে সুন্দরের সীতা!

সত্যে ও সুন্দরে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বাঁধে না!’ (সত্য ও সুন্দর)
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে সকল অভিমান, অভিযোগ, পাওয়া না পাওয়া বুকে নিয়ে ২০১৬ সালের ১২ মার্চ এই প্রথা ভেঙে প্রথা তৈরি করা কলমের জাদুকর কবি রফিক আজাদ এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন. 

বৃষ্টি চেয়ে উড়ো চিঠি

http://bonikbarta.net/bangla/magazine-post/2526/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE/


মন আমার,
ভালো আছিস বেশ দেখতে পাচ্ছি, ভালো লাগে, জানিস, এই যে ভালো আছিস সেটা জেনে। যার সাথেই থাকিস
ভালো থাকিস, এটাই কি চাইনি?
আমি? হুঁ, রান্না-খাওয়া, সংসার করা, মেয়ের যত্ন, অফিস করা, মুভি দেখা, বেড়াতে যাওয়া আর সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড দেয়া যদি ভালো থাকার মাপকাঠি হয়, তবে আমিও বেশ আছি।
হা-হা-হা-হা
“আমায় কেউ ডাকলে বলি, নেই।
হারিয়ে গেছি সেই তো কবে, ভীষণ অলক্ষ্যেই।
দেখছ আমার শরীরটাকে, আমায় দেখো কই?
ছায়ার ভেতর মিথ্যে কায়া, ‘আমার’ ‘আমি’ নই।”
দুই আর দুইয়ে চার কি সহসা হয়? ধরে নিই যদি, জীবনটা একটা পাজল, বক্সের ওপর খুব সুন্দর ছবি দেয়া আছে আর সাথে সব ছোট ছোট সব খাঁজ কাটা টুকরোগুলো। নির্দিষ্ট খাঁজের টুকরোর সাথে শুধু নির্দিষ্ট টুকরোটাই মিলবে। যে জায়গাটা মিলছে না, সেখানে ওই খাঁজটায় মিলে যাবে, এমন দেখতে বেশকিছু টুকরো আমরা সবাই বসিয়ে বসিয়ে চেষ্টা কি করি না? মনে হয় মিলে যাচ্ছে, কিংবা এবার বুঝি মিলেই গেল। এটাই সেটা যেটার সন্ধান ছিল। এবার পাজল সল্ভড, কমপ্লিট। প্রতিযোগিতা হলে সময়েরও ব্যাপার আছে, কার আগে কে দ্রুত মেলাতে পারল। তিনটে কোনায় অনেক সময় মিলেও কিন্তু যায়, তারপর এক পাশ মেলে না। আমরা আবার মেলাতে সচেষ্ট হই, নতুন ‘পারফেক্ট’ টুকরোটা খুঁজতে থাকি...খুঁজতে থাকি...খুঁজতে থাকি...
একটা গোটা জীবন কেটে যায় সোনার হরিণ খুঁজতে খুঁজতে...
ইতি,
তোর হারিয়ে ফেলা পাখি

মনপাখি – একটি বয়ে চলা প্রেমের গল্প

https://arts.bdnews24.com/?p=21613&fbclid=IwAR3fvznOGSnbMKPbw6T6OuerPgGPbAF0iYRp-UlShBC-6-Z8z3DayCb9b7Y

“উইড়া যায় রে পংখী-পইরা থাকে তার মায়া” – হুমায়ূন আহমেদ
না না, রোমিও জুলিয়েটের মত বিয়োগান্তক কোন প্রেমের উপাখ্যান নয়, ভিনদেশী ছাড়া, ক্রোয়েশিয়ানদের নিজস্ব বিয়োগান্তক উপাখ্যানও আছে। কিন্তু এখানে প্রতীক্ষার, পাশে থাকার আর একটি সম্পর্কে যে জিনিসটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “দূরত্ব”, তাকে অতিক্রম করার গল্প এটি।
ছাব্বিশ বছর ধরে প্রেমিক সারসটি ক্রোয়েশিয়া’র সেই ছাদে উড়ে যায় যেখানে তার শারীরিক প্রতিবন্ধী কিন্তু তার প্রাণের সঙ্গী তার অপেক্ষায় আছে। পূর্ব ক্রোয়েশিয়ার স্লাভোনস্কি ব্রড (Slavonski Brod) গ্রামে প্রাণসখা ক্লেপটান প্রতি গরমে দক্ষিন আফ্রিকা থেকে তের হাজার কিলোমিটার উড়ে প্রিয় সখী মালেনা’র কাছে ফিরে আসে। একজন শিকারীর গুলির আঘাতে উনিশো তিরানব্বই সালে মালেনা’র ডানা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মালেনা আর উড়তে পারে না। শীতটা কাটিয়েই ফিরে আসে প্রিয়তমা’র কাছে আর প্রতি গরমে তাদের নতুন জন্ম নেয়া ছোট ছোট ছানাদের কলকাকলিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। স্টেপান ভকিক (Stjepan Vokic) গ্রামের স্কুলের একজন দপ্তরী মালেনাকে ডানা ভাঙা আহত অবস্থায় রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পেয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে এসে শুশ্রুষা করেন এবং তার নিজ বাড়ির ছাদে থাকার জায়গা করে দেন। স্টেপানের ভাষায়, মালেনা এখন তার পরিবারের সদস্য, শীতের সময় ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান, উষ্ণতায় থাকে মালেনা, বসন্তের শুরুতে ছাদে নিয়ে আসেন, আনন্দে উচ্ছাসে মেলেনা তার প্রেমিকের প্রতীক্ষা করে।
পাখিরে তুই দূরে থাকলে
কিছুই আমার ভালো লাগে না!
পাখিরে তুই কাছে থাকলে
গানের সুরে পরাণ দোলে (সুবীর নন্দী)
ক্লেপটান আর মালেনা’র প্রেম কাহিনী ক্রোয়েশিয়ানদের মুখে মুখে ফেরে। গত বসন্তে ক্লেপটানের ফিরতে ছয় দিন দেরি হওয়াতে স্থানীয় মিডিয়া খুব ফলাও করে এ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে, গ্রামবাসী অনেকেই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, হয়ত এবার আর সে ফিরে আসতে পারলো না। কারণ ক্লেপটান খুব কঠোরভাবে তার ফিরে আসার দিনটি মেনে চলে। প্রতি বসন্তে স্থানীয় লোকজন তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, ছোটখাট স্বাগতম উৎসব হয় তার ফিরে আসাকে ঘিরে। জনপ্রিয়তার কারণে ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবের প্রধান কেন্দ্রে ওদেরকে লাইভ টেলিকাস্ট করে দেখানো হয়। স্টেপান এক ঝুড়ি ভর্তি মাছ তৈরী করে রাখে ক্লেপটানকে স্বাগত জানাতে, যাতে এত লম্বা যাত্রার ধকল খানিকটা সে পুষিয়ে নিতে পারে। যদিও ডানা’র আঘাত সারেনি তবুও এই গরমে প্রেয়সী মালেনা বেশ খানিকটা উড়েছিল তার প্রিয়তম ক্লেপটানের সাথে। ছয় দিন দেরীতে ক্লেপটান ফিরে আসার পর কয়েক ঘন্টার জন্যে দু-দুজনকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ছিলো।
একবার একটি প্রেমিক সারস মালেনার চারপাশে উড়ছিল, অনেকেই ভেবেছিলো হয়ত ক্লেপটান ফিরে এসেছে। কিন্তু রাধিকা মালেনা যেভাবে প্রতিবাদী হয়ে তার প্রেমের প্রত্যাশায় থাকা অন্য প্রেমিককে আক্রমন করে ঠুকরে সরিয়ে দিলো তাতে পরিস্কার সবাইকে বোঝানো হয়েছে, সে শুধুই তার প্রিয়তম কানাইয়া ক্লেপটানের প্রতীক্ষায় আছে। অন্য কাউকে সে তার পাশে ঘেষতে দেবে না। সেবার ক্লেপটান এক সপ্তাহ আগে ফিরে এলে, গ্রামের লোকেরা স্টেপানকে জিজ্ঞেস করলো, এটা কি সত্যিই ক্লেপটান নাকি অন্য কেউ? স্টেপান সবাইকে আশ্বস্ত করলো এই বলে, ক্লেপটান জানে কোথায় আমি ওর মাছের ঝুড়ি রাখি, ফিরে সে প্রথমে সেখানেই গেলো যদিও ঝুড়িটি খালি ছিলো। তারপর গেলো তার সঙ্গিনী মালেনার কাছে।
প্রতি বসন্তে ছোট গ্রাম স্লাভোনস্কি ব্রড আজকাল মিডিয়া কর্মীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে, ক্লেপটান আর মালেনা এখন জাতীয় নায়ক নায়িকার মর্যাদায়। পর্যটন বিভাগ ও এই হৃদয়কাড়া ভালবাসা ও নিবেদনের গল্প ফলাও করে তাদের পর্যটকদের কাছে প্রচার করে থাকে।
তথ্যসূত্রঃ অন্তর্জাল
২৬/০২/২০১৯

ইনবক্স সমাচার


আচ্ছা, ইনবক্স কত প্রকার?

প্রবাসী ইনবক্সঃ আপু দেশটা কেমন, পড়তে আসতে চাই, ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন, চাকুরী পাওয়া যাবে, কাজের সুবিধা কেমন? ভিসা পেতে হলে কি করতে হবে, কতদিনে পাসপোর্ট পাওয়া যায় ইত্যাদি। কিংবা খুব অসুবিধায় আছি, কিছু টাকা পাঠাতে পারেন, দ্রুতই ফেরত দিয়ে দেবো

কাজের ইনবক্সঃ লেখা ছাপা হয়েছে, লেখা ছাপা হয় নি। আপু, আমার এই লেখাটা পড়ে আপনার মতামত দেবেন, প্লিজ। আপনার লেখাটা কি আমাদের সাইটে দিতে পারি কিংবা দিয়েছি এই যে লিঙ্ক। আমরা নতুন একটা পত্রিকা বের করছি, আপনার একটা লেখা চাই। শীতার্তদের সাহায্য করবো কিংবা বন্যা দুর্গতদের, আশাকরি আপনি পাশে থাকবেন ইত্যাদি

ফরোয়ার্ড ইনবক্সঃ বিভিন্ন ধরনের ভিডিও, মীম, কালী মাতা আজও জাগ্রত কিংবা এই দোয়াটি ত্রিশ জনকে না পাঠালে কালই আপনি চাকুরীচ্যুত হবেন ইত্যাদি। উত্তেজিত জনতা সাধারণত দেখা যায়, সামাজিক দায় থেকে, নিজের ইনবক্সে আসা মাত্র খুলে না দেখেই অন্যকে ফরোয়ার্ড করে দেয়

আবদারী ইনবক্সঃ ওয়ালে একটা কবিতা দিয়েছি আপু, একটা কমেন্ট করেন। নতুন ব্যবসা খুলেছি আপু, আপনার সহযোগিতা চাই। আমার এই লেখাটা কিংবা ড্রেসের পেইজটা আপনার ওয়ালে শেয়ার করেন

কৌতুহলী ইনবক্সঃ কেমন আছেন? কোথায় থাকেন? কি করেন? কি পড়েন? কিসে আছেন?

পারিবারিক ইনবক্সঃ এইটা কি ব্লাউজ পরছো! ক্ষ্যাতের চূড়ান্ত, তোমার রুচি এমন ডাউনগ্রেড হইছে! চুল আঁচরাও নাই ক্যান? আর হাতে ঐটা কি? কে দিছে তোমারে এসব?

সামাজিক ইনবক্সঃ আপু, ঐ উইকএন্ডে ফ্রী আছেন, বাসায় একটা গেটটুগেদার এরেঞ্জ করবো ভাবছি, কিংবা ভর্তা বানাবো নইলে হালিম, চলে আসেন। আফসোস এই ইনবক্সটা সবচেয়ে প্রার্থিত আর সবচেয়ে কম আসে। মাইনষের মনে মহব্বত কমে গেছে। কেয়ামতের আর দেরি নাই। আবার কিছু কিছু থাকে, অনুষ্ঠান করছি, আপনাদের উপস্থিত একান্ত কাম্য

খোঁজ খবর ইনবক্সঃ আপনি তো খবর লন না, কিংবা আপনের কুনু খবর নাই, দিনকাল কেমন যাইতেছে, দেশে আইবেন কবে ইত্যাদি ইত্যাদি

কূটনামি ইনবক্সঃ টাইমলাইনে লেখা পোস্ট করলে তাতে কেউ কমেন্ট করলে ইনবক্সে এসে অন্যজন বলে যাবে, ফেসবুকে বড় বড় কথা বলে, চিনি তো ওদের পরিবারসুদ্ধ। বাবা ঘুষ খেতো, বোনের এই হয়েছে, ভাইয়ের ঐ হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি

পরামর্শ ইনবক্সঃ আপু আপনার লেখাটা পড়লাম। আপনাকে আমার কেনো যেনো খুব আপন মনে হয়। আপনি যে ঘটনাটা লিখেছেন, সেরকম আমার সাথেও হয়েছে, আপু, কি করতে পারি, ওর সাথে কথা বলেছিলাম, সে ওটা পরামর্শ দিয়েছে কিন্তু ওটা করলে তো সেটা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি

লেখার রিভিউ ইনবক্সঃ লেখাটা পড়লাম আপু। এত সত্যি কথা কি করে লেখেন আপনি। আমি আপনার লেখার বিরাট ভক্ত আপু। প্রতিটি লেখাই এত বাস্তব। এ বছর কোনো বই আসবে আপু? আমাকে বলবেন, আমি কিনবো, সবাইকে কিনতেও বলবো

হুমকি ইনবক্সঃ ঐটা কি লিখছেন, ডিলিট করেন নইলে ----------

প্রেম-ভালবাসামূলক ইনবক্সঃ আপনার প্রোফাইল পিকচারটা খুব সুন্দর। কিংবা আপনার হাসিটা খুব জীবন্ত, খুব মিষ্টি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই লাইনে কথাবার্তা কিছুক্ষণ চালাইলে অন্য লাইনে যেতে পারে

*** এটা একটা স্যাটায়ার পোস্ট, প্লিজ ডু নট টেক ইট পার্সোন্যালি*** 



Tuesday, 11 December 2018

নির্জন প্রবাস ও কিছুটা একাকীত্ব

প্রবাসীদের জীবন ভর্তি হাজারও সমস্যা, ঠিক দেশী মানুষদের মতই, তাই কোনটা ফেলে কোনটা নিয়ে লিখবো তালগোল পাকাচ্ছি।সমস্যা তো হাজারও জানি, কিন্তু সমাধান জানি না একটারও।কলেজে অর্থনীতি ছিলো, অর্থনীতির মধ্যে আবার ছিলো“বাংলাদেশ অর্থনীতি”, নামেই পরিচয়।বাংলাদেশের অর্থনীতি মানেই নানা প্রকার সমস্যা কিন্তু আশা’র কথা হলো, সেখানে সমস্যার পাশাপাশি সমাধানও লেখা ছিলো।অবাক হয়ে টিচারদের জিজ্ঞেস করতাম, সমাধান তো সব বইয়ে লেখা আছে, তাহলে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে টিচাররা হয়ত মনে মনে হাসত, মুখে বলত, পড়বা, মুখস্থ করবা, পরীক্ষা দিবা, এর চেয়ে বেশী চিন্তা করার দরকার নেই। জীবনে কত থিওরি, এন্টি থিওরি, ইউটিলাইজেশান, এক্সেপশান মুখস্থ করলাম, পরীক্ষা দিলাম আবার ভুলেও গেলাম। পৃথিবী তার নিজের গতিতেই চলছে, এসব থিওরি তার কিছুই পরিবর্তন করতে পারে নি। তাই আমিও কোন সমাধানের কথা লিখছি না, আমার দৃষ্টিতে, “সমাধান” শব্দটা খানিকটা প্রতারণা কিংবা দুর্বলকে সান্ত্বনা দেয়াও বলা যেতে পারে।
সব প্রবাসীদের জীবন যেহেতু একই ছন্দে ঘোরে না, সবার সমস্যাও এক রকম না। অর্থনীতির চাকা কোথাও স্থির নেই, ক্রমাগত ঘুরছে, নতুন নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান, পুরনোকে বাদ দেয়া ইত্যাদি চলছেই। অনেক প্রবাসীর দিন কাটে আতঙ্কে, চাকুরীটা টিকে থাকবে তো, জীবন যাত্রা’র এই মান টিকিয়ে রাখতে পারবো তো? এই বয়সে না আবার কোন ঝামেলায় পড়ি। আবার অনেক প্রবাসীর দিন কাটে পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পাওয়ার টেনশানে, চলে তো এসেছি, এখন টিকে থাকতে পারবো তো? পাসপোর্টটা পাবো তো হাতে।এত মানুষের জায়গা হচ্ছে, শুধু আমাদের কি আর জায়গা হবে না।আবার অনেকেরই আছে টাকা পয়সার টেনশান, ঠিক দেশি কায়দায়।মাস শেষ হলে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে, বাড়ির মানুষ অপেক্ষা করে বসে আছে তার আশায়।এখানে যতটা বাঁচিয়ে চলা যায়, যত বেশি জমাতে পারবে, তত বেশি পাঠাতে পারবে,বাবা-মা পরিজনেরা ভাল মন্দ দু চারটে খেয়ে বাঁচতে পারবে, পরিবার পরিজন আর একটু ভাল থাকতে পারবে।
গ্লোবাল সিটিজেন অর্গানাইজেশান প্রবাসীদের সাতটি সমস্যাকে ক্রমিকনুসারে সাজিয়েছে। তারা অবশ্য তাদের গবেষনার স্থান হিসেবে “এমেরিকা”কে বেছে নিয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এই সমস্যা গুলো সারা পৃথিবীর প্রবাসীদের ক্ষেত্রেই সমান সত্য। তাদের গবেষনায় উঠে এসেছে, ভাষা শেখা এবং বলতে পারা প্রবাসীদের জন্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।  এ সমস্যার মোকাবেলা করতেই প্রবাসীরা হিমশিম খেয়ে যায়। বাচ্চারা অনেক দ্রুত ভাষা শিখতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে, তবে বড়দের অনেক সময় লেগে যায়। তারপর আসে বাচ্চা বড় করা, তাদের স্কুলের পড়ায় সাহায্য করা এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করা। অনেক সময় বাচ্চারা স্কুলে অন্য বাচ্চাদের দ্বারা বর্ণ বিদ্বেষ, নানা ধরনের হয়রানীর শিকার হয়, অনেক বাচ্চা ক্লাসে, পরীক্ষায় রেজলাট খারাপ করে, তাদেরকে পিছিয়ে দেয়া হয়, বয়সের তুলনায় তারা ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পরে।  এরপর থাকে কর্মসংস্থানের ব্যাপার। সংসার এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখতে অনেকেই যে কাজ পায় তাই দিয়ে জীবন শুরু করে তারপর আস্তে আস্তে উন্নত কাজের সন্ধান করে। সেই কারণেই দেখা যায় আজকে যে ট্যাক্সি চালক সে গতকাল হয়ত কোন স্কুলের টিচার ছিলো কিংবা ইঞ্জিনিয়ার আবার আগামীকালও তাকে অন্য পেশায় দেখা যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রেও প্রবাসীরা বর্ণ বিদ্বেষ এবং নানা ধরনের হয়রানীর শিকার হয়। কিছু কিছু কাজই আছে যেগুলো অন্যরা হয়ত করবে না, সেগুলোর জন্যে প্রবাসীদেরই বাছাই করা হয়ে থাকে।
আছে আবাসন সমস্যা। এ সমস্যাটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আর এমেরিকায় আলাদা রুপে আসে। ইউরপের বিভিন্ন দেশে পরিবারের  সদস্যনুসারে বড় বা ছোট বাড়ি সরকারের তরফ থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়। ভাড়ার অর্ধেকটা ভর্তুকি দেয়া হয়। আবার অনেক জায়গায় প্রবাসীরা নিজেদের সার্মথ্যনুযায়ী বাড়ি ভাড়া করে। এখানে বাড়ি ভাড়া যেহেতু খুব বেশী, অনেক সময় দেখা যায়, ঘিঞ্জি-কোলাহলপূর্ণ এলাকায়, ছোট বাসা ভাড়া করে শুরুর দিকে অনেকেই দিনযাপন করে।  বৈধ কাগজ ছাড়া প্রবাসীরা সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। অনেক সময় ডাক্তার দেখাতে পারে না, সামাজিক কাউন্সিলিংয়ের সুবিধা নিতে পারে না। অন্যান্য মানুষদের দ্বারা নানারকম হয়রানী ও নিপীড়নের শিকার হয়, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও ঘটে। এ সময়টাতেই অনেক বেশী মানসিক সমর্থণ বা সাহায্যের দরকার হয় যেটা থেকে তারা দিনের পর দিন বঞ্চিত থাকে। ভাষার সমস্যার মত ড্রাইভিং লাইসেন্স ও এখানে একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। গাড়ি চালানোর অনুমতি পেতে এখানে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয় এবং বেশীর ভাগ সময়ই এই পরীক্ষাগুলো হয় ইংরেজি কিংবা সে দেশের মাতৃভাষায়। যে অব্ধি ভাষা শেখা সম্পন্ন না হয় সে অব্ধি ড্রাইভিং এর কাগজ থেকে প্রবাসীরাবঞ্চিত থাকে এবং বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেয়া, কাজে যাওয়া ইত্যাদিতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যায়।  যানবাহন সমস্যার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে রাজধানীতে থাকার প্রবণতা অনেক বেশী, যতই শহরতলীর দিকে যাওয়া হবে ততই পাবলিক যানবাহনের সুবিধা কমে যাবে। সেদিকে প্রায় সবাই নিজের গাড়ি নিজে চালিয়ে অভ্যস্ত। অনেকেই নতুন এসে রাস্তা চেনে না, এলাকা চেনে না, ভাষা জানে না বলে অনেক সময় কারো সাহায্যও নিতে পারে না, রাস্তায় বেরোতে বা বাড়ি থেকে বের হতে তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে থাকে।
দেশের মানুষের মতো প্রবাসেও মানুষ হাজারও সমস্যার মধ্যেই বেঁচে থাকে।পার্থক্য হলো, জীবন এখানে আরও নির্মম, আরও সাদা-কালো।মন খারাপের দিনে জড়িয়ে ধরে কাঁদার কেউ নেই, মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই, বলার নেই কেউ, সব ঠিক হয়ে যাবে,মন খারাপ করিস না।সকল জাগতিক সমস্যার সাথে অনেক মানসিক সমস্যাও থাকে।ফেলে আসা প্রিয়জনদের জন্যে মনটা হু হু করে কাঁদে, শরীরটা থাকে বটে প্রবাসে কিন্তু মন তো ঘুরে বেড়ায় সেই চেনা আঙিনায়। এমনি দিন যদিও কোন রকম কেটে যায়, উৎসব-পার্বেনের দিন গুলোতে দেশকে ভেবে চোখের জল গোপন করে না এমন খুব কম প্রবাসীই আছে। আর তো আছে দুটো ভিন্ন দেশের ভাষা, সংস্কৃতির মধ্যে নিজেকে, পরিবারকে মানিয়ে নেয়ার নিত্য দিনের টানা পোড়েন। “পাস্তা-পিজা”সহজ লভ্য, বানাতেও সোজা, দামেও আরাম, ছেলেমেয়েরা খুব ভালবেসে খেয়ে নেয় কিন্তু তাদের স্বামী-স্ত্রীর একবেলা ভাত না হলে চলেই না। একটু ভর্তা, ভাজি মেখে, ডাল দিয়ে অন্তত দু গ্রাস দু গ্রাস ভাত না খেলে দিনের শেষে মনে হয় দিনের আসল কাজটাই করা হলো না। কেউ কেউ ছেলে মেয়েকে বাংলা গান, নাচ শেখায়, দূর থেকে দূরে যায়, মনে গোপন আশা নিয়ে, ছেলে মেয়েরা বাংলা জানুক, শিখুক, রবীন্দ্রনাথ – নজরুলের পরিচয় অন্তত জানুক। দিনের শেষে সকলেই নাড়ী’র টান খুঁজে বেড়ায়। অনেক সময় বাচ্চারা দুটো সংস্কৃতির টানাপোড়েনের মধ্যে পরে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে। স্কুল, বন্ধু, খেলা, দিন যাপন সব হয় এক রকম পরিবেশে কিন্তু বাড়িতে এলে হয়ে যায় অন্য দেশ অন্য সংস্কৃতি আর অন্য পরিবেশ। কোনটা বাস্তব আর কোনটা পরাবাস্তব তাই নিয়ে সমস্যায় পরে যায়। অনেক বাবা-মা চান সন্তান খুব দেশীয় আদব-কায়দা, সংস্কারে বড় হোক, এখানে বাস করলেও অন্তরে যেনো বাংলাদেশ লালন করে, তাদের দৃষ্টিতে তাদের সন্তানরা খুব দ্রুত বিদেশী হয়ে উঠছে, বাচ্চারা এর সাথে তাল মিলিয়ে পারে না, শুরু হয় মত পার্থক্য, মনোমালিন্য। অনেক সময় এই সমস্যা এতটা প্রকট আকার ধারণ করে যে পরিবারের সাথে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার অনেক ইতিহাস আছে। এ সমস্যাগুলো শুধু যে বাংলাদেশের প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়, প্রায় প্রতিটি দেশের প্রবাসীরাই কম বেশি এ সমস্যাগুলোর ভেতর দিয়ে যায়।  শুধু এমেরিকা নয় প্রবাসীদের নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন গবেষনায়ও উঠে এসেছে, ভাষার ভিন্নতা, সংস্কৃতির ভিন্নতা, ফেলে আসা জীবন আর নতুন করে বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আবার জীবন শুরু করার যে মানসিক ধকল সেটাই প্রবাসীদের অনেক বড় সমস্যা (CMAJ)
যারা গান-নাচে আস্থা রাখে না, তারা মসজিদে নিয়ে যায় বাচ্চা, বিদেশে থেকেও যেনো বাচ্চা আল্লাহর নাম জানে, রাসুলের ইতিহাস জানে, দ্বীনের পথে থাকে। মসজিদে দান খয়রাত করে, পরকালের ভাবনা ভাবে। অনেকেই আছে এ দুটোর কোনটাই হয়ত করে না। যতটা সম্ভব যে দেশে থাকে তার সংস্কৃতির সাথেই মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে তারপরও দেখা যাবে, দেশ থেকে বাচ্চাদের জন্যে সুন্দর সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবী কিনিয়ে আনিয়েছে, কোন বিশেষ উপলক্ষ্যে সেসব পরে সবাই সাজগোজ করে ছবি তুলে, ফেসবুকে বা ইন্সট্রাগ্রামে দিচ্ছে। যতদূরে, যে অবস্থায় থাকে না কেন মানুষ, হৃদয়ে দেশ তো লালন করেই, ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে হতে পারে কিন্তু ভালবাসা নিরবিচ্ছিন্ন। দেশ কখনও ছেড়ে যায় না, ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মনসতাত্ব্বিক সমস্যা।বিদেশে মানুষ এমনিতেই একাকীত্বে ভোগে, ব্রিটেনে কয় দিন আগে এ সম্বন্ধে মানুষকে সাহায্য দেয়ার জন্যে আলাদা মন্ত্রনালয় খোলা হয়েছে।এখানে জন্ম নেয়া, বড় হওয়া স্থানীয়দেরই যদি এ অবস্থা সে জায়গায় প্রবাসীদের মানসিক কষ্ট বর্ননাতীত।“বিসর্জন” নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “একাকীত্ব কারে বলে? যবে বসে আছি ভরা মনে,দিতে চাই, নিতে কেহ নাই”। এখানে প্রবাসীরা মোটামুটি উন্নত জীবন যাপন করে, ছিমছাম বাড়ি, গাড়ি, সাজানো গোছানো জীবন। কিন্তু এই সুখ ভাগ করে নেয়ার মত পরিবার, পরিজন, আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। একা একা ভালো থাকা, কি নিদারুণ স্বার্থপরতা। ফেসবুকে ছবি আপলোড দিয়ে কিংবা মোবাইলে বাড়িতে ছবি পাঠিয়ে কি একসাথে বসে সবাই খাওয়া দাওয়া করার, গল্প গুজব করার সেই তৃপ্তি আসে?প্রতিদিনের ছোট ছোট দুঃখ সুখ ভাগ করে নেয়ার আনন্দ কি ছবিতে পরিপূর্ণতা পায়, পায় না।দেশ থাকে সব সময় প্রবাসীদের হৃদয়ের গহনে, হারানো প্রেমের মত, কখনো ছেড়ে যায় না।
“একাকীত্ব” ব্যাপারটিকে আমরা যতটা অবহেলার চোখে দেখি আসলে কিন্তু ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এই লক্ষনটি অন্যান্য অনেক অসুস্থতা কিংবা অস্বাভাবিকতা তৈরী করে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক জীবনে।অনেকেই সিজোফ্রেনিয়া’র মত মানসিক রোগের লক্ষণ হিসেবে একাকীত্বকে দায়ী করে।একাকীত্বের অনুভূতি থেকে বড় ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যার হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে মন্ত্রী ট্রেসি ক্রাউচ বলেন, “এই ধরণের স্বাস্থ্য-ঝুঁকি সে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা উচিত যেভাবে কিনা ধূমপান বা স্থূলতা মোকাবিলা করা হয়।” দুনিয়া কাপানো গায়িকা ম্যাডোনা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ভাগ্যের অন্বেষণে একদা তিনি নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে এসেছিলেন, লন্ডন শহরে তিনি এতটাই একাকীত্বে ভুগছিলেন যে এক বছরের মধ্যে তিনি আবার নিউইর্য়কে ফিরে যান। মনোবিজ্ঞানী মাইক লুহম্যান এবং লুইস.সি.হওকলি সামাজিক অর্থনৈতিক প্যানেল ২০১৩এর প্রতিনিধিত্বমূলক একটি জরিপ চালান। সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলো ১৬,১৩২ জন মানুষ। জরিপের ফলাফল, “বয়স্ক ব্যক্তির একাকীত্বের অন্যতম প্রধান কারণ তাঁদের সামাজিক সম্পর্ক কমে যাওয়া। মাঝেমাঝে আয় কমে যাওয়াও এর একটি কারণ।“ মনোবিজ্ঞানীরা বলেন,“একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক আয় যত বেশি, তার একা হওয়ার সম্ভাবনা তত কম। এই সম্পর্কটি মধ্যবয়সে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যবয়সে অর্থ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বয়সের প্রভাবটা একাকীত্বের ক্ষেত্রে বেশি থাকে। এর সাথেও স্বাস্থ্য বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক সম্পর্কের ব্যাপারটিও জড়িত।“
একাকীত্ব কাটানোর জন্যে প্রবাসীদের অনেকেই একটা অবলম্বন খোঁজে, এবং তাকে অস্বাভাবিক ভাবে আকড়ে ধরে।অনেকে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে, জীবনের সমস্ত জায়গায় বাড়াবাড়ি রকম ভাবে ধার্মিক রীতি নীতির প্রয়োগ করতে থাকে।কেউ কেউ নেশাজাতীয় দ্রব্যের শরনাপন্ন হন।অনেকের দেখা যায়, বাস্তবতা থেকে দূরে থাকতে অন্তর্জাল আসক্তি বাড়াবাড়ি রকমভাবে বেড়ে যায়।ওপরের এই প্রত্যেকটি কারণকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অসুস্থতা হিসেবে দেখা হয় যার অন্যতম প্রধাণ কারণ হিসেবে একাকীত্বকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যরকমও আছে, কেউ কেউ সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন,ভলান্টিয়ার সোশ্যাল ওয়ার্ক, তবে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মাঝে শেষের ব্যাপারটি কম দেখা যায়। একাকীত্ব বোধের এই যন্ত্রণার জন্যে অনেক সময় আবহাওয়া ও একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। ঠান্ডা, বৃষ্টি, বরফ, তুষার দিনের পর দিন এই বৈরী আবহাওয়া ও মানুষের মনোজগতে বিরাট প্রভাব ফেলে। জন্মস্থান আর প্রবাসের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে মানুষ হিমসিম খেয়ে ওঠে।  তার ওপর বন্ধুহীনতা, আত্মীয়হীনতা, পরিজনহীনতা জীবনকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে।
প্রতিটি মানুষ আলাদা, তার ভাবনা চিন্তা সবই আলাদা।একজনের কাছে যেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অন্যজনের কাছে সেটা হয়ত কোন সমস্যা না।আবার জীবনের এক স্তরে যেটা অনেক গুরুত্ব বহন করে অন্য পর্যায়ে এসে সেটার আর তেমন গুরুত্ব থাকে না।ধর্ম, সংস্কৃতি, চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা নিশ্চয়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রবাসীদের জীবনে।এসকল কারণ আছে বলেই তো দেশ ছেড়ে প্রবাসজীবন গ্রহণ করতে মানুষ বাধ্য হয়। এসব দৃশ্যমান সমস্যার সাথে জড়িয়ে থাকে হাজারও অদৃশ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানসিক সমস্যা। দৃশ্যমান সমস্যা চিহ্নিত থাকে বলে তার কিছু সুরাহা হয়ত হয় কিন্তু অদৃশ্য সমস্যার সমাধান খুঁজতে অনেক বেশী ভেতরে উঁকি দিতে হয়। সেটা হয়ে ওঠে না বলে, সেগুলো থেকে অধরা আর অব্যক্ত। তবে আশার কথা এই যে, অনেকেই এই নিয়ে আজকাল কথা বলছেন, এগুলো এখন ওপরে উঠে আসছে আশাকরছি কখনও এগুলোও নিয়েও অনেক কাজ হবে, কিছু না কিছু আলো বেরিয়ে আসবে।

Tanbira Talukder is an accountant by profession. She is a novelist, reciter and human rights activists based in The Netherlands.

Monday, 3 December 2018

ডিপ্রেশন

কবিবর শ্রীজাত বলেছেন,

ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ? -
বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু' কাপ
কেবল মুঠোয় বন্দি কফির একলা কাপ -
ডিপ্রেশনের বাংলা জানি । মনখারাপ ।

ট্রেনে প্রায়ই যাতায়াত করতে হয়, মাঝে মাঝেই ট্রেন লেট, কারণ ট্রেনের নীচে কেউ ঝাঁপ দিয়েছে। এখানে বলে, “পাতা ঝরার মুহূর্ত থেকে নতুন পাতা আসার আগের মুহূর্ত” পর্যন্ত মানুষের বিষাদগ্রস্ততা অনেক বেড়ে যায়।

প্রায়ই আজকাল খবর দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের আত্মহত্যা, তরুণ/তরুণীদের আত্মহত্যা।

“বিষাদ-হতাশা” ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতই একটি মারাত্বক রোগ। এর সম্পর্কে প্রচার হওয়া জরুরী। এর চিকিৎসা হওয়া জরুরী, সর্বোপরি সমাজে এ অসুখটি নিয়ে সচেতনতা আরও জরুরী। বিষন্নতা শুধু মানসিক জায়গাতেই আটকে থাকে না। শরীরে এর প্রচন্ড প্রভাব পরে, ঘুম কমে যাওয়া, ঘুমের মধ্যে ঘেমে ওঠা, দুঃস্বপ্ন দেখা, প্রচন্ড পেটে ব্যথা হওয়া, ক্ষিদে না পাওয়া কিংবা অনেক বেশি ক্ষিদে পাওয়া, কাজ করার আগ্রহ এবং শক্তি কমে যাওয়া, দ্রুত রেগে যাওয়া, আবেগতাড়িত আচরন, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া সবই এর লক্ষণ। চুল পরে যাওয়া, শারীরিক লাবন্য কমে যাওয়া সহ বহুবিধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও আছে। 

মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও ওষুধ তো আছেই, সাথে ইয়োগা, মেডিটেশান, ব্যায়াম, বিষন্নতাকে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। বিষন্নতার ওপর প্রচুর গবেষনা হয়েছে এবং হচ্ছে, নেটে বিনামূল্যেই এ নিয়ে বিস্তর তথ্য পাওয়া যায়।


জীবনের মৌলিক ব্যাপার গুলো নিয়ে যারা খুব সচেতন এবং স্পর্শকাতর থাকেন তারা যখন সমকামিতাকে একটি অসুস্থতা কিংবা বিষন্নতা ফ্যাশন ভাবেন তখন খুব বেদনাদায়ক। আপনার ক্যান্সার হয় নি বলে আর একজনের ক্যান্সার কোন উপহাসের বিষয় নয়। এক এক জন এক এক ব্যাপারে স্পর্শকাতর। মানসিক ধকল সবাই এক ভাবে সামলাতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-খ্যাতিহীন ছাত্রের আত্মহত্যা যেমন সত্যি তেমনি খ্যাতির শিখরে থাকা এমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রেমিকা মেরিলিন মনরোর আত্মহত্যাও ততটাই সত্যি। তাই আসুন “উপহাসে”র পথে না যেয়ে – সাহায্যের পথে যাই। একটি প্রাণ বাঁচলেও বাঁচলো পৃথিবী।

02/12/2018