Sunday, 12 June 2016

বঞ্চনা থেকে নিজেকে দু'দন্ড সরিয়ে রাখতে সাহিত্যেই বড় অবলম্বন

* আপনার গল্প লেখার শুরু কখন, কীভাবে?

আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা দুইই শহরে। শহর মানেই আবব্ধ, ছেলেধরা নিয়ে যাবে কিংবা অচেনা লোকের কাছ থেকে কিছু খাওয়া নিষেধ, তাদের সাথে কথা বলা নিষেধ এভাবেই শুরু হয় শহুরে বাচ্চাদের জীবন। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। এই বদ্ধতার মধ্যে মনের জানালা খোলার একটি মাত্র উপায় ছিলো “বই”, খুব ছোটবেলা থেকেই পড়তে ভীষন ভালোবাসতাম। ইত্তেফাক পত্রিকায় দাদাভাইয়ের পরিচালনায় কচিঁকাচার আসরের নিয়মিত পাঠক ছিলাম, সাথে শিশু, নবারুণ পত্রিকার। পড়তে পড়তেই আসলে লেখার আগ্রহ জন্ম নিলো, বাড়ি থেকে উৎসাহও ছিল লিখতে চেষ্টা করার। সেসব চেষ্টা থেকে একটি গল্প ছোটবেলায় “শিশু” পত্রিকায় ছাপা হয়, এভাবেই হাতেখড়ি

* গল্প লেখেন কেন?

অক্ষমতার ক্ষোভ মেটাবার জন্যে হয়তো অনেকটা। চারদিকে এতো অন্যায়, অবিচার, ভন্ডামী, মুখোশে মুখোশে ঢাকা মানুষ। সবসময় যতোটা প্রতিবাদ করা উচিৎ ঠিক ততো করতে পারি না বলে, নিজের অভিজ্ঞতাগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করি। আমি আসলে ঠিক কল্পনা আশ্রিত কোন গল্প লিখি না। আমার চারপাশের জীবনের রোজকার গল্পগুলোই লিখে রাখার চেষ্টা আমার।

কী ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

চেনা জীবনের চেনা বাস্তবতাই আমার লেখার বিষয়। কল্পনা করে বানিয়ে বানিয়ে গল্প আমার লেখা হয়ে ওঠে না। একটু সহজ কিংবা কঠিন করে বললে, চারপাশে যা দেখি আসলে তাই লিখি।


* পাঠকদের ওপর আপনার গল্পের প্রভাব কেমন?

যেসব পাঠকরা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে চান না তাদের হয়তো একটু রুঢ় সত্যি লাগতে পারে। তবে বেশির ভাগ পাঠকদের ভালো লাগে। কিছুদিন আগে এক পাঠিকার টেলিফোনে শনিবার সকালের ঘুম ভাঙলো। রাতে তিনি আমার “একদিন অহনার অভিবাসন” উপন্যাসটি পড়ছিলেন। প্রথমে ভাবছিলেন এটা আমার গল্প, পড়তে পড়তে তার মনে হলো তার গল্পটি লেখা হয়েছে। সারা রাত পড়ে বইটি তিনি শেষ করেছেন, হাত থেকে রাখতে পারছিলেন না বলে জানালেন। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া লেখক মনকে সজীব করে।

গল্প লেখার সার্থকতা খুঁজে পান?

গল্প লিখে সামাজিক বিল্পব ঘটানোর মত কোন পরিকল্পনা আমার নেই। অনেকসময় নিজের বা নিজের খুব কাছের কারোর দুঃখ, বেদনা গুলো যা প্রকাশ করতে পারা যায় না, লুকিয়ে ফেলতে হয়, সেগুলো লিখে ফেলতে পারলে মনে হয় কাউকে বলতে পেরেছি, মনের ভার নেমেছে, হালকা হয়েছি। সে লেখাটা পড়ে অচেনা অজানা কেউ যখন ইনবক্সে ম্যাসেজ দেয় কিংবা মেইল করে জানায়, মনে হচ্ছে আমার কথাগুলোই লিখেছেন, লেখাটা পড়ে সারাদিন ভাবছি কী করে বুঝতে পারলেন বা জানলেন আমার কথাগুলো, পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসছে ইত্যাদি ইত্যাদি তখন মনের কোথাও প্রশান্তি আসে, মনে হয় লেখার মাধ্যেমে কারো অন্তর ছুঁয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে পেরেছি। তার কাছাকাছি আসতে পেরেছি, কোথাও কিছু রেখে গেলাম হয়তো।  

* প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সমাজে গল্প পাঠের প্রাসঙ্গিকতা কী?

সমাজ যেমন প্রতি নিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, সাহিত্যও ঠিক তার তালেই পরিবর্তন হচ্ছে। সাহিত্য হচ্ছে সমসাময়িক সমাজের দর্পন। কোন একটা সময়কে জানার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে সে সময়ের সাহিত্য। বঙ্কিম, শরৎ কিংবা রবীন্দ্রনাথ না পড়লে আমরা কী করে জানতাম সে যুগে বাঙালী তথা ভারতীয় মেয়েদের সমাজে কী রকম দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হতো।


* একজন পাঠক আপনার গল্প পড়বে কেন?

একজন পাঠককে আমার লেখা পড়তেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। পড়ার মূল কথা হলো জানার আগ্রহ। জানতে চাইলে পড়তে হবে, সে আমার লেখাই হোক কিংবা অন্য কারো। সাহিত্য আসলে বানিজ্যের বিষয় নয় যে, উপাদান বর্ননা করে বলা যাবে, এই এই ম্যাটেরিয়াল আছে এই প্রোডাক্টিতে তাই কনজুমারকে এই জিনিসটিই কিনতে হবে। এখানে ঘটনাটা পুরোই মানসিক, যার লেখার সাথে যে নিজেকে রিলেট করতে পারে, তার লেখাই সে পড়ে। পাঠক হিসেবে আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম নই। অনেকেই যারা আমার সহজ সরল ভাষায় লেখা বাস্তব ঘটনাগুলোর মাঝে নিজেকে দেখতে পান, তারা আমার লেখা পড়েন এবং হয়তো ভবিষ্যতেও পড়বেন।

বাংলা সাহিত্যে গল্পের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে আপনার লিখন প্রস্তুতি কী রকম?

প্রস্তূতি নিয়ে, প্লট ভেবে, হিসেব নিকেশ করে, চরিত্র এঁকে আমার এখনো কিছু লেখা হয়নি। কোন ঘটনা যখন আমাকে পীড়া দেয়, আমার বিবেককে আহত করে, আমার মনে কিছু গুমরাতে থাকে সেগুলোই একটা সময় আমার খাতায় ঝরে পরে। তাই কোন ধারার সাথে সংযুক্ত হয়ে কিছু লেখা বোধহয় আমার আর হয়ে উঠবে না। আমি আমার ধারাতেই লিখে যাবো হয়তো।

* গল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

আমি আশাবাদী মানুষ। সাহিত্য আশার নাম, প্রেরণার নাম। দিনে দিনে লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, মানে পাঠক বাড়ছে। অন্তর্জালের কারণে পড়ার সুযোগও অনেক সহজ হয়েছে। সংসারে পাওয়া না পাওয়ার বঞ্চনা থেকে নিজেকে দুদন্ড সরিয়ে রাখতে সাহিত্যের চেয়ে বড় অবলম্বন আর কী হতে পারে? বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভবিষ্যতে আরো অনেক এক্সপেরিমেন্ট হবে সে বলাই বাহুল্য।

* বিশ্বসাহিত্যে বাংলা গল্পের অবস্থান কোথায়?

বাংলা গল্পের অবস্থান আসলে বাঙালীদের কাছে। সাহিত্যের আঁধার হলো, ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি। নিজ ভাষার, নিজ সমাজের গল্প মানুষকে যতো কাছে টানবে অন্য ভাষা সংস্কৃতির মানুষের কাছে সেটা কল্পনা করা বৃথা। রবীন্দ্রনাথের “গীতাঞ্জলী” নোবেলের জন্যে অনুবাদ করা ছাড়া বিদেশীদের খুব একটা বাঙলা সাহিত্য নিয়ে মাতামাতি করতে শোনা যায়নি। সেদিক থেকে ব্লগের অবস্থান ভাল। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের ওপর লেখা ব্লগগুলো সেদিক দিয়ে অনেক বেশি বহিঃ বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

* আপনার গল্প লেখার প্রেরণা কী?

আমার বা আমার বন্ধুদের না বলা কথাগুলো কিংবা না বলতে পারা কথাগুলোই আমাকে লিখে ফেলার প্রেরণা যোগায়।

* আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশের নেপথ্য গল্প কী?

তেমন উল্লেখযোগ্য কোন গল্প আসলে নেই। অনেকদিন ধরে ব্লগে লেখালেখি করি, কিছু কিছু লেখা মাঝে মাঝে পত্রিকায়ও ছাপা হয়। প্রথম বইয়ের প্রকাশক নিয়মিত ব্লগ পড়ে থাকেন। তিনি ভাবলেন, নির্দিষ্ট কিছু গল্প একসাথে করে একটি বই করা যায়, তিনি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে বইটি প্রকাশ করেন, “পাহাড় আর নদীর গল্প”। তবে  হঠাৎ করে তিনি তার এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে বেশ একটি চমক দিয়েছিলেন, সেই অনুভবটুকু অসাধারণ ছিলো। অনেকের সাথে গল্প সংকলনে আমার লেখাও ছিলো আগে কিন্তু শুধু নিজের লেখাগুলো দিয়ে একটা আলাদা বই, বেশ অন্যরকম অনুভূতি বটে।

* আপনার প্রিয় গল্পকার কারা, কেন প্রিয়?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার প্রিয় গল্পকার। তার লেখা ছোটগল্প গুলো বিষয় বৈচিত্র্য ও লেখার গুনে অনবদ্য। বনফুল, প্রতিভা বসু, হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা কিছু অনবদ্য গল্প আছে যা আমাকে ছুঁয়ে গেছে। কেনো কিছু খুব প্রিয় কেন হয়ে যায় সেটা পোস্টমর্টেম করা আসলে মুশকিল, যা ভাল লেগে যায় তা শুধু ভাল লেগে যায়। এদের প্রত্যেকেই এতো সহজ ভাষায় জীবনের গল্প বলে গেছেন যে তা থেকে দূরে থাকা আমার জন্যে কঠিন।




Tuesday, 7 June 2016

প্রিয় গল্পগুলো

প্রিয় গল্পটি নিয়ে লিখতে বসা বড্ড কঠিন।

আমি অসংখ্যবার আমার অন্যান্য লেখায় এ-কথাটি উল্লেখ করেছি যে, এতো এতো মনোমুগ্ধকর লেখা ছড়িয়ে আছে চারপাশে, তার মধ্যে থেকে একটিকে প্রিয় বলে বেছে নেয়া অনেক শক্ত, অন্তত আমার জন্যে। এছাড়া  সময়ের সাথে, মানসিক অবস্থার সাথে, বয়সের সাথেও রুচি, পছন্দ, মন বদলাতে থাকে। দিনে দিনে দেশ বিদেশের নানা লেখকদের নাম যোগ হয়ে প্রিয় গল্পের তালিকাও দীর্ঘ হতে থাকে।

এমনিতে আমি আমার নিজের ভাষার বই পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, বাংলা সাহিত্যের বিশাল সম্ভার উপচে পড়ছে বিভিন্ন কৃতি লেখকদের অসামান্য সৃষ্টিতে। তার ওপর যতোদিন যাচ্ছে ততোই না-পড়া বইয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে কতো কী জানি না, পড়া হয় নি কিংবা হবে না তার হতাশা জাপটে ধরছে ক্রমশ।

সেই কঠিন কাজের ভার নিয়ে ভাবতে ভাবতে হারিয়ে গেলাম ছোটবেলায়। প্রিয় যা ছিল, প্রিয় তাই আছে। কিছুই হারায় নি, হয়তো হারাবেও না। সেই জ্বলে-ওঠা নিভে-যাওয়া জোনাকি পোকা, আমসত্ত্ব, চালতার আচার, সারা গায়ে সুর মেখে বৃষ্টিতে-ভেজা। না হারিয়েছে গান বা কবিতা, না সেই কাউকে নাম না-বলা হৃদয়গহিনে লুকিয়ে থাকা মানুষটা, চোখের কাজল কিংবা খোঁপার কাঁটা, তেঁতুল বনে জ্যোৎস্না দেখা কিংবা কপালে কারো নামের টিপ-আঁকা। সময়ের সাথে প্রিয় থেকে আরো প্রিয়তর হয়েছে সমস্ত কিছু

অনেকে বেশ বলেন, ছোটবেলায় এঁর লেখা আমার ভাল লাগতো, কিংবা গান বা খাবার। আমি এমন কিছু শুনলে সংশয়ে পড়ে যাই, আমার কি তাহলে কোন অতীত নেই! বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছোটবেলার ভালোলাগার রেশ আজোও আমাকে ছুঁয়ে রেখেছে। উন্মাদ কিংবা টিনটিন সামনে পেলে না-উলটে পারা যায়? কঠিন সময় হয়তো বদলে দেয় অনেককিছুই, শুধু পারে না হয়তো ভেতরের মানুষটাকে একেবারে বদলে ফেলতে তাই ছোটবেলার ভাল লাগার রেশ কোথাও না কোথাও রয়েই যায়। মানসিকতা, রুচি বদলে গেলেও, ভেতরে আবেশটা কোথাও রয়ে যায়।

আনমনে প্রিয় তালিকা ওল্টাতে ওল্টাতে যে-নামটি প্রথম মনে এলো, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা আমাদের আটপৌরে বাঙালিদের সবচেয়ে কাছের যে-মানুষটি, সেই রবি ঠাকুর। গল্পগুচ্ছের মোহে বয়ঃসন্ধিকাল কাটায় নি এমন বাঙালি খুব কম পাওয়া যাবে। বিভিন্ন স্বাদের গল্পে ঠাসা প্রায় সাতশ পৃষ্ঠার এই বইটি নেই এমন খুব কম বুকশেলফ আছে বাঙালি বাড়িতে। কাবুলিওয়ালা, গুপ্তধন, পোষ্টমাষ্টার, ল্যাবরেটরি, হৈমন্তী, নষ্টনীড়, মধ্যবর্তিনী, কঙ্কাল, সমাপ্তি প্রায় প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে ফিরে।

সেই গেরুয়া দুই মলাটের ভেতরে অজস্র কাব্যিক ও বাস্তবের চরিত্রের রূপমহলের চলচ্চিত্রে চোখ ধাঁধায়। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেও এখনো যার মুখ সবার প্রথমে আমার মনে ভেসে ওঠে সে হলো ‘মিনু’। মৃন্ময়ী বললেই বেশি কাব্যিক শোনায় কিন্তু তাতে সে বড্ড দূরের হয়ে যায়। মিনু’ বললে বুদ্ধিদীপ্ত দুষ্ট চোখের যে-নিষ্পাপ চেহারাটি মনে ভেসে ওঠে, সে যেন বড্ড চেনা, পাশের বাড়ির মেয়েটি। পিঠ পর্যন্ত ছোট ঈষৎ কোঁকড়ানো রুক্ষ চুলের শ্যামলা মেয়েটি উঁচু করে বাঙালি কায়দায় শাড়ি পরে বনে বাদাড়ে, উঠোনে মাঠে, গাছে, নদীতে, ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, আপন মনে নেচে বেড়াচ্ছে যা হলো গেছো মেয়ের রাবীন্দ্রিক প্রতিকৃতি

বিভূতিভূষণের ‘দুর্গা’-র আদল কি খানিকটা ‘মিনু’-তে ছায়া ফেলে? নাকি মিনু সেই লৌকিক দেবী বনদুর্গার রূপায়ণ?

বাংলার শাশ্বতরূপ মেনে সে বাপের আদরের মেয়ে। কিন্তু গতানুগতিক ধারার চেয়ে আলাদা, সাধারণের চোখে লক্ষ্মীছাড়া, দুরন্ত। যেসব কাজে সাধারণ মেয়েরা লজ্জা পেয়ে গায়ের কাপড় দিয়ে নাক মুখ ঢেকে ফেলে, সেসব ঘটনা সে কোঁকড়া চুল পিঠে দুলিয়ে, নিষ্পাপ হরিণ চোখ মেলে, নিদারুন কৌতূহলী চোখে কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। তারপর নিজের বালক সঙ্গীদের কাছে নিজের কল্পনার রঙ মিশিয়ে নিজের ভাষায় বর্ণনা করে।

এই যে শ্রীমান অপূর্বকৃষ্ণ-এর গ্রামে ফেরার ঘটনাটাই ধরা যাক। গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে অপূর্ব কোলকাতায় থেকে পড়ে, তাকে গ্রামসুদ্ধ কে না চেনে। ছুটিতে গ্রামে ফিরে এসে অনেকদিনের অনভ্যস্ততায় সে স্যুটকেস হাতে জুতোশুদ্ধ নৌকোঘাটের কাদায় পড়ে গেলে অন্য মেয়েরা এ-দৃশ্য দেখে লজ্জায় হয়তো পালিয়ে যেতো কিংবা দেখেও না-দেখার ভান করতো। কিন্তু মিনুর দ্বিধাহীন বাঁধভাঙা উচ্চহাসিতে অপূর্বই হয়ে গেলো অপ্রস্তুতসত্যজিতের চলচ্চিত্রে এই দৃশ্য যেন সরাসরি গল্পগুচ্ছের পাতা থেকে উঠে-আসা।

সমবয়েসি মেয়েদের সাথে মিনুর ততো ভাব নেই। গ্রামের গুরুজনস্থানীয় পুরুষেরা তাকে স্নেহের চোখে দেখলেও বয়স্থা নারীরা তার ওপর নিদারুণ বিরক্ত ছিল। মিনুর মা এ সমস্ত নিয়ে দারুণ বিপাকে ছিলেন কিন্তু মিনুর বাবা দূরে থাকে, মেয়েকে যারপরনাই স্নেহ করে, তাই মিনুর মা পারতপক্ষে হাত তুলতো না মিনুর গায়ে  

আচ্ছা, এতো এতো গল্প বা চরিত্র থাকতে হঠাৎ ‘সমাপ্তি’ মানে অপূর্ব-মিনুই বা কেন মনে ভাসলো? তা কি এই অস্থির সময়ের কারণে?

যে-সময়ের মধ্যে আমরা এখন বাস করছি তার সাথে সেই সময় কি আসলে মেলানো যায়? অনেকদিনের চেনাজানা, পছন্দের সহপাঠী কিংবা সহকর্মী যখন জীবনসাথীতে রূপ নেয়, অনেক সময় দেখা যায় তারপর সে এক ভিন্ন মানুষ। যে-মানুষটিকে চিনে দুজন দুজনের কাছে এসেছিলো, এ আসলে সে নয়। যে-সময়ে দুজন মানুষ দুজন মানুষকে মতের কিংবা মনের অমিলের কারণে বরদাস্ত করতে পারে না, সেসময়ে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতেও কষ্ট হয় অপূর্ব একবুক ভালোবাসা নিয়ে নীরবে তার বালিকা বধূর পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। অপূর্ব তার বউকে কোন সময় বেঁধে দেয়নি, শর্ত দেয় নি, দিয়েছে একবুক শর্তহীন ভালবাসা।

কিন্তু সব ঘটনার সমাপ্তিই কি ঠিক এরকম মধুর?
সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলীও বালিকা বয়সে বউ সেজেছিলো, মাত্র এগারোতে তাকে বড় ঘরের রুগ্ন একটি পাত্রের হাতে তুলে দেয়া হয় যে নিজের অসমর্থতা ঢাকতে দীপাবলীর ওপর প্রথম রাতেই হামলা করে। পাত্রের ওপর তার পরিবারের চাপ ছিলো যেকোনো ভাবেই দীপাবলীকে গর্ভবতী করতে হবে। মাত্র বাহাত্তর ঘন্টা সে বিবাহিত ছিলো তারপরই বিধবা। শুরু হলো সংগ্রামী জীবন যা তাকে বালিকা থেকে এক ধাক্কায় পরিণত মানুষে পরিবর্তিত করে ফেলে। দুঃস্বপ্নের এই নিষ্ঠুর অতীতের কৃষ্ণচিহ্ন মুছে ফেলে সে শুরু করতে চেয়েছিল নতুন জীবন, জয় করতে চেয়েছে নিজের ভাগ্য। আর সেই চলার পথেও কাছের মানুষের বীভৎস, লোভী চেহারা তাকে বার বার আঘাত করে, কিন্তু পারে না পর্যুদস্ত করতে। তার জীবন এসে মেশে নাটকে, আবার জীবন কেবলই ছাপিয়ে যায় নাটকে। মিনু বয়ঃসন্ধিকালের যে সমস্ত ভালোবাসা আর আনন্দের সমাপ্তির মাঝে দিয়ে গেছে সেরকম কিছুতে কি অধিকার ছিলো না দীপাবলীরও? 

সমরেশ মজুমদারকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘দীপাবলী’ তিনি কেন আঁকলেন? লেখক জবাব দিয়েছিলেন, তিনি একবার তরুণ বয়সে জলপাইগুড়ি জঙ্গলে হাঁটছিলেন, সেখানের চা বাগানে বছর দশ/এগারোর একটি বেশ হাসিখুশী বিধবা মেয়েকে দেখেছিলেন সপ্রতিভ মুখে হাসছে, বেড়াচ্ছে, ঘুরছে। কেনো যেনো সেই মেয়েটির ছবিটি তাঁর মাথায় গেঁথেছিলো। সেই মুখটি মনে করেই ‘দীপাবলী’-কে রচনা আর কিছুতেই তিনি তাঁর উপন্যাসের ‘দীপাবলী’-কে হারতে দিতে চাননি তার জীবন সংগ্রামে, তাই ‘সাতকাহন’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শান্তিনিকেতনে জানিয়েছিলেন ‘সমাপ্তি’ গল্পের পটভূমির কথা। রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁর জমিদারি দেখা উপলক্ষে একটি নদীর তীরে নৌকা লাগিয়েছেননৌকায় বসে তিনি কাজ করছিলেন। দেখলেন একটি বেশ বড়ো মেয়ে, অবিবাহিত, নদীর তীর থেকে তাঁর নৌকার দিকে দেখছে। তার সরল সতেজ দৃষ্টি, চলাফেরার মধ্যে একটি সহজ ফূর্তির ভাব দেখে রবীন্দ্রনাথের খুব ভাল লাগলো। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে সেরকম ভাব তিনি দেখেনই নি বলা চলে। তারপর দিন দেখলেন তাঁর পাশের নৌকায় চাল, ডাল, তেল, নুন মশলা বোঝাই হচ্ছে আর সে মেয়েটিকে কনে সাজিয়ে অনেকে মিলে তার পাশের নৌকায় নিয়ে আসছে। মেয়েটি কিছুতেই নৌকায় উঠবে না, তাকে অনেক জোরজার করে নৌকায় তোলা হলো।

সচরাচর মেয়ে পাঠাবার সময় যে কান্নাকাটি হয় তার কিছুই সেখানে ছিলো না। বরং অনেকের মধ্যে বেশ আমোদের ভাব ছিলো। পাশের নৌকাটি ছেড়ে গেলে, তীরের স্ত্রীলোকেরাও চলে গেলেন। দূর থেকে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুনতে পেলেন, একজন স্ত্রীলোক আর একজনকে বলছেন, “ওকে তো জানো বোন, ও ওই রকমই। কত করে বললাম, পরের ঘর করতে যাচ্ছিস, বেশ সাবধানে থাকিস, ঘাড় হেঁট করে থাকিস, উঁচু করে কথা বলিস নে, কিন্তু সে কি তা পারবে” ইত্যাদি ইত্যাদিএই ঘটনাটিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ লেখার পটভূমি। কিন্তু নৌকোঘাটে দেখা সেই তেজি মেয়েটির ‘সমাপ্তি’ কি রবীন্দ্রনাথের কল্পনার ‘সমাপ্তি’-র মতো হয়েছিলো? তার স্বামী কি তার মন বোঝার চেষ্টা করেছিলো? নাকি বাকি হাজার হাজার লুকনো কান্নার গল্পের মাঝেই মিশে গেলো সেই গল্পটি? অজানাই হয়তো রয়ে গেলো সেই কাহিনি

উপন্যাস কেনো শুধু, যদি আমাদের চারপাশে তাকাই বাংলাদেশের অনেক মেয়ের জীবনেইতো বয়ঃসন্ধিকালের সমাপ্তি অনেক করুণ। যদিও আমরা বাঙালি মেয়েরা আমাদের একান্ত ব্যাপারগুলো বাইরে বলতে ভয় পাই, এড়িয়ে যাই কিন্তু এর ভেতরও কেউ কেউ প্রথা ভেঙে কিছুতো লিখছেনতসলিমা নাসরিন তাঁর ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটিতে লিখেছেন তাঁর বয়ঃসন্ধিকালের এবং তারও আগের অনেক নিপীড়নের কথা। লোভী পুরুষের অনেক অযাচিত স্পর্শ শিশুকালেই নিজের শরীর সম্পর্কে মেয়েদের মনে অজানা ভয়, ক্ষেত্রবিশেষে খানিকটা বিতৃষ্ণা এনে দেয়। পদে পদে মেয়েদেরকে ঘরেই করা হয় বঞ্চনা, নিপীড়ন। ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করে, মেয়েকে পশ্চাৎপদ করতে প্রথমে উদ্যত হয় তার একান্ত আপনজনেরা। সবার কি আর মিনুর মতো অবাধ স্বাধীনতায় পাখা মেলে হাওয়া কাটার সুযোগ হয়? নাকি অপূর্বেরা গল্প উপন্যাস ছেড়ে বাস্তবের স্ত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ায় অপূর্ব-পছন্দ নিয়ে?

এতো বড় ঘরে সেধে বিয়ে হলো মিনুর, কিন্তু বেচারি বুঝতেই পারে নি কী সে পেলো। বরং তার খেলাধূলা, ঘোরাফেরাতে বাধা-পড়ায় সে আরো বিরক্ত হয়ে উঠলো। অপূর্বকে সে তার জন্যে দায়ী করে তাকে দূরে ঠেললো। অপূর্ব মিনুর ভুল ভাঙানোর জন্যে, তার কাছে যাওয়ার জন্যে মিনুর সব খেলার, কাজের, দুষ্টুমির সহচর হলো। যেভাবেই হোক বউয়ের মন তাকে জয় করতে হবে। মনে মনে অপেক্ষা করতে থাকলো সে, কখন মিনু বুঝতে শিখবে, সংসারের দায়িত্ব নেবে নিজের মনে করেছুটি ফুরিয়ে আসাতে, মিনুকে তার মায়ের কাছে রেখেই অপূর্ব কোলকাতা রওয়ানা হলো। যাওয়ার সময় স্ত্রীর কাছে একটি ‘চুম্বনের’ আবদার করেও অবুঝ মিনুর কাছে নিরাশ হলো। মিনু উপলব্ধিই করতে পারেনি স্বামী তার কাছে কী চেয়েছে। মিনু জানে অপূর্ব তার সকল দুষ্টুমির সহচারী যে তাকে তার বাবার মতো সবকিছুতে প্রশ্রয় দিয়ে যাবে, বিনিময়ে কিছুই চাইবে না।
অপূর্ব ও মৃন্ময়ীর তখনকার মানসিক অবস্থা রবীন্দ্রনাথেরই লেখা “নববঙ্গদম্পতির প্রেমালাপ  কবিতা থেকে আমরা অনুভব করতে পারি,
বর।         তোমার অপার প্রেমপারাবার,
            জুড়াইতে আমি এনু তাই।
       বলো একবার আমিও তোমার,
            তোমা ছাড়া কারে নাহি চাই।
       ওঠ কেন, ওকি, কোথা যাও সখী?
                     
                   সরোদনে
কনে।
       আইমার কাছে শুতে যাই!

দু-দিন পরে

বর।  কেন সখী, কোণে কাঁদিছ বসিয়া
              চোখে কেন জল পড়ে?
              বসন্ত কি নাই, বনলক্ষ্মী তাই
              কাঁদিছে আকুল স্বরে?

কনে      পুষি মেনিটিরে
              ফেলিয়া এসেছি ঘরে

বর   গুন্গুন্ছলে  কার নাম বলে
            চঞ্চল যত অলিকুল?
        কানন নিরালা,  আঁখি হাসি-ঢালা,
            মন সুখস্মৃতি-সমাকুল
        কী করিছ বনে কুঞ্জভবনে?
কনে
       খেতেছি বসিয়া টোপাকুল

বর   জগৎ ছানিয়া কী দিব আনিয়া
            জীবন যৌবন করি ক্ষয়?
       তোমা তরে, সখী, বলো করিব কী?
কনে
       আরো কুল পাড়ো গোটা ছয়

বর   তবে যাই সখী, নিরাশাকাতর
            শূন্য জীবন নিয়ে
        আমি চলে গেলে এক ফোঁটা জল
            পড়িবে কি আঁখি দিয়ে?
বিষাদিনী বসি বিজন বিপিনে
            কী করিবে তুমি প্রিয়ে?
       বিরহের বেলা কেমনে কাটিবে?
কনে
       দেব পুতুলের বিয়ে

অপূর্ব যখন ছিলো তখন অপূর্বের জন্যে বিশেষ কিছু অনুভব না করলেও, অপূর্ব চলে যাওয়ার পরে তার শূন্যতা মিনুকে অন্য মানুষে রূপান্তর করে দিলো। পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলার চেষ্টা করে দেখলো মন বসে না, নিজে নিজে একা একা বাগানে ঘুরে দেখলো আগের মতো ফুল চুরি কিংবা ফল চুরি কোনটাই তাকে আনন্দ দেয় না। বন্ধুদের সঙ্গও পানসে হয়ে গেলো। অপূর্বের জন্যে তার সারাবেলা মন কেমন করতে থাকলো সেটা সে কাউকে বলতেও পারলো না। এই প্রথম সে লজ্জা অনুভব করলো, জানলো সব কথা সব সময় মুখ ফুটে বলা যায় না।

সংসার কী জিনিস যে কখনো জানতোই না, সে ঘরের কাজে মন দিলো, শেখার আগ্রহ তৈরি হলো ভেতর থেকে। আস্তে আস্তে শুরু হলো মিনুর বালিকা বেলার সমাপ্তি। মিনু অপূর্বের চিঠি কিংবা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনে যাচ্ছে সারাবেলা। শুধু আচার রোদে দিয়ে আর প্রদীপের সলতে পাকিয়ে কী করে সারাদিন কাটাবে সে! বিরহে কাতর তার প্রতিটি প্রহর, কাটছে একেলা বিরহের বেলা, কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারছে না। মনে মনে ভেবে যাচ্ছে হয়তো অপূর্ব তার ওপর ভীষণ রেগে আছে, অভিমান তো সে অনুভব করতেই পারছে।

অপূর্ব ধনীর তনয়। ছুটিতে বাড়ি না-আসায় অপূর্বের মা তার স্ত্রীকে নিয়ে কোলকাতা যেয়ে ছেলের মানভঞ্জন করে। মায়ের সাথে পুত্রের মান অভিমানের সমাপ্তি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অশ্রুসিক্ত আবেগপূর্ণ চুম্বনে স্ত্রী হিসেবে মিনুকে কাছে পাওয়ার আকুলতার সমাপ্তি। দুরন্ত মিনুর সদর্প সংসারে প্রবেশের মাঝে দিয়ে কৈশোরের সমাপ্তি। আর তারপর হ্যাপিলি এভার আফটারল্যান্ডের সুবাতাস।

আর এখন চারদিকে এতো পাওয়া না-পাওয়ার মধ্যে দিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের জীবন কাটছে। সম্পর্ক মানেই বেশির ভাগ সময় বিশ্বাস অবিশ্বাসের অম্লতিক্ত দোলাচলঅনেক প্রতীতি নিয়ে শুরু করা সম্পর্কেরও সমাপ্তি হয় বিচ্ছেদে। তাই কঠিন বাস্তব থেকে ছুটি পেতে গল্প হলেও খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে অপূর্ব মৃন্ময়ীর মিলনমধুর ‘সমাপ্তি’-কে।

তানবীরা
১৮/১১/২০১৪                



Monday, 30 May 2016

মাছরাঙা টিভি আর জিপিএ কান্ড




ফেসবুকে আজকে সারাদিন গেলো জিপিএ ফাইভের ভিডিও’র তোলপাদেখে। অনেকেই দেশের পড়াশোনার মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে স্ট্যাটাস লিখেছেন। আবার অনেকেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, এথিক্স, সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়ে লিখেছেন। আমি ভাবছি সমস্যাটা কী আজকের? নাকি ফেসবুক হওয়াতে সমস্যা ডিটেক্ট করা সহজ হয়েছে আমাদের জন্যে? নাকি সাংবাদিক করাতে কাজটি অন্যায় হয়েছে, নিজেরা করলে ঠিকাছে?

নিজের এস।এস।সি, এইচ।এস।সির এর রেজাল্টের কথা ভাবছি। যেদিন রেজাল্ট বের হতো, কখনো কথা না বলা প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের বাবা মা, বাবা মায়ের বন্ধুরা কে না রেজাল্ট জানতে চাইতো। বেশীর ভাগই যাই রেজাল্ট হোক না কেন, শুভেচ্ছা জানাতেন, অনেকে আবার তার নিজের কে কে আমার থেকে কতো বেশি ভাল করেছে তার লম্বা ফিরিস্তি দিতেন। এ ছাড়া দু চার জন অতিরিক্ত শিক্ষিত, দায়িত্বশীল, পাকনা মুরুব্বী অবশ্যই থাকতেন, যারা এস।এস।সির রেজাল্ট শোনার সাথে পাস কোর্সে পড়ানো হবে, এমন সব ঐতিহাসিক ঘটনার প্রশ্ন, এনসাইক্লোপেডিয়া, এন্টার্কটিকা জাতীয় বানান, ট্রান্সলেশান, বাগধারা, সাধারণ জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে দিতেন। মুখের ওপর প্রমান করে দিতে চাইতেন, কত কম জেনে আমরা সত্তর পচাত্তর ভাগ নম্বর নিয়ে পাশ করেছি, আমাদের বয়সে তারা কত বেশী জানতেন। আমি অবশ্য ফাইটার ছিলাম, চিঁ চিঁ গলায় বলার চেষ্টা করতাম, এগুলো তো সিলেবাসে ছিলো না, তখন আর এক দফা অপমান, সিলেবাসের বাইরে বোকা গল্পের বই পড়ে এতো সময় নষ্ট করছি, কাজের বই পড়লে কতো কাজ হতো। আত্মীয়দের অপমান শেষ হলে শুরু হতো বাবা মায়ের রোষ। কেন গল্পের বইয়ে মুখ গুঁজে পরে থাকি, জ্ঞানের বই পড়ি না। আমি জানি, আমার মত এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আমাদের সময়ে আরো অনেকেই হয়েছে।

এটাতো আজকের অসুখ না। মুখের ওপর অপমান করা বাংলাদেশীদের চিরন্তন রোগ বরং ওটা না করতে পারলেই তাদের কষ্ট লাগে। সেটা ছেলে মেয়ের পরীক্ষার রেজাল্ট হতে পারে, মেয়ের বিয়ে নিয়ে হতে পারে, ছেলের চাকরী কিংবা কোরবানীর গরু নইলে ঈদের জামা। বাড়িতে ঢুকেই প্রথম প্রশ্ন হতো, তোমার রোল নম্বর কত? ক্লাশে কয়জন ছাত্র? আজকে এতো নীতির কপচাকপচি, এতো তাড়াতাড়ি আমরা বদলে যাবো! আমি হলফ করে বলতে পারি, আমাদের জেনারশানের আমরা এ অপমান খেয়েই বড় হয়েছি।


প্রতিবার বইমেলাতেও টিভি ক্যামেরা সাথে নিয়ে এই ফাজলামোটা করা হয়। বেশ অনেক আগেই লিখেছিলাম এই নিয়ে। লেখার লিঙ্ক http://www.amrabondhu.com/tanbira/6355

Thursday, 26 May 2016

মানুষ মানুষের জন্যে



বাংলাদেশের জনপ্রিয় প্রয়াত লেখক ডঃ হুমায়ূন আহমেদের লেখা “হিমু” উপন্যাসটা প্রথমে ভাল লাগলেও শেষের দিকে আর সিরিজ গুলো পড়তে কোন আগ্রহ পেতাম না। একই রকম লাগতো অনেক সময় মজার পরিবর্তে কিছুটা ছ্যাবলামোও মনে হতো। তবুও তাতে লেখা একটা বিষয় বারবার মাথায় আসে। “হিমু”র বাবা হিমুকে (হিমালয়) মহামানব তৈরী করতে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, বইটিতে বার বার ঘুরে ফিরে লেখক লিখেছিলেন। ট্রেনিং দিয়ে কী মহামানব তৈরী করা যায়? আজকাল মনে হয়, মহা মানব তৈরী করা না গেলেও হয়তো, মানুষ অনেকটাই বানানো যায়।

এদেশের বাচ্চাদের কে প্লে স্কুল থেকে হাতে বানানো জিনিস এবং সেবা প্রদানের মাধ্যমে টাকা অর্জন শেখানো হয়। স্কুলে জিনিস বানিয়ে, স্কুলেই বিক্রি করে, স্কুলেই সেই টাকা কোন মহৎ কাজের জন্যে দান করা হয়। সেই দান বেশীর ভাগই সময়ই যায় তৃতীয় বিশ্বের কোন দরিদ্র দেশের কোন সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে। চার বছর বয়স থেকেই তাদেরকে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কাজেও বাধ্যতামূলক ভাবে অংশ গ্রহন করতে হয় বারো বছর বয়স থেকেই শেখানো হয়, পড়াশোনা করছো ভাল কথা, সে তো নিজের জন্যে, মানুষের জন্যে, দেশের জন্যে, দশের জন্যেও কিছু করো জানো, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে নিজের দেশে দরিদ্র, নিপীড়িত, সাহায্য প্রার্থী নেই তাহলে অন্য দেশে যাও কিন্তু জীবনে সত্যি কিছু করো।

ক’দিন আগে আমাদের বাসার কাছের হাই স্কুলের পরিকল্পনা জানলাম, পেরুতে বাড়ি বানাতে হবে, সেখানে অনেকের বাড়ি নেই। প্রথম ক্লাশ থেকে পঞ্চম ক্লাশ পর্যন্ত সবাই সে জন্যে পয়সা যোগাড় করবে। ষষ্ঠ মানে ফাইন্যাল ক্লাশের বাচ্চারা যাবে বাড়ি বানাতে। তারা সত্যি সত্যি ইট, কাঠ জোড়া দিয়ে, নিজেরা গায়ে গতরে খেঁটে বাড়ি বানাবে সেখানকার দুস্থ গরীব লোকদের জন্যে। ফেসবুকে গ্রুপ বানিয়ে সেখানে কর্মরত বাচ্চাদের ছবি, কাজের অগ্রগতি সব জানানো হচ্ছে ছবি দিয়ে, পোস্ট দিয়ে।

টাকা কীভাবে যোগাড় করবে? প্রত্যেক কে  নিম্নে ত্রিশ ইউরো যোগাড় করতে হবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেটি শুরু করবে নিজের পকেট মানি দিয়ে নিজের পকেট মানির পর বাবা মা, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, চেনা জানার মধ্যে থেকে নিতে হবেতার জন্যে ক্লাশে ট্রেনিং দেয়া হয়েছে, কেউ দিতে না চাইলে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না, তাকে বিনয়ের সাথে ধন্যবাদ দিয়ে, মাথা নীচু করে চলে আসতে হবে। টাকা দেয়া প্রত্যেকের ইচ্ছে, কাউকে জোর করা যাবে না। তারপর গ্রুপ করে দেয়া হয়েছে ক্লাশ থেকে, স্কুলের সীমানা থেকে প্রত্যেকটি বাচ্চা একেক দলে ভাগ হয়ে আট দশমিক এক কিলোমিটার হাঁটবে, এই পথের মধ্যে যত বাড়ি, পথচারী পরবে তাদের কাছে তাদের পিগি ব্যাঙ্ক বাড়িয়ে ধরে সাহায্য চাইবে। স্কুলে যেয়ে পিগি ব্যাঙ্ক খুলে টাকা গুনে দেখা হবে।

বারো থেকে আঠারো, প্রতি বছর তাদেরকে একবার এ ধরনের কিছু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেও, এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি থাকবে, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের সাহায্যে তুমি কী করেছো? যার কারণে দেখা যায়, মেধাবী সব ছেলে মেয়েরা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের অনেক প্রকল্পে, উন্নয়নের কাজে নিজের মেধা আর পরিশ্রম ব্যয় করছে। স্বার্থপরের মত শুধু নোট মুখস্থ করে গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাবে, ভাল চাকরি করে দামী গাড়ি হাঁকাবে এর নামই কী তবে মানব জীবন? সমাজের প্রতি, পৃথিবীর প্রতি, মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, সেটাও জানতে হবে, শিখতে হবে না? কে সে শেখাবে তা? হ্যাঁ রাষ্ট্র ... তার দায়িত্ব নিয়েছে।

মানুষ বানানোর মত আবার স্বার্থপর অমানুষও বানানো যায়। আমাদের দেশের বাচ্চাদের ছোট থেকে শেখানো হয়, বাড়িতেও তোমার কোন কাজের দরকার নেই, তুমি শুধু পড়বে আর রেজাল্ট ভাল করবে কারণ বড় হয়ে তোমাকে অনেক টাকা রোজগার করতে হবে। হয়তো বাড়িতেই সেই বাচ্চাটার সম বয়সী আর একটা বাচ্চা আছে যে তার সব কাজ করে দিচ্ছে। সেই বাচ্চাটিকে অবহেলা করে নিজের কাজে ব্যবহার করতে সেই বয়স থেকেই তাকে শেখানো হয়ে যায়। অন্যেকে টেক্কা দিয়ে ওপরে উঠে যাওয়ার এই নিম্ন মনোবৃত্তি নিজ পরিবার থেকেই বাচ্চারা প্রথম শেখে। কাউকে সাহায্য করবে না, খেলা ধূলা, গান বাজনা ইত্যাদি করে সময় নষ্ট করা যাবে না। বি।সি।এস দিতে হবে, বিদেশ যেতে হবে, নিজের ক্যারিয়ার, নিজের ভবিষ্যত সব সব নিজের নিজের নিজের জন্যে

না স্কুলে না পরিবারে না সমাজে বাচ্চাদের কোন সুযোগ আছে, পরের জন্যে কোন কিছু করার। তারা কাউকে করতে দেখে না, তারা জানে না “পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি” কী বস্তুর নাম। এই নেতিবাচক মনোবৃত্তির ফল আজকের এই অস্থির সমাজ। স্বার্থপর সমাজে রোজ নানান ঘটনা ঘটে চলছে, কেউ তা সামাল দিতে পারছে না, নাভিশ্বাস উঠছে সবার। মগজে পচন ধরেছে তাই সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। গত চল্লিশ বছর ধরে যে দিকে সমাজের মানসিকতা দৌড়েছে, আজ তারই ফল সবাই ভোগ করছি। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সবাই শক্ত করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। নৈতিকতা তো নেই কোথাও ধর্ম যদি রক্ষা করে এই সমাজকে। ধর্ম না কর্ম মানুষের পরিচয় নির্ধারন করবে?

পাদটীকাঃ ধর্মহীন রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসে কয়েদীর অভাবে কয়েকটি জেল বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকবার নিউজে এসেছে আর বাংলাদেশে যত অপরাধী জেলে আছে তার চেয়ে কয়েক গুন বেশি বাইরে খোলা হাওয়ায় ঘুরছে

পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !
 মুর্খরা সব শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ,–
গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো
কাজী নজরুল ইসলাম